hadith book logo

শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৫

চিন্তা–বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ

‘‘দ্বীন বা ধর্মের ব্যাপারে কোনরূপ জোর-জবরদস্তির অবকাশ নেই। কেননা প্রকৃত ও নির্ভুল সত্য-পথ অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে ভিন্নতরভাবে সুস্পষ্ট ও শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।’’ (সূরা বাকারাহঃ ২৫৬)

أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ

‘‘তুমি কি লোকেদের ওপর জোর-জবরদস্তি চালাবে যেন তারা মুমিন হয়?’’ (সূরা ইউনূসঃ ৯৯)

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمُ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ ۖ فَمَنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۖ وَمَا أَنَا عَلَيْكُم بِوَكِيلٍ

‘‘বল হে জনগণ! তোমাদের নিকট মহাসত্য উপস্থিত হয়েছে তোমাদের রব্ব্-এর নিকট থেকে। কাজেই যে লোক হেদায়েত গ্রহণ করবে, সে হেদায়েত গ্রহণ করবে নিজেরই কল্যাণের উদ্দেশ্যে। আর যে লোক গুমরাহ হয়ে গেল, তার গুমরাহীর কুফল তাকেই ভোগ করতে হবে। আমি তোমাদের উকীল নই।’’ (সূরা ইউনূসঃ ১০৮)

এই আয়াতসমূহ থেকে মানুষের সমাজ জীবনের কোন-না-কোন দিক সম্পর্কে সুস্পষ্ট পথ-নির্দেশ পাওয়া যায়। এতদ্ব্যতীত কুরআন মজীদের একটি সূরায় এক সঙ্গে ‘দশটি উপদেশ’ উদ্ধৃত হয়েছে। হযরত মূসা’র শরী’আতের দশটি উপদেশ থেকে তা সম্পূর্ণ ভিন্নতর; কাজেই কুরআনে বিশ্বাসী লোকদের এ দশটি উপদেশ মন-প্রাণ দিয়ে শোনা ও গ্রহণ করা কর্তব্য। বস্তুত তাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন পুনর্গঠনের জন্যে এ ‘দশটি উপদেশ’ যাতে ভিত্তি প্রস্তরের কাজ করতে পারে সে উদ্দেশেই এগুলো কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে। উপদেশগুলো হচ্ছেঃ

১. আল্লাহর সাথে একবিন্দু শিরক করবে না, তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

২. পিতা-মাতার সাথে অতীব উত্তম ব্যবহার করতে হবে।

৩. দারিদ্রের কারণে সন্তান হত্যা করতে পারবে না- সন্তানের জন্মও বন্ধ করতে পারবে না। কেননা আমিই তোমাদের রিযিক দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছি-তাদেরকেও আমিই দেব।

৪. নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতার নিকটেও যেও না, তা প্রকাশমান হোক কি গোপনীয়।

৫. নরহত্যা করবে না; কেননা আল্লাহ তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তবে সত্য বিধানের ভিত্তিতে হত্যা করা হলে স্বতন্ত্র কথা; তা করা যাবে। তোমরা বুঝবে ও অনুধাবন করবে, এই আশায়ই তোমাদেরকে এই উপদেশ দেয়া হচ্ছে।

৬. ইয়াতীমের ধন-সম্পদের নিকটেও যাবে না। তবে উত্তম পন্থায় কিছু করতে হলে স্বতন্ত্র কথা-যতক্ষণ না তারা পূর্ণবয়স্ক ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হচ্ছে।

৭. পরিমাপ ও ওজন পূর্ণ মাত্রায় সুবিচার সহকারে করবে। তবে মানুষের সাধ্যায়ত্ত যতটুকু ততটুকু করারই দায়িত্ব, তার বেশীর জন্যে কোন চাপ নেই।

৮. তোমরা যখন কথা বলবে, ভারসাম্য, সুবিচার ও ন্যায়নীতিপূর্ণ কথা বলবে, যদিও তা তোমাদের নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেই বলা হোক-না কেন।

৯. আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি-প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে। তোমরা এ উপদেশ গ্রহণ করবে, এই আশায়ই এসব কথা তোমাদেরকে বল হচ্ছে।

১০. এই হচ্ছে আমার নির্দেশিত পথ ও জীবন পদ্ধতি। এটা সহজ, সরল ও সুদৃঢ়। অতএব তোমরাও এই উপদেশ মেনে চল-এই পথেরই অনুসরণ কর। এ ছাড়া আর যত পথ ও পন্থা রয়েছে, তার কোনটিরই অনুসরণ করো না। যদি কর, তাহলে তোমরা আল্লাহর দেখানো ও রাসূলের অবলম্বিত এই পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তোমাদেরকে এ উপদেশ দেয়া হচ্ছে এই আশায় যে, তোমরা এটি গ্রহণ করে ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবে।’’

(সূরা আল আন’আমঃ ১৫১–১৫৩)

এসব আদেশ ও উপদেশ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কুরআনী প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হচ্ছে সমাজ এবং এ সবের মূলে নিহিত রয়েছে ‘তাক্ওয়া’- আল্লাহ-বিশ্বাস ও আল্লাহর ভয়। আর এ তাক্ওয়ার পরিণাম হচ্ছে সামাজিক সুবিচার। এ সমাজ গঠিত হবে ব্যক্তিদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া-মায়া, সহানুভূতি, অগ্রাধিকার দান, কল্যাণ কামনা, ক্ষমাশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের পবিত্র ভাবধারার সমন্বয়ে। তাতে অবশ্যই চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে, তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই কার্যকর থাকবে দায়িত্ব ও জবাবদিহির ব্যবস্থা। ব্যক্তি স্বাধীনতার আসল ও সঠিক ভাবধারা এখানেই কার্যকর হওয়া সম্ভব হবে। আর এ কারণেই এরূপ এক আদর্শ ও উন্নত সমাজই বিশ্বমানবতার লক্ষ্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে। এরূপ সমাজে যেমন জুলুম-শোষণ থাকতে পারে না, তেমনি আল্লাহদ্রোহিতা, সীমালংঘন, ধ্বংস-বিপর্যয় ও বঞ্চনারও কোন স্থান থাকবেনা। কুরআন যে সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক আদর্শ উপস্থাপন করেছে, তার সাথে মানব রচিত কোন সমাজ ব্যবস্থারই তুলনা হতে পারেনা।