hadith book logo

পরিবার ও পারিবারিক জীবন

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১২

জন-প্রতিনিধি হওয়ার অধিকার

পর্দা রক্ষা করে ভোট দান করা যদি নারীদের পক্ষে দূষণীয় এবং আপত্তিকর কিছু না হয়, তাহলে সে নারীর পক্ষে বিভিন্ন পরিষদে ও নির্বাচনী সংস্থার প্রতিনিধি হওয়া কি দূষণীয় হবে?

এ প্রশ্নের জবাব দানের পূর্বে প্রতিনিধিত্ব ও জাতীয় নেতৃত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করে নেয়া আবশ্যক।

মনে রাখা দরকার, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বের দুটো প্রধান দায়িত্ব রয়েছে। একটি হচ্ছে আইন প্রণয়ন, জাতীয় শাসন-বিচার ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্যে জরুরী নিয়ম-নীতি রচনা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে পর্যবেক্ষণ, প্রশাসন কর্তৃপক্ষের কার্যকলাপ, ক্ষমতা প্রয়োগ ও জনসাধারণের সাথে তার আচার-ব্যবহার প্রভৃতি জটিল বিষয়ের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করা।

প্রথম পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের জন্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বিদ্যা অপরিহার্য। একদিকে যেমন ব্যক্তিগতভাবে জাতির প্রত্যেকটি ব্যক্তির এবং অপরদিকে সমষ্টিগতভাবে গোটা জাতির সমস্যা, জটিলতা ও প্রয়োজনাবলী সম্পর্কে সূক্ষ্ম, নির্ভূল ও প্রত্যক্ষ জ্ঞান আবশ্যক। আর একজন নারীর পক্ষে এ জ্ঞান অর্জন নিষিদ্ধ যেমন নয়, তেমনি কঠিন বা অসম্ভবও কিছু নয়। উপরন্তু ইসলাম নির্বিশেষে সকলকে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জনের অধিকারই দেয় না, তা ফরয বলেও ঘোষণা করেছে। অতএব বলা যায়, নারীর পক্ষে আইন-প্রণেতা –আইন পরিষদের সদস্যা হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়। ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু সংখ্যক নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁরা কুরআন, হাদীস ফিকাহ ও ইসলামী সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেছেন।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কার্যাবলী পর্যবেক্ষণ, এ কাজের সারকথা হচ্ছে “আমর বিল মারুফ ও নিহি আনিল মুনকার” –ভালো ও ন্যায়সঙ্গত কাজের আদেশ দান এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে নিষেধকর। আর ইসলামে এ ব্যাপারে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান। আল্লাহ তা’আলা নিজেই এ সম্পর্কে বলেছেনঃ

(আরবী)

মু’মিন পুরুষ স্ত্রী পরস্পরের সাহায্যকারী, পৃষ্ঠপোষক; সকলে মা’রুফ কাজের আদেশ করে ও অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে নিষেধ করে।

এ আয়াতে মু’মিন পুরুষ ও স্ত্রীদের সমান পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, সকলের জন্যে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত কাজের রূপ ও প্রকৃতি একই নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরুষ ও নারীকে পরস্পরের বন্ধু, সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এ সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দ্বীন পালন, দ্বীন প্রচার ও দ্বীনের বিপরীত কার্যাদির প্রতিরোধের ব্যাপারে অবশ্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা পুরুষ ও নারীর স্থায়ী পরিচয় এবং গুণ। এ আয়াত অনুযায়ী কাজ করা পুরুষ স্ত্রী সকলেই কর্তব্য। অতএব ইসলামে এমন কোনো সুস্পষ্ট দলীল নেই, যার ভিত্তিতে মেয়েদের ‘প্রতিনিধি’ (Representative) হওয়ার অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখা যেতে পারে, সে প্রতিনিধি কাজ আইন প্রণয়ন ও শাসন কার্য পরিচালন, পর্যবেক্ষণ –যাই হোক না কেন, তাদের এ কাজের যোগ্যতা নেই, তা বলারও কোনো ভিত্তি নেই।

কিন্তু বিয়ষটিকে অপর এক দৃষ্টিতে বিচার করে দেখা যায় যে, নারীর এ ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রয়োগ করার পথেই ইসলামের প্রাথমিক নিয়ম-কানুন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যোগ্যতা না থাকার কারণে এ বাধ্য নয়, বাধা হচ্ছে সামাজিক ও সামগ্রিক কল্যাণের দৃষ্টি।

নারীর স্বভাবিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে তাকে অন্যসব দিকের ছোট বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে থাকতে হবে এবং তার সে দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে কোনো প্রকার অসুবিধার সৃষ্টি করা কিছুতেই উচিত হবে না।

‘প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা নারীর আছে’ –স্বীকার করলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এ কাজ করতে গিয়ে তার অপরাপর স্বাভাবিক দায়িত্বসমূহ পালন করা তার পক্ষে সম্ভব কি? তাকে পারিবারিক জীবন যাপন, গর্ভ ধারণ, সন্তান প্রসব, সন্তান পালন ও ভবিষ্যৎ সমাজের মানুষ তৈরীর কাজ সঠিকভাবে করতে হলে তাকে কিছুতেই প্রতিনিধিত্বের ঝামেলায় নিক্ষেপ করা যেতে পারে না। আর যদি কেউ সেখানে নিক্ষিপ্ত হয়, তবে তার পক্ষে সেই একই সময় উপরোক্ত স্বাভাবিক দায়িত্বসমূহ পালন করা সম্ভব নয়।

নারীকে এ কাজে টেনে আনলেও এ দায়িত্ব সঠিকরূপে পালন করতে হলে তাকে অবশ্যই ভিন পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে হবে, নিরিবিলি ও একাকীত্বে সম্পূর্ণ গায়র-মুহাররম পুরুষদের সাথে একত্রিত হতে হবে। আর এ দুটো কাজই ইসলামে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ। এমন কি মুখমণ্ডল ও হাত-পা ভিন পুরুষের সামনে উন্মুক্ত করা –যা না হলে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব কিছুতেই পালন হতে পারে না –একান্তই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। শুথু তা নয়, তাকে একাকী ভিন পুরুষদের সাথে –নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে ভিন্ন ও দূরবর্তী শহরেও গমন করতে হবে। কিন্তু ইসলামে তাও কিছুমাত্র জায়েয নয়।

এ চারটি ব্যাপারে ইসলামী সমাজ ও পারিবারিক ব্যবস্থার অন্তর্ভূক্ত ও একান্তই মৌলিক এবং এ কারণে নারীর পক্ষে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন –হারাম না হলেও –কঠিন ও দুঃসাধ্য ব্যাপার। কোনো মুসলিম নারীই এসব মৌলিক নিষেধকে অস্বীকার করে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হবার সাহস করতে পারে না। অতএব বলা যায়, জাতীয় প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা নারীর রয়েছে বটে; কিন্তু একদিকে নারীর স্বাভাবিক দুর্বলতা, অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা এবং অপরদিকে প্রতিনিধিত্বের স্বরূপ প্রকৃতির দৃষ্টিতে নারীকে এ কাজ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং স্বতন্ত্র করে রাখায়ই জাতীয় ও ধর্মীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

আরো গভীরভাবে নারীর প্রতিনিধি হওয়ার পরিণাম চিন্তা ও বিবেচনা করলে দেকা যাবে, এর ক্ষতি ব্যাপক এবং অত্যন্ত ভয়াবহ।

নারী যদি প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করতে চায়, তাহলে প্রথমত তাকে তার ঘর-বাড়ি, শিশু-সন্তান ছেড়ে বাইরে যেতে হবে। এর ফলে অবহেলিত ঘর-বাড়ি ও সন্তান স্বামীর সঙ্গে অন্তর মনের দূরত্ব এক স্থায়ী ভাঙ্গনের সৃষ্টি করতে পারে। এতদ্ব্যতীত স্বামীর সাথে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে পারস্পরিক কঠিন মনোমালিন্য অবশ্যম্ভাবী। আমেরিকার এক নির্বাচনে কোনো এক স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যা করে শুধু এ কারণে যে, স্ত্রী স্বামীর বিপরীত এক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে দলের প্রার্থী হয়েছিল এবং এজন্যে উভয়ের মধ্যে বিরাট ঝগড়া ও বিবাদের সৃষ্টি হয়। বস্তুত নারীকে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক তৎপরতায় যোগদান করতে দিলে পারিবারিক জীবনে যে ভাঙন ও বিপর্যয় দেকা দেবেই, তাতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না।

নারীর পক্ষে এ কাজ আরো অবাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে তখন, যখন নারী হয় যুবতী ও সুন্দরী। নারীর রূপ-সৌন্দর্যকে নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রে জয়লাভের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বিশেষত সেই যুবতী সুন্দরী নারী নিজেই যদি নির্বাচনে প্রার্থী হয়, তাহলে তার গুণাগুণ বিচার না করে কেবল এ রূপের জন্যে মুগ্ধ একদল যুবক কর্মী তার চারপাশে একত্রিত হয়ে যাবে, মধুর চাকার সঙ্গে যেমন জড়িয়ে থাকে মৌ-পোকার দল। আর এর পরিণাম নৈতিক-রাজনৈতিক উভয় দিক দিয়েই যে কত মারাত্মক হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

জনগণের প্রতিনিধিত্ব নারীর পক্ষে যারা সহজ কাজ বলে ধারণা করে, তারা প্রতিনিধিত্বের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে কিছুমাত্র সচেতন নয় বলে ধরা যেতে পারে। প্রতিনিধিদের একদিকে যেমন পদের দায়িত্ব পালন করতে হয় অপর দিকে তার চাইতেও বেশি নির্বাচকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদের দাবি-দাওয়া পূরণ ও তাদের মন সন্তুষ্টি সাধনের প্রতি পুরাপুরি লক্ষ্য আরোপ করতে হয় অন্যথায় এ দুটো দিকই সমানভাবে উপেক্ষিত ও অবহেলিত হবে এবং এ প্রতিনিধিত্ব হবে শুধু নামে মাত্র, কার্যথ তা কিছুই হবে না। কিন্তু চিন্তার বিষয় এটা যে, নারীর পক্ষে কি এ দুটো দিকেরই দায়িত্ব সমান গুরুত্ব সহকারে একই সঙ্গে প্রতিপালিত হওয়া বাস্তবিকই সম্ভব; পার্লামেন্টের পরিসদের বৈঠক সমূহে কেবল উপস্থিত থাকাই কি তার পরবর্তী সাফল্যের জন্যে যথেষ্ট?

এতদ্ব্যতীত সবচেয় কঠিন প্রশ্ন, এহেন প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব সম্পন্ন নারীর পক্ষে কি কারো সফল স্ত্রী হওয়া এবং সন্তানের মা হওয়া সম্ভব? অন্য কথায়, সেই নারী যদি কারো স্ত্রী এবং সন্তানের মা হয়, তাহলে একদিকে ঘরের ভিতরকার বিবিধ দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার দায়িত্বও পূর্ণমাত্রায় পালন করতে হবে; কিন্তু তা কি বাস্তবিকই সম্ভব হতে পারে? আর তা যদি সম্ভবই না হয়, -আর কেবল বলতে পারে যে, তা সম্ভব? –তাহলে জনপ্রতিনিধিত্বশীল নারীকে কি স্ত্রী ও মা হওয়ার দায়িত্ব বা অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে হবে? বঞ্চিত রাখা হলে তা কি তার স্বভাব-প্রকৃতির দাবির বিপরীত পদক্ষেপ হবে না? আর ঘরের এসব দায়িত্ব পালন সহকারেও যদি দশদিন এবং বছর-দুবছরে অন্তত একবার করে দশ বারো মাসের জন্যে মুলতবী রাখা হবে? কেননা নারীর জন্যে –বিশেষ করে বিবাহিতা নারীর পক্ষে এ তো একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। এ সময় গুলো নারীর পক্ষে বড়ই সংকটের সময়। এ সময় নারীর মেজাজ প্রকৃতি স্বাভাবিকভাবেই বিগড়ে যায়। প্রায় সব কাজ থেকেই তার মন মেজাজ থাকে বিরূপ, কিছুই তার ভালো লাগে না এ সময়ে। এমতাবস্থায় তার পক্ষে বাইরে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালনের জন্যে বছরে কতটুকু নিরংকুশ অবসর নির্লিপ্ততার সময় পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

এতসব ঝামেলা অনিবার্য হওয়া সত্ত্বেও নারীকে রাজনীতির এ চক্রজালে জড়িয়ে দেয়ায় জাতির ও সমাজের যে কি শুভ ফল লাভ হতে পারে, তা বোঝা কঠিন। তারা কি এক্ষেত্রে এতই দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে যে, সেই কাজ তাদের বাদ দিয়ে কেবল পুরুষদের দ্বারা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়? –কী এমন সে কাজ যা পুরুষরা করতে সক্ষম নয়? ….কে এর জবাব দেবে?

কেউ কেউ বলেন, এতে করে নারীর সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, নারী মানুষ হওয়ার –সমাজের, দেশের পুরুষদের সমপর্যায়ের সদস্য বা নাগরিক হওয়ার বোধ লাভ করতে পারে।

আমরা প্রশ্ন করব, নারীদের যদি প্রতিনিধিত্বের ময়দানে, রাজনীতির মঞ্চে অবতরণ থেকে বঞ্চিতই করে দেয়া হয়, তাহলে তাতে কি একথাই প্রমাণিত হবে যে, নারীর না আছে কোনো সম্মান, না মনুষত্ববোধ? প্রত্যেক জাতির পুরুষদের মধ্যেই কি একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ এমন থাকে না, যাদের সরাসরি রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ কেউই মেনে নিতে রাজি নয়? …যেমন দায়িত্বপূর্ণ সরকারী কর্মচারী এবং সৈন্যবাহিনী? তাহলে তাদের সম্পর্কে কি ধরে নিতে হবে যে, তাদের কোনো সম্মান নেই আর নেই তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ।

বস্তুত প্রত্যেক সমাজে ও প্রত্যেক জাতিরই অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুতা বিধান ও যাবতীয় কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করানোর জন্যে কর্মবণ্টন নীতি অবশ্যই কার্যকর করতে নয়। এ নীতি অনুযায়ী কোনো মানব সমষ্টিকে (Group of people) কোনো বিশেষ কাজের দায়িত্ব দিলে এবং এ দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে –এমন সব কাজ থেকে তাদের দূরে রাখা হলে তাতে তাদের না মানসম্মান নষ্ট হতে পারে, না তাদের মনুষ্যত্ব লোপ পেতে পারে আর না তাদের কোন হক (Right) নষ্ট বা হরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা যেতে পারে। ঠিক এ দৃষ্টিতেই নারী সমাজকে যদি তাদের বৃহত্তর ও স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে স্বামী ও সন্তানের অধিকার রক্ষার কারণে বাইরের সব রকমের দায়িথ্ব পালন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় এবং রাখা হয় সমাজ, জাতি ও বৃহত্তর মানবতার কল্যাণের দৃষ্টিতে, তবে তাকে কি কোনো দিক দিয়েই অন্যায় বা জুলুম বলে অভিহিত করা যেতে পারে? সৈনিকদের যেমন রাজনীতির ঝামেলা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, কঠোর দৃঢ়তা সহকারে। সৈনিকদের রাজনীতি করতে না দেয়ায় যেমন কোনো লোকসান নেই? ঠিক তেমনিভাবে নারীদেরও যদি দূরে রাখা হয়, তবে তাতে কি জাতীয় কল্যাণের কোনো লোকসান হতে পারে।

এ পর্যায়ে যে শেষ কথাটি বলতে চাই, তা হলো এই যে, নারীদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ গ্রহণের ব্যাপারে যে উৎসাহ আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, তার কারণ ইউরোপের অন্ধ অনুকরণ গ্রহণের ব্যাপারে যে উৎসাহ আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, তার কারণ ইউরোপের অন্ধ অনুকরণ, পাশ্চাত্য চিন্তাধারার মানসিক গোলামী এবং বিবেচনাহীন অযৌক্তিক আবেগ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইউরোপে তো রেনেসাঁর প্রায় একশ বছর পর নারীরা রাজনৈতিক অধিকার লাভ করেছে। জিজ্ঞেস করতে পারি কি, ইউরোপীয় সমাজে এ অভিজ্ঞতার কি ফল পাওয়া গেছে?

ইউরোপীয় সমাজ এ ব্যাপারে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা লাভের এ সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছে যে, নারীদের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ গ্রহণের কোনো ফায়দা নেই, বরং পারিবারিক, সামাজিক, নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিতে এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহই হয়েছে ইউরোপে। সেখানে এরফলে ঘর ভেঙ্গেছে, পরিবার ভেঙ্গেছে, পথে-ঘাটে সন্তান জন্মানোর কলংকের সৃষ্টি হয়েছে, আর রাজনীতিক নারীকে নিয়ে পুরুষদের মধ্যে টানাটানি হিড়িক পড়েছে। এক্ষেত্রে বৃটেনে ক্রীষ্টান কীলারের ব্যাপারটি অতি সাম্প্রতিক ঘটনা, যেখানে নারীর সরাসরি রাজনীতির হওয়ার ব্যাপারে নেই, কেবলমাত্র এক রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে অবৈধ যোগাযোগের পরিণামই বৃটিশ সরকারের পক্ষে মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে পর ফ্রান্সের নেতৃবন্দ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেনঃ রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারিণী ও প্রভাব-শালিনা মেয়েরাই আমাদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

এ পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা একথা জোরের সঙ্গেই বলব, আমাদের সমাজে নারীদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে টেনে আনার ফলও অনুরূপ মারাত্মক হবে, এতে এক বিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই। জাতীয় বা জেলা পরিষদসমূহে নারীদের সদস্যপদের কার্যত কোনো সুফল হতে পারে না বলে তা যত তাড়াতাড়ি বন্ধ করা হবে, ততই মঙ্গল।