hadith book logo

পরিবার ও পারিবারিক জীবন

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২৯

তালাক

ইসলামে তালাকের সুযোগ বিধিবদ্ধ করা হয়েছে পারিবারিক জীবনের চূড়ান্ত বিপর্যয় থেকে স্বামী ও স্ত্রী –উভয়কে বাঁচাবার জন্যে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন চরমভাবে ভাঙ্গন দেখা দেয়, পরস্পরে মিলেমিশে ঠিক স্বামী-স্ত্রী হিসেবে শান্তিপূর্ণ ও মাধুর্যমণ্ডিত জীবন যাপন যখন একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, পারস্পরিক সম্পর্ক যখন হয়ে পড়ে তিক্ত, বিষাক্ত। এক জনের মন যখন অপর জন থেকে এমনবাবে বিমুখ হয়ে যায় যে, তাদের শুভ মিলনের আর কোনো আশায় থাকে না, ঠিক তখনই এ চূড়ান্ত পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ। এ হচ্ছে নিরুপায়ের উপায়। বাঁধন যখন টুটে যাবেই, পরস্পরকে বেঁধে রাখার শেষ চেষ্টাও যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত, তখন বিয়ের রশিটুকু আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন করে না দিলে উভয়ের জীবন দুর্বিষহ –প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন সে রশিকে কেটে দিয়ে পরস্পরের অস্তিত্বকে রক্ষা করার এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।

কুরআন মজীদে একদিকে যেমন স্বামীতে-স্ত্রীতে মিলমিশ রক্ষা করে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে, তেমনি অপরদিকে উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর কার্যকর নিয়ম-কানুন পেশ করা হয়েছে। ইসলামের এ ব্যবস্থা কিছুমাত্র নিরর্থক নয়। এ ব্যাপারে কোনো প্রকার জুলুম, অবিচার, নির্যাতন ও সীমালংঘনের অনুমতি দেয়া হয়নি, কোনো কারণ ও কল্যাণ-উদ্দেশ্য ব্যতীতই স্ত্রীকে তালাক দেয়া কিংবা স্বামীর কাছ থেকে তালাক গ্রহণের কাজেও কিছুমাত্র পছন্দ করা হয়নি। কি স্ত্রী আর কি স্বামী –কি মেয়েলোক আর কি পুরুষ লোক, কাউকেই বিনা কারণে ও বিনা অপরাধে কোনো প্রকার কষ্ট দেয়াই ইসলাদের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট হারাম।

তা সত্ত্বেও তালাক দেয়ার ব্যবস্থা ইসলামে কেন রাখা হয়েছে? …..রাখা হয়েছে সকল প্রকার সীমালংঘনকারী কাজ থেকে ব্যক্তি ও সমাজকে রক্ষা করা এবং সকল অবস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ ও মাধ্যম অবলম্বন করার সুযোগ দানের উদ্দেশ্যে। কেননা তালাক বা বিচ্ছেদের ব্যবস্থা না থাকলে যে কোনো অবস্থায়ই হোক না কেন, বিবাহ সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে মানুষ বাধ্য হয়। অথচ এমন অবস্তা দেখা দেয়া অসম্ভব নয় যে, স্বামী-স্ত্রীর একজন চরিত্রহীন হবে কিংবা উভয়ের প্রকৃতি এমন অনমনীয় হয়ে পড়বে যে, কারো পক্ষেই অপরকে বরদাশত করা আদৌ সম্ভব হচ্ছে না। পরস্পরের মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি, চাল-চলন, উদ্দেশ্য-লক্ষ্য পরস্পর বিরোধী –শুধু বিরোধীই নয় –সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছে, যার ফলে উভয়ের সাথে প্রতি মুহুর্ত কেবল ঝগড়া-বিবাদ তর্ক-বিতর্ক আর গালাগাল দেয়ার অবস্থারও উদ্ভব হয়ে পড়েছে। আর দুজনের কেউই না পারে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে চলতে এবং না পারে পরস্পরের হক-হকুক যথাযথভাবে আদায় করতে। এরূপ অবস্থায় উভয়ের চূড়ান্ত বিচ্ছেদই উভয়ের নিকট কাম্য হয়ে থাকে। আইনসম্মতভাবে এ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা না তাকলে উভয়েরই জীবন বরাবদ হয়ে যেতে বাধ্য।

কিন্তু তাই বলে তালাক দেয়ার ব্যাপারেও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ইসলাম বরদাশত করেনি। তালাক দেয়ার সঠিক পন্থা স্পষ্টভাবে বেঁধে দিয়েছে। এমনিতে তো বিয়ে সম্পর্কে সবদিক দিয়ে সুরক্ষিত করে দিয়েছে। কোনো প্রকার সাময়িক বা আকস্মিক ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া যাতে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তার প্রতিও পূর্ণমাত্রায় লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সাধারণত আকস্মিকভাবে স্বামী ক্রোধান্ধ ও উত্তেজিত হয়ে স্ত্রীকে তালাক দিতে উদ্যত হয় বা তালাক দিয়ে ফেলে। পরে যখন সে ক্রোধ প্রশমিত হয়, উত্তেজনার বিষবাষ্প উবে যায়, যখন ঘাটে পানি আসে, সুস্থভাবে বিচার বিবেচনা করে দেখতে পারে, এ কাজ আদৌ করবে কি না। ঠাণ্ডা মন-মগজে এসব চিন্তা করার শক্তি তখন ফিরে আসে। তখন উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে কৃত কাজ সম্পর্কে তার মনে জাগে অনুতাপ। …কি করে ফেললাম ভেবে অনেক মানুষই তখন দিশেহারা –পাগল হয়ে যায়।

মানুষের প্রকৃতি-নিহিত এ দুর্বলতাকে লক্ষ্য করেই ইসলাম তালাক দানের একটা অতীব ভারসাম্যপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে।