hadith book logo

পরিবার ও পারিবারিক জীবন

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪৪

এক সঙ্গে তিন তালাক সম্পর্কে বিভিন্ন মত

একসঙ্গে বা এক শব্দের তিনটি তালাক দিয়ে দিলে তাতে তিনটি তালাকই হয়ে যাবে, না তা এক তালাক গণ্য হবে, এ সম্পর্কে ফিকাহবিদদের মধ্যে খানিকটা মতভেদ রয়েছে। এখানে তার বিস্তারির বিবরণ পেশ করা যাচ্ছে।

তাঊস, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক, হাজ্জাজ ইবনে আরতাত, নখয়ী ও ইবনে মুকাতিল এবং জাহিরী মাযহাবের মনীষীগণের মতে একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তাতে এক তালাক গণ্য হবে। তাঁদের দলীল হিসেবে তাঊস বর্ণিথ একটি হাদীসের উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে; আবা-সাহবা হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে বললেনঃ

(আরবী)

নবী করীম (ﷺ) ও হযরত আবূ বকরের খিলাফত আমল পর্যন্ত একসঙ্গে দেয়া তিন তালাক এক তালাক গণ্য হতো এবং উমরের সময়ে থেকে তা তিন তালাক গণ্য হতে শুরু হয়েছে, তা কি আপনি জানেন?

জবাবে হযরত ইবনে আব্বাস বললেনঃ হ্যাঁ।

অথচ ইমাম আওজায়ী, নখয়ী, সওরী, ইমাম মালিক ও তাঁর সঙ্গী ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম মালিক ও তাঁর ছাত্রগণ, ইমাম শাফিয়ী ও তাঁর ছাত্রবৃন্দ, ইমামা আহমদ ও তাঁর সঙ্গী-সাথী, ইসহাক ইবনে রাওয়ায়, আবূ সওর ও আবূ দাউদ প্রমুখ বিপুল সংখ্যক তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী ফিকাহবিদগণ একবাক্যে এ মত প্রকাশ করেছেনঃ

(আরবী)

যে লোক একসঙ্গে তিন তালাক দেব, তার দেয়া তিনটি তালাক কার্যকর হবে, তবে সে অবশ্যই গুনাহগার হবে। সে সঙ্গে তাঁরা আরো বলেছেনঃ

(আরবী)

উপরোক্ত সর্বসম্মত মতের বিপরীত যাঁরা মত দিয়েছেন, তাঁরা সংখ্যায় খুবই কম এবং তাঁরা সুন্নতপন্থীদের বিরোধী মতাবলম্বী। এ বিপরীত মত কেবল বিদআতপন্থীরাই আঁকড়ে ধরেছে। আর তাঁরা সংখ্যায় কম বলে নগণ্য ও অনুল্লেখযোগ্য। কেননা তাঁরা এমন জামা’আতের বিপরীত মত পোষণ করেছে, যাঁদের সম্পর্কে এমন ধারণা কিছুতেই করা যেতে পারে না যে, তাঁরা কুরআন-হাদীসের কিছুমাত্র রদবদল করেছেন।

এই বিপরীত মতের সমর্থনে –একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তাতে এক তালাক হওয়া মতের অনুকূলে –হযরত ইবনে আব্বাস সমর্থিত যে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, তার জবাবে ইমাম তাহাভী বলেছেনঃ

(আরবী)

একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তাতে এক তালাক হওয়ার মতটি বাতিল হয়ে গেছে।

এ মনটি বাতিল হয়ে যাওয়া সম্পর্কিত ঘটনার বিবরণ এই যে, হযরত উমরের খলীফা থাকাকালে একদিন উপস্থিত লোকদের সম্বোধন করে তিনি বললেনঃ

(আরবী)

সমবেত জনগণ, তালাকের ক্ষেত্রে তোমাদেরকে একটা বড় সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এখন যে লোক তালাকের ব্যাপারে আল্লাহর দেয়া এ সুযোগ গ্রহণে তাড়াহুড়া করল; আমরা তাকে তার ফল গ্রহণে বাধ করে দিলাম (একসঙ্গে তিন তালাক হওয়ার ফয়সালা দিলাম)।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী এ বিবরণ দেয়ার পর লিখেছেনঃ

(আরবী)

এ কথা শুনে তখনকার উপস্থিত লোকদের একজনও তাঁর কোনো প্রতিবাদ করলেন না, কেউ তাঁর এ কথায় বাঁধা দিলেননা। ফলে তৎপূর্ব ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়া ও তিন তালাক কার্যকর হওয়ার রায় বলবৎ হওয়া সম্পর্কে এই হলো সবচেয়ে বড় দলীল।

আইনী অতঃপর বলেনঃ

(আরবী)

হযরত উমর যখন সাহাবীদের সম্বোধন করে এ সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দিলেন, তখন তার কোনো প্রতিবাদ হয়নি বরে এ মতটির ব্যাপারে তাঁদের সম্পূর্ণ ঐকমত্য ইজমা –স্থাপিত হলো।

আর ইজমা সম্পর্কে তিনি বলেনঃ

(আরবী)

ইজমা নিঃসন্দেহে দৃঢ় প্রত্যয়পূর্ণ জ্ঞান দান করে, ঐকান্তিক বিশ্বাস সহকারে তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, যেমন কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট অকাট্য ঘোষণাকে নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা হয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) তাঁর স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে রাসূলে করীমের নিকট এ খবর বললেন। তিনি এ খবর শুনে বললেনঃ ‘তোমার স্ত্রীকে তুমি ফিরিয়ে গ্রহণ করো’। তিনি বললেনঃ

(আরবী)

হে রাসূল, আমি যদি আমার স্ত্রীকে (এক তালাক না দিয়ে) একসঙ্গে তিন তালাক দিতাম, তাহলেও কি আমি তাকে পুনরায় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে পারতাম?

তখন রাসূলে করীম (ﷺ) বললেনঃ

(আরবী)

না, ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কেননা তিন তালাক দিলে তোমার স্ত্রী তোমার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। আর এভাবে তিন তালাক দেয়া তোমার অবশ্যই গুনাহ।

এ থেকৈ প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইবনে উমর তাঁর স্ত্রীকে তিন তালাক দেন নি, দিয়েছিলেন এক তালাক। তাই তাঁর দেয়া তিন তালাককে এক তালাক বানাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।