hadith book logo

পরিবার ও পারিবারিক জীবন

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮৩

স্বামীর সন্তুষ্টি বিধান ও তার আনুগত্য

এ দৃষ্টিতে স্বামীর যেমন কর্তব্য স্ত্রীর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে চেষ্টা করা, তেমনি স্ত্রীরও তা-ই কর্তব্য। স্ত্রীর যাবতীয় কাজে-কর্মে লক্ষ্য থাকবে প্রথম আল্লাহর সন্তোষ লাভ এবং তারপরই দ্বিতীয়ত থাকবে স্বামীর সন্তোষ লাভ। আর এ স্বামীর সন্তোষ লাভের জন্য চেষ্টা করাও আল্লাহর সন্তোষেরই অধীন। কেননা আল্লাহই তার সন্তোষ লাভের জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন স্ত্রীদের। এ কারণে নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ

(আরবী)

যে মেয়েলোকই এমনভাবে মৃত্যুবরণ করবে যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট, সে অবশ্যই বেহেশতবাসিনী হবে।

স্বামীর সন্তোষ বিধানের জন্যেই তার আনুগত্য করাও স্ত্রীর কর্তব্য। রাসূলে করীম (ﷺ) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী))

স্ত্রী যদি পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায রীতিমত পড়ে, যদি রমযানের একমাস ফরয রোযা রাখে, যদি তার যৌন অঙ্গের পবিত্রতা পূর্ণ মাত্রায় রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে, তবে সে অবশ্যই বেহেশতের যে দুয়ার দিয়েই ইচ্ছে প্রবেশ করতে পারবে।

এ হাদীসে স্বামীর আনুগত্য করাকে নামায-রোযা ও সতীত্ব রক্ষা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একেও সেসব কাজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। অন্য কথায় হাদীসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, স্ত্রীর ওপর যেমন আল্লাহর হক রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বামীর অধিকার। স্ত্রীর যেমন কর্তব্য আল্লাহর হক আদায় করা, তেমনি কর্তব্য স্বামীর কতা শোনা এবং তার আনুগত্য করা, স্বামীর যাবতীয় অধিকার পূরণের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা। স্বামীর অধিকার আদায় না করে স্ত্রীর জৈবিক জীবন তেমনি সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে না, যেমন আল্লাহর হক আদায় না করে সফল হতে পারে না তার নৈতিক ও পরকালীন জীবন। শুধু তাই নয়, স্বামীর হক আদায় না করলে আল্লাহর হকও আদায় করা যায় না। রাসূলে করীম (ﷺ) খুবই জোরালো ভাষায় বলেছেনঃ

(আরবী)))))

যাঁর মুষ্টিতে মুহাম্মদের প্রাণ-জীবন, তাঁর শপথ, স্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত তার স্বামীর হক আদায় না করবে, ততক্ষণ সে তার আল্লাহর হকও আদায় করতে পারবে না। স্বামী যদি স্ত্রীকে পেতে চায় –যখন সে সওয়াব হয়ে যাচ্ছে –তবে তখনো সে স্বামীকে নিষেধ করতে পারবে না।

বস্তুত স্বামীর হক আদায় করার জন্যে দরকার তার আনুগত্য করা, তার কথা বা দাবি অনুযায়ী কাজ করা। এজন্যে সর্বোত্তম স্ত্রী কে এবং কি তার গুণ, এ ধরনের এক প্রশ্নের জবাবে রাসূলে করীম (ﷺ) বলেছেনঃ

(আরবী)

সে হচ্ছে সেই স্ত্রীলোক, যাকে স্বামী দেখে সন্তুষ্ট হবে, যে স্বামীর আনুগত্য করবে এবং তার নিজের স্বামীর ধনমালে স্বামীর মতের বিরোধিতা করবে না –এমন কাজ করবে না, যা সে পছন্দ করে না।

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর যেমন কর্তব্য, তেমনি অত্যন্ত বিরাট মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের ব্যাপারও বটে। নিম্নোক্ত হাদীসে এ মর্যাদা ও মাহাত্মের কথা সুস্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে।

(আরবী)

মুসলিমদের জন্যে তাকওয়ার পর সবচেয়ে উত্তম জিনিস হচ্ছে নেককার চরিত্রবতী স্ত্রী –এমন স্ত্রী, যে স্বামীর আদেশ মেনে চলে, স্বামী তার প্রতি তাকালে সন্তুষ্ট হয়ে যায় এবং স্বামী কোনো বিষয়ে কসম দিলে সে তা পূরণ করবে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার নিজের ও স্বামীর ধনমালের ব্যাপারে স্বামীর কল্যাণকামী হবে।

অন্য কথায়, আল্লাহর ভয় ও তাকওয়ার পর সব মুসলিম পুরুষের জন্যেই সর্বোত্তম সৌভাগ্যের সম্পদ হচ্ছে সতী-সাধ্বী, সুদর্শনা ও অনুগতা স্ত্রী। প্রিয়তম স্বামীর সে একান্ত প্রিয়তমা, স্বামীর প্রতিটি কতায় সে উৎসর্গীকৃতা, সতীত্ব ও পবিত্রতা রক্ষার ব্যাপারে সে অতন্দ্র সজাগ আর এ রকম স্ত্রী যেমন একজন স্বামীর পক্ষে গৌরব ও মাহাত্ম্যের ব্যাপার, তেমনি এ ধরনের স্ত্রীও অত্যন্ত ভাগ্যবতী।

স্বামীর আনুগত্য করার ওপর এই সব হাদীসেই বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, পারিবারিক জীবনে স্ত্রী যদি স্বামীর প্রাধান্য স্বীকার না করে, স্বামীকে মেনে না চলে, স্বামীর উপস্থিতি-অনুপস্থিতি উভয় সময়ই যদি স্ত্রী স্বামীর কল্যাণ বিধানে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে দাম্পত্য জীবন কখনই মধুর হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু স্বামীর এ আনুগত্যও অবাধ নয়, অসীম নয়, নয় নিঃশর্ত। ইসলামের আনুগত্যের ব্যাপারে সর্বত্র শরীয়ত সীমার উল্লেখ করা হয়েছে। নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ ‘সঙ্গত ও শরীয়তসম্মত কাজে স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য’। অন্যত্র বলেছেনঃ ‘কোনো স্ত্রী ঈমানের স্বাদ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে না, যতক্ষণ না সে তার স্বামীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায় করবে’। (আরবী)

এ দুটি হাদীসেই ‘সঙ্গত’ ও ‘শরীয়তসম্মত’ বা ‘ন্যায়সঙ্গত’ শর্তের উল্লেখ রয়েছে। কাজেই স্বামীর অন্যায় জিদ বা শরীয়ত-বিরোধী কাজের কোনো আদেশ বা আবদার পালন করতে স্ত্রী বাধ্য নয়। শুধু তা-ই নয়, স্বামী শরীয়ত-বিরোধী কোনো কাজের আদেশ করলে তা অমান্য করাই ঈমানদার স্ত্রীর কর্তব্য। বুখারী শরীফের এক অধ্যায়ের শিরোনাম হচ্ছেঃ

(আরবী)

গুনাহের কাজে স্ত্রী স্বামীর আদেশ মানবে না –এ সম্পর্কিত হাদীসের অধ্যায়।

আর তারপরই যে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে, এক আনসারী মহিলা তার কন্যাকে বিয়ে দেয়। বিয়ের পর কন্যার মাথায় চুল পড়ে যেতে শুরু করে। তখন মহিলাটির জামাতা তাকে বলল –তার স্ত্রীর মাথায় পরচুলা লাগিয়ে দিতে। তখন মাহিলাটি রাসূলে করীমের দরবারে হাজির হয়ে বললঃ

(আরবী)

আমার মেয়ের স্বামী আমাকে আদেশ করেছে যে, আমি যেন মেয়ের মাথায় পরচুলা জুড়ে দেই।

একথা শুনে রাসূলে করীম (ﷺ) বললেনঃ

(আরবী)

না, তা করবে না, কেনান যেসব মেয়েলোক পরচুলা লাগায় তাদের ওপর লানত করা হয়েছে।

অন্য কথায়, পরচুলা লাগানো যেহেতু হারাম, অতএব এ হারাম কাজের জন্যে স্বামীর নির্দেশ মানা যেতে পারে না। (আরবী)