১
পরিবার ও পারিবারিক জীবন
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৩১
খ্রিষ্টান সমাজে তালাক
প্রথম দিকে খ্রিষ্টান সমাজের ওপর রোমান আইনের প্রভাব পড়েছিল বটে, কিন্তু খ্রিষ্টবাদ যখন ইউরোপে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে দাঁড়াল এবং বৈরাগ্যবাদী মতবাদ দানা বেঁধে উঠল, তখন বিয়েকে এমন এক ধর্মীয় কাজ বলে ঘোষণা করা হলো যা জীবনের শেষ নিঃশাস ত্যাগ করা পর্যন্ত শেষ হতে পারে না। এরূপ বাধ্যবাধকতার ফলে ইউরোপীয় সমাজ সাংঘাতিক রকমের অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। এ সমাজে তালাককে একটি মহা গুনাহের কাজ বলে গণ্য করা হতো, বিবাহ বিচ্ছেদকারীদের পথে ছিল নানা প্রকারের দুর্লংঘ্য প্রতিবন্ধকাত। উত্তরকালে গির্জার আইন যখন বলবৎ হলো, তখন বিয়ে ও তালাক –উভয়ের ওপর কঠিন প্রতিবন্ধকতা চাপিয়ে দেয়া হয়। বস্তুত গির্জার এসব আইন ছিল মানব স্বভাব ও প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিরোধী। দৈনন্দিন জীবন তদনুযায়ী যাপন করা ছিল প্রায় অসম্ভব। ফলে গির্জার বিরুদ্দে জনমনে বিদ্রোহের বাষ্প পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে। ষষ্ঠদশ শতকে তা প্রচণ্ড আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে। এ কারণে পনের শত বচর পর্যন্ত খ্রিষ্টান সমাজ গির্জার অত্যাচারী নির্যাতন, নির্মম অমানুষিক আইন-শাসনের অধীনে থেকে নিষ্পেষিত হতে বাধ্য হয়েছে।
গির্জা-বিরোধী আন্দোলন সাফল্যমণ্ডিত হলে পরে প্রোটেস্ট্যাণ্ট ধর্মমত প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বিয়ে তালাকের ব্যাপারে অনেকখানি উদার নীতি অবলম্বিত হতে শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত এ দুটো ব্যাপারকেই ধর্মীয় সীমার বাইরে ফেলে দেয়া হয়। আসল ব্যাপার এই যে, প্রোটেষ্ট্যান্ট পাদ্রীদের কাছে এসব সমস্যার কোনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছিল না, ছিল না এ বিষয়ে তাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা। ফলে ‘তালাক’কে গ্রহণ করা হলো, কিন্তু তালাক দেয়ার ক্ষমতা একান্তভাবে স্বামীর কুক্ষিগত করে দেয়া হলো। আর তালাক লাভের ন্যে একমাত্র উপায় হলো পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপন। সহজেই বোঝা যায়, এরূপ উপায়ে তালাক লাভের পর দু’জনের পক্ষে আর কোনো দিনই মিলিত হওয়ার আর কোনো সুযোগই থাকতে পারে না।
ইংলণ্ডে তালাক
ইংরণ্ডে ‘পিউরিটান’দের প্রতিপত্তি শুরু হলে তারা বিয়ে-শাদীর ব্যাপারটির দিকে বিশেষ নযর দেয়। প্রথমত বিয়েকে তারা ধর্মীয় সীমার বাইরে নিক্ষেপ করল। বিয়ের জন্যে ছেলের বয়স ১৬ আর মেয়ের বয়স ১৪ নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো। বিয়ে-অনুষ্ঠানের জন্যে পাদ্রীর বদলে রেজিষ্ট্রিকারী নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু এ ব্যবস্থা বেশি দিন চলতে পারল না। পরে তা বাতিল করে প্রাচীন গির্জা-আইন পুনরায় চালু করা হলো।
এ সময়ে প্রখ্যাত ইংরেজ কবি মিল্টন তালাকের সমর্থনে এক পুস্তিকা রচনা ও প্রকাশ করেন। তাতে স্বামী ও স্ত্রী –উভয়কেই তালাক দানের ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়, যদিও গির্জা আইন তার তীব্র প্রতিবাদ করে।
ষষ্ঠদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত পূর্ণ আড়াই শত বছর কাল যাবত ইংলণ্ডে গির্জা-আইনের প্রবল প্রতিপত্তি থাকে, যার প্রচণডতা ও অপরিবর্তনীয়তা সাধারণ মানুষকে রীতিমত ক্ষেপিয়ে তোলে। ১৮৭৫ সালে তালাক সম্পপের্ক একটি আইন জারি করা হয়, যা পরে পার্লমেণ্ট কর্তৃকও গৃহীন হয়। এ আইনে স্ত্রীর ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে তাকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা কেবলমাত্র স্বামীকেই দেয়া হয়। কিন্তু পুরুষের জ্বেনা-ব্যভিচারকে কোনো দোষের কাজ বলে আদপেই ধরা হয় না। দ্বিতীয়ত স্ত্রী যদি তালাক গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে, তাহলে তাকে স্বামীর ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার এবং সে সঙ্গে তার ওপর তার অমানুষিক অত্যাচার ও জুলুমের প্রমাণও অকাট্যভাবে পেশ করার শর্ত আরো করা হলো। অবশ্য ১৯২৩ সালের এক আইনে ব্যভিচারের অভিযোগে তালাক গ্রহণের সুযোগ স্বামী-স্ত্রী –উভয়কেই দেয়া হয়। ১৯৩৭ সালে তালাক আইনে আরো অনেক সংশোধন সংযোজন করা হয়। এতে করে ব্যভিচার ছাড়াও একাধিক্রমে তিন বছরকাল স্ত্রীকে নিঃসম্পর্ক করে ফেলে রাখা, নির্মমতা, অভ্যাসগত মদ্যপান, অচিকিৎসা, পাগলামী ও দূরারোগ্য যৌন ব্যধির কারণে তালাক লওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু তার সাথে শর্ত আরোপ করা হয় যে, বিয়ে হওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে তালাকের আবেদন পেশ করা যাবে না। যদিও এ আইন বলবত থাকা সত্ত্বেও ইংলণ্ডে আজও ব্যভিচারই হচ্ছে তালাক গ্রহণের সবচেয়ে বড় ও কার্যকর কারণ ও উপায়। জনৈক ইংরেজ সমাজবিজ্ঞানী লিখেছেনঃ
ব্যভিচার ও নির্মম ব্যবহার প্রমাণ করতে পারলেই তবে আজকের ইংরেজ স্ত্রী স্বামীর কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে। স্বামী তো কেবল স্ত্রীর ব্যভিচার লিপ্ততার অভিযোগ এনেই তালাক পেতে পারে; কিন্তু স্ত্রীকে সেজন্যে স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের সঙ্গে সঙ্গে তার নির্মম ব্যবহারের অভিযোগও আনতে হবে –এই হচ্ছে ইংরেজদের ইনসাফ। বস্তুত আইনের এ স্বৈরাচার বেশিদিন বরদাশত করা যেতে পারে না। অদূর ভবিষ্যতে স্বামী ও স্ত্রী –উভয়ই তালাক গ্রহণের সমান অধিকার লাভ করবেই। (আরবী)
গির্জা-বিরোধী আন্দোলন সাফল্যমণ্ডিত হলে পরে প্রোটেস্ট্যাণ্ট ধর্মমত প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বিয়ে তালাকের ব্যাপারে অনেকখানি উদার নীতি অবলম্বিত হতে শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত এ দুটো ব্যাপারকেই ধর্মীয় সীমার বাইরে ফেলে দেয়া হয়। আসল ব্যাপার এই যে, প্রোটেষ্ট্যান্ট পাদ্রীদের কাছে এসব সমস্যার কোনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছিল না, ছিল না এ বিষয়ে তাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা। ফলে ‘তালাক’কে গ্রহণ করা হলো, কিন্তু তালাক দেয়ার ক্ষমতা একান্তভাবে স্বামীর কুক্ষিগত করে দেয়া হলো। আর তালাক লাভের ন্যে একমাত্র উপায় হলো পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপন। সহজেই বোঝা যায়, এরূপ উপায়ে তালাক লাভের পর দু’জনের পক্ষে আর কোনো দিনই মিলিত হওয়ার আর কোনো সুযোগই থাকতে পারে না।
ইংলণ্ডে তালাক
ইংরণ্ডে ‘পিউরিটান’দের প্রতিপত্তি শুরু হলে তারা বিয়ে-শাদীর ব্যাপারটির দিকে বিশেষ নযর দেয়। প্রথমত বিয়েকে তারা ধর্মীয় সীমার বাইরে নিক্ষেপ করল। বিয়ের জন্যে ছেলের বয়স ১৬ আর মেয়ের বয়স ১৪ নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো। বিয়ে-অনুষ্ঠানের জন্যে পাদ্রীর বদলে রেজিষ্ট্রিকারী নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু এ ব্যবস্থা বেশি দিন চলতে পারল না। পরে তা বাতিল করে প্রাচীন গির্জা-আইন পুনরায় চালু করা হলো।
এ সময়ে প্রখ্যাত ইংরেজ কবি মিল্টন তালাকের সমর্থনে এক পুস্তিকা রচনা ও প্রকাশ করেন। তাতে স্বামী ও স্ত্রী –উভয়কেই তালাক দানের ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়, যদিও গির্জা আইন তার তীব্র প্রতিবাদ করে।
ষষ্ঠদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত পূর্ণ আড়াই শত বছর কাল যাবত ইংলণ্ডে গির্জা-আইনের প্রবল প্রতিপত্তি থাকে, যার প্রচণডতা ও অপরিবর্তনীয়তা সাধারণ মানুষকে রীতিমত ক্ষেপিয়ে তোলে। ১৮৭৫ সালে তালাক সম্পপের্ক একটি আইন জারি করা হয়, যা পরে পার্লমেণ্ট কর্তৃকও গৃহীন হয়। এ আইনে স্ত্রীর ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে তাকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা কেবলমাত্র স্বামীকেই দেয়া হয়। কিন্তু পুরুষের জ্বেনা-ব্যভিচারকে কোনো দোষের কাজ বলে আদপেই ধরা হয় না। দ্বিতীয়ত স্ত্রী যদি তালাক গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে, তাহলে তাকে স্বামীর ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার এবং সে সঙ্গে তার ওপর তার অমানুষিক অত্যাচার ও জুলুমের প্রমাণও অকাট্যভাবে পেশ করার শর্ত আরো করা হলো। অবশ্য ১৯২৩ সালের এক আইনে ব্যভিচারের অভিযোগে তালাক গ্রহণের সুযোগ স্বামী-স্ত্রী –উভয়কেই দেয়া হয়। ১৯৩৭ সালে তালাক আইনে আরো অনেক সংশোধন সংযোজন করা হয়। এতে করে ব্যভিচার ছাড়াও একাধিক্রমে তিন বছরকাল স্ত্রীকে নিঃসম্পর্ক করে ফেলে রাখা, নির্মমতা, অভ্যাসগত মদ্যপান, অচিকিৎসা, পাগলামী ও দূরারোগ্য যৌন ব্যধির কারণে তালাক লওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু তার সাথে শর্ত আরোপ করা হয় যে, বিয়ে হওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে তালাকের আবেদন পেশ করা যাবে না। যদিও এ আইন বলবত থাকা সত্ত্বেও ইংলণ্ডে আজও ব্যভিচারই হচ্ছে তালাক গ্রহণের সবচেয়ে বড় ও কার্যকর কারণ ও উপায়। জনৈক ইংরেজ সমাজবিজ্ঞানী লিখেছেনঃ
ব্যভিচার ও নির্মম ব্যবহার প্রমাণ করতে পারলেই তবে আজকের ইংরেজ স্ত্রী স্বামীর কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে। স্বামী তো কেবল স্ত্রীর ব্যভিচার লিপ্ততার অভিযোগ এনেই তালাক পেতে পারে; কিন্তু স্ত্রীকে সেজন্যে স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের সঙ্গে সঙ্গে তার নির্মম ব্যবহারের অভিযোগও আনতে হবে –এই হচ্ছে ইংরেজদের ইনসাফ। বস্তুত আইনের এ স্বৈরাচার বেশিদিন বরদাশত করা যেতে পারে না। অদূর ভবিষ্যতে স্বামী ও স্ত্রী –উভয়ই তালাক গ্রহণের সমান অধিকার লাভ করবেই। (আরবী)