১
পরিবার ও পারিবারিক জীবন
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১২১
হযরত লুকমানের নসীহত
এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদে উল্লিখিত হযরত লুকমানের তাঁর পুত্রের প্রতি প্রদত্ত নসীহত বিশেষভাবে স্মরণীয়। সূরা লুকমান-এ নসীহত বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। সেই নসীহতের কথাগুলো আমরা এখানে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করছি।
প্রথম কথাঃ
(আরবী)
হে প্রিয় পুত্র, আল্লাহর সাথে শিরক করো না, কেননা শিরক হচ্ছে অত্যন্ত বড় জুলুম।
মানুষের জীবন এক বিশেষ আকীদা-বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই বিশ্বাসই হচ্ছে সকল কর্মের মূর প্রেরণার উৎস। সেই কারণে হযরত লুকমান তাঁর ছোট্ট বয়সের প্রিয় পুত্রকে যে নসীহত করলেন, তার প্রথম কথাটিই হচ্ছে শিরক পরিহার করে তওহীদ –আল্লাহ সম্পর্কে সর্বতোভাবে একত্বের ধারণা ও বিশ্বাস মনের মধ্যে দৃঢ়মূল ও স্থায়ী করে নেয়ার নির্দেশ। বস্তুত তওহীদের আকীদাহ যেমন ব্যক্তির জীবনে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য সংস্থাপন করে, তেমনি পরিবার ও সমাজ জীবনেও অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ইসলামের দিক দিয়ে এ হচ্ছে ঈমানের বুনিয়াদ –প্রাথমিক কথা।
দ্বিতীয় কথাঃ
(আরবী)
হে পুত্র, একটা পরিমাণ শিরক কোনো জিনিসে ও যদি কোনো প্রস্তরের অভ্যন্তরে কিংবা আসমা-জমিনের কোনো এক নিভৃত কোণেও লুকিয়ে থাকে, তবুও আল্লাহ তা’আলা তা অবশ্যই এনে হাজির করবেন। বস্তুত আল্লাহ বড়ই সূক্ষ্মদর্শী –গোপন জিনিস সম্পর্কেও পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
নসীহতের এ অংশে আল্লাহ তা’আলার ইলম ও কুদরতের বিরাটত্ব, ব্যাপকতা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মতার অকাট্য বর্ণনা দেয়া হয়েছে। পূর্বোক্ত শিরক পরিহার ও তওহীদের আকীদাহ গ্রহণ সংক্রান্ত নসীহতের সঙ্গে এর স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আল্লাহ সম্পর্কে এ আকীদাহ-ই মানুষকে সকল প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ-নাফরমানী থেকে বিরত রাখে এবং পরকালে বিচারের দিনে অনুপরমাণু পরিমাণ আমল-ভালো কিংবা মন্দ –এর ফল ভোগ করার অনিবার্যতা মানুষের মন ও মগজে দৃঢ়মূল করে দেয়।
বরং এরূপ আকীদা মানব ম জাগ্রত ও সক্রিয় প্রভাবশীল হয়ে না থাকলে তা কখনো সম্ভব হতে পারে না।ৱ
আল্লাহ সম্পর্কে এ আকীদা অনুযায়ী বাস্তব জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে যে কাজ একান্তই জরুরী ও সর্বাধিক প্রভাবশালী তা হচ্ছে রীতিমত নামায পড়া। এজন্যে এর পরই বলা হয়েছে-
তৃতীয় কথাঃ (আরবী) –হে পুত্র, নামায কায়েম করো।
আকীদাহ সঠিকরূপে মন-মগজে বসিয়ে দেয়ার পর বাস্তব কর্মের নির্দেশ। আকীদার ক্ষেত্রে তওহীদ যেমন মূল, আমলের ক্ষেত্রে নামায হচ্ছে তেমনি সবকিছুর মূল। নামায হচ্ছে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের এক বাস্তব অনুষ্ঠান। নামায কায়েক ব্যতীত সঠিকরূপে ইসলামী জীবন যাপন সম্ভব নয়। নামায যদিও এক সামগ্রিক ও সমষ্টিগত কাজ, কিন্তু আমলের দৃষ্টিতে নামায একটি কাজ, যা ব্যক্তির নিজ সত্তার পূর্ণত্ব ও পরিপক্কতার বিধান করে। এজন্যে সন্তান-সন্ততির আকীদাহ যেমন দুরস্ত করা প্রথম প্রয়োজন, তেমনি দ্বিতীয় প্রয়োজন হচ্ছে সঠিকভাবে নামায পড়ার কায়দা-কানুন শেখানো, রীতিমত নামায পড়তে অভ্যস্থ করা। এজন্যে সূরা ‘তা-হা’তে আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততিদের নামায পড়বার জন্যে আদেশ করো এবং তা রীতিমত আদায় করায় তাদের অভ্যস্ত করে তোলো। (১৩২ আয়াত) যেন তারা আল্লাহর ভয়, আনুগত্য, নতি ও বিনয় সহকারে আল্লাহর বন্দেগী করার কাজে জীবন যাপন করার ব্যাপারে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে পারে এবং কখনই তা থেকে বিচ্যুত হয়ে না পড়ে।
নামায সম্পর্কে হাদীসেও সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে; নবী করীম (ﷺ) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ
(আরবী)
তোমরা তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের নামায পড়তে আদেশ করো যখন তারা সাদ বছর বয়স পর্যন্ত পৌঁছবে এবং নামাযের জন্যেই মারধোর করো –শাসন করো যখন তারা হবে দশ বছর বয়ষ্ক। আর তখন তাদের জন্যে আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করাও কর্তব্য।
এখানে ‘সাত বছর’ আর ‘দশ বছর’ বলার কারণ হচ্ছে, আরব অত্যন্ত গরম দেশ বলে সেখানকার বালক-বালিকারা সত বছরেই বালেগ হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে, আর দশ বছর বয়সে পূর্ণ বালেগ হয়ে যায়। আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন দেশ ও পরিবেশে এই ‘প্রায়-বালেগ’ ও ‘পূর্ণ বালেগ’ হওয়ার বয়সে তারতম্য হতে পারে এবং সে হিসেবেই রাসূলে করীম (ﷺ)-এর এ আদেশ কার্যখর করতে হবে। উল্লিখিত ‘সাত’ ও ‘দশ’ সংখ্যাই আসল উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রায়-বালেগ ও পূর্ণ-বালেগই মূল লক্ষ্য।
চতুর্থ কথায় বলা হয়েছেঃ
(আরবী)
এবং ভালো কাজের আদেশ করো আর অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখ।
নসীহতের এ অংশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঈমানদার ব্যক্তি কেবলমাত্র নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে পারে না অপর লোকদের –তথা গোটা সমাজ ও জাতির ভালো মন্দ সম্পর্কে দায়িত্ব বোধ করা এবং ভালো কাজের প্রচলন ও অন্যায় ও পাপ কাজের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাও তার এক অন্যতম প্রধান কর্তব্য। এমন কি কারো ব্যক্তিগতভাবে সৎ পথে চলা ও সৎ কাজ করাও পূর্ণত্ব ও যথার্থতা লাভ করতে পারে না, যতক্ষণ না অপর লোকদেরও হেদায়েত প্রাপ্ত রূপে তৈয়ার করতে চেষ্টা করা হবে। এ কেবল হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) প্রবর্তিত শরীয়তেরই নীতি নয়, এ হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত সমস্ত ব্যবস্থার প্রাণশক্তি। যে বালক-বালিকা ছোট্ট বয়সেই ন্যায়-অন্যায় ও পাপ-পূণ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে এবং এ সম্পর্কে দায়িত্ববোধ করতে শুরু করবে, আশা করা যায়, ভবিষ্যতে তারা নিজেরাই শুধু ন্যায়বাদী ও সত্যপন্থী হবে না, অন্য মানুষকেও –সমান ও জাতিকেও –ন্যায়বাদী ও সত্যাদর্শী বানাতে সচেষ্ট হবে।
এ প্রসঙ্গেই পঞ্চম নসীহত হচ্ছেঃ
(আরবী)
যা কিছু দুঃখ-কষ্ট লাঞ্ছনা আসবে এ কাজে তা উদারভাবে বরদাশত করো, কেননা এ এমন কাজ, যা সম্পন্ন করার একান্তই জরুরী ও অপরিহার্য।
‘ভালো কাজের আদেশ ও অন্যায়-পাপ কাজর নিষেধ’ কোনো ছেলে খেলার ব্যাপার নয়। এ হচ্ছে অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কাজ, অত্যন্ত কষ্ট ও দুঃখ-লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয় এ কাজ করতে গেলে। কাজেই বালক-বালিকাদের শিক্ষা এমনভাবে দিতে হবে, যাতে তারা শৈশবকাল থেকেই বীর সাহসী হয়ে গড়ে ওঠে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেন তারা নির্ভীক হয়, পরম পরাক্রমশালী জালিমের মুখোমুখী দাঁড়াতে যেন একটুও ভয় না পায়। অন্যায়কে নীরবে সহ্য করার মতো কাপুরুষতা যেন তাদের ভিতরে কখনো দেখা না দেয়।
নসীহতের ষষ্ঠ কথা হচ্ছেঃ
(আরবী)
লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না, অহংকার করে ঘৃণা করে লোকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।
এর তাৎপর্য হচ্ছে, তুমি নিজেকে সাধারণ লোক থেকে ভিন্ন, স্বতন্ত্র মনে করো না। নিজেকে তাদের একজন মনে করে তাদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকো।
সপ্তম কথাঃ
(আরবী)
জমিনের ওপর গৌরব-অহংকার স্ফীত হয়ে চলাফেরা করো না কেননা আল্লাহ যে কোনো অহংকারী গৌরবকারীকে মোটেই পছন্দ করেন না, তাতে সন্দেহ নেই।
অহংকারী গৌরবকারী- এ আচরণ সত্যিই অমানুষিক। লোকদের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকানো, মুখ ফিরিয়ে আর একদিকে তাকিয়ে অবজ্ঞাভরে কারো সাথে কথা বলা, চিৎকার করে বুক ফুলিয়ে কথা বলা ও বাহাদুরী করা এমন আচরণ, যা সামাজিক সুস্থতা ও সমৃদ্ধির দৃষ্টিতে কিছুমাত্র বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। অপরদিকে একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিবেচনা করলেই বোঝা যাবে যে, এ ধরনের অহংকারপূর্ণ আচরণ ঈমানেরও পরিপন্থী।
এ জন্যে অষ্টম নসীহতে বলা হয়েছেঃ
(আরবী)
মধ্যম নীতি অবলম্বন করে মাঝামাঝি ধরনের চালচলন অবলম্বন করো।
সাধারণ মানুষের একজন হয়েই সাধারণ জীবন যাপন করতে পূর্বোদ্ধৃত আদেশেরই পরিপূরক নিম্নের নবম এবং শেষ নসীহতটিঃ
(আরবী)
তোমার কণ্ঠধ্বনি নিচু করে, সংযত ও নরম করো কেননা সবচেয়ে ঘৃণ্য হচ্ছে গর্দভের কর্কশ আওয়াজ।
চিৎকার করা, চিৎকার করে কথাবার্তা বলা শালীনতা বিরোধী। সাধারণ সভ্যতা-ভব্যতা ও সামাজিকতা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলাই যদি জ্ঞান-বুদ্ধির পরিচায়ক হতো, তাহলে বলতে হবে গাধারা সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। যারা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে অভ্যস্ত, তাদের মনস্তত্ত্ব সম্ভবত এরূপ যে, আমাদের কথা উচ্চমার্গে ধ্বনিত হচ্ছে। অতএব আমার সম্মান ও মর্যাদাও সকলের কাছে স্বীকৃতব্য।
হযরত লুকমানের এ নয়টি নসীহতের কথা –যা তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে বলেছিলেন –বালক-বালিকাদের সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষাদানের পর্যায়ে –এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ হচ্ছে মৌলিক কানবীয় শিক্ষার বিভিন্ন ধারা, যার ভিত্তিতে শৈশবকাল থেকেই বালক-বালিকাদের শিক্ষিত করে তোলা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরিহার্য এবং এ কাজ পিতামাতাকেই সঠিকভাবে করতে হবে। পিতামাতা যদি সন্তানকে ভবিষ্যত সমাজের মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হতে পারে। এ ধরনের সন্তানই পিতামাতার পক্ষে ইহকাল-পরকাল সর্বত্র কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে। এজন্যে পিতামাতার প্রতি তাদের এভঅবে গড়ে তোলা হচ্ছে সন্তানের অনিবার্য হক। এ হক পিতামাতা আদায় করতে একান্ত বাধ্য।
এজন্যেই নবী করীম (ﷺ) এরশাদ করেছেনঃ
(আরবী)
কোনো পিতামাতা সন্তানকে উত্তম আদব-কায়দা ও স্বভাব-চরিত্র শিক্ষাদান অপেক্ষা ভালো কোনো দান দিতে পারে না।
অন্যত্র বলেছেনঃ
(আরবী)
তোমাদের সন্তানদের সম্মান করো এবং তাদের ভালো স্বভাব-চরিত্র শিক্ষা দাও।
সন্তানকে যতদূর সম্ভব চরিত্র সম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্যে চেষ্টা করা পিতামাতার কর্তব্য। এ কর্তব্য পালন তার নিজস্ব চেষ্টা-সাধনা ও যত্নের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল হলে চলবে না। মুমিন লোকদের তো অন্যান্য যাবতীয় ব্যাপারের ন্যায় এক্ষেত্রেও আল্লাহর ওপরই নির্ভরতা স্থাপন করতে হয়। কুরআন মজীদ পিতামাতাকে তাদের সন্তানরে জন্যে আল্লাহর কাছে দো’আ করবার উপদেশ এবং শিক্ষা দিয়েছেন। সূরা আল-ফুরকান-এ আল্লাহর নেক বান্দানের গুণের সঙ্গে এ গুণটিরও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ
আল্লাহর নেক বান্দা তারাই, যারা সব সময় দো’আ করে এই বলেঃ
(আরবী)
হে আল্লা, আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানের দিক থেকে চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে পরহেজগার লোকদের নেতা বানাও।
‘চোখের শীতলতা দান করো’ মানে তুমি তাদের তোমার অনুগত ও আদেশ পালনকারী বানাও, যা দেখে চোখ জুড়াবে, দিল খুশী হবে। ‘আমাদেরকে পরহেজগার লোকদের নেতা বানাও’ মানে তাদেরকে কল্যাণ ও মঙ্গলময় কাজ –আল্লাহ-রাসূলের আনুগত্যের কাজে আমাকে অনুগামী বানাও ও তাদের এমন নেতা বানাও যে, তারা দুনিয়ার মানুষকে সত্যের পথ, কল্যাণ ও মঙ্গলের পথ প্রদর্শন করবে। বস্তুত কারো স্ত্রী ও সন্তান যদি আল্লাহর অনুগত হয়, আল্লাহর দ্বীন পালনে আগ্রহশীল হয় এবং সত্য পথের মুজাহিদ ও অগ্রনেতা হয়, তাহলে মুমিন ব্যক্তির চোখ সত্যিই শীতল হয়, দিল ঠাণ্ডা হয়। কিন্তু ব্যাপার যদি তার বিপরীত হয়, স্ত্রী ও সন্তান হয় যদি আল্লাহর নাফরমান, তাহলে মু’মিন ব্যক্তির পক্ষে তার চেয়ে বড় দুঃখবোধ আর কিছুতেই হতে পারে না। এ কারণে পিতামাতার উচিত সব সময় সন্তানের কল্যাণের জন্যে তারা যাতে আল্লাহর নেক বান্দা হয়ে গড়ে ওঠে তার জন্যে আল্লাহর কাছে দো’আ করা।
ইসলামে পুত্র সন্তান অপেক্ষা কন্যা সন্তানের প্রতি দায়িত্ব এবং কর্তব্য সমধিক। জাহিলিয়াতের যুগে নারী ও কন্যা সন্তানের প্রতি যে অবজ্ঞা-অবহেলা ও ঘৃণার ভাব মানব মনে পুঞ্জীভূত ছিল, তার প্রতিবাদ ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে কন্যা সন্তানদের উন্নত ও ভালো চরিত্র শিক্ষাদানের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিশেষত নারীদের স্বাভাবিক দুর্বলতা এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী হওয়ার জন্যে তাদের প্রতি পিতামাতার অধিক লক্ষ্য আরোপ করা কর্তব্য। এজন্যে নবী করীম (ﷺ) এক বিশেষ ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছিলেনঃ
(আরবী)
যে লোককে এই কন্যা সন্তান দ্বারা পরীক্ষায় ফেলা হবে, সে যদি তাদের প্রতি কল্যাণময় ব্যবহার করে তবে এ কন্যারাই তার জন্যে জাহান্নামের পথে প্রতিবন্ধক হবে।
এ হলো সন্তানের প্রতি পিতামাতার আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাগত কর্তব্য; কিন্তু এ ছাড়াও কিছু কর্তব্য রয়েছে। তা হচ্ছে তাদের শিশু বয়সে খেলা ধুলা করার ব্যবস্থা করা এবং একটু বড় হলে তাদের ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী বানাবার জন্যে ব্যায়াব বা শরীর চর্চার শিক্ষা দান।
প্রথম কথাঃ
(আরবী)
হে প্রিয় পুত্র, আল্লাহর সাথে শিরক করো না, কেননা শিরক হচ্ছে অত্যন্ত বড় জুলুম।
মানুষের জীবন এক বিশেষ আকীদা-বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই বিশ্বাসই হচ্ছে সকল কর্মের মূর প্রেরণার উৎস। সেই কারণে হযরত লুকমান তাঁর ছোট্ট বয়সের প্রিয় পুত্রকে যে নসীহত করলেন, তার প্রথম কথাটিই হচ্ছে শিরক পরিহার করে তওহীদ –আল্লাহ সম্পর্কে সর্বতোভাবে একত্বের ধারণা ও বিশ্বাস মনের মধ্যে দৃঢ়মূল ও স্থায়ী করে নেয়ার নির্দেশ। বস্তুত তওহীদের আকীদাহ যেমন ব্যক্তির জীবনে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য সংস্থাপন করে, তেমনি পরিবার ও সমাজ জীবনেও অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ইসলামের দিক দিয়ে এ হচ্ছে ঈমানের বুনিয়াদ –প্রাথমিক কথা।
দ্বিতীয় কথাঃ
(আরবী)
হে পুত্র, একটা পরিমাণ শিরক কোনো জিনিসে ও যদি কোনো প্রস্তরের অভ্যন্তরে কিংবা আসমা-জমিনের কোনো এক নিভৃত কোণেও লুকিয়ে থাকে, তবুও আল্লাহ তা’আলা তা অবশ্যই এনে হাজির করবেন। বস্তুত আল্লাহ বড়ই সূক্ষ্মদর্শী –গোপন জিনিস সম্পর্কেও পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
নসীহতের এ অংশে আল্লাহ তা’আলার ইলম ও কুদরতের বিরাটত্ব, ব্যাপকতা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মতার অকাট্য বর্ণনা দেয়া হয়েছে। পূর্বোক্ত শিরক পরিহার ও তওহীদের আকীদাহ গ্রহণ সংক্রান্ত নসীহতের সঙ্গে এর স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আল্লাহ সম্পর্কে এ আকীদাহ-ই মানুষকে সকল প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ-নাফরমানী থেকে বিরত রাখে এবং পরকালে বিচারের দিনে অনুপরমাণু পরিমাণ আমল-ভালো কিংবা মন্দ –এর ফল ভোগ করার অনিবার্যতা মানুষের মন ও মগজে দৃঢ়মূল করে দেয়।
বরং এরূপ আকীদা মানব ম জাগ্রত ও সক্রিয় প্রভাবশীল হয়ে না থাকলে তা কখনো সম্ভব হতে পারে না।ৱ
আল্লাহ সম্পর্কে এ আকীদা অনুযায়ী বাস্তব জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে যে কাজ একান্তই জরুরী ও সর্বাধিক প্রভাবশালী তা হচ্ছে রীতিমত নামায পড়া। এজন্যে এর পরই বলা হয়েছে-
তৃতীয় কথাঃ (আরবী) –হে পুত্র, নামায কায়েম করো।
আকীদাহ সঠিকরূপে মন-মগজে বসিয়ে দেয়ার পর বাস্তব কর্মের নির্দেশ। আকীদার ক্ষেত্রে তওহীদ যেমন মূল, আমলের ক্ষেত্রে নামায হচ্ছে তেমনি সবকিছুর মূল। নামায হচ্ছে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের এক বাস্তব অনুষ্ঠান। নামায কায়েক ব্যতীত সঠিকরূপে ইসলামী জীবন যাপন সম্ভব নয়। নামায যদিও এক সামগ্রিক ও সমষ্টিগত কাজ, কিন্তু আমলের দৃষ্টিতে নামায একটি কাজ, যা ব্যক্তির নিজ সত্তার পূর্ণত্ব ও পরিপক্কতার বিধান করে। এজন্যে সন্তান-সন্ততির আকীদাহ যেমন দুরস্ত করা প্রথম প্রয়োজন, তেমনি দ্বিতীয় প্রয়োজন হচ্ছে সঠিকভাবে নামায পড়ার কায়দা-কানুন শেখানো, রীতিমত নামায পড়তে অভ্যস্থ করা। এজন্যে সূরা ‘তা-হা’তে আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততিদের নামায পড়বার জন্যে আদেশ করো এবং তা রীতিমত আদায় করায় তাদের অভ্যস্ত করে তোলো। (১৩২ আয়াত) যেন তারা আল্লাহর ভয়, আনুগত্য, নতি ও বিনয় সহকারে আল্লাহর বন্দেগী করার কাজে জীবন যাপন করার ব্যাপারে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে পারে এবং কখনই তা থেকে বিচ্যুত হয়ে না পড়ে।
নামায সম্পর্কে হাদীসেও সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে; নবী করীম (ﷺ) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ
(আরবী)
তোমরা তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের নামায পড়তে আদেশ করো যখন তারা সাদ বছর বয়স পর্যন্ত পৌঁছবে এবং নামাযের জন্যেই মারধোর করো –শাসন করো যখন তারা হবে দশ বছর বয়ষ্ক। আর তখন তাদের জন্যে আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করাও কর্তব্য।
এখানে ‘সাত বছর’ আর ‘দশ বছর’ বলার কারণ হচ্ছে, আরব অত্যন্ত গরম দেশ বলে সেখানকার বালক-বালিকারা সত বছরেই বালেগ হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে, আর দশ বছর বয়সে পূর্ণ বালেগ হয়ে যায়। আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন দেশ ও পরিবেশে এই ‘প্রায়-বালেগ’ ও ‘পূর্ণ বালেগ’ হওয়ার বয়সে তারতম্য হতে পারে এবং সে হিসেবেই রাসূলে করীম (ﷺ)-এর এ আদেশ কার্যখর করতে হবে। উল্লিখিত ‘সাত’ ও ‘দশ’ সংখ্যাই আসল উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রায়-বালেগ ও পূর্ণ-বালেগই মূল লক্ষ্য।
চতুর্থ কথায় বলা হয়েছেঃ
(আরবী)
এবং ভালো কাজের আদেশ করো আর অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখ।
নসীহতের এ অংশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঈমানদার ব্যক্তি কেবলমাত্র নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে পারে না অপর লোকদের –তথা গোটা সমাজ ও জাতির ভালো মন্দ সম্পর্কে দায়িত্ব বোধ করা এবং ভালো কাজের প্রচলন ও অন্যায় ও পাপ কাজের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাও তার এক অন্যতম প্রধান কর্তব্য। এমন কি কারো ব্যক্তিগতভাবে সৎ পথে চলা ও সৎ কাজ করাও পূর্ণত্ব ও যথার্থতা লাভ করতে পারে না, যতক্ষণ না অপর লোকদেরও হেদায়েত প্রাপ্ত রূপে তৈয়ার করতে চেষ্টা করা হবে। এ কেবল হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) প্রবর্তিত শরীয়তেরই নীতি নয়, এ হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত সমস্ত ব্যবস্থার প্রাণশক্তি। যে বালক-বালিকা ছোট্ট বয়সেই ন্যায়-অন্যায় ও পাপ-পূণ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে এবং এ সম্পর্কে দায়িত্ববোধ করতে শুরু করবে, আশা করা যায়, ভবিষ্যতে তারা নিজেরাই শুধু ন্যায়বাদী ও সত্যপন্থী হবে না, অন্য মানুষকেও –সমান ও জাতিকেও –ন্যায়বাদী ও সত্যাদর্শী বানাতে সচেষ্ট হবে।
এ প্রসঙ্গেই পঞ্চম নসীহত হচ্ছেঃ
(আরবী)
যা কিছু দুঃখ-কষ্ট লাঞ্ছনা আসবে এ কাজে তা উদারভাবে বরদাশত করো, কেননা এ এমন কাজ, যা সম্পন্ন করার একান্তই জরুরী ও অপরিহার্য।
‘ভালো কাজের আদেশ ও অন্যায়-পাপ কাজর নিষেধ’ কোনো ছেলে খেলার ব্যাপার নয়। এ হচ্ছে অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কাজ, অত্যন্ত কষ্ট ও দুঃখ-লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয় এ কাজ করতে গেলে। কাজেই বালক-বালিকাদের শিক্ষা এমনভাবে দিতে হবে, যাতে তারা শৈশবকাল থেকেই বীর সাহসী হয়ে গড়ে ওঠে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেন তারা নির্ভীক হয়, পরম পরাক্রমশালী জালিমের মুখোমুখী দাঁড়াতে যেন একটুও ভয় না পায়। অন্যায়কে নীরবে সহ্য করার মতো কাপুরুষতা যেন তাদের ভিতরে কখনো দেখা না দেয়।
নসীহতের ষষ্ঠ কথা হচ্ছেঃ
(আরবী)
লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না, অহংকার করে ঘৃণা করে লোকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।
এর তাৎপর্য হচ্ছে, তুমি নিজেকে সাধারণ লোক থেকে ভিন্ন, স্বতন্ত্র মনে করো না। নিজেকে তাদের একজন মনে করে তাদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকো।
সপ্তম কথাঃ
(আরবী)
জমিনের ওপর গৌরব-অহংকার স্ফীত হয়ে চলাফেরা করো না কেননা আল্লাহ যে কোনো অহংকারী গৌরবকারীকে মোটেই পছন্দ করেন না, তাতে সন্দেহ নেই।
অহংকারী গৌরবকারী- এ আচরণ সত্যিই অমানুষিক। লোকদের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকানো, মুখ ফিরিয়ে আর একদিকে তাকিয়ে অবজ্ঞাভরে কারো সাথে কথা বলা, চিৎকার করে বুক ফুলিয়ে কথা বলা ও বাহাদুরী করা এমন আচরণ, যা সামাজিক সুস্থতা ও সমৃদ্ধির দৃষ্টিতে কিছুমাত্র বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। অপরদিকে একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিবেচনা করলেই বোঝা যাবে যে, এ ধরনের অহংকারপূর্ণ আচরণ ঈমানেরও পরিপন্থী।
এ জন্যে অষ্টম নসীহতে বলা হয়েছেঃ
(আরবী)
মধ্যম নীতি অবলম্বন করে মাঝামাঝি ধরনের চালচলন অবলম্বন করো।
সাধারণ মানুষের একজন হয়েই সাধারণ জীবন যাপন করতে পূর্বোদ্ধৃত আদেশেরই পরিপূরক নিম্নের নবম এবং শেষ নসীহতটিঃ
(আরবী)
তোমার কণ্ঠধ্বনি নিচু করে, সংযত ও নরম করো কেননা সবচেয়ে ঘৃণ্য হচ্ছে গর্দভের কর্কশ আওয়াজ।
চিৎকার করা, চিৎকার করে কথাবার্তা বলা শালীনতা বিরোধী। সাধারণ সভ্যতা-ভব্যতা ও সামাজিকতা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলাই যদি জ্ঞান-বুদ্ধির পরিচায়ক হতো, তাহলে বলতে হবে গাধারা সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। যারা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে অভ্যস্ত, তাদের মনস্তত্ত্ব সম্ভবত এরূপ যে, আমাদের কথা উচ্চমার্গে ধ্বনিত হচ্ছে। অতএব আমার সম্মান ও মর্যাদাও সকলের কাছে স্বীকৃতব্য।
হযরত লুকমানের এ নয়টি নসীহতের কথা –যা তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে বলেছিলেন –বালক-বালিকাদের সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষাদানের পর্যায়ে –এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ হচ্ছে মৌলিক কানবীয় শিক্ষার বিভিন্ন ধারা, যার ভিত্তিতে শৈশবকাল থেকেই বালক-বালিকাদের শিক্ষিত করে তোলা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরিহার্য এবং এ কাজ পিতামাতাকেই সঠিকভাবে করতে হবে। পিতামাতা যদি সন্তানকে ভবিষ্যত সমাজের মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হতে পারে। এ ধরনের সন্তানই পিতামাতার পক্ষে ইহকাল-পরকাল সর্বত্র কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে। এজন্যে পিতামাতার প্রতি তাদের এভঅবে গড়ে তোলা হচ্ছে সন্তানের অনিবার্য হক। এ হক পিতামাতা আদায় করতে একান্ত বাধ্য।
এজন্যেই নবী করীম (ﷺ) এরশাদ করেছেনঃ
(আরবী)
কোনো পিতামাতা সন্তানকে উত্তম আদব-কায়দা ও স্বভাব-চরিত্র শিক্ষাদান অপেক্ষা ভালো কোনো দান দিতে পারে না।
অন্যত্র বলেছেনঃ
(আরবী)
তোমাদের সন্তানদের সম্মান করো এবং তাদের ভালো স্বভাব-চরিত্র শিক্ষা দাও।
সন্তানকে যতদূর সম্ভব চরিত্র সম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্যে চেষ্টা করা পিতামাতার কর্তব্য। এ কর্তব্য পালন তার নিজস্ব চেষ্টা-সাধনা ও যত্নের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল হলে চলবে না। মুমিন লোকদের তো অন্যান্য যাবতীয় ব্যাপারের ন্যায় এক্ষেত্রেও আল্লাহর ওপরই নির্ভরতা স্থাপন করতে হয়। কুরআন মজীদ পিতামাতাকে তাদের সন্তানরে জন্যে আল্লাহর কাছে দো’আ করবার উপদেশ এবং শিক্ষা দিয়েছেন। সূরা আল-ফুরকান-এ আল্লাহর নেক বান্দানের গুণের সঙ্গে এ গুণটিরও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ
আল্লাহর নেক বান্দা তারাই, যারা সব সময় দো’আ করে এই বলেঃ
(আরবী)
হে আল্লা, আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানের দিক থেকে চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে পরহেজগার লোকদের নেতা বানাও।
‘চোখের শীতলতা দান করো’ মানে তুমি তাদের তোমার অনুগত ও আদেশ পালনকারী বানাও, যা দেখে চোখ জুড়াবে, দিল খুশী হবে। ‘আমাদেরকে পরহেজগার লোকদের নেতা বানাও’ মানে তাদেরকে কল্যাণ ও মঙ্গলময় কাজ –আল্লাহ-রাসূলের আনুগত্যের কাজে আমাকে অনুগামী বানাও ও তাদের এমন নেতা বানাও যে, তারা দুনিয়ার মানুষকে সত্যের পথ, কল্যাণ ও মঙ্গলের পথ প্রদর্শন করবে। বস্তুত কারো স্ত্রী ও সন্তান যদি আল্লাহর অনুগত হয়, আল্লাহর দ্বীন পালনে আগ্রহশীল হয় এবং সত্য পথের মুজাহিদ ও অগ্রনেতা হয়, তাহলে মুমিন ব্যক্তির চোখ সত্যিই শীতল হয়, দিল ঠাণ্ডা হয়। কিন্তু ব্যাপার যদি তার বিপরীত হয়, স্ত্রী ও সন্তান হয় যদি আল্লাহর নাফরমান, তাহলে মু’মিন ব্যক্তির পক্ষে তার চেয়ে বড় দুঃখবোধ আর কিছুতেই হতে পারে না। এ কারণে পিতামাতার উচিত সব সময় সন্তানের কল্যাণের জন্যে তারা যাতে আল্লাহর নেক বান্দা হয়ে গড়ে ওঠে তার জন্যে আল্লাহর কাছে দো’আ করা।
ইসলামে পুত্র সন্তান অপেক্ষা কন্যা সন্তানের প্রতি দায়িত্ব এবং কর্তব্য সমধিক। জাহিলিয়াতের যুগে নারী ও কন্যা সন্তানের প্রতি যে অবজ্ঞা-অবহেলা ও ঘৃণার ভাব মানব মনে পুঞ্জীভূত ছিল, তার প্রতিবাদ ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে কন্যা সন্তানদের উন্নত ও ভালো চরিত্র শিক্ষাদানের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিশেষত নারীদের স্বাভাবিক দুর্বলতা এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী হওয়ার জন্যে তাদের প্রতি পিতামাতার অধিক লক্ষ্য আরোপ করা কর্তব্য। এজন্যে নবী করীম (ﷺ) এক বিশেষ ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছিলেনঃ
(আরবী)
যে লোককে এই কন্যা সন্তান দ্বারা পরীক্ষায় ফেলা হবে, সে যদি তাদের প্রতি কল্যাণময় ব্যবহার করে তবে এ কন্যারাই তার জন্যে জাহান্নামের পথে প্রতিবন্ধক হবে।
এ হলো সন্তানের প্রতি পিতামাতার আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাগত কর্তব্য; কিন্তু এ ছাড়াও কিছু কর্তব্য রয়েছে। তা হচ্ছে তাদের শিশু বয়সে খেলা ধুলা করার ব্যবস্থা করা এবং একটু বড় হলে তাদের ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী বানাবার জন্যে ব্যায়াব বা শরীর চর্চার শিক্ষা দান।