hadith book logo

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২য় খন্ড

লেখকঃ আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসীর আদ-দামেশকী (র) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩২

বেথেলহাম ও কুমামার ভিত্তি স্থাপন

হযরত ঈসা মাসীহ (আ) যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে স্থানে সম্রাট কনস্টান্টাইন একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যার নাম রাখা হয় বায়তু লাহাম (বেথেলহাম)। অপর দিকে সম্রাটের মা হায়লানা কথিত ক্রুশবিদ্ধ ঈসার কবরের উপর আর একটি প্রাসাদ তৈরি করেন, যার নাম রাখা হয় কুমামা। ইহুদীদের প্রচারণায় পড়ে তারাও বিশ্বাস করত যে, নবী ঈসা মাসীহকেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এই মত পোষণকারী পূর্বের ও পরের সকলেই কাফির। এরা বিভিন্ন রকম মনগড়া বিধি-বিধান ও আইন-কানুন তৈরি করে। এসব বিধানের মধ্যে ছিল পুরাতন নিয়ম তথা তাওরাতের বিরোধিতা করা। তারা তাওরাতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তুকে হালাল করে নেয়, যেমন শূকর খাওয়া। তারা পূর্বমুখী হয়ে উপাসনা করে। অথচ ঈসা-মাসীহ বায়তুল মুকাদ্দাসের শুভ্র পাথরের দিকে মুখ করে ছাড়া ইবাদত করতেন না। শুধু তিনিই নন, বরং মূসা (আ)-এর পরবর্তী সকল নবী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেছেন। এমনকি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-ও হিজরতের পরে ষোল কিংবা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে নামায আদায় করেছেন। পরে তিনি আল্লাহর হুকুমে ইবরাহীম খলীল (আ) কর্তৃক নির্মিত কা’বা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন।

তারা গীর্জাগুলোতে মূর্তি স্থাপন করে অথচ ইতিপূর্বে গীর্জায় কখনও কোন মূর্তি রাখা হতো না। তারা এমন সব আকীদা তৈরি করে যা শিশু, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই বিশ্বাস করত। এই আকীদার নাম ছিল ‘আমান’। প্রকৃত পক্ষে এটা ছিল সম্পূর্ণ কুফরী আকীদা ও বিশ্বাস ভঙ্গের নামান্তর। মালাকিয়া ও নাসতুরিয়া দলভুক্ত সকলেই ছিল নাসতুরাস এর অনুসারী। এরা ছিল দ্বিতীয় মহা সম্মেলনপন্থী। আর ইয়াকূবিয়া সম্প্রদায় হচ্ছে ইয়াকূব আল বারাদায়ীর অনুসারী। এরা হল তৃতীয় মহা সমাবেশ পন্থী। এ দুই দলই প্রথমোক্ত দলের একই আকীদা পোষণ করত, যদিও খুঁটিনাটি বিষয়ে পারস্পরিক বিরোধ ছিল। আমি তাদের কুফরী আকীদার কথা বর্ণনা করছি।

আর কুফরের বর্ণনা করায় কেউ কাফির হয় না। তাদের আকীদার বাক্যগুলোর মধ্যে এমন সব জঘন্য শব্দ আছে, যার মধ্যে কুফরীর ভাব অতি প্রকট এবং তা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। এ আকীদা মানুষকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পোঁছিয়ে দেয়। তাদের বলে থাকে যে, আমরা এক আল্লাহকে বিশ্বাস করি যিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, আসমান ও যমীনের দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, ঐ একই প্রতিপালককে আমরা মানি। মাসীহ সেই এক আল্লাহরই একক পুত্র। অনাদিকালেই পিতা থেকে তাঁর জন্ম। তিনি নূর থেকে সৃষ্ট নূর। সদা প্রভু থেকে তিনিও সদা প্রভু। তিনি জন্মলাভ করেছেন, সৃষ্ট হননি। সেই মূল উপাদানে তিনি পিতার সমকক্ষ যার দ্বারা সবকিছু সৃষ্ট হয়েছে। আমাদের ললাটলিপি অনুযায়ী আমরা মানুষ। আমাদের মুক্তির জন্যে তিনি আসমান থেকে অবতরণ করেছেন এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা দেহ ধারণ করেছেন ও কুমারী মারয়ামের গর্ভ থেকে মানবরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এরপর মালাতিস নাবাতীর আমলে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন। তারপরে সমাধিস্থ হয়েছেন। সমাধিস্থ হওয়ার তিন দিন পর কবর থেকে বেরিয়ে এসেছেন এবং আসমানে উঠে গিয়ে পিতার ডান পাশে বসে আছেন। আবার তিনি দেহ ধারণ করে আসবেন। জীবিত ও মৃতদের খোঁজ খবর নিবেন। তাঁর রাজত্বের ক্ষয় নেই। তিনি পবিত্র আত্মা। তিনি প্রভু, জীবন দানকারী। পিতার কাছ থেকে এসেছেন। পিতার সাথে থাকবেন। পুত্র সিজদা পাওয়ার যোগ্য। নবীকুলের মধ্যে দোলনায় কথা বলার গৌরব তিনিই লাভ করেছেন। আল্লাহর সাথে পবিত্র ও পূর্ণাংগ সম্পর্ক তাঁর। সমস্ত পাপ ক্ষমা করার জন্যে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি চিরঞ্জীব, মৃতকে জীবন দানকারী, সর্বদা বিরাজমান ও যিম্মাদার।