hadith book logo

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২য় খন্ড

লেখকঃ আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসীর আদ-দামেশকী (র) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৬

অন্ধ, কুষ্ঠ ও টাক মাথাওয়ালা তিন ব্যক্তির ঘটনা

ইমাম বুখারী (র) ও মুসলিম (র) একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছেন যে, বনী ইসরাইলের তিন ব্যক্তি একজন কুষ্ঠ রোগী, একজন অন্ধ, একজন টাক মাথা বিশিষ্ট ছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তাদের নিকট আল্লাহ তাআলা একজন ফিরিশতা পাঠালেন। তিনি প্রথম কুষ্ঠরোগীর নিকট উপস্থিত হন।

ফিরিশতা তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার প্রিয় বস্তু কি?’ সে বলে, ‘সুন্দর রং ও সুন্দর ত্বক। লোকজন এখন আমাকে ঘৃণা করে।’ ফিরিশতা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। ফলে তার রোগ বিদূরিত হয়। তাকে সুন্দর রং ও সুন্দর ত্বক দান করা হয়। ফিরিশতা আবার বলেন, ‘কোন সম্পদ তোমার নিকট প্রিয়?’ সে বলে, ‘উট। অথবা সে বললো গাভী।‘ (কুষ্ঠ রোগী ও টেকো মাথা বিশিষ্ট এ দু’জনের একজন উট চেয়েছিল অপরজন চেয়েছিল গাভী। তাদের কে উট চেয়েছিল আর কে গাভী চেয়েছিল তা নিয়ে রাবীর সন্দেহ রয়েছে।) ফিরিশতা একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী তাকে প্রদান করেন এবং বলেন, ‘এতে আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন!’

রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর ফিরিশতা আসেন টেকো মাথা বিশিষ্ট ব্যক্তির নিকট। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন। ‘কোন বস্তু তোমার প্রিয়?’ জবাবে সে বলে। ‘আমার প্রিয় হল সুন্দর চুল, আর এই টাক যেন দূরীভূত হয়। লোকজন তো এখন আমাকে ঘৃণা করে।’ ফিরিশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। টাক দূরীভূত হয় এবং তার মাথায় সুন্দর চুল গজায়। আবার ফিরিশতা বলেন, ‘কোন সম্পদ তোমার নিকট প্রিয়?’ সে বলে, ‘গরু।‘ ফিরিশতা তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করেন এবং বলেন, ‘আল্লাহ এতে তোমাকে বরকত দিন!’

এবার ফিরিশতা আসেন অন্ধ ব্যক্তির নিকট। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার প্রিয় বস্তু কি?’ সে বললো, ‘আল্লাহ যেন আমার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেন। আমি যেন লোকজনকে দেখতে পাই।’ ফিরিশতা তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলেন। আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফিরিশতা বললেন, ‘কোন সম্পদ তোমার প্রিয়?’ সে বলে, ‘ছাগল।’ তিনি তাকে একটি গর্ভবতী বকরী দান করেন।

ইতিমধ্যে উটনী, গাভী ও বকরী বাচ্চা দিতে থাকে। ক্রমে ক্রমে উট ওয়ালার মাঠ উটে ভর্তি হয়ে যায়। গাভীওয়ালার মাঠ পূর্ণ হয়ে যায় গরুতে। আর বকরী ওয়ালার মাঠ পরিপূর্ণ হয় বকরীতে।

এরপর একদিন ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর নিকট তার পূর্বের আকৃতি নিয়ে উপস্থিত হন। তিনি বললেন, ‘আমি একজন মিসকিন। সফরে এসে আমার যা ছিল সব ফুরিয়ে গেছে। আল্লাহর সাহায্য এবং অতঃপর আপনার সহযোগিতা ব্যতীত আমার দেশে ফেরার কোন উপায় নেই। যে আল্লাহ আপনাকে সুন্দর দেহ, বর্ণ ও সুন্দর ত্বক দান করেছেন তাঁর দোহাই দিয়ে আপনার নিকট আমি একটি উট ভিক্ষা চাইছি। আমার সফর কালে সেটি কাজে লাগবে।’ সে বলল, ‘মানুষের চাহিদার শেষ নেই।’ ফেরেশতা বলেন, ‘আপনাকে আমার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আপনি না কুষ্ঠ রোগী ছিলেন? মানুষ আপনাকে ঘৃণা করত। আর আপনি ছিলেন দরিদ্র। আল্লাহই তো আপনাকে সব সম্পদ দান করেছেন।’ সে বলল, ‘আমি তো বংশানুক্রমে উত্তরাধিকার সূত্রে এ সম্পদের মালিক হয়েছি।’ ফেরেশতা বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো, তাহলে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেন!’

এরপর ফেরেশতা টেকো মাথা লোকের নিকট তাঁর আকৃতি নিয়ে আসলেন। কুষ্ঠরোগীকে যেরূপ বলেছিলেন, তাকেও সেরূপ বললেন। সেও ঐ কুষ্ঠরোগীর মত উত্তর দিল। ফেরেশতা বললেন, ‘তুমি মিথ্যাবাদী হলে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেন!’

এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির নিকট তাঁর আকৃতিতে আসলেন। তিনি বললেন, ‘আমি মিসকিন ও মুসফির ব্যক্তি। সফরে এসে আমার সহায় সম্বল ফুরিয়ে গিয়েছে। আল্লাহর সাহায্য ও তারপর আপনার সহায়তা ব্যতীত আমার বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। যে মহান আল্লাহ আপনাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন তার দোহাই দিয়ে আমি আপনার নিকট একটি বকারী যাঞ্চা করছি। ওটি দ্বারা আমার সফরের প্রয়োজনীয় খরচ মিটাবো।’ বকরী ওয়ালা বলল, ‘আমি ছিলাম অন্ধ। আল্লাহ আমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ছিলাম দরিদ্র। আল্লাহ আমাকে ধনী বানিয়েছেন। তোমার যেটা পছন্দ সেটা নিয়ে যাও। আল্লাহর নামে তুমি আজ যেটিই নিবে আমি তাতে দুঃখ পাব না।’ ফিরিশতা বললেন, ‘আপনার মাল আপনি রেখে দিন। বস্তুত আল্লাহ আপনাদের তিনজনকে পরীক্ষা করলেন। আপনার প্রতি আল্লাহর রাজী হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনার অপর দুই সাথীর প্রতি আল্লাহ নারাজ ও অসন্তুষ্ট হয়েছেন।’

এটি ইমাম বুখারী (র)-এর ভাষ্য। বনী ইসরাঈল বিষয়ক হাদীসসমূহে তিনি এটি উদ্ধৃত করেছেন।