১
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২য় খন্ড
লেখকঃ আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসীর আদ-দামেশকী (র) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৯
উদ্যান মালিকদের ঘটনা
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَا بَلَوْنَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ إِذْ أَقْسَمُوا لَيَصْرِمُنَّهَا مُصْبِحِينَ () وَلَا يَسْتَثْنُونَ () فَطَافَ عَلَيْهَا طَائِفٌ مِنْ رَبِّكَ وَهُمْ نَائِمُونَ () فَأَصْبَحَتْ كَالصَّرِيمِ () فَتَنَادَوْا مُصْبِحِينَ () أَنِ اغْدُوا عَلَى حَرْثِكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَارِمِينَ () فَانْطَلَقُوا وَهُمْ يَتَخَافَتُونَ () أَنْ لَا يَدْخُلَنَّهَا الْيَوْمَ عَلَيْكُمْ مِسْكِينٌ () وَغَدَوْا عَلَى حَرْدٍ قَادِرِينَ () فَلَمَّا رَأَوْهَا قَالُوا إِنَّا لَضَالُّونَ () بَلْ نَحْنُ مَحْرُومُونَ () قَالَ أَوْسَطُهُمْ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ لَوْلَا تُسَبِّحُونَ () قَالُوا سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ () فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَلَاوَمُونَ () قَالُوا يَا وَيْلَنَا إِنَّا كُنَّا طَاغِينَ () عَسَى رَبُّنَا أَنْ يُبْدِلَنَا خَيْرًا مِنْهَا إِنَّا إِلَى رَبِّنَا رَاغِبُونَ () كَذَلِكَ الْعَذَابُ وَلَعَذَابُ الْآَخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
“আমি ওদেরকে পরীক্ষা করেছি যেভাবে পরীক্ষা করেছিলাম উদ্যান মালিকদেরকে। যখন তারা শপথ করেছিল যে, ওরা প্রত্যুষে আহরণ করবে বাগানের ফল, এবং তারা ইনশাআল্লাহ বলেনি। অতঃপর আপনার প্রতিপালকের নিকট থেকে এক বিপর্যয় হানা দিল সেই উদ্যানে, যখন তারা ছিল নিদ্রিত। ফলে সেটি দগ্ধ হয়ে কাল বর্ণ ধারণ করল। প্রত্যুষে ওরা একে অপরকে ডেকে বলল, তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও তবে সকাল সকাল বাগানে চল। অতঃপর ওরা চলল নিম্নস্বরে কথা বলতে বলতে। অদ্য যেন তোমাদের নিকট কোন অভাবগ্রস্ত এতে প্রবেশ করতে না পারে। তারপর ওরা নিবৃত্ত করতে সক্ষম এ বিশ্বাস নিয়ে প্রভাতক বাগানে যাত্রা করল। ওরা যখন বাগানের অবস্থা প্রত্যক্ষ করল। তখন বলল, আমরা তো দিশা হারিয়ে ফেলেছি। বরং আমরা তো বঞ্চিত। ওদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাদের বলিনি, এখনও তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছ না কেন? তখন ওরা বলল, আমরা আমাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি, আমরা তো সীমালংঘনকারী ছিলাম। তারপর ওরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে লাগল। ওরা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের। আমরা তো ছিলাম সীমালংঘনকারী। সম্ভবত আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে দিবেন উৎকৃষ্টতর বিনিময়। আমরা আমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হলাম। শাস্তি এরূপই হয়ে থাকে এবং আখিরাতের শাস্তি কঠিনতর। যদি তারা জানত।”( ৬৮ কালামঃ ১৭-৩৩) এটি একটি উপমা। কুরায়শ বংশীয় কাফিরদের জন্যে আল্লাহ তাআলা এ উপমাটি বর্ণনা করেছেন। কারণ আল্লাহ তাআলা সম্মানিত রাসূল প্রেরণ করে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কিন্তু এর বিপরীতে তারা রাসূলকে প্রত্যাখ্যান ও তাঁর বিরোধিতা করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ بَدَّلُوا نِعْمَةَ اللَّهِ كُفْرًا وَأَحَلُّوا قَوْمَهُمْ دَارَ الْبَوَارِ () جَهَنَّمَ يَصْلَوْنَهَا وَبِئْسَ الْقَرَارُ
“তুমি কি ওদের লক্ষ্য করো না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং ওরা ওদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনে ধ্বংসের ক্ষেত্রে। জাহান্নামে যার মধ্যে ওরা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট এই আবাসস্থল!” (১৪ ইবরাহীম ২৮-২৯)
হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেন, এখানে কুরায়শ বংশীয় কাফিরদেরকে বুঝানো হয়েছে। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা একটি উদ্যানের মালিকের সাথে তুলনা করেছেন। এমন একটি উদ্যান যার মধ্যে রয়েছে নানা জাত ও নানা রঙের ফলমূল ও শস্য। সেগুলো পরিপক্ক ও কর্তন যোগ্য হয়ে উঠেছিল।
এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলার বর্ণনা,
اِذْاَقْسَمُوْا
“যখন তারা শপথ করেছিল” নিজেদের মধ্যে
لَیَصۡرِمُنَّہَا مُصۡبِحِیۡنَ ,
“তারা আহরন করবে বাগানের ফল” অর্থাৎ ফল কেটে ঘরে তুলবে তথা শস্য সংগ্রহ করবে,
مُصۡبِحِیۡنَ
“অর্থাৎ ভোর বেলায় যাতে কোন ফকীর কিংবা অভাবী লোক তাদেরকে দেখতে না পায়, এবং ওদেরকে কিছু দিতে না হয়। তারা এ বিষয়ে শপথ করেছে বটে কিন্তু তাতে ইনশাআল্লাহ বলেনি। ফলে আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ করে দিলেন। তাদের বাগানে প্রেরণ করলেন আপদ ও দুর্যোগ। ঐ দুর্যোগে উদ্যানটি বিরান হয়ে যায়। ঐ আপদটি ছিল জ্বলন্ত আগুন। এটি বাগানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। ফলে কাজে আসার মত কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন
فَطَافَ عَلَیۡہَا طَآئِفٌ مِّنۡ رَّبِّکَ وَ ہُمۡ نَآئِمُوۡنَ
“ফলে সেটি পুড়ে গিয়ে কালো বর্ণ ধারণ করল” অর্থাৎ অন্ধকার রাত্রির মত কাল হয়ে গেল। এটি হল তাদের আশা আকাঙ্খার বিপরীত।
فَتَنَادَوۡا مُصۡبِحِیۡنَ
প্রত্যুষে তারা একে অপরকে ডেকে বলল” অর্থাৎ তারা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠল এবং একে অপরকে ডেকে বলল
اَنِ اغۡدُوۡا عَلٰی حَرۡثِکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰرِمِیۡنَ
“তোমরা যদি ফল আহরণ করতে না চাও তবে সকাল সকাল বাগানে চল” এবং বেলা বাড়ার এবং ফকীরের সংখ্যা বৃদ্ধির পূর্বেই ফল সংগ্রহের কাজ শেষ কর।
فَانۡطَلَقُوۡا وَ ہُمۡ یَتَخَافَتُوۡنَ
“তারপর অর্থাৎ তারা চুপি চুপি এ কথা বলতে বলতে যাত্রা করল”
لَّا یَدۡخُلَنَّہَا الۡیَوۡمَ عَلَیۡکُمۡ مِّسۡکِیۡنٌ
অর্থাৎ তারা সবাই এ বিষয়ে পরামর্শ করে যে ফকীররা যেন কোনমতেই ঢুকতে না পারে। একমত হল।
وَّ غَدَوۡا عَلٰی حَرۡدٍ قٰدِرِیۡنَ
অতঃপর তারা নিবৃত্ত করতে সক্ষম এ বিশ্বাস নিয়ে প্রভাতকালে বাগানে যাত্রা করল অর্থাৎ তারা এই অসৎ মতলব মনে মনে এঁটে তা বাস্তবায়নে সক্ষম মনে করে যাত্রা করল। তাফসীরকার ইকরামা ও শাবী (র) বলেন, আয়াতের অর্থ হল, ফকীর-মিসকীনদের প্রতি ক্রুদ্ধ মনোভাব নিয়ে তারা রওয়ানা করল। তাফসীরকার সুদ্দী (র) বলেছেন যে, ওদের বাগানের নাম ছিল হারদ ( حرد )। তবে তার এ বক্তব্য কষ্টকল্পিত ও বাস্তবতা বর্জিত। فَلَمَّا رَاَوۡہَا অর্থাৎ বাগানে গিয়ে পৌঁছল, বাগানের অবস্থা প্রত্যক্ষ করল এবং নিজেদের মন্দ নিয়াতের প্রেক্ষিতে সুদৃশ্য, সবুজ শ্যামল ও মনোরম বাগান যে দুঃখজনক পরিণতি লাভ করেছে তা দেখল তখন, قَالُوۡۤا اِنَّا لَضَآلُّوۡنَ তারা বলল, আমরা তো দিশা হারিয়ে ফেলেছি আমরা আমাদের বাগানে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছি এবং অন্য পথে চলে এসেছি।
তারপর তারা বলল,
, بَلۡ نَحۡنُ مَحۡرُوۡمُوۡنَ
“বরং আমরা তো বঞ্চিত” অর্থাৎ আমাদের অসৎ উদ্দেশ্যের জন্য আমরা শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছি এবং ফসলের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়েছি। قَالَ اَوۡسَطُہُمۡ “ওদের মধ্যম ব্যক্তি বলল” হযরত ইবন আব্বাস (রা) মুজাহিদ ও অন্যান্য তাফসীরকারের মতে এর অর্থ তাদের সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ ও শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি, বলল, اَلَمۡ اَقُلۡ لَّکُمۡ لَوۡ لَا تُسَبِّحُوۡنَ “আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? এখনও তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছ না কেন?” কতক তাফসীরকার বলেন, এর অর্থ তোমরা ইনশাআল্লাহ বলছ না কেন? মুজাহিদ (র) সুদ্দী (র) ও ইবন জারীর (র)-এর মতে। অন্য কতক তাফসীরকার বলেন, তোমরা ইতিপূর্বে যে মন্দ কথা বলেছ তার পরিবর্তে এখন ভাল কথা বলছ কেন?
قَالُوۡا سُبۡحٰنَ رَبِّنَاۤ اِنَّا کُنَّا ظٰلِمِیۡنَ فَاَقۡبَلَ بَعۡضُہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ یَّتَلَاوَمُوۡنَقَالُوۡا یٰوَیۡلَنَاۤ اِنَّا کُنَّا طٰغِیۡنَ
“তখন ওরা বলল, আমরা আমাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা তো সীমালংঘনকারী ছিলাম। তারপর ওরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে লাগল। ওরা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের, আমরা তো ছিলাম সীমালংঘনকারী।” তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে এমন সময় লজ্জিত হল ও অনুতপ্ত হল যখন অনুতপ্ত হওয়ায় তাদের কোন লাভ হলো না। শাস্তি ভোগের পর তারা দোষ স্বীকার করল। তখন দোষ স্বীকারে কোন কাজ হয় না।
কথিত আছে যে, ওরা পরস্পরে ভাই ছিল। পিতার মৃত্যুর পর তারা এ বাগানের মালিকানা লাভ করে। তাদের পিতা এ বাগান থেকে প্রচুর ফলমূল সাদকা করতেন। তারা এটির মালিক হওয়ার পর পিতার কাজকে তারা বোকামী মনে করল এবং দরিদ্রদেরকে না দিয়ে সম্পূর্ণ ফল নিজেরাই ঘরে তোলার ইচ্ছা করেছিল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঐ কঠিন শাস্তি প্রদান করলেন। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা ফলের সাদকা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ফল কাটার দিবসে সাদকা প্রদানে উৎসাহিত করেছেন।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
کُلُوۡا مِنۡ ثَمَرِہٖۤ اِذَاۤ اَثۡمَرَ وَ اٰتُوۡا حَقَّہٗ یَوۡمَ حَصَادِہٖ
“যখন সেটি ফলবান হয় তখন সেটির ফল আহরণ করবে এবং ফসল তোলার দিনে সেটির হক আদায় করবে।”(৬ আনআম ১৪১) কতক তাফসীরকার বলেন, এই উদ্যানের মালিকগণ ইয়ামানের যারওয়ান নামক জনপদের অধিবাসী ছিল। অন্য কতক তাফসীরকারের মতে, তারা ছিল আবিসিনিয়ার অধিবাসী। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আল্লাহ তাআলা বলেন।
کَذٰلِکَ الۡعَذَابُ
“শাস্তি এরূপই হয়ে থাকে” অর্থাৎ যে আমার নির্দেশের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং সৃষ্টি জগতের অভাবীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন না করে তাকে আমি এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি।
وَ لَعَذَابُ الۡاٰخِرَۃِ
“এবং আখিরাতের শাস্তি কঠিনতর” অর্থাৎ দুনিয়ার আযাব অপেক্ষা অধিক ভয়াবহ ও স্থায়ী।
لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ
“যদি তারা জানত।”
আলোচ্য উদ্যান মালিকদের ঘটনা আল্লাহ তাআলার বাণী আয়াতদ্বয়ে বর্ণিত ঘটনার অনুরূপ। আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতদ্বয়ে বলেছেনঃ
وَ ضَرَبَ اللّٰہُ مَثَلًا قَرۡیَۃً کَانَتۡ اٰمِنَۃً مُّطۡمَئِنَّۃً یَّاۡتِیۡہَا رِزۡقُہَا رَغَدًا مِّنۡ کُلِّ مَکَانٍ فَکَفَرَتۡ بِاَنۡعُمِ اللّٰہِ فَاَذَاقَہَا اللّٰہُ لِبَاسَ الۡجُوۡعِ وَ الۡخَوۡفِ بِمَا کَانُوۡا یَصۡنَعُوۡنَ وَ لَقَدۡ جَآءَہُمۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡہُمۡ فَکَذَّبُوۡہُ فَاَخَذَہُمُ الۡعَذَابُ وَ ہُمۡ ظٰلِمُوۡنَ
“আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সব দিক থেকে প্রচুর জীবনোপকরণঃ তারপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তারা যা করত তার জন্যে আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল, তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল, ফলে সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করল।”(১৬ নাহল ১১২-১১৩)
কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন, এটি একটি উপমা। মক্কাবাসীদের নিকট এই উপমাটি পেশ করা হয়েছে। অপর কতক তাফসীরকার বলেন,আলোচ্য দৃষ্টান্ত দ্বারা মক্কাবাসীদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তাদেরকে এবং তাদের কাজ কর্মকেই তাদের নিকট দৃষ্টান্ত রূপে পেশ করা হয়েছে। এ উভয় মতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আল্লাহই সঠিক জানেন।
إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَا بَلَوْنَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ إِذْ أَقْسَمُوا لَيَصْرِمُنَّهَا مُصْبِحِينَ () وَلَا يَسْتَثْنُونَ () فَطَافَ عَلَيْهَا طَائِفٌ مِنْ رَبِّكَ وَهُمْ نَائِمُونَ () فَأَصْبَحَتْ كَالصَّرِيمِ () فَتَنَادَوْا مُصْبِحِينَ () أَنِ اغْدُوا عَلَى حَرْثِكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَارِمِينَ () فَانْطَلَقُوا وَهُمْ يَتَخَافَتُونَ () أَنْ لَا يَدْخُلَنَّهَا الْيَوْمَ عَلَيْكُمْ مِسْكِينٌ () وَغَدَوْا عَلَى حَرْدٍ قَادِرِينَ () فَلَمَّا رَأَوْهَا قَالُوا إِنَّا لَضَالُّونَ () بَلْ نَحْنُ مَحْرُومُونَ () قَالَ أَوْسَطُهُمْ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ لَوْلَا تُسَبِّحُونَ () قَالُوا سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ () فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَلَاوَمُونَ () قَالُوا يَا وَيْلَنَا إِنَّا كُنَّا طَاغِينَ () عَسَى رَبُّنَا أَنْ يُبْدِلَنَا خَيْرًا مِنْهَا إِنَّا إِلَى رَبِّنَا رَاغِبُونَ () كَذَلِكَ الْعَذَابُ وَلَعَذَابُ الْآَخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
“আমি ওদেরকে পরীক্ষা করেছি যেভাবে পরীক্ষা করেছিলাম উদ্যান মালিকদেরকে। যখন তারা শপথ করেছিল যে, ওরা প্রত্যুষে আহরণ করবে বাগানের ফল, এবং তারা ইনশাআল্লাহ বলেনি। অতঃপর আপনার প্রতিপালকের নিকট থেকে এক বিপর্যয় হানা দিল সেই উদ্যানে, যখন তারা ছিল নিদ্রিত। ফলে সেটি দগ্ধ হয়ে কাল বর্ণ ধারণ করল। প্রত্যুষে ওরা একে অপরকে ডেকে বলল, তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও তবে সকাল সকাল বাগানে চল। অতঃপর ওরা চলল নিম্নস্বরে কথা বলতে বলতে। অদ্য যেন তোমাদের নিকট কোন অভাবগ্রস্ত এতে প্রবেশ করতে না পারে। তারপর ওরা নিবৃত্ত করতে সক্ষম এ বিশ্বাস নিয়ে প্রভাতক বাগানে যাত্রা করল। ওরা যখন বাগানের অবস্থা প্রত্যক্ষ করল। তখন বলল, আমরা তো দিশা হারিয়ে ফেলেছি। বরং আমরা তো বঞ্চিত। ওদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাদের বলিনি, এখনও তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছ না কেন? তখন ওরা বলল, আমরা আমাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি, আমরা তো সীমালংঘনকারী ছিলাম। তারপর ওরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে লাগল। ওরা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের। আমরা তো ছিলাম সীমালংঘনকারী। সম্ভবত আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে দিবেন উৎকৃষ্টতর বিনিময়। আমরা আমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হলাম। শাস্তি এরূপই হয়ে থাকে এবং আখিরাতের শাস্তি কঠিনতর। যদি তারা জানত।”( ৬৮ কালামঃ ১৭-৩৩) এটি একটি উপমা। কুরায়শ বংশীয় কাফিরদের জন্যে আল্লাহ তাআলা এ উপমাটি বর্ণনা করেছেন। কারণ আল্লাহ তাআলা সম্মানিত রাসূল প্রেরণ করে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কিন্তু এর বিপরীতে তারা রাসূলকে প্রত্যাখ্যান ও তাঁর বিরোধিতা করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ بَدَّلُوا نِعْمَةَ اللَّهِ كُفْرًا وَأَحَلُّوا قَوْمَهُمْ دَارَ الْبَوَارِ () جَهَنَّمَ يَصْلَوْنَهَا وَبِئْسَ الْقَرَارُ
“তুমি কি ওদের লক্ষ্য করো না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং ওরা ওদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনে ধ্বংসের ক্ষেত্রে। জাহান্নামে যার মধ্যে ওরা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট এই আবাসস্থল!” (১৪ ইবরাহীম ২৮-২৯)
হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেন, এখানে কুরায়শ বংশীয় কাফিরদেরকে বুঝানো হয়েছে। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা একটি উদ্যানের মালিকের সাথে তুলনা করেছেন। এমন একটি উদ্যান যার মধ্যে রয়েছে নানা জাত ও নানা রঙের ফলমূল ও শস্য। সেগুলো পরিপক্ক ও কর্তন যোগ্য হয়ে উঠেছিল।
এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলার বর্ণনা,
اِذْاَقْسَمُوْا
“যখন তারা শপথ করেছিল” নিজেদের মধ্যে
لَیَصۡرِمُنَّہَا مُصۡبِحِیۡنَ ,
“তারা আহরন করবে বাগানের ফল” অর্থাৎ ফল কেটে ঘরে তুলবে তথা শস্য সংগ্রহ করবে,
مُصۡبِحِیۡنَ
“অর্থাৎ ভোর বেলায় যাতে কোন ফকীর কিংবা অভাবী লোক তাদেরকে দেখতে না পায়, এবং ওদেরকে কিছু দিতে না হয়। তারা এ বিষয়ে শপথ করেছে বটে কিন্তু তাতে ইনশাআল্লাহ বলেনি। ফলে আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ করে দিলেন। তাদের বাগানে প্রেরণ করলেন আপদ ও দুর্যোগ। ঐ দুর্যোগে উদ্যানটি বিরান হয়ে যায়। ঐ আপদটি ছিল জ্বলন্ত আগুন। এটি বাগানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। ফলে কাজে আসার মত কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন
فَطَافَ عَلَیۡہَا طَآئِفٌ مِّنۡ رَّبِّکَ وَ ہُمۡ نَآئِمُوۡنَ
“ফলে সেটি পুড়ে গিয়ে কালো বর্ণ ধারণ করল” অর্থাৎ অন্ধকার রাত্রির মত কাল হয়ে গেল। এটি হল তাদের আশা আকাঙ্খার বিপরীত।
فَتَنَادَوۡا مُصۡبِحِیۡنَ
প্রত্যুষে তারা একে অপরকে ডেকে বলল” অর্থাৎ তারা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠল এবং একে অপরকে ডেকে বলল
اَنِ اغۡدُوۡا عَلٰی حَرۡثِکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰرِمِیۡنَ
“তোমরা যদি ফল আহরণ করতে না চাও তবে সকাল সকাল বাগানে চল” এবং বেলা বাড়ার এবং ফকীরের সংখ্যা বৃদ্ধির পূর্বেই ফল সংগ্রহের কাজ শেষ কর।
فَانۡطَلَقُوۡا وَ ہُمۡ یَتَخَافَتُوۡنَ
“তারপর অর্থাৎ তারা চুপি চুপি এ কথা বলতে বলতে যাত্রা করল”
لَّا یَدۡخُلَنَّہَا الۡیَوۡمَ عَلَیۡکُمۡ مِّسۡکِیۡنٌ
অর্থাৎ তারা সবাই এ বিষয়ে পরামর্শ করে যে ফকীররা যেন কোনমতেই ঢুকতে না পারে। একমত হল।
وَّ غَدَوۡا عَلٰی حَرۡدٍ قٰدِرِیۡنَ
অতঃপর তারা নিবৃত্ত করতে সক্ষম এ বিশ্বাস নিয়ে প্রভাতকালে বাগানে যাত্রা করল অর্থাৎ তারা এই অসৎ মতলব মনে মনে এঁটে তা বাস্তবায়নে সক্ষম মনে করে যাত্রা করল। তাফসীরকার ইকরামা ও শাবী (র) বলেন, আয়াতের অর্থ হল, ফকীর-মিসকীনদের প্রতি ক্রুদ্ধ মনোভাব নিয়ে তারা রওয়ানা করল। তাফসীরকার সুদ্দী (র) বলেছেন যে, ওদের বাগানের নাম ছিল হারদ ( حرد )। তবে তার এ বক্তব্য কষ্টকল্পিত ও বাস্তবতা বর্জিত। فَلَمَّا رَاَوۡہَا অর্থাৎ বাগানে গিয়ে পৌঁছল, বাগানের অবস্থা প্রত্যক্ষ করল এবং নিজেদের মন্দ নিয়াতের প্রেক্ষিতে সুদৃশ্য, সবুজ শ্যামল ও মনোরম বাগান যে দুঃখজনক পরিণতি লাভ করেছে তা দেখল তখন, قَالُوۡۤا اِنَّا لَضَآلُّوۡنَ তারা বলল, আমরা তো দিশা হারিয়ে ফেলেছি আমরা আমাদের বাগানে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছি এবং অন্য পথে চলে এসেছি।
তারপর তারা বলল,
, بَلۡ نَحۡنُ مَحۡرُوۡمُوۡنَ
“বরং আমরা তো বঞ্চিত” অর্থাৎ আমাদের অসৎ উদ্দেশ্যের জন্য আমরা শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছি এবং ফসলের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়েছি। قَالَ اَوۡسَطُہُمۡ “ওদের মধ্যম ব্যক্তি বলল” হযরত ইবন আব্বাস (রা) মুজাহিদ ও অন্যান্য তাফসীরকারের মতে এর অর্থ তাদের সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ ও শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি, বলল, اَلَمۡ اَقُلۡ لَّکُمۡ لَوۡ لَا تُسَبِّحُوۡنَ “আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? এখনও তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছ না কেন?” কতক তাফসীরকার বলেন, এর অর্থ তোমরা ইনশাআল্লাহ বলছ না কেন? মুজাহিদ (র) সুদ্দী (র) ও ইবন জারীর (র)-এর মতে। অন্য কতক তাফসীরকার বলেন, তোমরা ইতিপূর্বে যে মন্দ কথা বলেছ তার পরিবর্তে এখন ভাল কথা বলছ কেন?
قَالُوۡا سُبۡحٰنَ رَبِّنَاۤ اِنَّا کُنَّا ظٰلِمِیۡنَ فَاَقۡبَلَ بَعۡضُہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ یَّتَلَاوَمُوۡنَقَالُوۡا یٰوَیۡلَنَاۤ اِنَّا کُنَّا طٰغِیۡنَ
“তখন ওরা বলল, আমরা আমাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমরা তো সীমালংঘনকারী ছিলাম। তারপর ওরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে লাগল। ওরা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের, আমরা তো ছিলাম সীমালংঘনকারী।” তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে এমন সময় লজ্জিত হল ও অনুতপ্ত হল যখন অনুতপ্ত হওয়ায় তাদের কোন লাভ হলো না। শাস্তি ভোগের পর তারা দোষ স্বীকার করল। তখন দোষ স্বীকারে কোন কাজ হয় না।
কথিত আছে যে, ওরা পরস্পরে ভাই ছিল। পিতার মৃত্যুর পর তারা এ বাগানের মালিকানা লাভ করে। তাদের পিতা এ বাগান থেকে প্রচুর ফলমূল সাদকা করতেন। তারা এটির মালিক হওয়ার পর পিতার কাজকে তারা বোকামী মনে করল এবং দরিদ্রদেরকে না দিয়ে সম্পূর্ণ ফল নিজেরাই ঘরে তোলার ইচ্ছা করেছিল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঐ কঠিন শাস্তি প্রদান করলেন। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা ফলের সাদকা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ফল কাটার দিবসে সাদকা প্রদানে উৎসাহিত করেছেন।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
کُلُوۡا مِنۡ ثَمَرِہٖۤ اِذَاۤ اَثۡمَرَ وَ اٰتُوۡا حَقَّہٗ یَوۡمَ حَصَادِہٖ
“যখন সেটি ফলবান হয় তখন সেটির ফল আহরণ করবে এবং ফসল তোলার দিনে সেটির হক আদায় করবে।”(৬ আনআম ১৪১) কতক তাফসীরকার বলেন, এই উদ্যানের মালিকগণ ইয়ামানের যারওয়ান নামক জনপদের অধিবাসী ছিল। অন্য কতক তাফসীরকারের মতে, তারা ছিল আবিসিনিয়ার অধিবাসী। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আল্লাহ তাআলা বলেন।
کَذٰلِکَ الۡعَذَابُ
“শাস্তি এরূপই হয়ে থাকে” অর্থাৎ যে আমার নির্দেশের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং সৃষ্টি জগতের অভাবীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন না করে তাকে আমি এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি।
وَ لَعَذَابُ الۡاٰخِرَۃِ
“এবং আখিরাতের শাস্তি কঠিনতর” অর্থাৎ দুনিয়ার আযাব অপেক্ষা অধিক ভয়াবহ ও স্থায়ী।
لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ
“যদি তারা জানত।”
আলোচ্য উদ্যান মালিকদের ঘটনা আল্লাহ তাআলার বাণী আয়াতদ্বয়ে বর্ণিত ঘটনার অনুরূপ। আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতদ্বয়ে বলেছেনঃ
وَ ضَرَبَ اللّٰہُ مَثَلًا قَرۡیَۃً کَانَتۡ اٰمِنَۃً مُّطۡمَئِنَّۃً یَّاۡتِیۡہَا رِزۡقُہَا رَغَدًا مِّنۡ کُلِّ مَکَانٍ فَکَفَرَتۡ بِاَنۡعُمِ اللّٰہِ فَاَذَاقَہَا اللّٰہُ لِبَاسَ الۡجُوۡعِ وَ الۡخَوۡفِ بِمَا کَانُوۡا یَصۡنَعُوۡنَ وَ لَقَدۡ جَآءَہُمۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡہُمۡ فَکَذَّبُوۡہُ فَاَخَذَہُمُ الۡعَذَابُ وَ ہُمۡ ظٰلِمُوۡنَ
“আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সব দিক থেকে প্রচুর জীবনোপকরণঃ তারপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তারা যা করত তার জন্যে আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল, তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল, ফলে সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করল।”(১৬ নাহল ১১২-১১৩)
কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন, এটি একটি উপমা। মক্কাবাসীদের নিকট এই উপমাটি পেশ করা হয়েছে। অপর কতক তাফসীরকার বলেন,আলোচ্য দৃষ্টান্ত দ্বারা মক্কাবাসীদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তাদেরকে এবং তাদের কাজ কর্মকেই তাদের নিকট দৃষ্টান্ত রূপে পেশ করা হয়েছে। এ উভয় মতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আল্লাহই সঠিক জানেন।