hadith book logo

সিয়াম ও যাকাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

রোযার ফযীলত

রোযা রাখলে গোনাহ মাফ হয় :

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ ، عَنِ النَّبِيِّ قَالَ : مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযান মাসে রোযা রাখবে আল্লাহ তা‘আলা তার পেছনের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। [বুখারী, হা/২০১৪; মুসলিম, হা/১৮১৭।]

রোযার বিনিময় আল্লাহ নিজ হাতে দিয়ে থাকেন :

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- : كُلُّ عَمَلِ ابْنِ اٰدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا إِلٰى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا الصَّوْمَ فَإِنَّهٗ لِىْ وَأَنَا أَجْزِىْ بِه يَدَعُ شَهْوَتَهٗ وَطَعَامَهٗ مِنْ أَجْلِى

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব নিম্নে দশ গুণ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তবে রোযা ব্যতীত। কারণ রোযা আমার জন্যই হয়ে থাকে, তাই এর বদলা আমি নিজেই দেব। যেহেতু বান্দা আমার জন্যই তার কামনা-বাসনা ও খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করেছে। [সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৭১২; বায়হাকী, হা/৮১১৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭১০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৮৯৮৭; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।]

মূলত সকল ইবাদাতই আল্লাহর জন্য। তা সত্ত্বেও রোযাকে খাস করে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন ‘‘এটা আমার জন্য’’। এর কারণ হলো, রোযা একটি গোপন ইবাদাত। অন্যান্য ইবাদাত পালনের সময় কিছু না কিছু বাহ্যিক কাঠামোর আশ্রয় নিতে হয়। যেমন- সালাত আদায় করার সময় ওঠা-বসা ও রুকূ সিজদা করতে হয়। যাকাত আদায়ের সময় তা অপরকে দিতে হয়। হজ্জ করার সময় দীর্ঘ পথ সফর করতে হয়- এসব অন্য লোক দেখতে পায়; কিমুত রোযার মধ্যে তা নেই। রোযা যদি কেউ রেখে থাকে তবে তা আল্লাহর জন্যই রাখবে। কারণ কেউ যদি রোযার সময় গোপনে কিছু খায় তবে কোন মানুষ তা দেখতে পায় না। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, রোযা আমার জন্যই হয়ে থাকে।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন ‘‘রোযার সওয়াব আমিই দেব’’। বান্দা যেহেতু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রোযা রাখে, যার মধ্যে লোক দেখানো বা অহংকারের লেশমাত্র নেই, তাই আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রতি এতই সন্তুষ্ট হন যে, এ আমলের সওয়াব দেয়ার জন্য তিনি কোন মাধ্যম অবলম্বন করেন না, কোন পরিমাণের হিসাবও করেন না বরং তিনি নিজ হাতেই যত খুশি তত নেকী বান্দাকে দিয়ে থাকেন অথবা আল্লাহ তা‘আলা নিজেই রোযার বদলা হয়ে যান। সুবহা-নাল্লাহ!

রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে :

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ وَأَبِىْ سَعِيْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا- قَالَا قَالَ رَسُوْلُ اللهِ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُوْلُ إِنَّ الصَّوْمَ لِى وَأَنَا أَجْزِىْ بِه إِنَّ لِلصَّائِمِ فَرْحَتَيْنِ إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ وَإِذَا لَقِىَ اللهَ فَرِحَ

আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘সিয়াম আমারই জন্য এবং আমিই এর প্রতিফল দান করব।’’ সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে। একটি হলো যখন সে ইফতার করে তখন আনন্দিত হয়, অপরটি হলো যখন সে মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন সে আনন্দিত হবে। [সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৪; নাসাঈ, হা/২২১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০০; মুসনাদে আবু ই‘আলা, হা/১০০৫; জামেউস সগীর, হা/২৭৮৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৭২৩।]

ইফতারের সময় আনন্দের কারণ হচ্ছে, বান্দা সারাদিন রোযা রাখার পর যখন ইফতার সামনে নিয়ে বসে আর দেখে যে, এখনই তার রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে তখন সে নিজেকে ধন্য মনে করে এবং রোযার পুরস্কার পাওয়ার আশা করে। প্রতিটি ঘরে ইফতারীর আয়োজন হয়। একে অপরকে ইফতারী আদান-প্রদান করে। সবার মাঝে যেন আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হতে থাকে। আবার সারাটি মাস রোযা রাখার পর যখন ঈদের দিনটি আসে তখন ঘরে-বাইরে সমগ্র মুসলিম জাতির মধ্যে এক আনন্দের স্রোত বইতে থাকে। নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, ছোট-বড় সকলের মুখে হাসির ঢেউ খেলতে থাকে।

দ্বিতীয় আনন্দ হবে আখিরাতে। এটা পূর্ণাঙ্গ ও আসল আনন্দ। বান্দা যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে এবং আল্লাহ তা‘আলা বান্দাকে অগণিত পুরস্কার এবং বিশেষ মর্যাদা দেবেন তখনই সেই চরম আনন্দ লাভ হবে।

রোযাদারের মুখের গন্ধ মিশ্কে আম্বরের সুগন্ধ :

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ وَأَبِىْ سَعِيْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا - قَالَا قَالَ رَسُوْلُ اللهِ وَالَّذِىْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِه لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيْحِ الْمِسْكِ

আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সে মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! নিশ্চয় সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার কাছে মিশ্কের সুগন্ধের চেয়েও তীব্র। [সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৪; নাসাঈ, হা/২২১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০০; মুসনাদে আবু ই‘আলা, হা/১০০৫; জামেউস সগীর, হা/২৭৮৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৭২৩।]

সারাদিন রোযা রাখার ফলে উপবাসজনিত কারণে রোযাদারের মুখে যে গন্ধ সৃষ্টি হয় সেটা আল্লাহর কাছে খুবই পবিত্র জিনিস। সুগন্ধকে মানুষ যেভাবে ভালোবাসে এবং কাছে টানে, রোযাদারকেও আল্লাহ তা‘আলা সেভাবে ভালোবাসেন এবং রহমতের ছায়াতলে টেনে নেন।

রোযাদারদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা রয়েছে :

عَنْ سَهْلٍ عَنِ النَّبِيِّ قَالَ إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ

সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, জান্নাতের একটি বিশেষ দরজা রয়েছে যার নাম হলো রাইয়ান। কিয়ামতের দিন কেবল রোযাদাররাই এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। [সহীহ বুখারী, হা/১৮৯৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৬; নাসাঈ, হা/২২৩৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৪০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৮৯৩; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০২; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৪২০; মুসনাদে আবু ই‘আলা, হা/৭৫২৯; মুসত্মাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২১৬৬; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৫৬৮৭; বায়হাকী, হা/৭২৯৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭০৯; জামেউস সগীর, হা/৩৮৮৪।]

জান্নাতের বিভিন্ন স্তর ও দরজা রয়েছে এবং এগুলোর বিভিন্ন নাম রয়েছে, এর মধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান। রাইয়ান অর্থ- পিপাসামুক্ত, রোযাদাররা দুনিয়াতে ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করে রোযা রেখেছিল। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে তাদেরকে পরিতৃপ্ত করবেন। তাই যেখানে তাদেরকে রাখা হবে তার নাম দেয়া হয়েছে রাইয়ান বা পিপাসামুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতবাসীদেরকে বলবেন,

﴿كُلُوْا وَاشْرَبُوْا هَنِيْٓئًا ۢبِمَاۤ أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ﴾

অতীতের দিনগুলোতে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে তার বিনিময়ে এখন তৃপ্তিসহকারে খাও এবং পান করো। (সূরা হাক্কাহ- ২৪)