hadith book logo

সিয়াম ও যাকাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭

মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর উম্মতের রোযা

 রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার আগে নবী ﷺ মুসলমানদেরকে প্রতি মাসে তিনদিন (আইয়ামে বীজের) রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং আশুরার দিন রোযা রাখতে উৎসাহিত করতেন। হাদীসে এসেছে,

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ يَأْمُرُنَا بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُوْرَاءَ وَيَحُثُّنَا عَلَيْهِ وَيَتَعَاهَدُنَا عِنْدَهٗ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ لَمْ يَأْمُرْنَا وَلَمْ يَنْهَنَا وَلَمْ يَتَعَاهَدْنَا عِنْدَهٗ

জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে আশুরার দিন রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। আমরা রোযা রাখছি কি না- এরও খোঁজ-খবর নিতেন। পরে যখন রমাযানের রোযা ফরয হয়ে গেল তখন এ ব্যাপারে কোন আদেশ করতেন না, নিষেধও করতেন না এবং কোন খোঁজ-খবরও নিতেন না। [সহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৯৪৬; মুসনাদে তায়ালুসী, হা/৮২১; মুসত্মাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৪০৬; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৮৩৬; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৯৪৪৯; মিশকাত, হা/২০৬৯।]

عَنْ عَائِشَةَ - رَضِىَ اللهُ عَنْهَا - قَالَتْ كَانَ يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ يَوْمًا تَصُوْمُهٗ قُرَيْشٌ فِى الْجَاهِلِيَّةِ وَكَانَ رَسُوْلُ اللهِ - - يَصُوْمُهٗ فِى الْجَاهِلِيَّةِ فَلَمَّا قَدِمَ رَسُوْلُ اللهِ - الْمَدِيْنَةَ صَامَهٗ وَأَمَرَ بِصِيَامِه فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ كَانَ هُوَ الْفَرِيْضَةَ وَتُرِكَ عَاشُوْرَاءُ فَمَنْ شَاءَ صَامَهٗ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশুরার দিন রোযা পালন করত। জাহেলী যুগে রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও এ দিন রোযা রাখতেন। তিনি যখন মদিনায় আসেন, তখনও (প্রথমদিকে) তিনি এ রোযা রেখেছেন এবং তা রাখার হুকুমও দিয়েছেন। কিন্তু যখন রমাযানের রোযা ফরয হয় তখন তিনি আশুরার রোযা ছেড়ে দেন। অতঃপর যার ইচ্ছা সে তা রাখত আর যার ইচ্ছা সে তা ছেড়ে দিত। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৬২; সহীহ বুখারী, হা/২০০২; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৯৬; আবু দাউদ, হা/২৪৪৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬২১; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/২৮৫০; মুসত্মাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩৯৪; বায়হাকী, হা/৮১৯২; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭০২; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৮৪৫।]

 দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে সর্বপ্রথম রমাযান মাসে রোযা রাখার বিধান নাযিল হয়। তবে এতে লোকদেরকে এতটুকু পর্যমত্ম সুযোগ দেয়া হয়েছিল যে, যারা রোযা রাখতে চায় না, তারা প্রতি রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাওয়ালেও চলবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَاۤ أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ‐ أَيَّامًا مَّعْدُوْدَاتٍ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِيْضًا أَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِيْنَ يُطِيْقُوْنَهٗ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِيْنٍ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهٗ وَأَنْ تَصُوْمُوْا خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা (এর মাধ্যমে আল্লাহকে) ভয় করতে পার। (রোযা ফরয করা হয়েছে) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য, তবে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, তবে সমপরিমাণ দিনের রোযা (সুস্থ হয়ে অথবা সফর থেকে ফিরে এসে) কাযা আদায় করে নেবে; আর যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়ার সুযোগ থাকবে। আর তা হচ্ছে একজন গরীব ব্যক্তিকে (পেট ভরে) খাবার দেয়া। অবশ্য যদি কোন ব্যক্তি (এর চেয়ে বেশী দিয়ে) ভালো কাজ করতে চায়, তাহলে এ কাজ তার জন্য একান্ত কল্যাণকর হবে। তবে (এ সময়) রোযা রাখা তোমাদের জন্য খুবই ভালো; যদি তোমরা (রোযার উপকারিতা সম্পর্কে) জানতে পার।

(সূরা বাকারা- ১৮৩, ১৮৪)

 উপরোক্ত বিধান নাযিল হওয়ার এক বছর পর সুস্থদের ব্যাপারে যে ছাড় বা সুযোগ দেয়া হয়েছিল তা রহিত করে পুরো মাস রোযা রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় এবং রোগী ও মুসাফিরদের ব্যাপারে কাযার বিধান বহাল রাখা হয়। তবে যারা রোযা রাখতে অক্ষম তারা ফিদ্ইয়া দিতে পারবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيْۤ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدٰى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيْضًا أَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيْدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ ﴾

রমাযান মাস (এমন একটি মাস) যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কুরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং (হক ও বাতিলের) পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে, তবে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে তবে সে পরবর্তী দিনগুলোতে গুণে গুণে সেই পরিমাণ কাযা করে নেবে। (এ সুযোগ দিয়ে) আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কখনই তোমাদের (জীবন) কঠিন করতে চান না। আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা যেন গুণে গুণে (রোযার) সংখ্যাগুলো পূর্ণ করতে পার, আর আল্লাহ তোমাদেরকে (জীবন যাপনের) যে পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন সেজন্য তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে পার এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পার। (সূরা বাকারা- ১৮৫)

 রমাযান মাসে রোযা রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার পর এর বিস্তারিত বিধি-বিধান সম্পর্কে মুসলমানদেরকে ধারণা দেয়া হয় এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর জেগে উঠে সহবাস করা ও খাওয়া-দাওয়া করাকে হালাল করে দেয়া হয়, যা ইতিপূর্বে হালাল ছিল না। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় এসেছে,

কায়েস ইবনে সুরমাহ আল-আনসারী রোযা রেখে সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, খাওয়ার কিছু আছে কি? স্ত্রী বললেন, না। এরপর স্ত্রী খাবারের খুঁজে বের হলেন। ফিরে এসে দেখেন স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছেন। ফলে তিনি পরের দিন না খেয়ে রোযা রাখলেন। এক পর্যায়ে তিনি ক্ষুধার জ্বালায় বেহুঁশ হয়ে পড়েন। অতঃপর নবী ﷺ এর কাছে এ ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হলো।

অপরদিকে উমর (রাঃ) রোযার রাতে ঘুমানোর পর জেগে উঠে স্ত্রীর সাথে সহবাস করে বসেন। পরে তিনি নিজেকে দোষী মনে করে আক্ষেপের সাথে নবী ﷺ এর কাছে গিয়ে নিজের ঘটনা বললেন। এসব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াত নাযিল করে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সহবাস করা ও খাওয়া-দাওয়াকে বৈধ করে দিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلٰى نِسَآئِكُمْ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ عَلِمَ اللهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُوْنَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ فَالْاٰنَ بَاشِرُوْهُنَّ وَابْتَغُوْا مَا كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا حَتّٰى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ وَلَا تُبَاشِرُوْهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُوْنَ فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُوْدُ اللهِ فَلَا تَقْرَبُوْهَا كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ اٰيَاتِه لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ ﴾

রোযার মাসে রাতের বেলায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলন করা তোমাদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে, তোমাদের স্ত্রীরা যেমনি তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ, ঠিক তোমরাও তাদের জন্য পোশাক সমতুল্য। আল্লাহ এটা জানেন যে, তোমরা নিজেদের উপর খিয়ানত করে বসবে, তাই তিনি তোমাদের উপর দয়া করলেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এখন চাইলে তোমরা তাদের সাথে সহবাস করতে পার এবং (এ ব্যাপারে) আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য যা (বিধি-বিধান কিংবা সন্তান) লিখে রেখেছেন তা সন্ধান করো। আর তোমরা পানাহার অব্যাহত রাখতে পার যতক্ষণ পর্যন্ত রাতের অন্ধকার রেখার ভিতর থেকে ভোরের শুভ্র আলোকরেখা পরিষ্কার না হয়। অতঃপর তোমরা রাত আসা পর্যন্ত রোযা পূর্ণ করো। তবে মসজিদে যখন তোমরা ই’তিকাফ অবস্থায় থাকবে তখন নারী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকবে। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। সুতরাং তোমরা এসবের নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা তার যাবতীয় নিদর্শন মানুষের জন্য বলে দিয়েছেন, যেন তারা (এর আলোকে) আল্লাহকে ভয় করতে পারে। (সূরা বাকারা- ১৮৭)