hadith book logo

সিয়াম ও যাকাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৫

ঈদ উপলক্ষে বর্জনীয় কাজসমূহ

ঈদ হলো আল্লাহ রাববুল আলামীনের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎসব। কিমত্মু অনেক মুসলিম এ দিনটাকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে জানে না। তারা এ দিনে বিভিন্ন অনৈসলামিক কাজকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। নিম্নে এ ধরনের কিছু কাজকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

কাফিরদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ করা :

মুসলিম সমাজের অনেকে চাল-চলনে অমুসলিমদের অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অথচ হাদীসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ - مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্যতা রাখবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। [আবু দাউদ, হা/৪০৩৩; মুসনাদুল বাযযার, হা/২৯৬৬; মু‘জামুল আওসাত, হা/৮৩২৭; জামেউস সগীর, হা/১১০৯৪; মুখতাসার ইরওয়ালুল গালীল, হা/২৩৮৪; মিশকাত, হা/৪৩৪৭।]

এ হাদীসের বাহ্যিক অর্থ হলো, যে কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য রাখবে সে কাফির হয়ে যাবে।

পুরুষ কর্তৃক মহিলার বেশ ধারণ করা ও মহিলা কর্তৃক পুরুষের বেশ ধারণ :

পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন ও সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে পুরুষের মহিলার বেশ ধারণ ও মহিলার পুরুষের বেশ ধারণ করা হারাম। ঈদের দিন এ কাজটি অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। হাদীসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا ، قَالَ : لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ الْمُتَشَبِّهِيْنَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ

ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ সকল মহিলাকে অভিশম্পাত করেছেন, যারা পুরুষের বেশ ধারণ করে এবং ঐ সকল পুরুষকেও অভিশম্পাত করেছেন, যারা মহিলার বেশ ধারণ করে। [সহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৫; আবু দাউদ, হা/৪০৯৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৯০৪; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯৫৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩১৫১; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১১৪৮১; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩২০৬; জামেউস সগীর, হা/৯২৩১; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০৬৮; মিশকাত, হা/৪৪২৯।]

পর্দা লঙ্ঘন করা :

মহিলাদের খোলামেলা ও অশালীন পোশাকে রাসত্মাঘাটে বের হওয়া ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَرْنَ فِيْ بُيُوْتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْاُوْلٰى وَاَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَاٰتِيْنَ الزَّكَاةَ وَاَطِعْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ﴾

আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রথম যুগের মূর্খদের ন্যায় নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। (সূরা আহযাব- ৩৩)

হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ - .... وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيْلَاتٌ مَائِلَاتٌ رُءُوْسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيْحَهَا وَإِنَّ رِيْحَهَا لَيُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ كَذَا وَكَذَا

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অচিরেই এমন একদল মহিলার আগমন ঘটবে, যারা পোশাক পরিধান করেও যেন উলঙ্গ থাকবে। তারা অন্যদেরকে আকৃষ্ট করবে এবং তারাও অন্যদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথার চুলের অবস্থা উটের হেলে পড়া কুঁজের ন্যায়। এরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না। যদিও তার সুগন্ধি এতো এতো দূর থেকে পাওয়া যাবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৫৭০৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৩৩৮৬; জামেউস সগীর, হা/৭২৪৭; সিলসিলা সহীহাহ, হা/১৩২৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০৪৪; মিশকাত, হা/৩৫২৪।]

অনেককে দেখা যায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে ঈদের দিন গোনাহের কাজ বেশি করে। নিকট আত্মীয়দের মাঝে যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা শরীয়ত অনুমোদিত নয়, তাদের সাথে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : إِيَّاكُمْ وَالدُّخُوْلَ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ قَالَ الْحَمْوُ الْمَوْتُ .

উকবা ইবনে আমের (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা মেয়েদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে। আনসারী সাহাবীদের মধ্য থেকে এক লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! দেবর-ভাসুর প্রমুখ আত্মীয়দের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? তিনি উত্তরে বললেন, এ ধরনের দেবর-ভাসুর তো মৃত্যুর সমতুল্য। [সহীহ বুখারী, হা/৫২৩২; সহীহ মুসলিম, হা/৫৮০৩; তিরমিযী, হা/১১৭১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩৮৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৯১৭২; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৩৯০১; মুসত্মাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/৩২৬১; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৪১৮১; শারহুস সুন্নাহ, হা/২২৫২; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৫৫৮৮; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/১৭৯৫৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৯০৮; মিশকাত, হা/৩১০২।]

এমনসব আত্মীয়, যারা স্বামীর সম্পর্কের দিক দিয়ে নিকটতম যেমন- স্বামীর ভাই, তার মামা, খালু প্রমুখ তাদেরকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করার কারণ হলো, এসকল আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমেই বেপর্দাজনিত বিপদ বেশি ঘটে থাকে। অথচ এ বিষয়ে আমাদের সমাজ খুবই অসতর্ক।

গান-বাজনা করা :

বর্তমান সময়ে মানুষের কাছে গান-বাজনা অতি সাধারণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এটি একটি বড় ধরনের গোনাহের কাজ। আর ঈদের দিনে এ গোনাহের কাজটা আরো বেশি করে লক্ষ্য করা যায়। দেখে মনে হয় যেন এটি কোন মুসলিম সমাজের ঈদ নয়; বরং অন্য কোন ধর্মের অথবা জাতির আনন্দোৎসব। অথচ ইসলামী শরীয়তে গান ও বাদ্যযন্ত্রের নিষিদ্ধতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

لَيَكُوْنَنَّ مِنْ أُمَّتِيْ أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّوْنَ الْزِّنىٰ وَالْحَرِيْرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ

আমার উম্মতের মাঝে এমন একটা দলের আবির্ভাব ঘটবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। [সহীহ বুখারী, হা/৫৫৯০; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৬৭৫৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৬৩১৭; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৩৩৩৯; জামেউস সগীর, হা/৯৫৯৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০৬৭; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৯১; মিশকাত, হা/৫৩৪৩।]

আল্লাহ তা‘আলা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা দান করে মুসলিম উম্মাহকে এর মাধ্যমে জাহেলী ঈদ-উৎসব থেকে মুক্ত করেছেন। মুসলিমদের ঈদ হলো ইবাদাত, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে। আর কাফিরদের ঈদ হলো এর বিপরীত; কেননা সেখানে কুফর ও গোমরাহী প্রদর্শন করা হয় এবং বিভিন্ন শয়তানী কর্মকান্ড সংঘটিত হয়। তাই বছরের অন্যান্য দিনের মতো ঈদের দিনও শয়তানী কর্মকান্ড বর্জন করা মুসলিমদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।