hadith book logo

সিয়াম ও যাকাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

লাইলাতুল কদর

আরবি ভাষায় ক্বাফ বর্ণে যবর ও দাল বর্ণে সাকিন দিয়ে ‘ক্বাদ্রুন’ শব্দের অর্থ হলো- সম্মান ও মর্যাদা। এদিক থেকে শবে কদর বা লাইলাতুল কদর এর অর্থ হলো সম্মানিত ও মহিমান্বিত রজনী।

অন্যদিকে দাল বর্ণে যবর দিয়ে ‘ক্বাদারুন’ শব্দের অর্থ হলো পরিমাপ করা, নির্ধারণ করা। এ হিসেবে লাইলাতুল কদর অর্থ হলো, ভাগ্য রজনী, তাকদীরের ফয়সালা করার রাত ইত্যাদি।

কদরের রাত আল্লাহ তা‘আলার এক বিশেষ নিয়ামত। এ রাতের রয়েছে বিশেষ সম্মান, বিশেষ মাহাত্ম্য ও বিশেষ ফযীলত। এ রাতের নামে পবিত্র কুরআনে একটি সূরা রয়েছে। এ রাতের ব্যাপারে নবী ﷺ এর অনেক হাদীস রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো এ রাতের কেন এত মর্যাদা? কেন এত ফযীলত? উত্তর একটাই, আর তা হলো এ রাতেই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মর্যাদাপূর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মর্যাদাবান ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে মর্যাদাশীল নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর তাঁর মর্যাদাবান উম্মতের পথপ্রদর্শক হিসেবে নাযিল হয়েছে। সুতরাং যেখানে এতগুলো মর্যাদাপূর্ণ বিষয় একত্র হলো সেখানে যে রাতে এগুলোর সমাবেশ ঘটেছে সে রাতটি কি মর্যাদাপূর্ণ না হয়ে পারে?

আল্লাহ তা‘আলা নিজেই বলেছেন,

﴿ إِنَّاۤ أَنْزَلْنَاهُ فِيْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ﴾

নিশ্চয় আমি এটাকে (আল-কুরআনকে) কদরের রাত্রিতে নাযিল করেছি।

(সূরা কদর- ১)

এ রাতে কুরআন নাযিল করার অর্থ হলো- লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে এটি নাযিল হয়, পরে প্রয়োজন অনুপাতে পর্যায়ক্রমে তা নবী ﷺ এর উপর নাযিল হতে থাকে। এর অপর অর্থ হচ্ছে- এ রাতে কুরআন নাযিলের সিলসিলা শুরু হয়েছে এবং দীর্ঘ তেইশ বছরে তা পূর্ণতা লাভ করেছে।

এ রাতের মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَاۤ أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ‐ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ﴾

তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

(সূরা কদর- ২, ৩)

এখানে হাজার মাস বলতে কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং বেশি বুঝানোর উদ্দেশ্যে এটা বলা হয়েছে, তার মানে এ রাতটি হাজার হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

উত্তম কথাটির দু’টি ব্যাখ্যা আছে এবং উভয়টিই সঠিক।

১. কদরের রাতটি এমন ফযীলতপূর্ণ যে, এ রাতের ইবাদাত-বন্দেগী হাজার মাসের ইবাদাত-বন্দেগীর চেয়ে উত্তম। নবী ﷺ বলেছেন,

مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيْمَانًا وَّاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় কদরের রাতে জাগরণ করবে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। [সহীহ বুখারী, হা/৩৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮১৮; আবু দাউদ, হা/১৩৭৪; তিরমিযী, হা/৬৮৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৫৫৯; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৮৯৪; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯৪৯৫; বায়হাকী, হা/৮৩০৬; মুসনাদে আবু ই‘আলা, হা/২৬৩২; জামেউস সগীর, হা/১১৩৮৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৯৯২; মিশকাত, হা/১৯৫৮।]

২. এ রাতটি এদিক দিয়ে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম যে, এ রাতে বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল করে মানুষের এত কল্যাণ সাধন করা হয়েছে, যা মানব জাতির ইতিহাসে হাজার মাসেও করা হয়নি। কারণ এ কুরআন একটি অসভ্য, বর্বর জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে তাদেরকে সভ্য, ভদ্র ও চরিত্রবান করে উন্নতি ও কল্যাণের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। কুরআনের বাণী শুনে পাথরের মতো কঠিন অন্তরগুলো পানির মতো নরম হয়ে গিয়েছিল, এর মুজিযা ও মাধুর্যের সামনে সারা বিশ্ব অবাক, হতভম্ব ও নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সূরা দুখানে এ কথাটি এভাবে বলা হয়েছে,

﴿ إِنَّاۤ أَنْزَلْنَاهُ فِيْ لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ﴾

আমি একে এক বরকতময় রাত্রে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা দুখান- ৩)

এখানে কদরের রাতকে বরকতময় বলা হয়েছে। যেহেতু এ রাতে কল্যাণ ও বরকতের এমন ধারা শুরু হয়েছিল, যা সারা দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।

কদরের রাতের বিশেষত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿تَنَزَّلُ الْمَلَآئِكَةُ وَالرُّوْحُ فِيْهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِّنْ كُلِّ أَمْرٍ﴾

এ রাতে জিবরাঈল ও অন্যান্য ফেরেশতারা তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে নাযিল হয়। (সূরা কদর- ৪)

এ রাত্রে অগণিত ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। হাদীসে এসেছে,

إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تِلْكَ اللَّيْلَةِ أَكْثَرَ فِي الْأَرْضِ مِنْ عَدَدِ الْحَصٰى

কদরের রাতে ফেরেশতাদের সংখ্যা পৃথিবীর সমুদয় কংকরের চেয়েও বেশি হয়। [সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২১৯৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৭৪৫; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯৪৪৭; জামেউস সগীর, হা/৯৬০৪; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২২০৫।]

এই অসংখ্য ফেরেশতারা এ রাতে ইবাদাতকারীদের জন্য দু‘আ করেন।

এ রাতে বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করা হয়। সূরা দুখানে বলা হয়েছে,

﴿فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيْمٍ﴾

এই রাতে সব ব্যাপারে জ্ঞানগর্ভ ফায়সালা হয়ে থাকে। (সূরা দুখান- ৪)

﴿سَلَامٌ هِيَ حَتّٰى مَطْلَعِ الْفَجْرِ﴾

এ রাতটি ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি শান্তিময়। (সূরা কদর- ৫)

অর্থাৎ এ রাতে শুধু শান্তি আর শান্তি, মঙ্গল আর মঙ্গল। এতে অনিষ্টের নাম গন্ধও নেই। অনাবিল শান্তিপূর্ণ এ রজনীর অফুরন্ত শান্তি ফজর উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।