hadith book logo

সিয়াম ও যাকাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮৫

যাকাতের গুরুত্ব

ভিত্তিগত দিক থেকে ইসলামে যাকাতের অবস্থান তৃতীয়। এর মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা অনেক প্রকার কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। ফলে ইসলামে এর গুরুত্ব অনেক। নিম্নে এ ব্যাপারে বিসত্মারিত আলোচনা করা হলো :

যাকাত হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় মূলভিত্তি :

عَنْ عَبْدِ اللهِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلٰى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَّا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ ، وَإِيْتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করা অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল- এ কথার সাক্ষ্য দেয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, হজ্জ করা এবং রমাযান মাসে সিয়াম পালন করা। [সহীহ বুখারী, হা/৮; সহীহ মুসলিম, হা/১২১; তিরমিযী, হা/২৬০৯; নাসাঈ, হা/৫০০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬০১৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/৩০৮; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৫৮; মিশকাত, হা/৪।]

সকল নবীর যুগেই যাকাতের বিধান ছিল :

﴿وَجَعَلْنَاهُمْ اَئِمَّةً يَّهْدُوْنَ بِاَمْرِنَا وَاَوْحَيْنَاۤ اِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَاِقَامَ الصَّلَاةِ وَاِيْتَآءَ الزَّكَاةِۚ وَكَانُوْا لَنَا عَابِدِيْنَ﴾

তাদেরকে (নবীদেরকে) আমি নেতা বানিয়েছিলাম, যেন তাঁরা আমার নির্দেশানুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করতে পারে। আর তাঁদের নিকট ওহী প্রেরণ করেছিলাম, যেন তাঁরা সৎকর্ম করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে; আর তাঁরা ছিল আমারই ইবাদাতকারী। (সূরা আম্বিয়া- ৭৩)

সাহাবীরা যাকাত আদায় করতেন :

﴿رِجَالٌ لَّا تُلْهِيْهِمْ تِجَارَةٌ وَّلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَاِقَامِ الصَّلَاةِ وَاِيْتَآءِ الزَّكَاةِۚ يَخَافُوْنَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيْهِ الْقُلُوْبُ وَالْاَبْصَارُ﴾

তাঁরা এমন লোক, যাঁদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না। তাঁরা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। (সূরা নূর- ৩৭)

যাকাত আদায় করা মুমিনের একটি মৌলিক গুণ :

﴿وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍؕ يَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗؕ اُولٰٓئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُؕ اِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ﴾

মুমিন নর-নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। অচিরেই আল্লাহ তাঁদের উপর অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা তওবা- ৭১)

যাকাত হচ্ছে পরকালীন নাজাতের ক্ষেত্রে দলীলস্বরূপ :

عَنْ أَبِىْ مَالِكٍ الأَشْعَرِىَّ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ - - قَالَ : إِسْبَاغُ الْوُضُوْءِ شَطْرُ الْإِيْمَانِ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ تَمْلَأُ الْمِيْزَانَ وَالتَّسْبِيْحُ وَالتَّكْبِيْرُ يَمْلَأُ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضَ وَالصَّلَاةُ نُوْرٌ وَالزَّكَاةُ بُرْهَانٌ وَالصَّبْرُ ضِيَاءٌ وَالْقُرْاٰنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ

আবু মালিক আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পরিপূর্ণভাবে অযু করা ঈমানের অংশ বিশেষ। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাল্লাকে ভারী করে, ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ আসমান ও জমিনকে পূর্ণ করে। আর সালাত হলো নূর, যাকাত হলো দলীল, ধৈর্য হলো আলো এবং কুরআন হচ্ছে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীলস্বরূপ। [নাসাঈ, হা/২৪৩৭; ইবনে মাজাহ, হা/২৮০।]

সরকারিভাবে যাকাত উত্তোলনের জন্য নবী ﷺ এর প্রতি নির্দেশ :

﴿خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْؕ اِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْؕ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ﴾

তাদের সম্পদ হতে যাকাত গ্রহণ করো। এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে। আর তুমি তাদের জন্য দু‘আ করো। নিশ্চয় তোমার দু‘আ তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক; আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। (সূরা তওবা- ১০৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ যাকাত আদায়ের জন্য বাই‘আত গ্রহণ করতেন :

عَنْ جَرِيْرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ ، قَالَ : بَايَعْتُ رَسُوْلَ اللهِ عَلٰى إِقَامِ الصَّلَاةِ ، وَإِيْتَاءِ الزَّكَاةِ وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ

জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা এবং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করার জন্য বাই‘আত গ্রহণ করেছি। [সহীহ বুখারী, হা/৫৭; সহীহ মুসলিম, হা/২০৮; তিরমিযী, হা/১৯২৫; নাসাঈ, হা/৪১৭৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯১৮৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৩১৫; মিশকাত, হা/৪৯৬৭।]

যাকাত হচ্ছে আখিরাতের পুঁজি :

দুনিয়া হচ্ছে মানবজাতির জন্য আখিরাতের বিভিন্ন ধরনের বালা-মুসিবত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পুঁজি সংগ্রহ করার স্থান। কেননা সেদিন কোন টাকা-পয়সা, ধন-দৌঁলত, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ইত্যাদি কোন কাজে আসবে না; বরং সেদিন কেবল ঐ জিনিসগুলোই কাজে আসবে, যা সে দুনিয়ায় থাকাকালীন সময় আখিরাতের পুঁজি হিসেবে প্রেরণ করেছে। আর যাকাত হচ্ছে সে ধরনেরই একটি পুঁজি। মানুষ যদি যথাযথভাবে যাকাত আদায় করে সে সকল পুঁজিকে সমৃদ্ধশালী করে তুলে, তাহলে পরকালে তার জন্য নাজাত লাভ করা খুবই সহজ হয়ে যাবে। তাছাড়া মানুষ যদি দুনিয়াতে সামান্য পরিমাণ সম্পদ দান করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার পুঁজিকে আরো বহু গুণ সমৃদ্ধশালী করে উপস্থাপন করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَاۤ اٰتَيْتُمْ مِّنْ رِّبًا لِّيَرْبُوَ فِۤيْ اَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُوْا عِنْدَ اللهِ وَمَاۤ اٰتَيْتُمْ مِّنْ زَكَاةٍ تُرِيْدُوْنَ وَجْهَ اللهِ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُوْنَ﴾

মানুষের ধনসম্পদে তোমাদের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে- এ আশায় তোমরা যা কিছু সুদে (ঋণ) দিয়ে থাক, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যা কিছু যাকাত হিসেবে দিয়ে থাক, তবে এরূপ লোকের (প্রদত্ত বস্তু) আল্লাহর নিকট বৃদ্ধি পেতে থাকবে। (সূরা রূম- ৩৯)

হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  : مَنْ تَصَدَّقَ بِعَدْلِ تَمْرَةٍ مِنْ كَسْبٍ طَيِّبٍ ، وَلَا يَقْبَلُ اللهُ إِلَّا الطَّيِّبَ - وَإِنَّ اللهَ يَتَقَبَّلُهَا بِيَمِيْنِه ثُمَّ يُرَبِّيْهَا لِصَاحِبِه كَمَا يُرَبِّيْ أَحَدُكُمْ فَلْوَه حَتّٰى تَكُوْنَ مِثْلَ الْجَبَلِ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের পবিত্র (হালাল) উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ দান করল আর আল্লাহর কাছে পবিত্র জিনিসই গৃহীত হয়, আল্লাহ তা‘আলা ঐ দানকে নিজ ডান হাতে কবুল করেন। অতঃপর তা দানকারীর জন্য লালন-পালন করতে থাকেন যেমনিভাবে তোমাদের মধ্য হতে কেউ বকরির বাচ্চাকে লালন-পালন করে থাকে, অতঃপর তা পাহাড় সমতুল্য হয়ে যায়। [সহীহ বুখারী, হা/ ১৪১০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৩৬৩; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৩১৯; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮৯৮০; মিশকাত, হা/১৮৮৮।]

শয়তান যাকাত আদায় না করার জন্য কুমন্ত্রণা দেয় :

দুনিয়াতে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হল তার সম্পদ। তারা এগুলো অনেক কষ্ট করে উপার্জন করে থাকে। তাই এগুলোকে রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে এবং এগুলো হাত ছাড়া করতে সবসময় নারাজ থাকে। আর শয়তান মানুষের মানসিকতার এ সুযোগটাকেই যথাযথভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। ফলে অনেক মানুষ এটা জরিমানা বা অর্থদন্ড মনে করে বসে এবং সম্পদ কমে যাওয়া বা গরীব হয়ে যাওয়ার ভয় করে। যাতে করে মানুষ বিভ্রামত্ম হয়ে যাকাত আদায় না করে কুফরীতে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা শয়তানের এসব কুমন্ত্রণা ফাঁস করে দিয়ে বলেন,

﴿اَلشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَآءِۚ وَاللهُ يَعِدُكُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًاؕ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيْمٌ﴾

শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়; অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অসীম করুণাময় ও মহাজ্ঞানী। (সূরা বাকারা- ২৬৮)

হাদীসে এসেছে,

عَنْ بُرَيْدَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ : مَا يَخْرُجُ رَجُلٌ بِشَيْءٍ مِنَ الصَّدَقَةِ حَتّٰى يُفَكَّ عَنْهَا لَحْيَيْ سَبْعِيْنَ شَيْطَانًا

বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখনই কোন ব্যক্তি তার যাকাত বের করে, তখনই সে তার দ্বারা ৭০টি শয়তানের চক্রামত্মকে ব্যর্থ করে দেয়। [মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/১৫২১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০১২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৪৫৭; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৮০৭১; সিলসিলা সহীহাহ, হা/১২৬৮।]

যাকাত আদায়কারীদের জন্য ফেরেশতাগণ দু‘আ করেন :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ : ‏مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ الْعِبَادُ فِيْهِ إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ فَيَقُوْلُ اَحَدُهُمَا : اَللّٰهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُوْلُ الْآخَرُ : اَللّٰهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا‏

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, প্রতিদিন সকালে যখন আল্লাহর বান্দারা ঘুম থেকে উঠে, তখন দু’জন ফেরেশতা আকাশ থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! দানশীল ব্যক্তিকে প্রতিদান দাও। অপরজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে নিঃশেষ করো। [সহীহ বুখারী, হা/১৪৪২; সহীহ মুসলিম, হা/২৩৮৩; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৯১৩৪; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৯২০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৯১৪; মিশকাত, হা/১৮৬০।]