hadith book logo

ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০০

ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব কার?

দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব কার? আল্লাহপাক এ দায়িত্ব দিয়েই রসূল (ﷺ)-কে পাঠিয়েছেন। যেমন কুরআনুল কারীমের তিনটি সূরায় এ বিষয়ে পরিস্কার ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে।

“তিনিই সে সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়াত ও একমাত্র দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন (সে দ্বীনকে) আর সব দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন।”(সূরা আত তাওবা ৯: ৩৩, সূরা ফাতহ ৪৮ : ২৮, সূরা আস সফ ৬১ : ৯)।

কিন্তু এ দায়িত্ব কি শুধু রসূলেরই! রসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছিলেন তারা কি শুধু সলাত, সিয়াম, হাজ্জ ও অন্যান্য কতক ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করাই নাজাতের জন্য যথেষ্ট মনে করতেন?

কুরআন ও হাদীস একথার সাক্ষী যে, প্রত্যেক ঈমানদারকেই রসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর ‘ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালনে জান ও মাল দ্বারা পূর্ণরূপে শরীক হতে হতো। রসূল (ﷺ) -এর ইমামতিতে মদীনার মসজিদে জামায়াতে সলাত আদায়কারী এক হাজার লোক নিয়ে আল্লাহর রসূল (ﷺ) ওহুদের যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। কিছুদূর যেয়ে আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর নেতৃতে তিন শ' লোক যুদ্ধে শরীক না হয়ে ফিরে এলো। আল্লাহ তা'আলা এদেরকে মুনাফিক বলে ঘোষণা করলেন। তাবুকের যুদ্ধে তিনজন সাহাবী যথাসময়ে রওয়ানা না হওয়ায় এবং পরে রওয়ানা হবার নিয়ত তাদের থাকা সত্ত্বেও রসূলের নির্দেশে তাদেরকে মুসলিম জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হলো। এমনকি তাদের স্ত্রী সন্তানকে পর্যন্ত তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হলো। এ অবস্থায় দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন তাওবা করার পর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমা করলেন।

এ থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, রসূলের দায়িত্ব পালনে পূর্ণভাবে শরীক হওয়া ঈমানের অপরিহার্য দাবী। তাহলে বুঝা গেল যে, ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব প্রত্যেক মুসলিমেরই। রসূলের এ মহান দায়িত্ব শরীক না হলে ঈমান আনার প্রয়োজনই কি ছিল? কুরআনে রসূলের মুখ দিয়েই বলান হয়েছে যে :

“আল্লাহকে ভয় করে চল এবং আমার আনুগত্য কর।” (সূরা আশ শূয়ারা : ১৫০)

অর্থাৎ রসূলের পূর্ণ আনুগত্য করার মাধ্যমেই আল্লাহর আনুগত্য করা সম্ভব। আল্লাহ তা'আলা যত হুকুম করেছেন তা বাস্তবে মানব সমাজে তখনই চালু হতে পারে যখন আল্লাহর দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়। কোন ফরযই আনইসলামী শক্তির অধীনে ফরযের মর্যাদা পায় না। ইকামাতে দ্বীন ছাড়া কোন হারামই সমাজ থেকে উৎখাত হতে পারে না। তাই আল্লাহর রসূল (ﷺ) যত ফরয প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তা ইকামাতে দ্বীনের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কোন ফরযই সমাজে চালু করতে পারতেন না।

সুতরাং ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্বটিই সব ফরযের বড় ফরয। ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্বকে অগ্রাহ্য করে সলাত, যাকাত, সিয়াম, হাজ্জ, ইত্যাদি কোন ফরযকেই ঠিকভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তেমনি দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া সমাজ থেকে খারাবী ও অন্যায়কে উৎখাত করা যায় না। তাহলে এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব (ফরিয়ে ইকামাতে দ্বীন) প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। অর্থাৎ দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা বা বিজয়ী করার চেষ্টা করা ফরযে আইন”।

অবশ্য দ্বীন বিজয়ী হয়ে গেলে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচালক সরকারের উপরই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখার দায়িত্ব থাকে। তখন এটা সাধারণ মুসলিমদের জন্য ফরযে কিফায়া হয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা দ্বীনকে পরাজিত করে সঠিক দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্বটি অবশ্যই “ফরযে আইন”। আল্লাহর রসূল (ﷺ) -কে (উৎকৃষ্টতম আদর্শ) ও সাহাবাদের অনুকরণ যোগ্য মনে করলে একথা স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই। সব ফরযের বড় ফরয হিসেবে ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্বকে বুঝবার পর কারো পক্ষেই ইসলামের কতক মূল্যবান খেদমত করেই সন্তুষ্ট থাকা সম্ভব নয়।

অবশ্য এ দায়িত্বের অনুভূতিই যাদের নেই তাদের কথাই আলাদা। নাযাত দেয়ার মালিক যে মহান আল্লাহ তিনিই তাদের হাল জানেন এবং তিনি কারো উপর অবিচার করবেন না- একথা নিশ্চিত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব (ফরি) বুঝবার যোগ্যতা দিয়েছেন তাদের পক্ষে এ বিষয় অবহেলা করা স্বাভাবিক নয়। মাদ্রাসা, খানকাহ ও তাবলীগের মাধ্যমে দ্বীনের যতটুকু খেদমত হচ্ছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা তাদের পক্ষে অসম্ভব।

একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, মাদ্রাসা, ওয়ায, খানকাহ ও তাবলীগ দ্বারা দ্বীনের বড় বড় খেদমত হচ্ছে। এসব খেদমতই ইকামতে দ্বীনের জন্য বিশেষ সহায়ক। কিন্তু খেদমতগুলো দ্বারা আপনা আপনিই দ্বীন প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। দ্বীন কায়েমের কর্মনীতি ও কর্মসূচী শুধু খেদমত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে না। ইকামাতে দ্বীনের প্রচেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই একটি বিপ্লবী মুভমেন্টে রূপ লাভ করে। এ প্রচেষ্টাকেই তাই ইসলামিক মুভমেন্ট বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বলা হয়।