hadith book logo

ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮০

জ্ঞানের উৎস :

এরপর একটি মাত্র উৎসই থাকে যার থেকে আমি আমার এ অত্যাবশ্যক জ্ঞানের আলো লাভ করতে পারি। সেই উপায়টি হচ্ছে আমার ও নিখিল জাহানের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। আল্লাহ সবকিছুই অবগত আছেন, সবকিছুই দেখতে পান, প্রত্যেকটি জিনিসের প্রকৃতি তিনি ভাল করে জানেন ও বুঝেন। একমাত্র তিনিই বলে দিতে পারেন যে, কোন্ জিনিসে আমার প্রকৃত উপকার, আর কোন্ জিনিসে আমার আসল ক্ষতি হতে পারে, কোন্ কাজ আমার করা উচিত, কোন কাজ করা উচিত নয়- তা একমাত্র তিনিই বলে দিতে পারেন। আল্লাহর কোনো কিছুর অভাব নেই, তাঁর কোনো স্বার্থ নেই, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোনো জিনিসের প্রয়োজন নেই। তিনি ধোঁকা দিয়ে (নাউযুবিল্লাহ) আমার কাছ থেকে তাঁর নিজের কোনো স্বার্থ আদায় করবেন না। কারণ তিনি পাক-পবিত্র, তিনি সবকিছুরই মালিক, তিনি যা কিছু পরামর্শ দিবেন তার মধ্যে তাঁর নিজের স্বার্থের কোনো গন্ধ নেই এবং তা কেবল আমারই উপকারের জন্য। এছাড়া আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি কখনই কারো উপর অবিচার করেন না। কাজেই তাঁর সকল পরামর্শ নিশ্চিয়ই নিরপেক্ষ, ন্যায় ও ফলপ্রসু হবে। তাঁর আদেশ অনুযায়ী চললে আমার নিজের উপর বা অন্য কারো উপর কোনো যুলুম হবার আশংকা নেই।

আল্লাহর কাছ থেকে যে আলো পাওয়া যায়, তা থেকে কল্যাণ লাভ করা দুটি জিনিসের উপর একান্তভাবে নির্ভর করে।

প্রথম জিনিস এই যে, আল্লাহ এবং তিনি যে নবীর সাহায্যে এ আলো পাঠিয়েছেন সেই নারীর প্রতি আমাকে প্রকৃত ঈমান আনতে হবে, আমাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহর কাছ থেকে তার রসূল (ﷺ) যে বিধান ও উপদেশ নিয়ে এসেছেন, তা সম্পূর্ণ সত্য; তার সত্যিকার উপকারিতা যদি আমি অনুভব করতে না-ও পারি তবুও আমাকে একথা বিশ্বাস করতে হবে।

দ্বিতীয়, ঈমান আনার পর আমি আমার জীবনের প্রত্যেকটি কাজেই আল্লাহর সেই বিধান অনুসরণ করে চলবো। কারণ তার প্রতি ঈমান আনার পর কার্যত তাঁর অনুসরণ না করলে সেই আলো হতে কিছুমাত্র ফল পাওয়া যেতে পারে না। মনে করি, কোনো ব্যক্তি আমাকে বললো, অমুক জিনিসটি বিষ, তা প্রাণীর প্রাণ নাশ করে; কাজেই তা খেও না। আমি বললাম, হ্যা ভাই, তুমি যা বলছ তা খুবই সত্য, তা যে বিষ এবং তা প্রাণ ধবংস করে, তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু এ সত্য জেনেশুনে বিশ্বাস করে এবং মুখে স্বীকার করেও আমি তা খেলাম। এখন বিষের যা আসল ক্রিয়া তা তো হবেই। জেনে খেলেও হবে, না জেনে খেলেও হবে। আমি তা না জেনে খেলেও জেনে খাওয়ার মত একই ফল হতো। এরূপ জানা ও না জানার মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য নেই। আর এরূপ জানা এবং স্বীকার করার প্রকৃত ফল। ও উপকারিতা আমি ঠিক তখনই পেতে পারি যখন আমি কোনো সত্য জানার ও স্বীকার করার সাথে সাথে সেই অনুসারে কাজ করবো। আমাকে যে কাজের হুকুম দেয়া হয়েছে, কেবল মুখে মুখে তাকে সত্য বলে স্বীকার করে বসে থাকবো না বরং তাকে কাজে পরিণত করবো। আর যে কাজ করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে, শুধু মুখে মুখে তা থেকে ফিরে থাকার কথা মেনে নিলে চলবে না, বরং আমার জীবনের সমস্ত কাজকর্মেই সেই নিষিদ্ধ কাজ হতে ফিরে থাকতে হবে।

এজন্য আল্লাহ বার বার বলেছেন : “আল্লাহ ও রসূলের হুকুম মেনে চল।” (সূরা আন নিসা ৪: ৫৯)

“যদি তোমরা রসূলের অনুসরণ কর, তবেই তোমরা সৎপথের সন্ধান পাবে।” (সূরা আন নূর ২৪ : ৫৪)

“যারা আমার রসূলের হুকুমের বিরোধিতা করছে, তাদের ভয় করা উচিত যে, তাদের উপর বিপদ আসতে পারে।” (সূরা আন নূর ২৪ : ৬৩)

অন্ধভাবে কাউকে মানা যাবে না:

আমাদের কেবল আল্লাহ এবং তাঁর রসূলেরই আনুগত্য করা উচিত; এর অর্থ এই নয় যে, কোনো মানুষের হুকুম আদৌ মানতে হবে না। আসলে এর অর্থ এই যে, আমরা অন্ধ হয়ে কারো পিছনে চলবো না। সবসময়ই আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কেবল এটাই দেখবো যে, যে ব্যক্তি আমাকে কোনো কাজ করতে বলে, তা আল্লাহ ও রসূলের হুকুমের অনুরূপ, না তার বিপরীত। যদি তার অনুরূপ হয়, তবে তা মেনে নেয়া অবশ্যই কর্তব্য। কারণ, সেই হুকুম মতো কাজ করলে তাতে আসলে সেই ব্যক্তির নিজের হুকুম পালন করা হয় না, তা করলে আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূলেরই আনুগত্য করা হবে। আর সে যদি আল্লাহ ও রসূলের হুকুমের বিপরীত হুকুম দেয়, তবে তা গ্রহণ না করা, সে যে ব্যক্তিই হোক না কেন। কারণ, আল্লাহ ও রসূলের হুকুম ছাড়া অন্য কারো হুকুম পালন করা একেবারেই জায়েয নাই।

আমরা একথা সহজেই বুঝতে পারি যে, আল্লাহ নিজে মানুষের সামনে এসে হুকুম দেন না, তাঁর যা কিছু হুকুম-আহকাম দেয়ার ছিল, তা সবই তাঁর রসূলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। আমাদের সেই প্রিয় নবীও প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। তাঁর কাছে আল্লাহ যা কিছু হুকুম-আহকাম দিয়েছিলেন, তা সবই এখন কুরআন ও হাদীসের মধ্যে নিহিত আছে। কিন্তু এ কুরআনুল কারীম এমন কোনো জিনিস নয়, যা নিজেই আমাদের সামনে এসে আমাদেরকে আল্লাহর কথা বলতে ও হুকুম দান করতে পারে এবং আমাদেরকে আল্লাহর নিষিদ্ধ পথ হতে বিরত রাখতে পারে। মানুষই আমাদেরকে কুরআন ও হাদীস অনুসারে পরিচালিত করবে। কাজেই মানুষের অনুসরণ না করে তো কোনো উপায় নেই। অবশ্য অপরিহার্য কর্তব্য এই যে, আমরা কোনো মানুষের পিছনে অন্ধভাবে চলবো না। আমরা সতর্কভাবে শুধু এতটুকুই দেখবো যে, সেই লোকেরা আমাদেরকে কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুসারে পরিচালিত করে কিনা। যদি কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুসারে চালায় তবে তাদের অনুসরণ করা আমাদের কর্তব্য এবং তার বিপরীত পথে চালালে তাদের অনুসরণ করা পরিষ্কার হারাম।