hadith book logo

ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৭

কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে নয়

উপরে যা কিছু বলা হয়েছে তা কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে নয়। আসলে উদ্দেশ্য এই যে, আমরা যা কিছু হারিয়ে ফেলেছি, তা ফিরে পাবার জন্য চেষ্টা করা উচিত। হারানো জিনিস পুনরায় পাওয়ার চিন্তা মানুষের ঠিক তখনই হয়, যখন সে নিশ্চিতরূপে জানতে ও বুঝতে পারে যে, তারা কী জিনিস এবং কত মূল্যবান জিনিস হারিয়েছে। এজন্যই মুসলিমদেরকে সতর্ক করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যদি তাদের জ্ঞান ফিরে আসে এবং তারা যে প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছে তা যদি বুঝতে পারে, তবে তা পুনরায় ফিরে পেতে চেষ্টা করবে।

শুধু ঈমান আনলেই কি জান্নাতে যাওয়া যাবে?

আমাদের সমাজে একটা কথার প্রচলন আছে যে, যে একবার কালিমা পড়েছে সে একদিন না একদিন জান্নাতে যাবেই অথবা সমস্ত মুসলিমরা জান্নাতে যাবে আর অমুসলিমরা জাহান্নামে যাবে। একটা সেমিনারে একজন অমুসলিম অডিয়েন্স থেকে ড. জাকির নায়েককে এই প্রশ্নটাই করেছিলেন যে, “সমস্ত মুসলিমই জান্নাতে যাবে আর সমস্ত অমুসলিম জাহান্নামে যাবে এটা কি ঠিক?” উত্তরে ড. জাকির নায়েক একটা কুরআনের কপি হাতে নিয়ে বলেন, এই বইয়ের কোথাও এই ধরনের কথা লিখা নেই। তবে লিখা আছে যে, যারা এই বইটা অনুসরণ করবে তারাই জান্নাতে যাবে আর যারা অনুসরণ করবে না তারা জাহান্নামে যাবে।

কুরআন-হাদীসের আলোকে এই বিষয়টা আমাদের পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যেমন একটা হাদীস আছে যে, কেউ যদি প্রতিদিন ভালভাবে ওযু করে বাড়ি থেকে হেটে এসে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত করে তাহলে তার জন্য জান্নাত নিশ্চিত। এখন কেউ যদি শুধু এই হাদীসের লিটারাল মিনিং নিয়ে মনে করে যে এই কাজটুকু করলেই তো জান্নাতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট তাহলে তো সে বিভ্রান্ত হবে। আসলে জান্নাতে যাওয়ার কোন সর্টকাট রাস্তা নেই। নিম্মের তিনটি হাদীসের শুধু লিটারাল মিনিং নেয়ার কারণে জান্নাতে যাওয়া খুব সহজ মনে হচ্ছে। যদি কেউ মনে করে যে শুধু কালিমা পড়লেই সে জান্নাতে চলে যাবে। বিষয়টা তেমন নয়। এই কালিমার অন্তর্নিহিত বিস্তারিত অর্থ জানতে হবে যা আমরা আগের অধ্যায়গুলোতে পড়েছি।

হাদীস ১ : উবাদা বিন ছামেত (রা.) বলেন, ....... আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনছি, যে ঘোষণা করবে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রসূল, তার জন্য আল্লাহ জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। (সাহীহ মুসলিম)।

হাদীস ২ : উসমান বিন আফফান (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এটি জেনে (বিশ্বাস করে) মৃত্যুবরণ করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, সে জান্নাতে যাবে। (সহীহ মুসলিম)

হাদীস ৩ : মুআজ বিন জাবাল (রা.) বলেন, রসূল (ﷺ) বলেছেন, জান্নাতের চাবি হচ্ছে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। (মুসনাদে আহমদ)

এবার আমরা যদি নিমের কুরআনের আয়াতগুলো দেখি সেখানে স্পষ্ট সতর্ক করে বলা হচ্ছে যে জান্নাতে যাওয়া এতো সহজ নয়, পদে পদে আমাদেরকে পরীক্ষা দিতে হবে।

আয়াত : মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এতোটুকু বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা নেয়া হবে না? (সূরা আনকাবুত ২৯ : ২)।

আয়াত : তোমরা কি ভেবে নিয়েছ যে এমনিতেই জান্নাতে পৌঁছে যাবে? (সূরা ইমরান ৩ : ১০২)।

আয়াত : আর আল্লাহকে তো যাচাই করে দেখতেই হবে, কে ঈমানদার, আর কে মুনাফিক। (সূরা আনকাবুত ২৯ : ১১)

আয়াত : তোমরা কি মনে করে নিয়েছে যে, তোমরা অতি সহজেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? (সূরা বাকারা ২: ২১৪)

আয়াত : তোমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তোমাদেরকে অবশ্যই জিঞ্জাসাবাদ করা হবে। (সূরা আন নহল ১৬ : ৯৩)

ব্যাখ্যা:

নিম্নের আয়াতগুলোতে বলা হচ্ছে যে ঈমান আনার সাথে সাথে সেই অনু্যাই আমলও করতে হবে। শুধু মুখে বললেই হবে না যে আমি ঈমান এনেছি। আমল দিয়ে ঈমান প্রমাণ করতে হবে। আল কুরআনে যতো যায়গায় ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে ততো যায়গায় তার সাথে আমলের কথা বলা হয়েছে।

আয়াত : কালের কসম। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। কিন্তু তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ আমল করেছে। (সূরা আল আসর ১০৩: ১-৩)।

আয়াত : যারা ঈমান আনে ও সৎ আমল করে তাদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপুরষ্কারের ওয়াদা করেছে। (সূরা মায়িদা ৫: ৯)।

আয়াত : আর যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে নিশ্চয় আমি তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব এবং তারা যে উত্তম কাজ করত আমি অবশ্যই তার উত্তম প্রতিদান দেব। (সূরা আনকাবুত ২৯ : ৭)।

আয়াত : মানুষ নিজের কাজ অনুযায়ী (উভয়কালেই) তার অংশ লাভ করবে; বস্তুত হিসাব সম্পন্ন করতে আল্লাহর বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয়না। (সূরা আল-বাকারা ২ : ২০২)।

ব্যাখ্যা:

আমল হচ্ছে অন্তরে ঈমান থাকার নিদর্শন বা প্রমাণ। ঈমান (বিশ্বাস) আমলকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। ঈমানের জন্য পুরস্কার পেতে হলে যেমন আমল থাকতে হবে তেমনি আমলের জন্য পুরস্কার পেতে হলেও ঈমান থাকতে হবে। মুসলিম সেই ব্যক্তি যার ঈমান আছে এবং সে ঈমানের দাবী অনুযায়ী আমল করে। তাই পরকালে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে হলে ঈমান ও আমল উভয়টি থাকতে হবে। ঈমান হলো আমল কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত।

আয়াত : যারা ছোট-খাট গুনাহ ছাড়া বড় পাপ (কবীরা গুনাহ) ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থাকে, (তাদের ব্যাপারে) নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের ক্ষমার পরিধি ব্যাপক। (সূরা নাজম ৫৩ : ৩২)।

ব্যাখ্যা : এখানে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, যে সকল ঈমানদার কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত তাদের ছোটখাট গুনাহ আল্লাহ তাআলা কোন না কোনভাবে ক্ষমা করে দিবেন।

আয়াত : অবশ্যই আল্লাহ সেসব লোকদের তওবা কবুল করেন যারা জাহালাত (ভুল, লোভ, লালসা ইত্যাদি) বশত মন্দ কাজ করে এবং অনতিবিলম্বে তওবা করে, এদের তওবাই আল্লাহ কবুল করেন; আর আল্লাহ মহাপ্রজ্ঞাবান। (সূরা (নিসা ৪: ১৭)

ব্যাখ্যা : এখানে মহান আল্লাহ প্রত্যক্ষভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা অজ্ঞতা, ভুল বা ধোঁকায় পড়ে (ছোট বা বড়) পাপ কাজ করে ফেলার সাথে সাথে খালিস নিয়াতে তওবা করবে, (মানুষের হক ফাঁকি দেয়ার গুনাহ ব্যতীত) তাদের গুনাহ তিনি মাফ করে দিবেন।