hadith book logo

ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮৭

৫. কিভাবে ঈমানে দুর্বলতা দেখা দেয়?

আল্লাহর প্রতি সত্যিকার ঈমান থাকলে আল্লাহর সাথে যে সব সম্পর্ক গড়ে উঠে এ সম্পর্কের দাবি পূরণ করাই মুমিনের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু ঈমানের দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও ঈমানের দাবি পূরণে সে-ই ব্যর্থ হয় যার ঈমান দুর্বল। তাই প্রত্যেক মু'মিনেরই এ-বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন যে, কোন্ পথে ঈমানে দুর্বলতা আসে। যখনই ঈমানে দুর্বলতা দেখা দেবে তখনই আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আল্লাহ তাঁর কুরআনে নির্দেশ করেছেন।

قل إن كان آباؤكم وأبناؤكم وإخوانه وأزواجه وعشيرة وأموال اقترموها وتجار تشون گشادها ومساكن ترؤها أحب إليه من ال وشولو چهار في سبيل تبوا حتى يأتي الله بأمري و الله لا يهيي القوة القايقين

(হে রসূল! আপনি তাদেরকে) বলুন, তোমাদের পিতা, সন্তানাদি, ভাই-বোন, স্ত্রীগণ, আত্মীয়-স্বজন, ঐ সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের ঐ ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার মন্দার ভয় কর এবং তোমাদের ঐ সম্পদ যা তোমরা পছন্দ কর - (এস) যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আল্লাহ ফাসিকদেরকে হিদায়াত করেন না। (সূরা তাওবা ৯ : ২৪)

এক দিকে ৮টির প্রতি ভালোবাসা

১) পিতা

২) সন্তানাদি

৩) ভাই-বোন

৪) স্ত্রীগণ

৫) আত্মীয়-স্বজন

৬) জমানো সম্পদ

৭) ব্যবসা-বাণিজ্য

৮) বাড়ি

অন্য দিকে ৩টির প্রতি ভালোবাসা

১) আল্লাহ

২) রসূল

৩) আল্লাহর পথে জিহাদ বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা

এ আয়াতে মহান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা স্পষ্ট ভাষায় দুনিয়ার ভালোবাসার জিনিসগুলোকে কী পরিমাণ ভালোবাসা যাবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং বক্তব্য স্পষ্ট :

১. আল্লাহ

২. রসূল (ﷺ)

৩. আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়ে সম্পদ ও স্বজনকে বেশি ভালোবাসলেই ঈমান দুর্বল বলে প্রমাণিত হবে। যখন ঐ আটটি জিনিসের ভালোবাসা এ তিনটির চেয়ে বেশি হবে তখন-ই ঈমানের বিপদ।

একটি উদাহরণ:

পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া জীবন বাঁচে না বলেই এ কথাটি বলা হয়। কিন্তু মানুষ কি পানিতে ডুবে মরে না? তাহলে পানিকে জীবন বলা যায় কী করে? আসল কথা হলো, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি অবশ্যই জীবন। এ পরিমাণের বেশি হলে পানিই মরণ। আল্লাহ, রসূল ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রতি দায়িত্ব পালনের পথে যখন ঐ আটটি ভালোবাসার বস্তু প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তখন ঐ দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি হয়। এ বাধা দূর করতে পারলে, অর্থাৎ তিনটির ভালোবাসার খাতিরে যদি আটটির ভালোবাসা কুরবানী দেয়া যায়, তাহলে প্রমাণিত হবে যে ঈমান দুর্বল। নয়। ঈমান দুর্বল হলে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ তখন আর ঈমানের দাবি পূরণ করার শক্তি থাকে না। সম্পদ ও সন্তানকে আল্লাহ শোভাও বলেছেন, ফিতনাও বলেছেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহর বক্তব্য পরিষ্কার:

المال والبنون زينة الحياة الدنيا

“সম্পদ ও সন্তানাদি দুনিয়ার জীবনের শোভা।” (সূরা আল কাহাফ ১৮ : ৪৬)

إنما أم الگه وأولاده نه والله عنده أجر عليه

“নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তোমাদের জন্য ফিতনাহ।” (সূরা আত তাগাবুন ৬৪ : ১৫)

ঐ আটটি ও তিনটির ভালোবাসায় যদি ভারসাম্য রক্ষা করা হয় তাহলে সম্পদ ও সন্তান জীবনের শোভা। আর যদি আটটির ভালোবাসা বেশি হয় তাহলে সম্পদ ও সন্তান ফিতনাহ। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর হুকুম পালনে বাধাকেই ফিতনা বলা হয়। এর শাব্দিক অর্থ- পরীক্ষা, বিপদ, গোলযোগ, আকর্ষণ, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন :

“হে ঐ সব লোক যারা ঈমান এনেছ, শুন! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদেরকে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে না দেয়।” (সূরা মুনাফিকূন ৬৩ : ৯)

“তোমাদের প্রিয় জিনিসগুলিকে যদি তোমরা আল্লাহর জন্য কুরবানী না কর তা হলে তোমরা প্রকৃত কল্যাণ কিছুতেই লাভ করতে পারবে না।” (সূরা আলে-ইমরান ৩ : ৯২ )

“আল্লাহ ঈমানদার ব্যক্তিদের নিকট হতে তাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন এবং তার বিনিময়ে, তাদের জন্য জান্নাত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।” (সূরা তাওবা ৯ : ১১১)

তাই পার্থিব ভালোবাসায় এমন মগ্ন হওয়া যাবে না যার কারণে ঈমানের দাবি পূরণে অবহেলা হয়ে যায়। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক ঈমানের বুঝ দিন এবং প্রতিমুহূর্তে এই ঈমানকে ধরে রাখার তৌফিক দিন। আমীন। আসুন একটি উদাহরণের মাধ্যমে নিজেকে নিজে পরীক্ষা করি। আমরা জানি রসূল (ﷺ) এবং আরো অনেক সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দ্বীন ইসলামের জন্য নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করেছিলেন। ত্যাগ করার সময় ধন-সম্পদ-পরিবার-পরিজন কিছুই সাথে নিতে পারেননি, সব ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন, যেখানে যাচ্ছেন সেখানে থাকা-খাওয়ারও কোন নিশ্চয়তা ছিল না। এটা ছিল তাদের ত্যাগ। এবার আমাকে যদি বলা হয় দ্বীন ইসলাম প্রচারের জন্য টরন্টো শহর ছেড়ে অন্য প্রভিন্স নিউ ফাউন্ডল্যাণ্ড গিয়ে থাকতে হবে, সাথে পরিবারসহ সব কিছু নিতে পারবো, গিয়েই থাকার বাসা পাবো, চাকুরীতে যোগদান করতে পারবো। তারপরও কী আমরা যেতে রাজী হবো? হয়তো না।