১
ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা
লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৩
কালিমায়ে তাইয়্যিবাটা কী?
একটা সত্য কথা; এমন সত্য কথা যে, এ দুনিয়ায় তা অপেক্ষা অধিক সত্য কথা আর একটিও নেই। এক আল্লাহই সারাজাহানের ইলাহ, আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই একথার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। মানুষ, পশু, গাছ, পাথর, বালুকণা, প্রবাহমান ঝর্ণা, উজ্জ্বল সূর্য চারদিকে বিস্তৃত এ সমস্ত জিনিসের কোনটাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেনি? আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কি এগুলোকে সৃষ্টি করেছে? তাঁর দয়া ও মেহেরবানী ছাড়া অন্য কারোও অনুগ্রহে কি এগুলো বেঁচে আছে? এদের মধ্যে কোনো একটিকেও কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জীবন বা মৃত্যু দান করতে পারে? এ সারজাহান যখন আল্লাহরই সৃষ্টি তাঁরই দয়ায় যখন এসব কিছু বর্তমান আছে এবং তিনিই যখন এসবের একমাত্র মালিক ও হুকুমদাতা, তখন যে সময়েই আমি বলবো এ পৃথিবীতে সে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোও প্রভুত্ব নেই, তৎক্ষণাৎই আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটা জিনিসই বলে ওঠবে : তুমি সত্য কথাই বলেছো, আমরা সকলেই তোমার কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি।
সেই আল্লাহর সামনে যখন আমি মাথা নত করবো, বিশ্বভুবনের প্রত্যেকটি জিনিসই আমার সাথে তারই সামনে ঝুঁকে পড়বে। কারণ, ...এ সমস্ত জিনিসও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে। আমি যখন তাঁরই হুকুম পালন করে চলবো, তখন আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই আমার সাথী হবে, কারণ এসবই যে একমাত্র তাঁরই অনুগত। আমি যখন তাঁর পথে চলতে শুরু করবো, তখন আমি একাকী হবো না, এ নিখিল জাহানের অগণিত ‘সৈন্য আমার সাথে চলতে আরম্ভ করবে। কারণ, আকাশের সূর্য হতে শুরু করে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম বস্তুকণা পর্যন্ত সর্বদা তাঁরই নির্ধারিত পথে চলছে। আমি যখন সেই এক আল্লাহর উপর নির্ভর করবো, তখন সামান্য শক্তির উপর নির্ভর করা হবে না- আমার ভরসা করা হবে এমন এক বিরাট শক্তির উপর, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত শক্তি ও ধন-সম্পদের একমাত্র মালিক।
মোটকথা, এ নিগুঢ় তত্ত্ব যদিও আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে চলি, তবে আমি ভালো করে জানতে পারবো যে, কালিমায়ে তাইয়্যিবার প্রতি ঈমান এনে যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে সেই আদর্শ অনুসারে গঠন করে নেবে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় শক্তিই তার সাহায্য কাজে নিযুক্ত হবে। দুনিয়ার জীবন হতে পরকাল পর্যন্ত সে কেবল উন্নতিই করতে থাকবে। তার কোনো চেষ্টাই ব্যর্থ হবে না, কোনো উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থাকতে পারবে না।
কালিমার সম্পূর্ণ বিপরীত মতবাদও রয়েছে যেমন, এ দুনিয়ার ইলাহ বা সৃষ্টিকর্তা কেউ নেই, কিংবা এ দুনিয়ায় একাধিক ইলাহ (প্রভু) রয়েছে। একটু চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারবো যে, তা অপেক্ষা বড় মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন কথা আর কিছুই হতে পারে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন। আমাদেরকে সেই আল্লাহই তো সৃষ্টি করেছেন। আর সে আল্লাহই আমাকে ঐ জিহ্বা দিয়েছেন যার দ্বারা আমি এতবড় একটা মিথ্যা কথা বলছি। মুশরিক বলে যে, আল্লাহ এক নয়, তাঁর সাথে আরও অনেক দেবদেবী রয়েছে। তারাও রিযিক দেয়, তারাও আমাদের মালিক, তারাও আমাদের ভাগ্য গড়তে ও ভাংগতে পারে। উপকার করা কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদেরও আছে। তোমাদের জিকির">দু’আ তারাও শুনতে পারে। তারাও তোমাদের ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারে, তাদেরকে ভয় করে চলা উচিত। তাদের উপর ভরসা করা যেতে পারে। দুনিয়া পরিচালনার ব্যাপারে তাদেরও হুকুম চলে। আল্লাহ ছাড়া তাদেরও হুকুম পালন করে চলা কর্তব্য (নাউযুবিল্লাহ)। এসবই কালিমার বিপরীত।
এখন ভেবে দেখি, এ কালিমা যে ব্যক্তি কবুল করবে এবং সে অনুসারে নিজের জীবনকে গঠন করবে, দুনিয়া ও আখিরাতে সে কেমন করে উন্নতি লাভ করতে পারে? আল্লাহ অনুগ্রহ করে এসব লোককে অবসর ও অবকাশ দিয়ে রেখেছেন। এবং রিযিক দেবারও ওয়াদা করেছেন। কাজেই আকাশ ও পৃথিবীর শক্তিগুলো কিছু না কিছু পরিমাণে তাদেরকে প্রতিপালন করবে- যেমন বন-জঙ্গলে আগাছা পরগাছগুলোকে করছে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো একটা জিনিসও আগ্রহ করে তাদেরকে সাহায্য করবে না এবং পূর্ণশক্তি দিয়ে তাদের সহায়তা করবে না। তারা ঠিক জঙ্গলের আগাছার মতই কিছুদিন মাত্র বেঁচে থাকতে পারবে তার বেশী নয়।
‘কালিমায়ে তাইয়্যিবা যখন ফল দান করবে, তখন তা খুবই মিষ্ট ও সুস্বাদুই হবে। দুনিয়ার বুকে তা দ্বারা শান্তি স্থাপিত হবে। চারদিকে সত্য ও পূর্ণ সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। নিখিল দুনিয়ার মানুষ তা দ্বারা অসাধারণ উপকার লাভ করতে পারবে। কিন্তু কালিমার বিপরীত শক্তি ও মতোবাদ যতই বৃদ্ধি পাবে, কেবল কাঁটায় ভরা-ডাল-পালাই তা হতে বের হবে। তিক্ত ও বিষাক্ত ফল তাতে ফলবে। এর শিরায় শিরায় বিষ ভরা থাকবে। নিজেদের চোখ দিয়েই আমরা তা দেখে নিতে পারবো। দুনিয়ার যেখানেই কুফরি, শিরক এবং নাস্তিকতার জোর বেশী, সেখানে কী হচ্ছে? সেখানে মানুষ মানুষের রক্ত ঝড়াচ্ছে। দেশের পর দেশ ধবংস করার আয়োজন খুব জোরের সাথেই চলছে। বিষাক্ত গ্যাস তৈরী হচ্ছে। এক জাতি অন্য জাতিকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ওঠেপড়ে লেগেছে। শক্তিমান দুর্বল ব্যক্তিগণকে নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছে তার ভাগের আহার কেড়ে নেবার জন্য শুধু দুর্বল মানুষকে সেখানে সৈন্য, পুলিশ, জেল ও ফাঁসির ভয় দেখিয়ে অবদমিত করে রাখার এবং শক্তিশালী জাতির যুলুম নীরবে সহ্য করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে।
এছাড়া এসব জাতির ভিতরের অবস্থা আরও ভয়ানক খারাপ। তাদের নৈতিক চরিত্র এতই কদর্য যে, স্বয়ং শয়তানও তা দেখে লজ্জা পায়। মানুষ সেখানে। জন্তু-জানোয়ার অপেক্ষাও হীনতর কাজ করছে। মায়েরা সেখানে নিজেদের হাতেই নিজেদের সন্তানকে হত্যা করছে- যেন এ সন্তান তাদের সুখ-সম্ভোগের পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে। স্বামীরা সেখানে নিজেদের স্ত্রীদেরকে অন্যের কোলে ঠেলে দিচ্ছে শুধু পরের স্ত্রীকে নিজের কাছে পাবার উদ্দেশ্যে। নুড ক্লাব তৈরী করা হয়েছে, সেখানে নারী-পুরুষ পশুর মতো উলংগ হয়ে আনন্দ করছে। ধনী ব্যক্তি সুদ গ্রহণ করে গরীবদের প্রতি কেনা গোলামের ন্যায় ব্যবহার করছে। মনে হয়, কেবল তাদেরই খেদমত করার জন্য দুনিয়ায় এদের জন্ম হয়েছে।
এই বিশ্লেষণ থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, ‘কালিমায়ে তাইয়্যিবা’র প্রতি যারা ঈমান আনবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে একটি মজবুত বাণীর সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন। তারা অটল ও অক্ষয় হবে। আর তার মোকাবিলায় কালিমার বিপরীত যারা কাজ করবে, আল্লাহ তাদের সকল আয়োজন ও চেষ্টাকেই ব্যর্থ করে দেবেন। তারা কখনই কোনো সহজ কাজ করতে পারবে না। তা দ্বারা দুনিয়া কিংবা আখিরাতে তাদের কিছুমাত্র কল্যাণও সাধিত হতে পারে না।
এখন প্রশ্নঃ আমরা ‘কালিমায়ে তাইয়্যিবা’কে মানি; কিন্তু কোন কারণে আমাদের উন্নতি হয় না? আর যে কাফিরগণ কালিমার বিপরীত বিশ্বাস করে তারাই বা কোন কারণে এত শক্তিমান ও উন্নত হচ্ছে?
উত্তরঃ এ প্রশ্নের অবশ্যই সুন্দর উত্তর রয়েছে। তবে খুবই গভীরভাবে এবং ধৈর্যসহকারে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
আমরা কালিমায়ে তাইয়্যিবার প্রতি ঈমান এনেছি বলে দাবী করি এবং তবুও আমাদের উন্নতি হচ্ছে না, প্রথমত একথাটাই ঠিক নয়। কারণ কেবল মুখে মুখে। কালিমায়ে তাইয়্যিবা পড়লেই কোনো কাজ হয় না, তা মন দিয়ে পড়তে হবে। মন দিয়ে পড়ার অর্থ বিশ্বাস ও মতবাদের পরিবর্তন করা। এর বিরোধী কোনো মতবাদ যেন কালিমা বিশ্বাসী ব্যক্তির মনে স্থান না পায় এবং কালিমার নির্দেশের বিপরীত কোনো কাজও যেন সে কখনও না করে। কিন্তু আমাদের প্রকৃত অবস্থা কি এরূপ? আমাদের মধ্যে কি কালিমায়ে তাইয়্যিবার বিপরীত হাজারও কুফরি ও মুশরিকী ধারণা বর্তমান নেই? মুসলিমের মাথা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোও সামনে নত হয় না? মুসলিম আল্লাহ ছাড়া অন্য লোককে কি ভয় করে না? অন্যের সাহায্যের উপর কি ভরসা করে না? আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও কি তারা রিযিকদাতা বলে বিশ্বাস করে না? আল্লাহর আইনকে ছেড়ে দিয়ে তারা খুশী হয়েই কি অন্যের আইন অনুসরণ করে চলে না? মুসলিম হবার দাবীদার লোকেরা আদালতে গিয়ে পরিষ্কারভাবে বলে না যে, আমরা শরীয়াতের বিচার চাই না? আমরা দেশের প্রচলিত প্রথামত বিচার চাই?
আমাদের মধ্যে এমন কোনো লোক কি নেই, যারা দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ লাভের জন্য আল্লাহর আইন লংঘন করতে একটুও পরোয়া করে না? আমাদের মধ্যে এমন লোক কি নেই, যারা কাফিরদের ক্রোধের ভয়ে ভীত; কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ দৃষ্টি লাভ করার জন্য কিছুই করতে রাজী নয়? এমন লোকও কি নেই, যারা কাফিরদের রাজত্বকে ‘রাজত্ব বলে মনে করে, কিন্তু আল্লাহর রাজত্ব যে কোথাও বর্তমান আছে, সেই কথা তাদের একেবারেই মনে পড়ে না? এসব কথা কি সত্য নয়? যদি বাস্তবিকই সত্য হয়ে থাকে, তবে আমরা কালিমায়ে তাইয়্যিবাকে স্বীকার করি এবং তা সত্ত্বেও আমাদের উন্নতি হয় না একথা কোন মুখে বলতে পারি?
প্রথমে খাটি মনে ঈমান আনতে হবে এবং কালিমায়ে তাইয়্যিবা অনুসারে জীবনকে গঠন করতে হবে। তারপর যদি গভীর মাটির তলে মজবুত শিকড় ও শূন্য আকাশে বিস্তৃত শাখার সেই মহান গাছের জন্ম না হয়, তখন বলতে পারবো যে, আল্লাহ মিথ্যা ওয়াদা করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। পরন্তু কালিমায়ে অবিশ্বাসী লোক দুনিয়ায় খুবই উন্নতি লাভ করছে বলে মনে করাও সম্পূর্ণরূপে ভুল। কারণ কালিমায়ে অবিশ্বাসী যারা তারা প্রকৃত উন্নতি লাভ করতে পারে না; অতীতে কখনও পারেনি আর এখনও পারছে না। তাদের ধন-দৌলত, সুখ-শান্তি ও ফুর্তির জীবন, বিলাসিতা ও আনন্দের সাজ-সরঞ্জাম এবং বাহ্যিক শান শওকত দেখে আমরা হয়ত মনে করেছি যে, তারা আসলে বুঝি খুবই উন্নতি করছে। কিন্তু আমরা তাদের মনের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখি, তাদের মধ্যে কতজন লোক বাস্তবিকই শান্তিতে আছে? বিলাসিতা ও সুখের সরঞ্জাম তাদের প্রচুর আছে; কিন্তু মনের মধ্যে আগুনের উলকাপিণ্ড সবসময় দাউ দাউ করে জ্বলছে। এজন্যই তারা এক আল্লাহকে পেতে পারে না। আল্লাহর আইন অমান্য করার কারণে তাদের প্রত্যেকটি পরিবারে অশান্তি।
প্রতিনিয়ত নিউজ মিডিয়াতে দেখছি, ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানে আত্মহত্যার হাড় দিন দিন বাড়ছে। কত অসংখ্য তালাক দিন-রাত সংঘটিত হচ্ছে। দেশের সন্তান কিভাবে নষ্ট করা হচ্ছে এবং ওষুধ ব্যবহার করে জন্মের হার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। নানা প্রকার নতুন নতুন রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কিভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে খাদ্য নিয়ে কিভাবে টানাটানি ও কাড়াকাড়ি চলছে। হিংসা-দ্বেষ এবং শত্রুতা এক জাতীয় মানুষের মধ্যে কিভাবে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। বিলাসিতার লোভ মানুষের মধ্যে কিভাবে দিন দিন বাড়ছে। দুনিয়ার এসব বড় বড় চাকচিক্যময় শহরে দূর হতে দেখে যাকে আমরা স্বর্গের রাজ্য মনে করি- লক্ষ লক্ষ লোক কি দুঃখের জীবনযাপন করছে, তা ভাবলেও শরীর শিউরে ওঠে।... এটাকে কি কখনও উন্নতি বলে মনে করা যায়? এ ‘স্বর্গ’ পাবার জন্যই কি আমরা লালায়িত?
মনে রাখতে হবে, আল্লাহর বাণী কখনও মিথ্যা হতে পারে না। বাস্তবিকই কালিমায়ে তাইয়্যিবা ছাড়া আর কোনো ‘কালিমা’ এমন নেই, যা অনুসরণ করে মানুষ দুনিয়ায় সুখ এবং পরকালে মহাশান্তি লাভ করতে পারে। যে দিকে ইচ্ছে আমরা চোখ খুলে চেয়ে যদি দেখি, এ সত্যের বিপরীত আমরা কোথাও দেখতে পাবে না।
সেই আল্লাহর সামনে যখন আমি মাথা নত করবো, বিশ্বভুবনের প্রত্যেকটি জিনিসই আমার সাথে তারই সামনে ঝুঁকে পড়বে। কারণ, ...এ সমস্ত জিনিসও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে। আমি যখন তাঁরই হুকুম পালন করে চলবো, তখন আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই আমার সাথী হবে, কারণ এসবই যে একমাত্র তাঁরই অনুগত। আমি যখন তাঁর পথে চলতে শুরু করবো, তখন আমি একাকী হবো না, এ নিখিল জাহানের অগণিত ‘সৈন্য আমার সাথে চলতে আরম্ভ করবে। কারণ, আকাশের সূর্য হতে শুরু করে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম বস্তুকণা পর্যন্ত সর্বদা তাঁরই নির্ধারিত পথে চলছে। আমি যখন সেই এক আল্লাহর উপর নির্ভর করবো, তখন সামান্য শক্তির উপর নির্ভর করা হবে না- আমার ভরসা করা হবে এমন এক বিরাট শক্তির উপর, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত শক্তি ও ধন-সম্পদের একমাত্র মালিক।
মোটকথা, এ নিগুঢ় তত্ত্ব যদিও আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে চলি, তবে আমি ভালো করে জানতে পারবো যে, কালিমায়ে তাইয়্যিবার প্রতি ঈমান এনে যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে সেই আদর্শ অনুসারে গঠন করে নেবে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় শক্তিই তার সাহায্য কাজে নিযুক্ত হবে। দুনিয়ার জীবন হতে পরকাল পর্যন্ত সে কেবল উন্নতিই করতে থাকবে। তার কোনো চেষ্টাই ব্যর্থ হবে না, কোনো উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থাকতে পারবে না।
কালিমার সম্পূর্ণ বিপরীত মতবাদও রয়েছে যেমন, এ দুনিয়ার ইলাহ বা সৃষ্টিকর্তা কেউ নেই, কিংবা এ দুনিয়ায় একাধিক ইলাহ (প্রভু) রয়েছে। একটু চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারবো যে, তা অপেক্ষা বড় মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন কথা আর কিছুই হতে পারে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন। আমাদেরকে সেই আল্লাহই তো সৃষ্টি করেছেন। আর সে আল্লাহই আমাকে ঐ জিহ্বা দিয়েছেন যার দ্বারা আমি এতবড় একটা মিথ্যা কথা বলছি। মুশরিক বলে যে, আল্লাহ এক নয়, তাঁর সাথে আরও অনেক দেবদেবী রয়েছে। তারাও রিযিক দেয়, তারাও আমাদের মালিক, তারাও আমাদের ভাগ্য গড়তে ও ভাংগতে পারে। উপকার করা কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদেরও আছে। তোমাদের জিকির">দু’আ তারাও শুনতে পারে। তারাও তোমাদের ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারে, তাদেরকে ভয় করে চলা উচিত। তাদের উপর ভরসা করা যেতে পারে। দুনিয়া পরিচালনার ব্যাপারে তাদেরও হুকুম চলে। আল্লাহ ছাড়া তাদেরও হুকুম পালন করে চলা কর্তব্য (নাউযুবিল্লাহ)। এসবই কালিমার বিপরীত।
এখন ভেবে দেখি, এ কালিমা যে ব্যক্তি কবুল করবে এবং সে অনুসারে নিজের জীবনকে গঠন করবে, দুনিয়া ও আখিরাতে সে কেমন করে উন্নতি লাভ করতে পারে? আল্লাহ অনুগ্রহ করে এসব লোককে অবসর ও অবকাশ দিয়ে রেখেছেন। এবং রিযিক দেবারও ওয়াদা করেছেন। কাজেই আকাশ ও পৃথিবীর শক্তিগুলো কিছু না কিছু পরিমাণে তাদেরকে প্রতিপালন করবে- যেমন বন-জঙ্গলে আগাছা পরগাছগুলোকে করছে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো একটা জিনিসও আগ্রহ করে তাদেরকে সাহায্য করবে না এবং পূর্ণশক্তি দিয়ে তাদের সহায়তা করবে না। তারা ঠিক জঙ্গলের আগাছার মতই কিছুদিন মাত্র বেঁচে থাকতে পারবে তার বেশী নয়।
‘কালিমায়ে তাইয়্যিবা যখন ফল দান করবে, তখন তা খুবই মিষ্ট ও সুস্বাদুই হবে। দুনিয়ার বুকে তা দ্বারা শান্তি স্থাপিত হবে। চারদিকে সত্য ও পূর্ণ সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। নিখিল দুনিয়ার মানুষ তা দ্বারা অসাধারণ উপকার লাভ করতে পারবে। কিন্তু কালিমার বিপরীত শক্তি ও মতোবাদ যতই বৃদ্ধি পাবে, কেবল কাঁটায় ভরা-ডাল-পালাই তা হতে বের হবে। তিক্ত ও বিষাক্ত ফল তাতে ফলবে। এর শিরায় শিরায় বিষ ভরা থাকবে। নিজেদের চোখ দিয়েই আমরা তা দেখে নিতে পারবো। দুনিয়ার যেখানেই কুফরি, শিরক এবং নাস্তিকতার জোর বেশী, সেখানে কী হচ্ছে? সেখানে মানুষ মানুষের রক্ত ঝড়াচ্ছে। দেশের পর দেশ ধবংস করার আয়োজন খুব জোরের সাথেই চলছে। বিষাক্ত গ্যাস তৈরী হচ্ছে। এক জাতি অন্য জাতিকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ওঠেপড়ে লেগেছে। শক্তিমান দুর্বল ব্যক্তিগণকে নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছে তার ভাগের আহার কেড়ে নেবার জন্য শুধু দুর্বল মানুষকে সেখানে সৈন্য, পুলিশ, জেল ও ফাঁসির ভয় দেখিয়ে অবদমিত করে রাখার এবং শক্তিশালী জাতির যুলুম নীরবে সহ্য করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে।
এছাড়া এসব জাতির ভিতরের অবস্থা আরও ভয়ানক খারাপ। তাদের নৈতিক চরিত্র এতই কদর্য যে, স্বয়ং শয়তানও তা দেখে লজ্জা পায়। মানুষ সেখানে। জন্তু-জানোয়ার অপেক্ষাও হীনতর কাজ করছে। মায়েরা সেখানে নিজেদের হাতেই নিজেদের সন্তানকে হত্যা করছে- যেন এ সন্তান তাদের সুখ-সম্ভোগের পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে। স্বামীরা সেখানে নিজেদের স্ত্রীদেরকে অন্যের কোলে ঠেলে দিচ্ছে শুধু পরের স্ত্রীকে নিজের কাছে পাবার উদ্দেশ্যে। নুড ক্লাব তৈরী করা হয়েছে, সেখানে নারী-পুরুষ পশুর মতো উলংগ হয়ে আনন্দ করছে। ধনী ব্যক্তি সুদ গ্রহণ করে গরীবদের প্রতি কেনা গোলামের ন্যায় ব্যবহার করছে। মনে হয়, কেবল তাদেরই খেদমত করার জন্য দুনিয়ায় এদের জন্ম হয়েছে।
এই বিশ্লেষণ থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, ‘কালিমায়ে তাইয়্যিবা’র প্রতি যারা ঈমান আনবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে একটি মজবুত বাণীর সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন। তারা অটল ও অক্ষয় হবে। আর তার মোকাবিলায় কালিমার বিপরীত যারা কাজ করবে, আল্লাহ তাদের সকল আয়োজন ও চেষ্টাকেই ব্যর্থ করে দেবেন। তারা কখনই কোনো সহজ কাজ করতে পারবে না। তা দ্বারা দুনিয়া কিংবা আখিরাতে তাদের কিছুমাত্র কল্যাণও সাধিত হতে পারে না।
এখন প্রশ্নঃ আমরা ‘কালিমায়ে তাইয়্যিবা’কে মানি; কিন্তু কোন কারণে আমাদের উন্নতি হয় না? আর যে কাফিরগণ কালিমার বিপরীত বিশ্বাস করে তারাই বা কোন কারণে এত শক্তিমান ও উন্নত হচ্ছে?
উত্তরঃ এ প্রশ্নের অবশ্যই সুন্দর উত্তর রয়েছে। তবে খুবই গভীরভাবে এবং ধৈর্যসহকারে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
আমরা কালিমায়ে তাইয়্যিবার প্রতি ঈমান এনেছি বলে দাবী করি এবং তবুও আমাদের উন্নতি হচ্ছে না, প্রথমত একথাটাই ঠিক নয়। কারণ কেবল মুখে মুখে। কালিমায়ে তাইয়্যিবা পড়লেই কোনো কাজ হয় না, তা মন দিয়ে পড়তে হবে। মন দিয়ে পড়ার অর্থ বিশ্বাস ও মতবাদের পরিবর্তন করা। এর বিরোধী কোনো মতবাদ যেন কালিমা বিশ্বাসী ব্যক্তির মনে স্থান না পায় এবং কালিমার নির্দেশের বিপরীত কোনো কাজও যেন সে কখনও না করে। কিন্তু আমাদের প্রকৃত অবস্থা কি এরূপ? আমাদের মধ্যে কি কালিমায়ে তাইয়্যিবার বিপরীত হাজারও কুফরি ও মুশরিকী ধারণা বর্তমান নেই? মুসলিমের মাথা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোও সামনে নত হয় না? মুসলিম আল্লাহ ছাড়া অন্য লোককে কি ভয় করে না? অন্যের সাহায্যের উপর কি ভরসা করে না? আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও কি তারা রিযিকদাতা বলে বিশ্বাস করে না? আল্লাহর আইনকে ছেড়ে দিয়ে তারা খুশী হয়েই কি অন্যের আইন অনুসরণ করে চলে না? মুসলিম হবার দাবীদার লোকেরা আদালতে গিয়ে পরিষ্কারভাবে বলে না যে, আমরা শরীয়াতের বিচার চাই না? আমরা দেশের প্রচলিত প্রথামত বিচার চাই?
আমাদের মধ্যে এমন কোনো লোক কি নেই, যারা দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ লাভের জন্য আল্লাহর আইন লংঘন করতে একটুও পরোয়া করে না? আমাদের মধ্যে এমন লোক কি নেই, যারা কাফিরদের ক্রোধের ভয়ে ভীত; কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ দৃষ্টি লাভ করার জন্য কিছুই করতে রাজী নয়? এমন লোকও কি নেই, যারা কাফিরদের রাজত্বকে ‘রাজত্ব বলে মনে করে, কিন্তু আল্লাহর রাজত্ব যে কোথাও বর্তমান আছে, সেই কথা তাদের একেবারেই মনে পড়ে না? এসব কথা কি সত্য নয়? যদি বাস্তবিকই সত্য হয়ে থাকে, তবে আমরা কালিমায়ে তাইয়্যিবাকে স্বীকার করি এবং তা সত্ত্বেও আমাদের উন্নতি হয় না একথা কোন মুখে বলতে পারি?
প্রথমে খাটি মনে ঈমান আনতে হবে এবং কালিমায়ে তাইয়্যিবা অনুসারে জীবনকে গঠন করতে হবে। তারপর যদি গভীর মাটির তলে মজবুত শিকড় ও শূন্য আকাশে বিস্তৃত শাখার সেই মহান গাছের জন্ম না হয়, তখন বলতে পারবো যে, আল্লাহ মিথ্যা ওয়াদা করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। পরন্তু কালিমায়ে অবিশ্বাসী লোক দুনিয়ায় খুবই উন্নতি লাভ করছে বলে মনে করাও সম্পূর্ণরূপে ভুল। কারণ কালিমায়ে অবিশ্বাসী যারা তারা প্রকৃত উন্নতি লাভ করতে পারে না; অতীতে কখনও পারেনি আর এখনও পারছে না। তাদের ধন-দৌলত, সুখ-শান্তি ও ফুর্তির জীবন, বিলাসিতা ও আনন্দের সাজ-সরঞ্জাম এবং বাহ্যিক শান শওকত দেখে আমরা হয়ত মনে করেছি যে, তারা আসলে বুঝি খুবই উন্নতি করছে। কিন্তু আমরা তাদের মনের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখি, তাদের মধ্যে কতজন লোক বাস্তবিকই শান্তিতে আছে? বিলাসিতা ও সুখের সরঞ্জাম তাদের প্রচুর আছে; কিন্তু মনের মধ্যে আগুনের উলকাপিণ্ড সবসময় দাউ দাউ করে জ্বলছে। এজন্যই তারা এক আল্লাহকে পেতে পারে না। আল্লাহর আইন অমান্য করার কারণে তাদের প্রত্যেকটি পরিবারে অশান্তি।
প্রতিনিয়ত নিউজ মিডিয়াতে দেখছি, ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানে আত্মহত্যার হাড় দিন দিন বাড়ছে। কত অসংখ্য তালাক দিন-রাত সংঘটিত হচ্ছে। দেশের সন্তান কিভাবে নষ্ট করা হচ্ছে এবং ওষুধ ব্যবহার করে জন্মের হার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। নানা প্রকার নতুন নতুন রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কিভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে খাদ্য নিয়ে কিভাবে টানাটানি ও কাড়াকাড়ি চলছে। হিংসা-দ্বেষ এবং শত্রুতা এক জাতীয় মানুষের মধ্যে কিভাবে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। বিলাসিতার লোভ মানুষের মধ্যে কিভাবে দিন দিন বাড়ছে। দুনিয়ার এসব বড় বড় চাকচিক্যময় শহরে দূর হতে দেখে যাকে আমরা স্বর্গের রাজ্য মনে করি- লক্ষ লক্ষ লোক কি দুঃখের জীবনযাপন করছে, তা ভাবলেও শরীর শিউরে ওঠে।... এটাকে কি কখনও উন্নতি বলে মনে করা যায়? এ ‘স্বর্গ’ পাবার জন্যই কি আমরা লালায়িত?
মনে রাখতে হবে, আল্লাহর বাণী কখনও মিথ্যা হতে পারে না। বাস্তবিকই কালিমায়ে তাইয়্যিবা ছাড়া আর কোনো ‘কালিমা’ এমন নেই, যা অনুসরণ করে মানুষ দুনিয়ায় সুখ এবং পরকালে মহাশান্তি লাভ করতে পারে। যে দিকে ইচ্ছে আমরা চোখ খুলে চেয়ে যদি দেখি, এ সত্যের বিপরীত আমরা কোথাও দেখতে পাবে না।