hadith book logo

ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৫

কালিমার দুটি অংশ

এ কালিমার দু'টি অংশ অর্থাৎ দুটি আলাদা আলাদা বাক্য। একাংশে বলা হয়েছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এই অংশে অন্যের নয়, শুধু মাত্র আল্লাহরই সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয় এবং অপর অংশে বলা হয়েছে মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ এই অংশে স্বীকার করা হয় এবং যে মুহাম্মাদই ও তাঁর পাঠানো Appointed Authority. যেসব ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর রসূল (ﷺ) -কে ক্ষমতা প্রদান করেছেন সে সব ক্ষেত্রে অন্যের কিছুই বলার অধিকার নেই।

যেমন কোর্টের জাজ- যাকে সরকার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন একমাত্র তারই অধিকার রয়েছে কোন মামলার বিচার করার আর কারও সে অধিকার নেই, ঠিক তেমনই রসূল (ﷺ) -কে আল্লাহ যেহেতু হাকিম নিযুক্ত করেছেন, কাজেই কোন ব্যাপারে আল্লাহর রসূল (ﷺ) -ই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, অন্যরা নয়।

আমি যদি কোন আসামীর জামীনের জন্যে কোর্টের কোন জাজের নিকট দরখাস্ত পেশ করি তাহলে সেই দরখাস্তে জামিন মঞ্জুরের ক্ষমতা যেমন জাজ বা সরকারের নিয়োজিত Authority ভিন্ন অন্য কারও নেই, ঠিক তেমনই মানুষের জীবনযাপন কোন্ নিয়মে চলবে, মানুষের কোন্ অপরাধের কী শাস্তি হবে ইত্যাদির ব্যাপারে ব্যবস্থা প্রনয়ণকারী ও হাকিম হিসেবে যিনি আল্লাহর নিকট থেকে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়েছেন, একমাত্র তিনিই দিতে পারেন জীবন ব্যবস্থা, অন্যেরা নয়। এটাই স্বীকারোক্তি রয়েছে এ কালিমার শেষাংশে।

এখন মানুষ যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে মানে তাহলে যেমন আল্লাহর উলুহিয়াতে (প্রভুত্বে) শরীক করা হয় তেমন কেউ যদি জীবন ব্যবস্থা রচয়িতা হিসেবে কাউকে মানে তা সে মাওসেতুং হোক, কার্ল মার্কস হোক বা X Y Z যেই হোক না, অন্য কাউকে জীবন ব্যবস্থার রচয়িতা হিসেবে মানলেই রসূলের রিসালাতিতে তাদেরকে শরীক করা হয়।

আল্লাহ বলেন : “তুমি কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে দিয়ে বুঝিয়েছেন? কালিমা তাইয়্যিবা একটি পবিত্র বলিষ্ঠ উত্তম বৃক্ষ যেন এর মূল (মাটির গভীরে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং এর শাখা-প্রশাখা মহাশূন্যে (বিস্তীর্ণ)। এটা সব সময় তার মালিকের অনুমতিক্রমে স্বীয় ফল প্রদান করতে থাকে।” (সূরা ইবরাহীম ১৪ : ২৪-২৫)

কালিমা তাইয়্যিবা ইসলামের মূল ঘোষণা। এটা না পড়ে কোন মানুষই ইসলামের সীমার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। এ জন্যই কোন কাফির অথবা মুশরিক ব্যক্তি যখন ইসলাম কবুল করতে চায়, তখন সর্বপ্রথমই তাকে এ কালিমা পড়তে হয়। মুসলিমদের ঘরে কোন সন্তানের জন্ম হলেও এ কারণে তাকে সর্বপ্রথম এ কালিমার আওয়াজ শুনানো হয়। মুসলিমদের এলাকায় এলাকায় দিন-রাতের মধ্যে পাঁচ বার মুয়াজ্জিন এ কালিমা উচ্চস্বরে ঘোষণা করে সকলকে সলাতের দিকে আহ্বান জানায়। সলাতের মধ্যে এ কালিমা বারবার পড়তে হয়। কুরআন শরীফের পাতায় পাতায় এ কালিমার কথা নানাভাবে লিখা আছে। ইসলামে এ কালিমার গুরুত্ব যে কতখানি, এর দ্বারাই তা বুঝা যায়। অতএব প্রত্যেকটি মুসলিমের পক্ষেই এ কালিমার অর্থ খুব ভাল করে জেনে নেয়া অত্যন্ত আবশ্যক।

বীজ বপন না করলে যেমন গাছ হতে পারে না, তেমনি এ কালিমা মানুষের হৃদয়-মনে ভাল করে শিকড় গাড়তে না পারলে মানুষের জীবন ক্ষেত্রে ইসলামের গাছ কিছুতেই জন্মাতে পারে না। বীজ বপন করলেই গাছ হয় এবং সে গাছের যেমন কাণ্ড, ডাল-পালা এবং ফুল ও ফল হয়ে থাকে, তেমনি মুসলিমগণ এ কালিমার অর্থ খুব ভাল করে বুঝে-শুনে তা মনে-প্রাণে গ্রহণ না করলে ইসলামের এ সলাত, যাকাত, সিয়াম ও হাজ্জ আদায় করা, হারাম হালাল বেছে চলা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাপারে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লক্ষ্য করে কাজ করা প্রভৃতি গুণাবলী মুসলিমদের জীবনে কিছুতেই পরিপূর্ণরূপে ফুটে উঠতে পারে না।

আমি যদি কারো সাথে কোন ব্যবসা করি- তা যে কোন ব্যবসাই হোক না কেন- তবে প্রথমেই আমাকে তার সাথে পাকাপাকিভাবে একটি agreement করে নিতে হয়; নতুবা ব্যবসায় ঝামেলা হতে পারে। আমি যদি কাউকে কোন টাকা-পয়সা ধার দেই, তবে প্রথমে আমি তার দ্বারা এ কথা স্বীকার করিয়ে নেই যে, টাকা নিয়ে সে ঠিক সময়মত পরিশোধ করবে এবং একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে পরিশোধ করে দিবে। সর্বোপরি, টাকা নিয়ে তা সে কখনও অস্বীকার করবে না ইত্যাদি। এ সব কথা সে যদি স্বীকার করে তবেই আমি তাকে টাকা ধার দেবো; নতুবা আমি কিছুতেই টাকা ধার দেবো না।

আমি যদি আমার জমি কাউকেও চাষ করতে দেই, তবে তার সাথেও আমার প্রয়োজনীয় এগ্রিমেন্ট আগেই করে নিতে হয়। আমি নিজে যদি কারও জমি চাষাবাদ বা ভোগ-ব্যবহার করতে চাই, তবে আমাকে জমির মালিকের শর্ত স্বীকার করে deed of agreement-এ সাইন করতে হয়। ঠিক এরূপই, মুসলিমকে সমস্ত জীবনব্যাপী যে আল্লাহর সঙ্গে কারবার করতে হয়, এ কালিমা পড়ে সেই আল্লাহর সঙ্গেই জীবনের সমস্ত কাজের বিষয়ে কথাবার্তা পাকা করে নিতে হয়। দলিলে কী লেখা হয়েছে, তা না জেনেই যদি আমি তাতে সাক্ষর করে দেই, তবে সে দলিলের কোন কোন শর্ত স্বীকার করে আমি সাক্ষর করেছি, তা আমি জানি না। ফলে আমার কাজকর্ম সে দলিলের শর্তের বিরুদ্ধে যেতে পারে।

এরূপেই, আমি কালিমা তাইয়্যিবা পড়ে ইসলামের সীমার মধ্যে আসলাম, নিজেকে মুসলিম ও আল্লাহর দাস’ বলে মনে করলাম; কিন্তু আমি জানলাম না যে, কালিমা পড়ে আমি কোন কোন কাজ করবো বলে স্বীকার করেছি আর কোন কোন কাজ করবো না বলে ওয়াদা করেছি। এরূপ অবস্থা হলে আমার কালিমা পাঠ করার কোনই মূল্য থাকে না। আমার এ কালিমা পড়া আল্লাহর নিকট কবুল না-ই হওয়ার কথা। এভাবে আমি প্রকৃত মুসলিম ও ‘আল্লাহর বান্দা হতে পারি না। আমার জীবনের কোন কাজই সে কালিমা অনুসারে সমাধা হতে পারে না।