hadith book logo

ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪২

নবীর কাজ

নবীগণ দুনিয়ায় আসেন আল্লাহর বিধান নিয়ে। তাঁদের আসার একমাত্র উদ্দেশ্য এ যে, যারা কালিমা তাইয়্যিবার প্রথম অংশ- “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বিশ্বাস করে আল্লাহর একচ্ছত্র প্রভুত্ব স্বীকার করবে, তারা যেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীদের প্রদর্শিত নিয়মে এ পন্থায় কাজ করে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারে। নবীগণ নিজেরাই আল্লাহর বিধান মত কাজ করে মানুষকে দেখিয়ে দেন। তাঁরাই ভাল করে জানেন আল্লাহর বিধান কী এবং কোন নিয়মে জীবনযাপন করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। নবীগণ ছাড়া মানুষের মধ্যে কেউই তা জানতে পারে। কাজেই সর্বসাধারণ মানুষের কর্তব্য ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বিশ্বাস করার পর নবীদের প্রতি ঈমান আনা, পরিপূর্ণরূপে নবীদের আনুগত্য স্বীকার করা এবং আরও একটু অগ্রসর হয়ে ঘোষণা করা- ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'- মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। ঠিক এই কারণে প্রত্যেক নারীই যেমন দুনিয়ায় আল্লাহর প্রভুত্ব ও তাওহীদের বাণী প্রচার করেছেন এবং তেমনি লোকদের নিকট তাঁদের নিজেদের আনুগত্যের দাবি করেছেন।

“আমি তোমাদের প্রতি (আল্লাহর) বিশ্বস্ত নবী, অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মানো ও অনুসরণ কর।” (সূরা শু'আরা ২৬ : ১০৭ ও ১০৮)

‘বিশ্বস্ত নবী” অর্থ দুনিয়ার মানুষের জন্য আল্লাহ যে বিধান তাঁর নিকট পাঠিয়েছেন, তা তিনি যথাযথভাবে লোকদের নিকট পৌঁছিয়েছেন এবং বাস্তবে তা অনুসরণ ও পালন করে দেখিয়েছেন। এই আমানতদারীতে তিনি একবিন্দু খিয়ানত বা বিশ্বাসভঙ্গের কাজ করেন নাই। আল্লাহ নিজেও প্রত্যেক নারীর পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করার সুস্পষ্ট আদেশ ও অনুমতি দিয়েছেন :

من يطع الرسول فق أطاع الله ومن تولى ما أ نا عليهم حفيظا

“আল্লাহর আনুগত্য কর ও রসূলের আনুগত্য কর। এবং যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করে সে ঠিক আল্লাহরই আনুগত্য করে।” (সূরা নিসা ৪ : ৮০)।

কারণ নবীগণ (আলাইহিস সালাম) নিজেদের ইচ্ছেমত বা অন্য কারও আদেশ মত কিছুই করেন না। আল্লাহর নিকট হতে যখন যে আদেশ নাযিল হয়, সর্বপ্রথম নবী তাই নিজের কাজের ভিতর দিয়ে বাস্তবায়িত করেন।

إن أثبع إلا ما يوحي إلي

“আমার প্রতি যে ওহী নাযিল করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি, সেটা ভিন্ন আর কিছুই আমি করি না।” (সূরা আন'আম ৬ : ৫০)

এই কারণেই আল্লাহ সর্বশেষ নবী ও রসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) -কে সর্বোত্তম আদর্শ ও অনুসরণীয় নেতা করে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। বলেছেন :

“নিঃসন্দেহে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের ব্যক্তিত্ব সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা করে এবং খুব বেশী করে আল্লাহর স্মরণ করে।” (সূরা আহযাব ৩৩ : ২১)

এসব আয়াত হতে একথা পরিষ্কাররূপে বুঝতে পারা যায় যে, সত্যিকারভাবে। আল্লাহর ইবাদত এবং একান্তভাবে তাঁর আনুগত্য করার পথ হচ্ছে জীবনের প্রতিটি কাজে কেবল নবীগণের অনুসরণ করা এবং দুনিয়ার আল্লাহদ্রোহী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করা। বস্তুত নবীর আনুগত্যই হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তব রূপ।

শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বিধান আল কুরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করেছেন এবং দেখিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী একজন মুসলিমকে কিভাবে জীবনযাপন করতে হয়। এই কুরআনের ব্যাখ্যা তিনিই দিয়ে গিয়েছেন মুখের কথা ও বাস্তব কাজ দ্বারা। এর পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত বর্ণনা সুসংরক্ষিত রয়েছে দুনিয়ার মুসলিমদের নিকট হাদীস বা সুন্নাতের মাধ্যমে। এই কুরআনের বিধান অনুযায়ী গঠিত লোকদের এক আদর্শ সমাজও তিনি রেখে গিয়েছেন। এই আদর্শ সমাজও দুনিয়ার মানুষের জন্য রসূলের উপস্থাপিত আদর্শের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে পূর্ণ শুভ্রতা সহকারে। তাই মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর নবুয়াত ও রিসালাত শাশ্বত ও চিরন্তন।

তাই কালিমার প্রথম অংশের সাথে শেষ অংশ মিলিয়ে যখন আমরা পড়ি- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ”, তখন আমরা যেমন বলি যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাকেও প্রভু ও আইনদাতা বলে মানি না, আল্লাহ ছাড়া আর কাকেও প্রভুত্ব, নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী ও আইনদাতা স্বীকার করি না, সে সঙ্গে আমরা একথাও ঘোষণা করি যে, আল্লাহর যে আইন-বিধান, জীবনযাপন প্রণালী এবং আল্লাহকে পাওয়ার যে পন্থা ও পদ্ধতি শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) প্রচার করেছেন আমরা কেবল তাই মানি, তাই অনুসরণ করি; তা ছাড়া অন্য কিছু মানতে আমরা মাত্রই প্রস্তুত নই, কেননা তিনিই আমাদের চিরকালীন অনুসরণীয় নেতা।

এখানে পরিষ্কার করে জেনে নেয়া দরকার যে, যে ব্যক্তি জীবনের সমস্ত ব্যাপারে কেবল আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের হেদায়েত মেনে কাজ করে, প্রকৃতপক্ষে সে-ই খাঁটি ও আসল মুসলিম বলে বিবেচিত হতে পারে অন্য কেউ নয়। প্রকৃতপক্ষে কালিমা তাইয়্যিবা -

প্রথমত একটি বিপ্লবী আকীদা ও বিশ্বাস, চিন্তা ও মতবাদ মাত্র।

দ্বিতীয় স্তরে এটি বাস্তব কর্ম জীবনের আদর্শ ও চরিত্র গঠনের মৌলিক মানদণ্ড।

তৃতীয় স্তরে এটি আন্দোলনের মূল দাওয়াত এবং জন-সংগঠন ও সমাজ-সংশোধনের হাতিয়ার।

চতুর্থ স্তরে এটি একটি বিপ্লব, একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজের ভিত্তি, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও সরকারী নীতি নির্ধারণের মূলনীতি, ভিন্নতর জাতি ও রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের স্থায়ী মাপকাঠি।

শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর জীবনাদর্শ ও কর্মধারা হতে এ কথার সত্যতা অনস্বীকার্যরূপে প্রমাণিত হয়। তাই কালিমার এ মর্যাদা ও ধারণাকে যথার্থরূপে বজায় রাখা ও এরূপ ক্রমিক ধারার ভিত্তিতে একে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া এবং সে জন্য চেষ্টা করাই কালিমা বিশ্বাসী লোকদের কর্তব্য।