১
সূরা আলে ইমরান
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১০২
আয়াত : ১৮৬ – ১৮৮ কাফিরদের পক্ষ আগত প্রতিরোধ সম্পর্কে আল্লাহর সতর্কবাণী
لَتُبْلَوُنَّ فِيْۤ اَمْوَالِكُمْ وَاَنْفُسِكُمْ۫ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِيْنَ اَشْرَكُوْاۤ اَذًى كَثِيْرًاؕ وَّاِنْ تَصْبِرُوْا وَتَتَّقُوْا فَاِنَّ ذٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْاُمُوْرِ (১৮৬) وَاِذْ اَخَذَ اللهُ مِيْثَاقَ الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّه لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُوْنَه ۚ فَنَبَذُوْهُ وَرَآءَ ظُهُوْرِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِه ثَمَنًا قَلِيْلًاؕ فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُوْنَ (১৮৭) لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ يَفْرَحُوْنَ بِمَاۤ اَتَوْا وَّيُحِبُّوْنَ اَنْ يُّحْمَدُوْا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوْا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِۚ وَلَهُمْ عَذَابٌ اَلِيْمٌ (১৮৮)
শাব্দিক অনুবাদ
১৮৬. لَتُبْلَوُنَّ অবশ্যই তোমরা পরীক্ষিত হবে فِيْۤ দ্বারা اَمْوَالِكُمْ তোমাদের ধন-সম্পদ وَاَنْفُسِكُمْ ও তোমাদের জীবনসমূহের وَلَتَسْمَعُنَّ আর অবশ্যই শুনতে হবে مِنَ (তাদের পক্ষ) হতে اَلَّذِيْنَ যাদেরকে اُوْتُوا দেয়া হয়েছে اَلْكِتَابَ কিতাব مِنْ قَبْلِكُمْ তোমাদের পূর্বে وَمِنَ (তাদের পক্ষ) হতে اَلَّذِيْنَ যারা اَشْرَكُوْاۤ শিরক করেছে اَذًى কষ্টকর কথা كَثِيْرًا অনেক। وَاِنْ আর যদি تَصْبِرُوْا তোমরা ধৈর্যধারণ কর وَتَتَّقُوْا ও (আল্লাহকে) ভয় কর, فَاِنَّ তবে অবশ্যই ذٰلِكَ তা হবে مِنْ عَزْمِ الْاُمُوْرِ সুদৃঢ় কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত।
১৮৭. وَاِذْ আর যখন اَخَذَ গ্রহণ করলেন اَللهُ আল্লাহ مِيْثَاقَ অঙ্গীকার اَلَّذِيْنَ যাদেরকে اُوْتُوا দেয়া হয়েছে اَلْكِتَابَ কিতাব لَتُبَيِّنُنَّهٗ অবশ্যই তোমরা এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে لِلنَّاسِ মানুষের নিকট وَلَا تَكْتُمُوْنَه এবং তোমরা তা গোপন করবে না فَنَبَذُوْهُ কিন্তু তারা এটা নিক্ষেপ করল وَرَآءَ ظُهُوْرِهِمْ তাদের পশ্চাতে وَاشْتَرَوْا এবং তারা বিক্রি করে দিল بِه তা দ্বারা ثَمَنًا মূল্যে قَلِيْلًا সামান্য। فَبِئْسَ আর কতই না নিকৃষ্টতর مَا যা يَشْتَرُوْنَ তারা বিক্রি করেছিল ।
১৮৮. لَا تَحْسَبَنَّ তুমি কখনো মনে করো না, اَلَّذِيْنَ (তাদের ব্যাপারে) যারা يَفْرَحُوْنَ আনন্দিত হয় بِمَاۤ ঐ কারণে যা اَتَوْا তারা নিজেরা করেছে وَيُحِبُّوْنَ এবং তারা ভালোবাসে اَنْ যে, يُحْمَدُوْا তারা প্রশংসিত হবে بِمَا ঐ কারণে যা لَمْ يَفْعَلُوْا তারা নিজেরা করেনি فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ অতএব তুমি তাদের ব্যাপারে কখনো ধারণা করো না بِمَفَازَةٍ মুক্তির ব্যাপারে مِنَ الْعَذَابِ শাস্তি থেকে। وَلَهُمْ (মূলত) তাদের জন্য রয়েছে عَذَابٌ শাস্তি اَلِيْمٌ যন্ত্রণাদায়ক।
সরল অনুবাদ
১৮৬. (হে ঈমানদারগণ!) অবশ্যই তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের জীবনসমূহের দ্বারা পরীক্ষিত হবে এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে ও যারা শিরক করেছে, তাদের পক্ষ হতে তোমাদেরকে বহু কষ্টকর কথা শুনতে হবে। (এমতাবস্থায়) যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো ও (আল্লাহকে) ভয় করো, তবে অবশ্যই তা হবে সুদৃঢ় কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত। [এখানে ঈমানদারদেরকে এমন একটি বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, তারা দুনিয়াতে পরিপূর্ণ ঈমানের উপর চলতে গেলে অনেক কষ্ট ও কঠিন বিপদের সম্মুখীন হবে। একদিকে তারা আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষিত হবে এবং অপরদিকে তারা শয়তান ও তার অনুচরদের পক্ষ হতে আগত কষ্টের দ্বারাও পরীক্ষিত হবে। এমনকি কখনো কখনো এমন কিছু কথা শুনতে হবে, যা মানসিকভাবে যে কোন মানুষকে ঘায়েল করে ফেলে। অতএব এই প্রতিটি পরিস্থিতিতে মুমিনদের জন্য আবশ্যক হলো- আল্লাহকে ভয় করা এবং যথাযথভাবে ধৈর্যধারণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা।]
১৮৭. (স্মরণ করো) যখন আল্লাহ কিতাবধারীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, নিশ্চয় তোমরা এটা (কিতাবের বিষয়সমূহ) মানুষের নিকট স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না; কিন্তু তারা এটা তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং তা সামান্য মূল্যে বিক্রি করে দিল। [এখানে আহলে কিতাবদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে। কেননা ইতিপূর্বে আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে বনী ইসরাঈল থেকে এ ধরনের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁর কিতাবে যা কিছু লিপিবদ্ধ আছে, সেগুলো যথাযথভাবে মানুষের কাছে বর্ণনা করবে এবং এর কোন কিছুই গোপন করবে না। বিশেষ করে এখানে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো আছে, সেগুলোও গোপন করবে না। বর্তমানে তাদের কাছে বাইবেল নামে যে কিতাব রয়েছে, তাতে এর স্বপক্ষে অনেক প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। অবশেষে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নবুওয়াত নিয়ে আগমন করলেন, তখন তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে নবী ও রাসূল হিসেবে চেনার পরও দুনিয়ার অন্যান্য তুচ্ছ স্বার্থের কারণে নিজেদের সেই অঙ্গীকারের মধ্যে আর টিকে থাকতে পারল না। ফলে নিজেদের স্বার্থে তাওরাতের অনেক বিধান গোপন করতে শুরু করল। ফলে আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। সেই সাথে অত্র আয়াত দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদীর ঐসব আলেম সমাজকেও সতর্ক করে দেন, যারা নিজেদের সুবিধার্থে আল্লাহ তা‘আলার অনেক বিধান মানুষের কাছে বর্ণনা করতে চায় না বা করে না। বিনিময়ে তারা দ্বীনের মধ্যে এমন কিছুর প্রবেশ ঘটায়, যার দ্বারা মানুষ ক্রমেই বিভ্রান্তের মধ্যে পতিত হয়।] আর তারা যা বিক্রি করেছিল তা কতই না নিকৃষ্টতর।
১৮৮. যারা (নিজেরা) যা করেছে তাতে আনন্দ প্রকাশ করে এবং যা নিজেরা করেনি এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে ভালোবাসে তুমি কখনো মনে করো না যে, তারা শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। (মূলত) তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন, তখন কিছু সংখ্যক মুনাফিক ঘরে বসে থাকত এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বেরিয়ে যাওয়ার পর বসে থাকতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করত। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফিরে আসলে তাঁর কাছে শপথ করে ওজর পেশ করত এবং যে কাজ করেনি, সে কাজের জন্য প্রশংসিত হতে পছন্দ করত। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে তাদের গোমরাহী ফাঁস করে দেন। (সহীহ বুখারী, হা/৪৫৬৭) এখানে ঐসব লোকের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা কেবল লোক দেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ভালো আমল করে থাকে। তাদের ভালো-মন্দ সব ধরনের কাজের পেছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করা। শুধু তাই নয়, এসব লোক এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতেও ভালোবাসে, যা সে করেনি অথবা তার দ্বারা সংঘটিত হয়নি। উপরন্তু তারা অন্যের কৃতিত্বকে নিজেরা জবরদখল করে নিতেও ভালোবাসে। প্রকৃতপক্ষে এগুলোই হচ্ছে মুনাফিকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যার পরিপূর্ণ প্রতিফলন ইহুদীদের মধ্যে ছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ঘোষণা করেছেন। অতএব কারো দ্বারা অনেক বড় বড় উত্তম কাজ সংঘটিত হতে দেখে, তা নিজেদের আমলের সাথে তুলনা করে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না এবং এটাও ধারণা করা যাবে না যে, তারা তাদের ঐসব কর্মের কারণে অধিক সওয়াব পাবে এবং আমার এই তুচ্ছ কাজের জন্য সামান্য সওয়াব লাভ করব। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মূলত মানুষের কর্ম থেকে তাদের নিয়তের দিকটি বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। যার নিয়তের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিবে, সে সর্বক্ষেত্রেই কম পুরস্কার পাবে- যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমলের পরিমাণ অনেক বেশি দেখায়। অনুরূপভাবে যার নিয়তের মধ্যে পরিপূর্ণতা থাকবে, সে সর্বক্ষেত্রেই বেশি পুরস্কার অর্জন করতে সক্ষম হবে- যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমলের পরিমাণ অতি সামান্য মনে হয়।]
আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
ধন-সম্পদ ও জীবনের নানা ধরণের কষ্ট আল্লাহর পক্ষ হতে মুমিনদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।
ঈমানের উপর থাকলে বিরোধীদের পক্ষ হতে অনেক সমালোচনা ও কষ্টের স্বীকার হতে হয়।
বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে।
আহলে কিতাবের লোকেরা আল্লাহর কিতাবের নির্দেশসমূহকে মান্য করত না এবং তাতে বিকৃত ঘটিয়েছিল।
আল্লাহর কিতাবের বাণীসমূহ প্রচার করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অতীব জরুরি।
আল্লাহর কোন বাণীকে বিকৃত করা যাবে না।
নিজের পাপকর্মের জন্য আনন্দিত হওয়া যাবে না।
অন্যের কর্মের দ্বারা প্রশংসা অর্জনের চিন্তা করা উচিত নয়।
দুনিয়াতে কেউ প্রশংসিত হলেই পরকালে সে মুক্তি পেয়ে যাবে- এরূপ ধারণা করা ঠিক নয়।
শাব্দিক অনুবাদ
১৮৬. لَتُبْلَوُنَّ অবশ্যই তোমরা পরীক্ষিত হবে فِيْۤ দ্বারা اَمْوَالِكُمْ তোমাদের ধন-সম্পদ وَاَنْفُسِكُمْ ও তোমাদের জীবনসমূহের وَلَتَسْمَعُنَّ আর অবশ্যই শুনতে হবে مِنَ (তাদের পক্ষ) হতে اَلَّذِيْنَ যাদেরকে اُوْتُوا দেয়া হয়েছে اَلْكِتَابَ কিতাব مِنْ قَبْلِكُمْ তোমাদের পূর্বে وَمِنَ (তাদের পক্ষ) হতে اَلَّذِيْنَ যারা اَشْرَكُوْاۤ শিরক করেছে اَذًى কষ্টকর কথা كَثِيْرًا অনেক। وَاِنْ আর যদি تَصْبِرُوْا তোমরা ধৈর্যধারণ কর وَتَتَّقُوْا ও (আল্লাহকে) ভয় কর, فَاِنَّ তবে অবশ্যই ذٰلِكَ তা হবে مِنْ عَزْمِ الْاُمُوْرِ সুদৃঢ় কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত।
১৮৭. وَاِذْ আর যখন اَخَذَ গ্রহণ করলেন اَللهُ আল্লাহ مِيْثَاقَ অঙ্গীকার اَلَّذِيْنَ যাদেরকে اُوْتُوا দেয়া হয়েছে اَلْكِتَابَ কিতাব لَتُبَيِّنُنَّهٗ অবশ্যই তোমরা এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে لِلنَّاسِ মানুষের নিকট وَلَا تَكْتُمُوْنَه এবং তোমরা তা গোপন করবে না فَنَبَذُوْهُ কিন্তু তারা এটা নিক্ষেপ করল وَرَآءَ ظُهُوْرِهِمْ তাদের পশ্চাতে وَاشْتَرَوْا এবং তারা বিক্রি করে দিল بِه তা দ্বারা ثَمَنًا মূল্যে قَلِيْلًا সামান্য। فَبِئْسَ আর কতই না নিকৃষ্টতর مَا যা يَشْتَرُوْنَ তারা বিক্রি করেছিল ।
১৮৮. لَا تَحْسَبَنَّ তুমি কখনো মনে করো না, اَلَّذِيْنَ (তাদের ব্যাপারে) যারা يَفْرَحُوْنَ আনন্দিত হয় بِمَاۤ ঐ কারণে যা اَتَوْا তারা নিজেরা করেছে وَيُحِبُّوْنَ এবং তারা ভালোবাসে اَنْ যে, يُحْمَدُوْا তারা প্রশংসিত হবে بِمَا ঐ কারণে যা لَمْ يَفْعَلُوْا তারা নিজেরা করেনি فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ অতএব তুমি তাদের ব্যাপারে কখনো ধারণা করো না بِمَفَازَةٍ মুক্তির ব্যাপারে مِنَ الْعَذَابِ শাস্তি থেকে। وَلَهُمْ (মূলত) তাদের জন্য রয়েছে عَذَابٌ শাস্তি اَلِيْمٌ যন্ত্রণাদায়ক।
সরল অনুবাদ
১৮৬. (হে ঈমানদারগণ!) অবশ্যই তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের জীবনসমূহের দ্বারা পরীক্ষিত হবে এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে ও যারা শিরক করেছে, তাদের পক্ষ হতে তোমাদেরকে বহু কষ্টকর কথা শুনতে হবে। (এমতাবস্থায়) যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো ও (আল্লাহকে) ভয় করো, তবে অবশ্যই তা হবে সুদৃঢ় কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত। [এখানে ঈমানদারদেরকে এমন একটি বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, তারা দুনিয়াতে পরিপূর্ণ ঈমানের উপর চলতে গেলে অনেক কষ্ট ও কঠিন বিপদের সম্মুখীন হবে। একদিকে তারা আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষিত হবে এবং অপরদিকে তারা শয়তান ও তার অনুচরদের পক্ষ হতে আগত কষ্টের দ্বারাও পরীক্ষিত হবে। এমনকি কখনো কখনো এমন কিছু কথা শুনতে হবে, যা মানসিকভাবে যে কোন মানুষকে ঘায়েল করে ফেলে। অতএব এই প্রতিটি পরিস্থিতিতে মুমিনদের জন্য আবশ্যক হলো- আল্লাহকে ভয় করা এবং যথাযথভাবে ধৈর্যধারণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা।]
১৮৭. (স্মরণ করো) যখন আল্লাহ কিতাবধারীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, নিশ্চয় তোমরা এটা (কিতাবের বিষয়সমূহ) মানুষের নিকট স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না; কিন্তু তারা এটা তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং তা সামান্য মূল্যে বিক্রি করে দিল। [এখানে আহলে কিতাবদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে। কেননা ইতিপূর্বে আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে বনী ইসরাঈল থেকে এ ধরনের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁর কিতাবে যা কিছু লিপিবদ্ধ আছে, সেগুলো যথাযথভাবে মানুষের কাছে বর্ণনা করবে এবং এর কোন কিছুই গোপন করবে না। বিশেষ করে এখানে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো আছে, সেগুলোও গোপন করবে না। বর্তমানে তাদের কাছে বাইবেল নামে যে কিতাব রয়েছে, তাতে এর স্বপক্ষে অনেক প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। অবশেষে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নবুওয়াত নিয়ে আগমন করলেন, তখন তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে নবী ও রাসূল হিসেবে চেনার পরও দুনিয়ার অন্যান্য তুচ্ছ স্বার্থের কারণে নিজেদের সেই অঙ্গীকারের মধ্যে আর টিকে থাকতে পারল না। ফলে নিজেদের স্বার্থে তাওরাতের অনেক বিধান গোপন করতে শুরু করল। ফলে আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। সেই সাথে অত্র আয়াত দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদীর ঐসব আলেম সমাজকেও সতর্ক করে দেন, যারা নিজেদের সুবিধার্থে আল্লাহ তা‘আলার অনেক বিধান মানুষের কাছে বর্ণনা করতে চায় না বা করে না। বিনিময়ে তারা দ্বীনের মধ্যে এমন কিছুর প্রবেশ ঘটায়, যার দ্বারা মানুষ ক্রমেই বিভ্রান্তের মধ্যে পতিত হয়।] আর তারা যা বিক্রি করেছিল তা কতই না নিকৃষ্টতর।
১৮৮. যারা (নিজেরা) যা করেছে তাতে আনন্দ প্রকাশ করে এবং যা নিজেরা করেনি এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে ভালোবাসে তুমি কখনো মনে করো না যে, তারা শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। (মূলত) তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন, তখন কিছু সংখ্যক মুনাফিক ঘরে বসে থাকত এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বেরিয়ে যাওয়ার পর বসে থাকতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করত। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফিরে আসলে তাঁর কাছে শপথ করে ওজর পেশ করত এবং যে কাজ করেনি, সে কাজের জন্য প্রশংসিত হতে পছন্দ করত। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে তাদের গোমরাহী ফাঁস করে দেন। (সহীহ বুখারী, হা/৪৫৬৭) এখানে ঐসব লোকের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা কেবল লোক দেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ভালো আমল করে থাকে। তাদের ভালো-মন্দ সব ধরনের কাজের পেছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করা। শুধু তাই নয়, এসব লোক এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতেও ভালোবাসে, যা সে করেনি অথবা তার দ্বারা সংঘটিত হয়নি। উপরন্তু তারা অন্যের কৃতিত্বকে নিজেরা জবরদখল করে নিতেও ভালোবাসে। প্রকৃতপক্ষে এগুলোই হচ্ছে মুনাফিকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যার পরিপূর্ণ প্রতিফলন ইহুদীদের মধ্যে ছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ঘোষণা করেছেন। অতএব কারো দ্বারা অনেক বড় বড় উত্তম কাজ সংঘটিত হতে দেখে, তা নিজেদের আমলের সাথে তুলনা করে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না এবং এটাও ধারণা করা যাবে না যে, তারা তাদের ঐসব কর্মের কারণে অধিক সওয়াব পাবে এবং আমার এই তুচ্ছ কাজের জন্য সামান্য সওয়াব লাভ করব। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মূলত মানুষের কর্ম থেকে তাদের নিয়তের দিকটি বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। যার নিয়তের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিবে, সে সর্বক্ষেত্রেই কম পুরস্কার পাবে- যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমলের পরিমাণ অনেক বেশি দেখায়। অনুরূপভাবে যার নিয়তের মধ্যে পরিপূর্ণতা থাকবে, সে সর্বক্ষেত্রেই বেশি পুরস্কার অর্জন করতে সক্ষম হবে- যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমলের পরিমাণ অতি সামান্য মনে হয়।]
আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
ধন-সম্পদ ও জীবনের নানা ধরণের কষ্ট আল্লাহর পক্ষ হতে মুমিনদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।
ঈমানের উপর থাকলে বিরোধীদের পক্ষ হতে অনেক সমালোচনা ও কষ্টের স্বীকার হতে হয়।
বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে।
আহলে কিতাবের লোকেরা আল্লাহর কিতাবের নির্দেশসমূহকে মান্য করত না এবং তাতে বিকৃত ঘটিয়েছিল।
আল্লাহর কিতাবের বাণীসমূহ প্রচার করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অতীব জরুরি।
আল্লাহর কোন বাণীকে বিকৃত করা যাবে না।
নিজের পাপকর্মের জন্য আনন্দিত হওয়া যাবে না।
অন্যের কর্মের দ্বারা প্রশংসা অর্জনের চিন্তা করা উচিত নয়।
দুনিয়াতে কেউ প্রশংসিত হলেই পরকালে সে মুক্তি পেয়ে যাবে- এরূপ ধারণা করা ঠিক নয়।