hadith book logo

সূরা আলে ইমরান

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯৫

আয়াত : ১৭৩ – ১৭৫ মুনাফিকদের প্রতারণা এবং এ ব্যাপারে করণীয়

اَلَّذِيْنَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ اِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ اِيْمَانًا وَّقَالُوْا حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ (১৭৩) فَانْقَلَبُوْا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوْٓءٌ وَّاتَّبَعُوْا رِضْوَانَ اللهِؕ وَاللهُ ذُوْ فَضْلٍ عَظِيْمٍ (১৭৪) اِنَّمَا ذٰلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ اَوْلِيَآءَه فَلَا تَخَافُوْهُمْ وَخَافُوْنِ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ (১৭৫)

শাব্দিক অনুবাদ

১৭৩. اَلَّذِيْنَ যারা قَالَ বলেছিল لَهُمُ তাদেরকে اَلنَّاسُ লোকেরা اِنَّ النَّاسَ নিশ্চয় লোকজন قَدْ جَمَعُوْا সমবেত হয়েছে لَكُمْ তোমাদের বিরুদ্ধে فَاخْشَوْهُمْ অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো; فَزَادَهُمْ কিন্তু এতে আরো বর্ধিত হয়েছিল اِيْمَانًا তাদের বিশ্বাস وَقَالُوْا এবং তারা বলেছিল, حَسْبُنَا আমাদের জন্য যথেষ্ট اَللهُ আল্লাহই وَنِعْمَ এবং তিনি কতই না মঙ্গলময় اَلْوَكِيْلُ কর্মবিধায়ক!

১৭৪. فَانْقَلَبُوْا অতঃপর তারা ফিরে আসল بِنِعْمَةٍ নিয়ামতসহ مِنَ اللهِ আল্লাহর পক্ষ হতে وَفَضْلٍ ও সম্পদসহ; لَمْ يَمْسَسْهُمْ তাদেরকে স্পর্শ করেনি سُوْٓءٌ কোন ক্ষতিই; وَاتَّبَعُوْا আর তারা অনুসরণ করেছিল رِضْوَانَ اللهِ আল্লাহর সন্তুষ্টির (পথ); وَاللهُ আর আল্লাহ ذُوْ فَضْلٍ অনুগ্রহশীল عَظِيْمٍ মহা।

১৭৫. اِنَّمَا নিশ্চয় ذٰلِكُمُ এই হচ্ছে اَلشَّيْطَانُ শয়তান يُخَوِّفُ যে ভয় দেখায় اَوْلِيَآءَه  তার বন্ধুদের। فَلَا تَخَافُوْهُمْ অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো না وَخَافُوْنِ বরং আমাকেই ভয় করো اِنْ যদি كُنْتُمْ তোমরা হও مُؤْمِنِيْنَ ঈমানদার ।

সরল অনুবাদ

১৭৩. লোকেরা (মুনাফিকরা) যাদেরকে বলেছিল, নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে লোকজন সমবেত হয়েছে, অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো; কিন্তু এতে তাদের বিশ্বাস আরো বর্ধিত হয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না মঙ্গলময় কর্মবিধায়ক! [একদা আবু সুফিয়ান কিছু লোককে ভাড়া করে এ মর্মে গুজব রটায় যে, মক্কার মুশরিকরা যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এ ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যাতে করে এর মাধ্যমে মুসলিমদের উৎসাহ-উদ্দীপনা হ্রাস পায় এবং তাদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাদের এই চক্রান্ত মুসলিমদের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারল না। বরং এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা আরো বৃদ্ধি পেয়ে গেল। অত্র আয়াতটি এই ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতেই অবতীর্ণ হয়।]

১৭৪. অতঃপর তারা আল্লাহর নিয়ামত (অনুগ্রহ) ও সম্পদসহ (যুদ্ধ হতে) ফিরে আসল; [এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে, এখানে نعمة (নিয়ামত) মানে হচ্ছে শান্তি ও নিরাপত্তা। অর্থাৎ মুসলিমগণ বদরে সুগরা থেকে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে মদিনায় ফিরে এসেছিল। আর فضل (অনুগ্রহ) মানে হচ্ছে মুনাফা, যা বদরে সুগরায় ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বদরে সুগরা হয়ে গমনকারী এক বাণিজ্য-কাফেলার নিকট থেকে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করে অন্যত্র বিক্রি করেছিলেন, যা থেকে অনেক মুনাফা অর্জিত হয়েছিল। অতঃপর তিনি সেগুলো মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছিলেন।] অথচ তাদেরকে কোন ক্ষতিই স্পর্শ করেনি; (কেননা) তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির (পথ) অনুসরণ করেছিল; আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।

১৭৫. এরাই হচ্ছে শয়তান, যে (তোমাদেরকে শত্রুপক্ষের অতিরঞ্জিত শক্তির কথা বলে) তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। কিন্তু যদি তোমরা ঈমানদার হও, তবে তাদেরকে ভয় করো না; বরং তোমরা আমাকেই ভয় করো। [ভয় করার ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর কাউকে প্রাধান্য দিও না। দুনিয়াতে ঈমানের উপর বসবাস করতে গেলে শয়তান ও তার দলের সদস্যরা তোমাদেরকে অনেক ভয়-ভীতি প্রদর্শন করবে- যেরকমভাবে সম্প্রতি প্রদর্শন করেছিল। সুতরাং তোমরা তাদের এসব অসার কথায় কান দেবে না। বরং তোমাদের কাজ হচ্ছে, কেবল আল্লাহকেই ভয় করা এবং তার উপর নির্ভর করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগ থেকে প্রতিটি যুগেই কাফিররা মুসলিমদেরকে নানা ধরনের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে আসছে। এমনকি এখনও কাফির শক্তিসমূহ সম্মিলিত হয়ে মুসলিমদেরকে সবসময় হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। মুসলিমরা যাতে কোন ভাবেই তাদের থেকে শক্তিশালী হতে না পারে, সে জন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে অনেকটাই সফলকাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে। কেননা তাদের এসব অপপ্রচারের কারণে অনেক মানুষ- বিশেষ করে দুর্বল ঈমানের অধিকারী মুসলিমগণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় বিধিবিধান পালনেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুসলিম শাসকরা আজ এমনভাবে প্রভাবিত হচ্ছে যে, তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা দেখে মনে হয় যেন তারা কাফির-মুশরিকদেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। কেননা তারা ইসলামী আইনসমূহকে ভুলে গিয়ে বা অস্বীকার করে কাফির-মুশরিকদের নির্ধারিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। আর মুসলিম জনগণও যেন তাদের অনুসরণ করে সব ধরনের অত্যাচার সহ্য করে নিচ্ছে। যার কারণে মুসলিম দেশগুলোতে সরকার ও রাষ্ট্র উভয়ই ব্যাপক দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন অতিবাহিত করছে। আর এই সব কিছুই সংঘটিত হচ্ছে কুরআন মাজীদের এই আয়াতটি ভুলে যাওয়ার কারণে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে কাফিরদের ভয়-ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করুন। আমীন]

আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

১. সর্বযুগে কিছু লোক সত্যের অনুসারীদেরকে নানা ধরনের ভয় দেখিয়ে থাকে।

২. আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন শক্তিকেই ভয় করা যাবে না।

৩. বিপদ দেখলে মুমিনদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পায়।

৪. খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমগণ প্রচুর গনীমত লাভ করেছিল।

৫. খন্দকের যুদ্ধে অধিক সংখ্যক শত্রু মুসলিমদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিল।

৬. আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণকারীদেরকে কেউ পরাজিত করতে পারে না।