১
সূরা আলে ইমরান
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪১
আয়াত : ৬৫ - ৬৮ ইবরাহীম (আঃ)-কে নিয়ে আহলে কিতাবের বিতর্ক
يَاۤ اَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَآجُّوْنَ فِيْۤ اِبْرَاهِيْمَ وَمَاۤ اُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْاِنْجِيْلُ اِلَّا مِنْ ۢبَعْدِه ۤؕ اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ (৬৫) هَاۤ اَنْتُمْ هٰؤُلَآءِ حَاجَجْتُمْ فِيْمَا لَكُمْ بِه عِلْمٌ فَلِمَ تُحَآجُّوْنَ فِيْمَا لَيْسَ لَكُمْ بِه عِلْمٌؕ وَّاللهُ يَعْلَمُ وَاَنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ (৬৬) مَا كَانَ اِبْرَاهِيْمُ يَهُوْدِيًّا وَّلَا نَصْرَانِيًّا وَّلٰكِنْ كَانَ حَنِيْفًا مُّسْلِمًاؕ وَّمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ (৬৭) اِنَّ اَوْلَى النَّاسِ بِاِبْرَاهِيْمَ لَلَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُ وَهٰذَا النَّبِيُّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْاؕ وَاللهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِيْنَ (৬৮)
শাব্দিক অনুবাদ
৬৫. يَا হে اَهْلَ الْكِتَابِ আহলে কিতাব! لِمَ কেন تُحَآجُّوْنَ তোমরা বিতর্ক করছ فِيْۤ اِبْرَاهِيْمَ ইবরাহীম সম্পর্কে? وَمَاۤ اُنْزِلَتِ অথচ অবতীর্ণ হয়নি اَلتَّوْرَاةُ তাওরাত وَالْاِنْجِيْلُ এবং ইঞ্জীল اِلَّا তবে (অবতীর্ণ হয়েছে) مِنْ ۢبَعْدِهٖ তার পরে। اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ তবে কি তোমরা বুঝ না?
৬৬. هَاۤ اَنْتُمْ হ্যাঁ- তোমরা هٰؤُلَآءِ এমন লোক, حَاجَجْتُمْ যারা (ইতিপূর্বে) বিতর্ক করতে فِيْمَا সে বিষয় নিয়ে, لَكُمْ তোমাদের জন্য بِه যে বিষয়ে রয়েছে عِلْمٌ কিছু জ্ঞান। فَلِمَ তবে কেন تُحَآجُّوْنَ তোমরা বিতর্ক করছ فِيْمَا সে বিষয়ে لَيْسَ নেই لَكُمْ তোমাদের জন্য بِه যে বিষয়ে عِلْمٌ কোন জ্ঞান? وَاللهُ আর আল্লাহ يَعْلَمُ জানেন وَاَنْتُمْ আর তোমরা لَا تَعْلَمُوْنَ জান না।
৬৭. مَا كَانَ اِبْرَاهِيْمُ ইবরাহীম ছিল না يَهُوْدِيًّا ইহুদি وَلَا نَصْرَانِيًّا এবং খ্রিস্টানও ছিল না, وَلٰكِنْ বরং كَانَ সে ছিল حَنِيْفًا একনিষ্ঠ مُسْلِمًا মুসলিম। وَمَا كَانَ আর সে ছিল না مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও।
৬৮. اِنَّ নিশ্চয় اَوْلَى সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ اَلنَّاسِ মানুষ بِاِبْرَاهِيْمَ ইবরাহীমের কাছে, لَلَّذِيْنَ যারা اِتَّبَعُوْهُ তার অনুসরণ করেছে وَهٰذَا এবং এই اَلنَّبِيُّ নবী وَالَّذِيْنَ এবং যারা اٰمَنُوْا ঈমান এনেছে। وَاللهُ আর আললাহ وَلِيُّ বন্ধু اَلْمُؤْمِنِيْنَ মুমিনদের।
সরল অনুবাদ
৬৫. (আরো বলো) হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন ইবরাহীম সম্পর্কে বিতর্ক করছ? অথচ তাওরাত এবং ইঞ্জীল তার (অনেক) পরেই অবতীর্ণ হয়েছে। তবে কি তোমরা বুঝ না? [আহলে কিতাব তথা ইহুদী ও খ্রিস্টান উভয় ধর্মের মতাদর্শ অনুযায়ীই ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ও তাদের আদর্শস্বরূপ। তবে তারা উভয় পক্ষই তাঁর ব্যাপারে অনেক বিভ্রান্তিকর দাবী পোষণ করত। ইহুদীরা দাবী করত যে, ইবরাহীম (আঃ) ইহুদীদের অন্তর্ভুক্ত। আবার খ্রিস্টানরা দাবী করত যে, তিনি খ্রিস্টানদের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ দাবী করাটা ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং চরম মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। একেবারে সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকেই তাদের এই মিথ্যা দাবীর অসারতা প্রকাশ পেয়ে যায়। অত্র আয়াতে এ বিষয়টিই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তোমরা যে ইবরাহীম (আঃ)-কে ইহুদী অথবা খ্রিস্টান হিসেবে দাবী করছ, তার কোনটিই সঠিক নয়। কেননা তোমাদের অনুসরণীয় কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীল নাযিল হওয়ার বহু পূর্বেই ইবরাহীম (আঃ) এর আগমন ঘটেছিল। তোমাদের নবী ও রাসূলগণ ছিলেন তারই বংশধর। সুতরাং তিনি কীভাবে তার মৃত্যুর পর তারই বংশ হতে আগত কোন নবী অথবা রাসূলের অনুসরণ করেন অথবা তাদের কিতাবের অনুসরণ করে তাদের মতাদর্শের অনুসারী তথা ইহুদী অথবা খ্রিস্টান হতে পারেন?]
৬৬. হ্যাঁ- তোমরা তো তারাই, যারা (ইতিপূর্বে) সে বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে, যে বিষয়ে তোমাদের কিছু জ্ঞান আছে। তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তোমরা বিতর্ক করছ কেন? আল্লাহ জানেন, কিন্তু তোমরা জান না। [এখানে জ্ঞান বলতে দলীলের কথা বুঝানো হয়েছে। ইহুদী ও খ্রিস্টানদের একটি চরিত্র এই ছিল যে, তারা আল্লাহ, ফেরেশতা, রাসূলগণ, কিতাবসমূহসহ ঈমানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন বিভ্রান্তিকর দাবী করত যে, এর স্বপক্ষে তারা কোন গ্রহণযোগ্য দলীল অথবা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারত না। কিন্তু এরপরও তারা নিজেদের মতাদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের অহেতুক বিতর্কে লিপ্ত হত এবং বিভ্রান্তি থেকে আরো বিভ্রান্তিতে পতিত হত। অত্র আয়াতে তাদের এই চরিত্রটিকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং আল্লাহর পথের দাঈদেরকে বুঝানো হয়েছে যে, যখন তোমরা কোন অমুসলিমকে দাওয়াত দিবে, তখন তারা এ দাওয়াতের বিরুদ্ধে অসংখ্য অহেতুক যুক্তি উপস্থাপনের দ্বারা তোমার সাথে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। সুতরাং তোমাকে তাদের ঐসব দাবীর প্রত্যুত্তর অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও ধৈর্য সহকারেই প্রদান করতে হবে। আর এজন্য তোমাকে অবশ্যই অধিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।]
৬৭. (সঠিক তথ্য হচ্ছে) ইবরাহীম ইহুদি ছিল না এবং নাসারাও (খ্রিস্টানও) ছিল না, বরং সে একনিষ্ঠ মুসলিম ছিল। [এখানে ‘একনিষ্ঠ মুসলিম’ বুঝাতে حنيفا مسلما শব্দাবলি ব্যবহার করা হয়েছে। আর حنيف বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একটি বিশেষ পথ অনুসরণ করে চলে। যেহেতু ইবরাহীম (আঃ) তৎকালীন যুগের সকল মতাদর্শ বা ধর্মকে পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহর পথ অনুসরণ করেছিলেন, এজন্য তাকেও ‘একনিষ্ঠ মুসলিম’ বলা হয়।] আর সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিল না। [অর্থাৎ তোমরা যেরূপ ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী দাবী করা সত্ত্বেও নানা দিক থেকে শিরক করে বেড়াচ্ছ তথা উযাইর (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র হিসেবে গ্রহণ করছ, মারইয়াম (আঃ)-কে আল্লাহর স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছ, হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করে তোমাদের আলেমদেরকে বিধানদাতার আসনে বসিয়ে দিয়েছ এবং এ ধরনের আরো অনেক শিরকী কর্মকান্ড করে মুশরিকে পরিণত হয়েছ, ইবরাহীম (আঃ) মোটেও সেরূপ ছিলেন না। বরং তৎকালীন যুগের সকল মানুষ শিরকে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি একাই ছিলেন শিরক থেকে মুক্ত এবং একনিষ্ঠ মুসলিমের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তোমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী হয়ে থাক, তাহলে প্রথমে নিজেদেরকে সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত করো এবং একনিষ্ঠ মুসলিমের অন্তর্ভুক্ত হও। তাহলে তোমাদের দাবীর যথার্থ প্রমাণিত হবে।]
৬৮. নিশ্চয় মানুষের মধ্যে ইবরাহীমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তারাই, যারা তার অনুসরণ করেছে এবং এই নবী ও ঈমানদারগণ। আর আল্লাহ মুমিনদের বন্ধু। [এখানে মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার অনুসারীদেরকে ইবরাহীম (আঃ) এর অধিক ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য একটি মূলনীতি প্রদান করা হয়েছে। আর তা হলো, কারো প্রকৃত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ঐসব ব্যক্তি, যারা যথাযথভাবে তার অনুসরণ করে চলে, তার মতাদর্শকে মেনে চলে এবং তাকে সম্মান প্রদান করে। আর এই হিসেবে বর্তমান যুগের ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী হিসেবে দাবীকারী ইহুদী ও খ্রিস্টানরা প্রকৃতপক্ষে তার অনুসারী নয়। কেননা মৌখিকভাবে তারা ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী হিসেবে দাবী করলেও কার্যত এর বিপরীত করে থাকে। সুতরাং মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার অনুসারীরাই হচ্ছে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। কেননা ইবরাহীম (আঃ) এর দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) এর দ্বীন একই। ইবরাহীম (আঃ) সারা জীবন মানুষকে যে আল্লাহর প্রতি আহবান করে গেছেন, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার অনুসারীরাও মানুষকে সেই পথের দিকে দাওয়াত প্রদান করে থাকে।অত্র আয়াতে রূপকভাবে মুমিনদেরকে আরো একটি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে যে, তোমরা যারা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর অনুসারী ও তাকে ভালোবাসো বলে দাবী করছ, তোমাদের এই দাবী প্রমাণের জন্য ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো তোমাদেরকেও কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে- অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমাদেরকে জীবনবিধান হিসেবে যা কিছু নির্দেশনা প্রদান করেন, তা নির্দ্বিধায় মেনে নিতে হবে। তিনি যা কিছু করেছেন সেগুলো সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর তার ভালোবাসা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিন্দু পরিমাণ সীমালঙ্ঘন তথা কোন প্রকার শিরক ও বিদআতের আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না- যেমনিভাবে ইবরাহীম (আঃ) এর প্রতি অধিক ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে ইহুদী ও খ্রিস্টানরা করেছিল।]
আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
১. ইবরাহীম (আঃ) এর আগমনের অনেক পরে তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল।
২. আহলে কিতাবের লোকজন ইবরাহীম (আঃ)-কে নিজে নানা ধরনের অযৌক্তিক মতভেদে লিপ্ত হত।
৩. কোন বিষয়ে অল্প জ্ঞান নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া যাবে না।
৪. ইবরাহীম (আঃ) কে ইহুদি অথবা খ্রিস্টান দাবী করাটা একেবারেই অযৌক্তিক।
৫. শুধুমাত্র মুমিনরাই ইবরাহীম (আঃ) এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ।
শাব্দিক অনুবাদ
৬৫. يَا হে اَهْلَ الْكِتَابِ আহলে কিতাব! لِمَ কেন تُحَآجُّوْنَ তোমরা বিতর্ক করছ فِيْۤ اِبْرَاهِيْمَ ইবরাহীম সম্পর্কে? وَمَاۤ اُنْزِلَتِ অথচ অবতীর্ণ হয়নি اَلتَّوْرَاةُ তাওরাত وَالْاِنْجِيْلُ এবং ইঞ্জীল اِلَّا তবে (অবতীর্ণ হয়েছে) مِنْ ۢبَعْدِهٖ তার পরে। اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ তবে কি তোমরা বুঝ না?
৬৬. هَاۤ اَنْتُمْ হ্যাঁ- তোমরা هٰؤُلَآءِ এমন লোক, حَاجَجْتُمْ যারা (ইতিপূর্বে) বিতর্ক করতে فِيْمَا সে বিষয় নিয়ে, لَكُمْ তোমাদের জন্য بِه যে বিষয়ে রয়েছে عِلْمٌ কিছু জ্ঞান। فَلِمَ তবে কেন تُحَآجُّوْنَ তোমরা বিতর্ক করছ فِيْمَا সে বিষয়ে لَيْسَ নেই لَكُمْ তোমাদের জন্য بِه যে বিষয়ে عِلْمٌ কোন জ্ঞান? وَاللهُ আর আল্লাহ يَعْلَمُ জানেন وَاَنْتُمْ আর তোমরা لَا تَعْلَمُوْنَ জান না।
৬৭. مَا كَانَ اِبْرَاهِيْمُ ইবরাহীম ছিল না يَهُوْدِيًّا ইহুদি وَلَا نَصْرَانِيًّا এবং খ্রিস্টানও ছিল না, وَلٰكِنْ বরং كَانَ সে ছিল حَنِيْفًا একনিষ্ঠ مُسْلِمًا মুসলিম। وَمَا كَانَ আর সে ছিল না مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও।
৬৮. اِنَّ নিশ্চয় اَوْلَى সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ اَلنَّاسِ মানুষ بِاِبْرَاهِيْمَ ইবরাহীমের কাছে, لَلَّذِيْنَ যারা اِتَّبَعُوْهُ তার অনুসরণ করেছে وَهٰذَا এবং এই اَلنَّبِيُّ নবী وَالَّذِيْنَ এবং যারা اٰمَنُوْا ঈমান এনেছে। وَاللهُ আর আললাহ وَلِيُّ বন্ধু اَلْمُؤْمِنِيْنَ মুমিনদের।
সরল অনুবাদ
৬৫. (আরো বলো) হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন ইবরাহীম সম্পর্কে বিতর্ক করছ? অথচ তাওরাত এবং ইঞ্জীল তার (অনেক) পরেই অবতীর্ণ হয়েছে। তবে কি তোমরা বুঝ না? [আহলে কিতাব তথা ইহুদী ও খ্রিস্টান উভয় ধর্মের মতাদর্শ অনুযায়ীই ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ও তাদের আদর্শস্বরূপ। তবে তারা উভয় পক্ষই তাঁর ব্যাপারে অনেক বিভ্রান্তিকর দাবী পোষণ করত। ইহুদীরা দাবী করত যে, ইবরাহীম (আঃ) ইহুদীদের অন্তর্ভুক্ত। আবার খ্রিস্টানরা দাবী করত যে, তিনি খ্রিস্টানদের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ দাবী করাটা ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং চরম মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। একেবারে সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকেই তাদের এই মিথ্যা দাবীর অসারতা প্রকাশ পেয়ে যায়। অত্র আয়াতে এ বিষয়টিই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তোমরা যে ইবরাহীম (আঃ)-কে ইহুদী অথবা খ্রিস্টান হিসেবে দাবী করছ, তার কোনটিই সঠিক নয়। কেননা তোমাদের অনুসরণীয় কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীল নাযিল হওয়ার বহু পূর্বেই ইবরাহীম (আঃ) এর আগমন ঘটেছিল। তোমাদের নবী ও রাসূলগণ ছিলেন তারই বংশধর। সুতরাং তিনি কীভাবে তার মৃত্যুর পর তারই বংশ হতে আগত কোন নবী অথবা রাসূলের অনুসরণ করেন অথবা তাদের কিতাবের অনুসরণ করে তাদের মতাদর্শের অনুসারী তথা ইহুদী অথবা খ্রিস্টান হতে পারেন?]
৬৬. হ্যাঁ- তোমরা তো তারাই, যারা (ইতিপূর্বে) সে বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে, যে বিষয়ে তোমাদের কিছু জ্ঞান আছে। তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তোমরা বিতর্ক করছ কেন? আল্লাহ জানেন, কিন্তু তোমরা জান না। [এখানে জ্ঞান বলতে দলীলের কথা বুঝানো হয়েছে। ইহুদী ও খ্রিস্টানদের একটি চরিত্র এই ছিল যে, তারা আল্লাহ, ফেরেশতা, রাসূলগণ, কিতাবসমূহসহ ঈমানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন বিভ্রান্তিকর দাবী করত যে, এর স্বপক্ষে তারা কোন গ্রহণযোগ্য দলীল অথবা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারত না। কিন্তু এরপরও তারা নিজেদের মতাদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের অহেতুক বিতর্কে লিপ্ত হত এবং বিভ্রান্তি থেকে আরো বিভ্রান্তিতে পতিত হত। অত্র আয়াতে তাদের এই চরিত্রটিকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং আল্লাহর পথের দাঈদেরকে বুঝানো হয়েছে যে, যখন তোমরা কোন অমুসলিমকে দাওয়াত দিবে, তখন তারা এ দাওয়াতের বিরুদ্ধে অসংখ্য অহেতুক যুক্তি উপস্থাপনের দ্বারা তোমার সাথে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। সুতরাং তোমাকে তাদের ঐসব দাবীর প্রত্যুত্তর অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও ধৈর্য সহকারেই প্রদান করতে হবে। আর এজন্য তোমাকে অবশ্যই অধিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।]
৬৭. (সঠিক তথ্য হচ্ছে) ইবরাহীম ইহুদি ছিল না এবং নাসারাও (খ্রিস্টানও) ছিল না, বরং সে একনিষ্ঠ মুসলিম ছিল। [এখানে ‘একনিষ্ঠ মুসলিম’ বুঝাতে حنيفا مسلما শব্দাবলি ব্যবহার করা হয়েছে। আর حنيف বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একটি বিশেষ পথ অনুসরণ করে চলে। যেহেতু ইবরাহীম (আঃ) তৎকালীন যুগের সকল মতাদর্শ বা ধর্মকে পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহর পথ অনুসরণ করেছিলেন, এজন্য তাকেও ‘একনিষ্ঠ মুসলিম’ বলা হয়।] আর সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিল না। [অর্থাৎ তোমরা যেরূপ ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী দাবী করা সত্ত্বেও নানা দিক থেকে শিরক করে বেড়াচ্ছ তথা উযাইর (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র হিসেবে গ্রহণ করছ, মারইয়াম (আঃ)-কে আল্লাহর স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছ, হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করে তোমাদের আলেমদেরকে বিধানদাতার আসনে বসিয়ে দিয়েছ এবং এ ধরনের আরো অনেক শিরকী কর্মকান্ড করে মুশরিকে পরিণত হয়েছ, ইবরাহীম (আঃ) মোটেও সেরূপ ছিলেন না। বরং তৎকালীন যুগের সকল মানুষ শিরকে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি একাই ছিলেন শিরক থেকে মুক্ত এবং একনিষ্ঠ মুসলিমের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তোমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী হয়ে থাক, তাহলে প্রথমে নিজেদেরকে সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত করো এবং একনিষ্ঠ মুসলিমের অন্তর্ভুক্ত হও। তাহলে তোমাদের দাবীর যথার্থ প্রমাণিত হবে।]
৬৮. নিশ্চয় মানুষের মধ্যে ইবরাহীমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তারাই, যারা তার অনুসরণ করেছে এবং এই নবী ও ঈমানদারগণ। আর আল্লাহ মুমিনদের বন্ধু। [এখানে মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার অনুসারীদেরকে ইবরাহীম (আঃ) এর অধিক ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য একটি মূলনীতি প্রদান করা হয়েছে। আর তা হলো, কারো প্রকৃত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ঐসব ব্যক্তি, যারা যথাযথভাবে তার অনুসরণ করে চলে, তার মতাদর্শকে মেনে চলে এবং তাকে সম্মান প্রদান করে। আর এই হিসেবে বর্তমান যুগের ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী হিসেবে দাবীকারী ইহুদী ও খ্রিস্টানরা প্রকৃতপক্ষে তার অনুসারী নয়। কেননা মৌখিকভাবে তারা ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসারী হিসেবে দাবী করলেও কার্যত এর বিপরীত করে থাকে। সুতরাং মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার অনুসারীরাই হচ্ছে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। কেননা ইবরাহীম (আঃ) এর দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) এর দ্বীন একই। ইবরাহীম (আঃ) সারা জীবন মানুষকে যে আল্লাহর প্রতি আহবান করে গেছেন, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার অনুসারীরাও মানুষকে সেই পথের দিকে দাওয়াত প্রদান করে থাকে।অত্র আয়াতে রূপকভাবে মুমিনদেরকে আরো একটি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে যে, তোমরা যারা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর অনুসারী ও তাকে ভালোবাসো বলে দাবী করছ, তোমাদের এই দাবী প্রমাণের জন্য ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো তোমাদেরকেও কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে- অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমাদেরকে জীবনবিধান হিসেবে যা কিছু নির্দেশনা প্রদান করেন, তা নির্দ্বিধায় মেনে নিতে হবে। তিনি যা কিছু করেছেন সেগুলো সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর তার ভালোবাসা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিন্দু পরিমাণ সীমালঙ্ঘন তথা কোন প্রকার শিরক ও বিদআতের আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না- যেমনিভাবে ইবরাহীম (আঃ) এর প্রতি অধিক ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে ইহুদী ও খ্রিস্টানরা করেছিল।]
আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
১. ইবরাহীম (আঃ) এর আগমনের অনেক পরে তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল।
২. আহলে কিতাবের লোকজন ইবরাহীম (আঃ)-কে নিজে নানা ধরনের অযৌক্তিক মতভেদে লিপ্ত হত।
৩. কোন বিষয়ে অল্প জ্ঞান নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া যাবে না।
৪. ইবরাহীম (আঃ) কে ইহুদি অথবা খ্রিস্টান দাবী করাটা একেবারেই অযৌক্তিক।
৫. শুধুমাত্র মুমিনরাই ইবরাহীম (আঃ) এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ।