hadith book logo

সূরা আলে ইমরান

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

আয়াত : ৭ কুরআনের আয়াতসমূহের প্রকারভেদ

هُوَ الَّذِيْۤ اَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ اٰيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ اُمُّ الْكِتَابِ وَاُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌؕ فَاَمَّا الَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَآءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَآءَ تَأْوِيْلِه ۚ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيْلَه اِلَّا اللهُۚ وَالرَّاسِخُوْنَ فِي الْعِلْمِ يَقُوْلُوْنَ اٰمَنَّا بِه كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَاۚ وَمَا يَذَّكَّرُ اِلَّاۤ اُولُو الْاَلْبَابِ (৭)

শাব্দিক অনুবাদ

৭. هُوَ الَّذِيْ তিনি (ঐ সত্তা) যিনি, اَنْزَلَ অবতীর্ণ করেছেন عَلَيْكَ তোমার উপর اَلْكِتَابَ কিতাব; مِنْهُ এর মধ্যে রয়েছে اٰيَاتٌ কিছু আয়াত مُحْكَمَاتٌ সুস্পষ্ট, هُنَّ এগুলোই اُمُّ الْكِتَابِ কিতাবের মূল وَاُخَرُ আর অন্যগুলো مُتَشَابِهَاتٌ অস্পষ্ট। فَاَمَّا الَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِمْ অতএব যাদের অন্তরে রয়েছে زَيْغٌ বক্রতা فَيَتَّبِعُوْنَ তারা অনুসরণ করে مَا تَشَابَهَ مِنْهُ এর মধ্যে থেকে যেগুলো অস্পষ্ট اِبْتِغَآءَ অনুসন্ধান করে اَلْفِتْنَةِ ফিতনা وَاِبْتِغَآءَ এবং অনুসন্ধান করে تَأْوِيْلِه  এগুলোর ব্যাখ্যা। وَمَا يَعْلَمُ আর জানে না تَأٓوِيْلَه  এগুলোর ব্যাখ্যা اِلَّا اللهُ আল্লাহ ব্যতীত। وَالرَّاسِخُوْنَ আর যারা গভীর فِي الْعِلْمِ জ্ঞানে يَقُوْلُوْنَ তারা বলে اٰمَنَّا আমরা ঈমান এনেছি بِه  এগুলোর উপর, كُلٌّ সবই مِنْ عِنْدِ পক্ষ থেকে رَبِّنَا আমাদের প্রতিপালকের। وَمَا يَذَّكَّرُ আর কেউই উপদেশ গ্রহণ করে না اِلَّا ব্যতীত اُولُو الْاَلْبَابِ বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ।

সরল অনুবাদ

৭. তিনিই (ঐ সত্তা), যিনি তোমার উপর কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন; এর মধ্যে কিছু আয়াত রয়েছে মুহকাম [মুহকামাত বলা হয় ঐ সমস্ত আয়াতকে, যার ভাষ্য স্পষ্ট এবং সহজেই বোধগম্য। যেগুলোর অর্থ নির্ধারণ করার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ থাকে না।], এগুলোই কিতাবের মূল (মৌলিক অংশ) [মূলত মুহকাম আয়াতগুলোই হচ্ছে কুরআন মাজীদের আসল বুনিয়াদ। কেননা যে উদ্দেশ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এ আয়াতগুলো তা পূর্ণ করে। এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে দুনিয়াবাসীকে ইসলামের দিকে আহবান জানানো হয়েছে। এগুলোতেই শিক্ষা ও উপদেশের কথা বলা হয়েছে। ভ্রষ্টতা তুলে ধরে সত্য ও সঠিক পথ সুস্পষ্ট করা হয়েছে। দ্বীনের মূলনীতি এবং আক্বীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত, চরিত্র, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং আদেশ-নিষেধের বিধান ও মূলনীতি এ আয়াতগুলোতেই বর্ণিত হয়েছে। কাজেই কোন সত্যসন্ধানী ব্যক্তি কোন্ পথে চলবে এবং কোন্ পথে চলবে না, এ কথা জানার জন্য যখন কুরআনের শরণাপন্ন হয়, তখন এ মুহকাম আয়াতগুলোই তাকে পথপ্রদর্শন করে। স্বাভাবিকভাবে এগুলোর প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় এবং এগুলো থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য সে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।]; আর অন্যগুলো মুতাশাবিহ [মুতাশাবিহাত বলা হয় ঐ সমস্ত আয়াতকে, যার ভাষ্য অস্পষ্ট। এগুলোর প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সুতরাং এগুলোর মাধ্যমে মানুষ সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে পতিত হওয়ার অধিক সম্ভাবনা থাকে। ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, মুতাশাবিহ হচ্ছে রহিত আয়াতসমূহ, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দৃষ্টান্ত এবং যেগুলোর দ্বারা শপথ করা হয়েছে। এসব আয়াতের উপর কেবল বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। আমল করার জন্য এগুলো থেকে হুকুম গ্রহণ করা যাবে না। (ইবনে কাসীর)]। অতএব যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে তারাই ফিতনার (বিশৃঙ্খলার) উদ্দেশ্যে এবং অপব্যাখ্যা অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহ এর অনুসরণ করে থাকে। অথচ এগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। (এ কারণেই) যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী তারা বলে, আমরা এগুলোতে ঈমান এনেছি, প্রত্যেকটিই আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে (এসেছে)। (প্রকৃতপক্ষে) বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউই (আল্লাহর নিদর্শনাবলি থেকে) উপদেশ গ্রহণ (শিক্ষা লাভ) করে না। [এখানে হেদায়াতপ্রাপ্ত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের এবং পথভ্রষ্ট ব্যক্তিবর্গের একটি সাধারণ পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। আর সেটি হলো- হেদায়াতপ্রাপ্ত ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ সবসময় মুহকাম আয়াতসমূহ হতে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে এবং তারা মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ এড়িয়ে চলে। পক্ষান্তরে পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ভ্রষ্টতার কারণে মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ হতেই তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজার চেষ্টা করে। ফলে তারা এর সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে না পেরে আরো বড় ধরনের ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়। অপরদিকে ইসলামের শত্রুরাও এসব আয়াত নিয়ে অধিক ঘাটাঘাটি করে এবং এর বক্র দিকগুলো খুঁজে বের করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। সুতরাং যারা মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ হতে কোন কিছু অনুসন্ধান করার জোর প্রয়াস চালায়, তাদের থেকে সাবধান থাকাটা প্রকৃত ঈমানদারদের জন্য খুবই জরুরি। হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বললেন, যখন তুমি কাউকে মুতাশাবিহ আয়াতের পেছনে ছুটতে দেখবে, তখন তুমি মনে করবে যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে (এ আয়াতে) এদের কথাই বর্ণনা করেছেন। সুতরাং তুমি তাদের থেকে সাবধান থাকবে। (সহীহ বুখারী, হা/৪৫৪৭; তিরমিযী, হা/২৯৯৪)]

আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

১. আল-কুরআনের আয়াতসমূহ দুই প্রকার- (১) মুহকাম (স্পষ্ট) এবং (২) মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট)।

২. কেবলমাত্র মুহকাম আয়াতসমূহই কুরআন মাজীদের মৌলিক অংশ, যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

৩. মুহকাম আয়াতসমূহের ভাষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট এবং অতি সহজেই বোধগম্য।

৪. মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা নিষেধ।

৫. ফিতনা সৃষ্টিকারীরা মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ দ্বারাই ফিতনা সৃষ্টি করে থাকে।

৬. মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না।

৭. প্রকৃত মুমিনগণ মুতাশাবিহ আয়াতসমূহ হতে কোন হুকুম গ্রহণ করে না; বরং কেবল এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে যে, এগুলো আল্লাহর বাণী।

৮. যারা মুতাশাবিহ আয়াত অন্বেষণের চেষ্টা চালায় তাদেরকে পরিত্যাগ করা ওয়াজিব; কারণ কুপ্রবৃত্তির অনুসারী।

৯. আল্লাহর নিদর্শনসমূহ হতে একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই অধিক উপকৃত হয়ে থাকে।