hadith book logo

সূরা আলে ইমরান

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৪

আয়াত : ১১১ – ১১২ কাফিরদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও তাদের ইহকালীন পরিণাম

لَنْ يَّضُرُّوْكُمْ اِلَّاۤ اَذًىؕ وَّاِنْ يُّقَاتِلُوْكُمْ يُوَلُّوْكُمُ الْاَدْبَارَ۫ ثُمَّ لَا يُنْصَرُوْنَ (১১১) ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ اَيْنَ مَا ثُقِفُوْاۤ اِلَّا بِحَبْلٍ مِّنَ اللهِ وَحَبْلٍ مِّنَ النَّاسِ وَبَآءُوْا بِغَضَبٍ مِّنَ اللهِ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الْمَسْكَنَةُؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمْ كَانُوْا يَكْفُرُوْنَ بِاٰيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُوْنَ الْاَنْۢبِيَآءَ بِغَيْرِ حَقٍّؕ ذٰلِكَ بِمَا عَصَوْا وَّكَانُوْا يَعْتَدُوْنَ (১১২)

শাব্দিক অনুবাদ

১১১. لَنْ يَّضُرُّوْكُمْ কখনো তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না اِلَّا ছাড়া اَذًى কষ্ট দেয়া। وَاِنْ আর যদি يُقَاتِلُوْكُمْ তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, يُوَلُّوْكُمُ তাহলে তারা তোমাদেরকে প্রদর্শন করবে الْاَدْبَارَ পৃষ্ঠ; ثُمَّ অতঃপর لَا يُنْصَرُوْنَ তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না।

১১২. ضُرِبَتْ পতিত হবে عَلَيْهِمُ তাদের উপর اَلذِّلَّةُ লাঞ্ছনা اَيْنَ مَا যেখানেই ثُقِفُوْا তাদেরকে পাওয়া যাবে اِلَّا ছাড়া بِحَبْلٍ রশি (নিরাপত্তা ব্যবস্থা) مِنَ থেকে اَللهِ আল্লাহর وَحَبْلٍ এবং রশি (ছাড়া) مِنَ থেকে اَلنَّاسِ মানুষের। وَبَآءُوْا তারা নিয়ে এসেছে بِغَضَبٍ ক্রোধকে مِنَ থেকে اَللهِ আল্লাহর وَضُرِبَتْ এবং আপতিত করা হয়েছে عَلَيْهِمُ তাদের উপর اَلْمَسْكَنَةُ দারিদ্রকে। ذٰلِكَ এসব এজন্য যে, بِاَنَّهُمْ নিশ্চয় তারা كَانُوْا يَكْفُرُوْنَ তারা অস্বীকার করত بِاٰيَاتِ নিদর্শনসমূহকে اَللهِ আল্লাহর وَيَقْتُلُوْنَ এবং তারা হত্যা করত اَلْاَنْۢبِيَآءَ নবীদেরকে بِغَيْرِ حَقٍّ অন্যায়ভাবে। ذٰلِكَ بِمَا আর এটা এ কারণে যে, عَصَوْا তারা অবাধ্য হয়েছিল وَكَانُوْا يَعْتَدُوْنَ এবং তারা সীমালঙ্ঘন করেছিল।

সরল অনুবাদ

১১১. (সামান্য) কষ্ট দেয়া ছাড়া কখনো তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। [এখানে ক্ষতি বলতে দুনিয়ার ক্ষতি তথা আর্থিক অবরোধ, মৌখিক ভয়ভীতি, কটুক্তি ও অপবাদ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি। অথচ প্রকৃতপক্ষে এগুলো মুমিনের জন্য কোন ক্ষতি নয়; বরং বড় ধরনের পুরস্কারের পূর্বাভাষ। কেননা দুনিয়াতে মুমিনগণ যতধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হোক না কেন, সেগুলো তাদের গুনাসমূহের কাফফারা হিসেবে গণ্য হয় অথবা সেগুলোর মাধ্যমে তাদের আখিরাতের জীবনে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়- এমনকি সে শহীদদের কাতারে উন্নীত হয়। আর একজন মুমিনের দুনিয়ার জীবনে এটাই হলো মূল লক্ষ্য। এখানে মুমিনদের জন্য আরো একটি সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে যে, কাফিররা তোমাদেরকে যত বড় ধরনের ভয়ভীতিই প্রদান করুক না কেন, তাদের এই শক্তি নেই যে, তারা তোমাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেবে অথবা তারা অনুরূপ বড় ধরনের কোন ক্ষতি করতে পারবে। বরং তারা তোমাদেরকে ততটুকুই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে, যতটুকু ক্ষতি আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ব্যাপারে চাইবেন।] আর যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তারা তোমাদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে (পালাবে) [এখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, তারা যদি মুসলিমদেরকে এই চূড়ান্ত ক্ষেত্রেই পরাজিত করতে না পারে, তাহলে ছোটখাট ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপবাদ রটানো, আর্থিক অবরোধ আরোপ ইত্যাদি কষ্ট দিয়ে কী আর ক্ষতি করতে পারবে।]; অতঃপর তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না। [এখানে সাহায্য করার প্রসঙ্গ এজন্যই আনা হয়েছে যে, যখন কোন দল পরাজিত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন তারা অপর কোন পক্ষ হতে সাহায্যপ্রাপ্ত হওয়ার জোর আশা পোষণ করে থাকে। আর প্রকৃত সাহায্য এসে থাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু কাফিররা যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে অনুরূপ বিপদে পতিত হবে, তখন তারা সেটি পাবে না। কেননা তারা এমন একটি দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, যারা সুযোগ্য দল হিসেবে আল্লাহরই সাহায্যপ্রাপ্ত। আর যাদের সাথে আল্লাহর সাহায্য থাকে দুনিয়ার সমস্ত দল মিলেও তাদেরকে পরাজিত করতে পারে না। সুতরাং হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা করো এবং তাঁরই পথে এগিয়ে যাও; তোমাদেরকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না।]

১১২. আল্লাহর পক্ষ থেকে রশি (নিরাপত্তা ব্যবস্থা) ছাড়া ও মানুষের পক্ষ থেকে রশি ছাড়া তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে তাদের উপর লাঞ্ছনা লেপন করা হবে। [এই আয়াতটি ইহুদীদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তারা আর কখনো নিজেদের ক্ষমতাবলে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না অথবা অনুরূপ সম্মান ও মর্যাদা লাভ করতে পারবে না, যেভাবে তারা ইতিপূর্বে বিশ্ববাসীর উপর মর্যাদা লাভ করেছিল। বরং তারা এখন থেকে যেখানেই বসবাস করুক না কেন, সেখানেই তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ হতে লাঞ্ছনা ও অপমান নেমে আসবে। তারা যদি এই লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে চায়, তাহলে এই আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয় তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে যেতে হবে; অন্যথায় ইসলামী দেশে বসবাস করার জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কর দিতে হবে।] তারা আল্লাহর ক্রোধকে (ডেকে) নিয়ে এসেছে এবং তাদের উপর দারিদ্রকে আপতিত করা হয়েছে। এসব এজন্য যে, নিশ্চয় তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করত এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। আর এ কারণে যে, তারা অবাধ্য হয়েছিল এবং তারা সীমালঙ্ঘন করেছিল। [এ অপরাধগুলো ইহুদীদের উপর অপমান ও লাঞ্ছনা অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এতে বর্তমান বিশ্ববাসীর জন্য একটি বড় ধরনের শিক্ষা রয়েছে। আর তা হলো- এখনও যদি কেউ ইহুদীদের অনুসরণ করে তথা নাস্তিকদের মতো বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে বেড়ায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনা অমান্য করে, নবীদের অনুপস্থিতিতে তাদের ওয়ারিশ তথা আলেমদেরকে অপমান করে, তাদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, সত্য বলার কারণে তাদের উপর নির্যাতন চালায়, দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে, তাহলে তাদের উপরও অনুরূপ আযাব নেমে আসতে পারে। সুতরাং হে বিশ্ববাসী! তোমরা ইহুদীদের অনুসরণ করা থেকে বিরত থাক এবং তাদেরকে সহযোগিতা প্রদান করা থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ কর।]

আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

১. সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হলে কাফিরদের পক্ষ হতে আগত কষ্ট সহ্য করতে হবে।

২. কাফিররা সর্বদা মুসলিমদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে থাকে।

৩. যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা কাফিরদের বৈশিষ্ট্য।

৪. সর্বযুগে কাফিরদের উপর লাঞ্ছনা বর্ষিত হয়।

৫. আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার করা মারাত্মক অন্যায়।