১
সূরা আলে ইমরান
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১০৩
আয়াত : ১৮৯ – ১৯৫ প্রকৃত জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য
وَلِلّٰهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِؕ وَاللهُ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ (১৮৯) اِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَاٰيَاتٍ لِّاُولِي الْاَلْبَابِ (১৯০) اَلَّذِيْنَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ قِيَامًا وَّقُعُوْدًا وَّعَلٰى جُنُوْبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُوْنَ فِيْ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِؕ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًاۚ سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (১৯১) رَبَّنَاۤ اِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ اَخْزَيْتَه ؕ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ اَنْصَارٍ (১৯২) رَبَّنَاۤ اِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُّنَادِيْ لِلْاِيْمَانِ اَنْ اٰمِنُوْا بِرَبِّكُمْ فَاٰمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْاَبْرَارِ (১৯৩) رَبَّنَا وَاٰتِنَا مَا وَعَدْتَّنَا عَلٰى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِؕ اِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيْعَادَ (১৯৪) فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ اَنِّيْ لَاۤ اُضِيْعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنْكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰىۚ بَعْضُكُمْ مِّنْ ۢبَعْضٍ ۚ فَالَّذِيْنَ هَاجَرُوْا وَاُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ وَاُوْذُوْا فِيْ سَبِيْلِيْ وَقَاتَلُوْا وَقُتِلُوْا لَاُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَاُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهَارُۚ ثَوَابًا مِّنْ عِنْدِ اللهِؕ وَاللهُ عِنْدَه حُسْنُ الثَّوَابِ (১৯৫)
শাব্দিক অনুবাদ
১৮৯. وَلِلّٰهِ আল্লাহরই জন্য مُلْكُ আধিপত্য اَلسَّمَاوَاتِ আকাশসমূহের وَالْاَرْضِ ও পৃথিবীর। وَاللهُ আর আল্লাহ عَلٰى উপর كُلِّ প্রত্যেক شَيْءٍ বিষয়ের قَدِيْرٌ পূর্ণ ক্ষমতাবান।
১৯০. اِنَّ নিশ্চয় فِيْ মধ্যে خَلْقِ সৃষ্টির اَلسَّمَاوَاتِ আসমানসমূহ وَالْاَرْضِ ও জমিনের وَاخْتِلَافِ এবং পরিবর্তনে اَللَّيْلِ রাত্রির وَالنَّهَارِ ও দিবসের لَاٰيَاتٍ নিদর্শনাবলি لِاُولِي الْاَلْبَابِ জ্ঞানবানদের জন্য।
১৯১. اَلَّذِيْنَ যারা يَذْكُرُوْنَ স্মরণ করে اَللهَ আল্লাহকে قِيَامًا দাঁড়িয়ে, وَقُعُوْدًا বসে وَعَلٰى جُنُوْبِهِمْ ও শুয়ে وَيَتَفَكَّرُوْنَ এবং তারা চিন্তা-ভাবনা করে فِيْ خَلْقِ সৃষ্টির বিষয়ে اَلسَّمَاوَاتِ আসমানসমূহ وَالْاَرْضِ ও জমিনের رَبَّنَا হে আমাদের প্রতিপালক! مَا خَلَقْتَ আপনি সৃষ্টি করেননি هٰذَا এগুলো بَاطِلًا অযথা। سُبْحَانَكَ আপনিই অতি পবিত্র, فَقِنَا অতএব আপনি আমাদেরকে রক্ষা করুন عَذَابَ আযাব হতে اَلنَّارِ জাহান্নামের।
১৯২. رَبَّنَاۤ হে আমাদের প্রতিপালক! اِنَّكَ অবশ্যই আপনি مَنْ যাকে تُدْخِلِ প্রবেশ করাবেন اَلنَّارَ জাহান্নামে, فَقَدْ অতি শীঘ্রই اَخْزَيْتَه তাকে লাঞ্ছিত করবেন। وَمَا আর নেই لِلظَّالِمِيْنَ যালিমদের জন্য مِنْ اَنْصَارٍ কোন সাহায্যকারী।
১৯৩. رَبَّنَاۤ হে আমাদের প্রতিপালক! اِنَّنَا নিশ্চয় আমরা سَمِعْنَا শুনেছি مُنَادِيًا এক আহবানকারীকে يُنَادِيْ আহবান করতে لِلْاِيْمَانِ ঈমানের দিকে اَنْ যে, اٰمِنُوْا তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো بِرَبِّكُمْ তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি, فَاٰمَنَّا ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। رَبَّنَا হে আমাদের প্রতিপালক! فَاغْفِرْ অতএব ক্ষমা করুন لَنَا আমাদেরকে ذُنُوْبَنَا আমাদের অপরাধসমূহ وَكَفِّرْ এবং মুছে দিন عَنَّا আমাদের থেকে سَيِّئَاتِنَا আমাদের গুনাহসমূহ; وَتَوَفَّنَا আর আপনি আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন مَعَ সাথে اَلْاَبْرَارِ পুণ্যবানদের।
১৯৪. رَبَّنَا হে আমাদের প্রতিপালক! وَاٰتِنَا আমাদেরকে দান করুন مَا যা وَعَدْتَّنَا আপনি আমাদেরকে অঙ্গীকার প্রদান করেছিলেন عَلٰى رُسُلِكَ আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে وَلَا تُخْزِنَا আর আপনি আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না يَوْمَ الْقِيَامَةِ কিয়ামতের দিন; اِنَّكَ নিশ্চয় আপনি لَا تُخْلِفُ ভঙ্গ করেন না اَلْمِيْعَادَ অঙ্গীকার।
১৯৫. فَاسْتَجَابَ অতঃপর সাড়া দিলেন لَهُمْ তাদের জন্য رَبُّهُمْ তাদের প্রতিপালক (এই বলে যে) اَنِّيْ নিশ্চয় আমি لَاۤ اُضِيْعُ নষ্ট করি না عَمَلَ আমল عَامِلٍ আমলকারীর مّنْكُمْ তোমাদের মধ্য হতে مِنْ ذَكَرٍ পুরুষদের থেকে اَوْ অথবা اُنْثٰىۚ নারীদের। بَعْضُكُمْ তোমাদের কতক তো مِنْ ۢبَعْضٍ অপর কতকেরই অংশ। فَالَّذِيْنَ অতএব যারা هَاجَرُوْا হিজরত করেছে, وَاُخْرِجُوْا এবং বিতাড়িত হয়েছে مِنْ دِيَارِهِمْ তাদের ঘর-বাড়ি হতে, وَاُوْذُوْا আর নির্যাতিত হয়েছে فِيْ سَبِيْلِيْ আমার পথে, وَقَاتَلُوْا এবং যুদ্ধ করেছে وَقُتِلُوْا এবং নিহত হয়েছে - لَاُكَفِّرَنَّ অবশ্যই আমি মোচন করব عَنْهُمْ তাদের থেকে سَيِّئَاتِهِمْ তাদের পাপসমূহ وَلَاُدْخِلَنَّهُمْ এবং তাদেরকে প্রবেশ করাব جَنَّاتٍ জান্নাতসমূহে, تَجْرِيْ প্রবাহিত হয়ে গেছে مِنْ تَحْتِهَا যার নিচ দিয়ে اَلْاَنْهَارُ নদীসমূহ; ثَوَابًا এটা একটি প্রতিদান مِنْ عِنْدِ নিকট হতে اَللهِ আল্লাহর। وَاللهُ عِنْدَهٗ আর আল্লাহরই নিকটে রয়েছে حُسْنُ উত্তম اَلثَّوَابِ প্রতিদান।
সরল অনুবাদ
১৮৯. আকাশসমূহ ও পৃথিবীর আধিপত্য (কেবলমাত্র) আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহই সকল বিষয়ের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।
১৯০. নিশ্চয় আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবা-রাত্রির পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলি রয়েছে। [অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি গাফিল না হয়ে, সারা বিশ্বের নিদর্শনসমূহের দিকে বিবেক-বুদ্ধিহীন জন্তু-জানোয়ারের দৃষ্টিতে না তাকিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাহলে প্রতিটি নিদর্শনের সাহায্যে অতি সহজেই যথার্থ ও চূড়ান্ত সত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারবে। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই আয়াতটি রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামাযের পূর্বে আসমানের দিকে তাকিয়ে পাঠ করতেন। (সহীহ বুখারী, হা/৪৫৬৯)]
১৯১. (এরা হচ্ছে ঐসব লোক) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে। [লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ঐসব ব্যক্তিকে জ্ঞানী হিসেবে পরিচয় প্রদান করা হয়েছে, যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে অথবা সামর্থ্যানুযায়ী সালাত আদায় করে এবং অধিকাংশ সময় আল্লাহর সৃষ্টিকুল নিয়ে- বিশেষ করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে। প্রকৃতপক্ষে এসব বিজ্ঞানীর চিন্তা-গবেষণাই সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। সুতরাং যেসব বিজ্ঞানী চিন্তা-গবেষণা করে ঠিকই, কিন্তু সালাত আদায় করে না, তারা প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানী নয়। তাদের চিন্তা-গবেষণা মানুষকে কুফরির দিকেই নিয়ে যায়।] (এরা বলে) হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তা এগুলো অযথা সৃষ্টি করেননি। আপনিই অতি পবিত্র, অতএব আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে রক্ষা করুন। [অর্থাৎ বিশ্বজগত সৃষ্টির দিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই সত্যটি তার সমানে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এটি সম্পূর্ণরূপে একটি জ্ঞানগর্ব ব্যবস্থাপনা। এগুলোর কোনটির অবস্থান এমন নয় যে, তা সৃষ্টিকুলের জন্য কোন প্রয়োজন নেই। আর এই সবকিছুর সমন্বয়েই গঠিত হয়েছে পৃথিবীর ভারসাম্য। এজন্যই গবেষকগণ বলে উঠেন যে, হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র; সুতরাং আপনি আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।]
১৯২. হে আমাদের প্রতিপালক! অবশ্যই আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, তাকে অবশ্যই লাঞ্ছিত করবেন। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।
১৯৩. হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আমরা এক আহবানকারীকে ঈমানের দিকে আহবান করতে শুনেছি যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো, ফলে আমরা তাতে ঈমান এনেছি। [এসব চিন্তা-গবেষণা তাদেরকে এ ব্যাপারেও নিশ্চিত করে দেয় যে, নবী-রাসূলগণ এ বিশ্ব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছেন এবং বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনাবলি সম্পর্কে যেসব ব্যাখ্যা করেছেন, অতঃপর মানুষের জীবন-ব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, সবগুলো পরিপূর্ণভাবে সত্য ও যথার্থ।] হে আমাদের প্রতিপালক! অতএব আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন আর আমাদের গুনাহসমূহ মুছে দিন; আর আপনি আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন।
১৯৪. হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যে অঙ্গীকার প্রদান করেছিলেন তা দান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না; নিশ্চয় আপনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না। [অর্থাৎ তারা আল্লাহর কাছে দু‘আ করে যে, এ প্রতিশ্রুতিগুলো তাদের ব্যাপারে কার্যকর করা হোক। এ দুনিয়ায় নবীর উপর ঈমান আনার কারণে তারা কাফিরদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের শিকার হয়েছে আবার কিয়ামতের দিনও যেন কাফিরদের সামনে তাদের অপমান ও লাঞ্ছনা পোহাতে না হয়। কাফিররা যেন সেদিন তাদের প্রতি এ ধরনের বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ না করে যে, ঈমান এনেও এদের কোন লাভ হলো না। এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার যেন তাদের না হতে হয়, এ আশাই তারা পোষণ করে।]
১৯৫. অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের আহবানে সাড়া দিলেন যে, আমি তোমাদের মধ্য হতে পুরুষ অথবা নারী যেকোন আমলকারীর আমল নষ্ট করব না, তোমরা তো একে অপরেরই অংশ। [অর্থাৎ তোমরা নেকী ও আনুগত্যের দিক দিয়ে সকলেই সমান। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ, চাকর-মনীব, সাদা-কালো, ছোট-বড় ইত্যাদি কোন ভেদাভেদ গ্রহণযোগ্য নয়। বর্ণিত আছে যে, একদা উম্মে সালামা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা‘আলা হিজরতের ব্যাপারে কেবল পুরুষদের কথাই উল্লেখ করেছেন; কোন মহিলাদের নাম নেননি কেন? তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর)] অতএব যারা হিজরত করেছে আর যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি হতে বিতাড়িত করা হয়েছে আর যারা আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে ও যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে- আমি অবশ্যই তাদের পাপসমূহ মোচন করব এবং তাদেরকে (এমন) জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত; এটা আল্লাহর নিকট হতে প্রতিদান (পুরস্কার)। আর আল্লাহরই নিকটে রয়েছে উত্তম প্রতিদান।
আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
১. আসমান-জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তন আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।
২. আল্লাহ নিদর্শনসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা জ্ঞানী লোকদের অন্যতম গুণ।
৩. জ্ঞানী লোকজন আল্লাহর নিদর্শনাবলি থেকে অনেক জ্ঞান লাভ করে থাকে।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা জরুরি।
৫. আল্লাহর কোন সৃষ্টিই নিরর্থক নয়।
৬. ঈমানের দিকে আহবানকারী ডাকে সাড়া দিতে হবে।
৭. পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যুবরণ করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।
৮. কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত না হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।
৯. আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষ কারো আমল বিন্দুমাত্র বিনষ্ট করেন না।
১০. আল্লাহর পথে কষ্টের স্বীকার হলে আল্লাহর এ কারণে তাকে উত্তম প্রতিদান ও জান্নাত দান করবেন।
শাব্দিক অনুবাদ
১৮৯. وَلِلّٰهِ আল্লাহরই জন্য مُلْكُ আধিপত্য اَلسَّمَاوَاتِ আকাশসমূহের وَالْاَرْضِ ও পৃথিবীর। وَاللهُ আর আল্লাহ عَلٰى উপর كُلِّ প্রত্যেক شَيْءٍ বিষয়ের قَدِيْرٌ পূর্ণ ক্ষমতাবান।
১৯০. اِنَّ নিশ্চয় فِيْ মধ্যে خَلْقِ সৃষ্টির اَلسَّمَاوَاتِ আসমানসমূহ وَالْاَرْضِ ও জমিনের وَاخْتِلَافِ এবং পরিবর্তনে اَللَّيْلِ রাত্রির وَالنَّهَارِ ও দিবসের لَاٰيَاتٍ নিদর্শনাবলি لِاُولِي الْاَلْبَابِ জ্ঞানবানদের জন্য।
১৯১. اَلَّذِيْنَ যারা يَذْكُرُوْنَ স্মরণ করে اَللهَ আল্লাহকে قِيَامًا দাঁড়িয়ে, وَقُعُوْدًا বসে وَعَلٰى جُنُوْبِهِمْ ও শুয়ে وَيَتَفَكَّرُوْنَ এবং তারা চিন্তা-ভাবনা করে فِيْ خَلْقِ সৃষ্টির বিষয়ে اَلسَّمَاوَاتِ আসমানসমূহ وَالْاَرْضِ ও জমিনের رَبَّنَا হে আমাদের প্রতিপালক! مَا خَلَقْتَ আপনি সৃষ্টি করেননি هٰذَا এগুলো بَاطِلًا অযথা। سُبْحَانَكَ আপনিই অতি পবিত্র, فَقِنَا অতএব আপনি আমাদেরকে রক্ষা করুন عَذَابَ আযাব হতে اَلنَّارِ জাহান্নামের।
১৯২. رَبَّنَاۤ হে আমাদের প্রতিপালক! اِنَّكَ অবশ্যই আপনি مَنْ যাকে تُدْخِلِ প্রবেশ করাবেন اَلنَّارَ জাহান্নামে, فَقَدْ অতি শীঘ্রই اَخْزَيْتَه তাকে লাঞ্ছিত করবেন। وَمَا আর নেই لِلظَّالِمِيْنَ যালিমদের জন্য مِنْ اَنْصَارٍ কোন সাহায্যকারী।
১৯৩. رَبَّنَاۤ হে আমাদের প্রতিপালক! اِنَّنَا নিশ্চয় আমরা سَمِعْنَا শুনেছি مُنَادِيًا এক আহবানকারীকে يُنَادِيْ আহবান করতে لِلْاِيْمَانِ ঈমানের দিকে اَنْ যে, اٰمِنُوْا তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো بِرَبِّكُمْ তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি, فَاٰمَنَّا ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। رَبَّنَا হে আমাদের প্রতিপালক! فَاغْفِرْ অতএব ক্ষমা করুন لَنَا আমাদেরকে ذُنُوْبَنَا আমাদের অপরাধসমূহ وَكَفِّرْ এবং মুছে দিন عَنَّا আমাদের থেকে سَيِّئَاتِنَا আমাদের গুনাহসমূহ; وَتَوَفَّنَا আর আপনি আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন مَعَ সাথে اَلْاَبْرَارِ পুণ্যবানদের।
১৯৪. رَبَّنَا হে আমাদের প্রতিপালক! وَاٰتِنَا আমাদেরকে দান করুন مَا যা وَعَدْتَّنَا আপনি আমাদেরকে অঙ্গীকার প্রদান করেছিলেন عَلٰى رُسُلِكَ আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে وَلَا تُخْزِنَا আর আপনি আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না يَوْمَ الْقِيَامَةِ কিয়ামতের দিন; اِنَّكَ নিশ্চয় আপনি لَا تُخْلِفُ ভঙ্গ করেন না اَلْمِيْعَادَ অঙ্গীকার।
১৯৫. فَاسْتَجَابَ অতঃপর সাড়া দিলেন لَهُمْ তাদের জন্য رَبُّهُمْ তাদের প্রতিপালক (এই বলে যে) اَنِّيْ নিশ্চয় আমি لَاۤ اُضِيْعُ নষ্ট করি না عَمَلَ আমল عَامِلٍ আমলকারীর مّنْكُمْ তোমাদের মধ্য হতে مِنْ ذَكَرٍ পুরুষদের থেকে اَوْ অথবা اُنْثٰىۚ নারীদের। بَعْضُكُمْ তোমাদের কতক তো مِنْ ۢبَعْضٍ অপর কতকেরই অংশ। فَالَّذِيْنَ অতএব যারা هَاجَرُوْا হিজরত করেছে, وَاُخْرِجُوْا এবং বিতাড়িত হয়েছে مِنْ دِيَارِهِمْ তাদের ঘর-বাড়ি হতে, وَاُوْذُوْا আর নির্যাতিত হয়েছে فِيْ سَبِيْلِيْ আমার পথে, وَقَاتَلُوْا এবং যুদ্ধ করেছে وَقُتِلُوْا এবং নিহত হয়েছে - لَاُكَفِّرَنَّ অবশ্যই আমি মোচন করব عَنْهُمْ তাদের থেকে سَيِّئَاتِهِمْ তাদের পাপসমূহ وَلَاُدْخِلَنَّهُمْ এবং তাদেরকে প্রবেশ করাব جَنَّاتٍ জান্নাতসমূহে, تَجْرِيْ প্রবাহিত হয়ে গেছে مِنْ تَحْتِهَا যার নিচ দিয়ে اَلْاَنْهَارُ নদীসমূহ; ثَوَابًا এটা একটি প্রতিদান مِنْ عِنْدِ নিকট হতে اَللهِ আল্লাহর। وَاللهُ عِنْدَهٗ আর আল্লাহরই নিকটে রয়েছে حُسْنُ উত্তম اَلثَّوَابِ প্রতিদান।
সরল অনুবাদ
১৮৯. আকাশসমূহ ও পৃথিবীর আধিপত্য (কেবলমাত্র) আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহই সকল বিষয়ের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।
১৯০. নিশ্চয় আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবা-রাত্রির পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলি রয়েছে। [অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি গাফিল না হয়ে, সারা বিশ্বের নিদর্শনসমূহের দিকে বিবেক-বুদ্ধিহীন জন্তু-জানোয়ারের দৃষ্টিতে না তাকিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাহলে প্রতিটি নিদর্শনের সাহায্যে অতি সহজেই যথার্থ ও চূড়ান্ত সত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারবে। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই আয়াতটি রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামাযের পূর্বে আসমানের দিকে তাকিয়ে পাঠ করতেন। (সহীহ বুখারী, হা/৪৫৬৯)]
১৯১. (এরা হচ্ছে ঐসব লোক) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে। [লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ঐসব ব্যক্তিকে জ্ঞানী হিসেবে পরিচয় প্রদান করা হয়েছে, যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে অথবা সামর্থ্যানুযায়ী সালাত আদায় করে এবং অধিকাংশ সময় আল্লাহর সৃষ্টিকুল নিয়ে- বিশেষ করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে। প্রকৃতপক্ষে এসব বিজ্ঞানীর চিন্তা-গবেষণাই সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। সুতরাং যেসব বিজ্ঞানী চিন্তা-গবেষণা করে ঠিকই, কিন্তু সালাত আদায় করে না, তারা প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানী নয়। তাদের চিন্তা-গবেষণা মানুষকে কুফরির দিকেই নিয়ে যায়।] (এরা বলে) হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তা এগুলো অযথা সৃষ্টি করেননি। আপনিই অতি পবিত্র, অতএব আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে রক্ষা করুন। [অর্থাৎ বিশ্বজগত সৃষ্টির দিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই সত্যটি তার সমানে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এটি সম্পূর্ণরূপে একটি জ্ঞানগর্ব ব্যবস্থাপনা। এগুলোর কোনটির অবস্থান এমন নয় যে, তা সৃষ্টিকুলের জন্য কোন প্রয়োজন নেই। আর এই সবকিছুর সমন্বয়েই গঠিত হয়েছে পৃথিবীর ভারসাম্য। এজন্যই গবেষকগণ বলে উঠেন যে, হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র; সুতরাং আপনি আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।]
১৯২. হে আমাদের প্রতিপালক! অবশ্যই আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, তাকে অবশ্যই লাঞ্ছিত করবেন। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।
১৯৩. হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আমরা এক আহবানকারীকে ঈমানের দিকে আহবান করতে শুনেছি যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো, ফলে আমরা তাতে ঈমান এনেছি। [এসব চিন্তা-গবেষণা তাদেরকে এ ব্যাপারেও নিশ্চিত করে দেয় যে, নবী-রাসূলগণ এ বিশ্ব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছেন এবং বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনাবলি সম্পর্কে যেসব ব্যাখ্যা করেছেন, অতঃপর মানুষের জীবন-ব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, সবগুলো পরিপূর্ণভাবে সত্য ও যথার্থ।] হে আমাদের প্রতিপালক! অতএব আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন আর আমাদের গুনাহসমূহ মুছে দিন; আর আপনি আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন।
১৯৪. হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যে অঙ্গীকার প্রদান করেছিলেন তা দান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না; নিশ্চয় আপনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না। [অর্থাৎ তারা আল্লাহর কাছে দু‘আ করে যে, এ প্রতিশ্রুতিগুলো তাদের ব্যাপারে কার্যকর করা হোক। এ দুনিয়ায় নবীর উপর ঈমান আনার কারণে তারা কাফিরদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের শিকার হয়েছে আবার কিয়ামতের দিনও যেন কাফিরদের সামনে তাদের অপমান ও লাঞ্ছনা পোহাতে না হয়। কাফিররা যেন সেদিন তাদের প্রতি এ ধরনের বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ না করে যে, ঈমান এনেও এদের কোন লাভ হলো না। এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার যেন তাদের না হতে হয়, এ আশাই তারা পোষণ করে।]
১৯৫. অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের আহবানে সাড়া দিলেন যে, আমি তোমাদের মধ্য হতে পুরুষ অথবা নারী যেকোন আমলকারীর আমল নষ্ট করব না, তোমরা তো একে অপরেরই অংশ। [অর্থাৎ তোমরা নেকী ও আনুগত্যের দিক দিয়ে সকলেই সমান। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ, চাকর-মনীব, সাদা-কালো, ছোট-বড় ইত্যাদি কোন ভেদাভেদ গ্রহণযোগ্য নয়। বর্ণিত আছে যে, একদা উম্মে সালামা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা‘আলা হিজরতের ব্যাপারে কেবল পুরুষদের কথাই উল্লেখ করেছেন; কোন মহিলাদের নাম নেননি কেন? তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর)] অতএব যারা হিজরত করেছে আর যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি হতে বিতাড়িত করা হয়েছে আর যারা আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে ও যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে- আমি অবশ্যই তাদের পাপসমূহ মোচন করব এবং তাদেরকে (এমন) জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত; এটা আল্লাহর নিকট হতে প্রতিদান (পুরস্কার)। আর আল্লাহরই নিকটে রয়েছে উত্তম প্রতিদান।
আয়াতগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
১. আসমান-জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তন আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।
২. আল্লাহ নিদর্শনসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা জ্ঞানী লোকদের অন্যতম গুণ।
৩. জ্ঞানী লোকজন আল্লাহর নিদর্শনাবলি থেকে অনেক জ্ঞান লাভ করে থাকে।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা জরুরি।
৫. আল্লাহর কোন সৃষ্টিই নিরর্থক নয়।
৬. ঈমানের দিকে আহবানকারী ডাকে সাড়া দিতে হবে।
৭. পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যুবরণ করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।
৮. কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত না হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।
৯. আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষ কারো আমল বিন্দুমাত্র বিনষ্ট করেন না।
১০. আল্লাহর পথে কষ্টের স্বীকার হলে আল্লাহর এ কারণে তাকে উত্তম প্রতিদান ও জান্নাত দান করবেন।