hadith book logo

ইসলামের রুকনসমূহের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

লেখকঃ কতিপয় ছাত্র • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১

অযুর সুন্নতসমূহ:

১- অযু করার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَا وُضُوءَ لِمَنْ لَمْ يَذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ»

“যে ব্যক্তি অযুর সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে নি (বিসমিল্লাহ বলে নি) তার অযু হয় নি”। [ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৭, ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আবু দাউদ, হাদীস নং ১০২, ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ মাকতু‘ বলেছেন। তিরমিযী, হাদীস নং ২৫, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, এ পরিচ্ছেদে আবু হুরাইরা, ‘আয়েশা, আবু সা‘ঈদ, সাহল ইবন সা‘দ ও আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে হাদীস বর্ণিত আছে।]

২- অযুর সময় মিসওয়াক করা। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম,

«لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِيْ لأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ، مَعَ كُلِّ وُضُوءٍ» .

“যদি আমার উম্মাতের জন্য কঠিন না হতো, তবে আমি তাদেরকে প্রত্যেক অযুর সাথে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম”। [মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং ২১৪; তবে হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে ‘প্রত্যেক অযুর সাথে’ এর পরিবর্তে ‘প্রত্যেক সালাতের সাথে’ বলা হয়েছে।আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلاَةٍ» “আমার উম্মাতের জন্য বা তিনি বলেছেন, লোকদের জন্য যদি কঠিন মনে না করতাম, তা হলে প্রত্যেক সালাতের সাথে তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম”। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৮৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫২।]

৩- অযুর শুরুতে তালু পর্যন্ত দু’হাত ধৌত করা। কেননা উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসে অযুর বর্ণনা এভাবে এসেছে, উসমান ইবন ‘আফফান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর আযাদকৃত গোলাম হুমরান রহ. থেকে বর্ণিত,

«أَنَّهُ رَأَى عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ دَعَا بِوَضُوءٍ، فَأَفْرَغَ عَلَى يَدَيْهِ مِنْ إِنَائِهِ، فَغَسَلَهُمَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ، ثُمَّ قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَوَضَّأُ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا »

“তিনি ‘উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে অযুর পানি আনাতে দেখলেন। তারপর তিনি সে পাত্র থেকে উভয় হাতের ওপর পানি ঢেলে তা তিনবার ধুয়ে ফেললেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার এ অযুর ন্যায় অযু করতে দেখেছি”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬।]

৪- কুলি করা। মুখের ভিতর পানি নিয়ে নড়াচড়া করে ফেলে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِذَا تَوَضَّأْتَ فَمَضْمِضْ»

“যখন তুমি অযু কর তখন কুলি করবে”। [আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৪। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

৫- নাকে পানি দেওয়া: নিশ্বাসের সাথে নাকের মধ্যে পানি টেনে নেওয়া ও নাক ঝাড়া, নাকের ভিতর থেকে পানি বের করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَبَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا»

“তুমি পরিপূর্ণরূপে অযু করো এবং নাকের ভেতর উত্তমরূপে পানি পৌঁছাও। কিন্তু তুমি সাওম পালনকারী হলে তা (বাড়তি) করবে না”। [ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪০৭। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪২; তিরমিযী, হাদীস নং ৭৮৮। ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।]

৬- দাঁড়ি খিলাল করা। আম্মার ইবন ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একলোক দাঁড়ি খিলাল করতে দেখে আশ্চর্য হলে তিনি বলেন,

«وَمَا يَمْنَعُنِي؟ وَلَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُخَلِّلُ لِحْيَتَهُ»

“এ কাজে কে আমাকে বাঁধা দিবে? আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর দাঁড়ি খিলাল করতে দেখেছি”। [তিরমিযী, হাদীস নং ২৯। ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

৭- হাত ও পায়ের আঙ্গুল খিলাল করা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِذَا تَوَضَّأْتَ فَخَلِّلْ بَيْنَ أَصَابِعِ يَدَيْكَ وَرِجْلَيْكَ»

“যখন তুমি অযু করবে তখন দু’হাত ও দু’পায়ের আঙ্গুল খিলাল করবে”। [তিরমিযী, হাদীস নং ৩৯। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪৪৭।]

৮- দু’কানের উপরিভাগ ও নিচেরভাগ মাসাহ করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করেছেন।

৯- প্রত্যেক অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করা। তবে একবার ধৌত করা ফরয, আর তিনবার ধৌত করা সুন্নত।

১০- হাত পা ধৌত করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِذَا لَبِسْتُمْ، وَإِذَا تَوَضَّأْتُمْ، فَابْدَءُوا بِأَيَامِنِكُمْ»

“তোমরা যখন পোশাক পরিধান করবে ও অযু করবে তখন ডান দিক থেকে শুরু করবে”। [আবু দাউদ, হাদীস নং ৪১৪১। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

১১- চেহারা ও হাতের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ অযু করার সময় মাথার সম্মুখভাগ ও চেহারার আশেপাশের অংশ ধৌত করতে ফরয অংশের চেয়ে একটু বেশি ধৌত করা। আর হাত ধোয়ার সময় কনুইর একটু বেশি ও পা ধোয়ার সময় টাখনুর উপরিভাগসহ ধৌত করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الوُضُوءِ» قال أبو هريرة : «فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ»

“কিয়ামতের দিন আমার উম্মাতকে এমন অবস্থায় ডাকা হবে যে, অযুর প্রভাবে তাদের হাত-পা ও মুখমণ্ডল থাকবে উজ্জ্বল”। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “তাই তোমাদের মধ্যে যে এ উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিতে পারে, সে যেন তা করে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৬। হাদীসে বর্ণিত الغرة শব্দের মূল অর্থ ঘোড়ার কপালের সাদা অংশ, আর التحجيل ঘোড়ার পায়ের সাদা অংশ। এখানে غُرًّا مُحَجَّلِينَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের দিন তাদের চেহারা ও হাত পা আলোয় আলোকিত হবে। এটি এ উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।]

১২- অযুর পরে নিম্নোক্ত দো‘আ পাঠ করা।

«أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ»

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শারীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও তাঁরই রাসুল। হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো এবং আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো”। [তিরমিযী, হাদীস নং ৫৫। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُسْبِغُ الْوَضُوءَ ثُمَّ يَقُولُ : أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ» .

“তোমাদের যে ব্যক্তি পূর্ণরূপে অযু করে এ দো‘আ পাঠ করবে, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো হক্ব ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল’ তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে যাবে এবং যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা সে জান্নাতের প্রবেশ করতে পারবে”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৪।]