hadith book logo

ইসলামের রুকনসমূহের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

লেখকঃ কতিপয় ছাত্র • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯৬

কিছু সতর্কীকরণ:

১- যাকাতের সম্পদ যেখানে আহরণ করা হবে সে স্থান থেকে অন্য স্থানের দূরত্ব যদি সফরে যে দূরত্বে কসর করতে হয় ততটুক দূরত্ব হয় বা তার বেশি হয় তবে তা স্থানান্তর করা জায়েয নয়; বরং যেখান থেকে যাকাত উত্তোলন করা হবে সে এলাকার লোকদের মধ্যেই উক্ত যাকাত বন্টন করা হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামেনে প্রেরণ করার সময় এ অসিয়ত করেছেন:

«فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ، فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ فِي فُقَرَائِهِمْ»

“যদি তারা তা মেনে নেয়, তাহলে তাদের জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন। তাদের ধনীদের থেকে তা আদায় করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে তা বণ্টন করা হবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৫৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯।]

তবে ফিকহবিদগণ যাকাত উত্তোলনকারী এলাকার মানুষ অভাবমুক্ত হলে বা দুর্ভিক্ষ বা মুজাহিদদের সাহায্যার্থে বা বিশেষ প্রয়োজনে এক স্থানের যাকাত অন্য স্থানের হকদারদের মধ্যে স্থানান্তর করা জায়েয বলেছেন।

২- যাকাত প্রদানের সময় উল্লিখিত আট খাতের সবগুলোকেই শামিল করতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। তবে যদি সম্পদের পরিমাণ বেশি হয় তবে সকল খাতে বণ্টন করা উত্তম। আর যদি সম্পদ কম হয় তবে আট খাতের যেকোনো একটিতে প্রদান করলেই যাকাত আদায় হয়ে যাবে। যদিও যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক অভাবী ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টির খেয়ালা রাখা জরুরী।

৩- আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের উচ্চ সম্মানের কারণে তাদেরকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা জায়েয নয়। আহলে বাইত হলো: বনী হাশিম, তারা হলেন: আলী, ‘আকীল, জা‘ফর, আব্বাস ও হারিস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এর পরিবারবর্গ। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ الصَّدَقَةَ لَا تَنْبَغِي لِآلِ مُحَمَّدٍ إِنَّمَا هِيَ أَوْسَاخُ النَّاسِ»

“এ যাকাত হলো মানুষের ময়লা-আবর্জনা, অতএব তা মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদ পরিবারের জন্য হালাল নয়”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৭২।]

তবে কিছু আলেম বলেছেন, নবী পরিবারের অভাব চরম পর্যায়ে পৌঁছলে এবং তাদেরকে তাদের নির্ধারিত খাতের অর্থ প্রদান করা না হলে তাদেরকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা জায়েয হবে।

৪- মুসলিম ব্যক্তির ওপর যাদের ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য, যেমন পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, (এবং এর ঊর্ধবর্তী ব্যক্তিরা) সন্তান, নাতি-নাতনি (এবং এর নিম্নগামী ব্যক্তিরা) এদেরকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। এভাবে নিজের স্ত্রীকেও যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। তবে স্ত্রী তার যাকাতের অর্থ স্বামীকে দিতে পারবেন। কারণ আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন,

«يَا نَبِيَّ اللَّهِ، إِنَّكَ أَمَرْتَ اليَوْمَ بِالصَّدَقَةِ، وَكَانَ عِنْدِي حُلِيٌّ لِي، فَأَرَدْتُ أَنْ أَتَصَدَّقَ بِهِ، فَزَعَمَ ابْنُ مَسْعُودٍ : أَنَّهُ وَوَلَدَهُ أَحَقُّ مَنْ تَصَدَّقْتُ بِهِ عَلَيْهِمْ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «صَدَقَ ابْنُ مَسْعُودٍ، زَوْجُكِ وَوَلَدُكِ أَحَقُّ مَنْ تَصَدَّقْتِ بِهِ عَلَيْهِمْ»

“হে আল্লাহর নবী! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ আপনি সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার অলংকার আছে। আমি তা সাদকা করব ইচ্ছা করেছি। ইবন মাস’উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মনে করেন, আমার এ সাদকায় তাঁর এবং তাঁ সন্তানদেরই হক বেশি। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইবন মাস‘উদ ঠিক বলেছে। তোমার স্বামী ও সন্তানই তোমার এ সাদকায় অধিক হকদার”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৬২।] যদিও এটি নফল সাদকার সাথে সংশ্লিষ্ট।

৫- কাফির, মুরতাদ, ফাসিক যেমন সালাত অনাদায়কারী ও ইসলামী শরি‘আতের উপহাসকারীকে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ فِي فُقَرَائِهِمْ»

“ধনীদের থেকে যাকাত আদায় করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৫৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯।]

এখানে মুসলিম ধনী ও মুসলিম গরিব মিসকীনের কথা বলা হয়েছে, অন্যদের নয়। তবে ইসলামের প্রতি আগ্রহী করতে তাদেরকে যাকাত দেওয়ার বিষয়টি তা থেকে ভিন্ন।

এমনিভাবে ধনী ও উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও যাকাত দেওয়া যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَا حَظَّ فِيهَا لِغَنِيٍّ وَلَا لِذِي مَرَّةٍ مُكْتَسِبٍ»

“ধনী ও উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তির জন্য যাকাতে কোনো হিস্যা নেই”। [আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৩৩। ‬ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। সুনান নাসায়ী, হাদীস নং ২৫৯৮।]

৬- যাকাত হলো ইবাদত। সুতরাং যাকাত আদায় সহীহ হওয়ার শর্ত হলো নিয়ত করা। যাকাত আদায়কারী একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় তা আদায় করা। মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করা যে, সে তার ওপর ফরযকৃত যাকাত আদায় করছে। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ»

“প্রত্যেক কাজ নিয়াতের ওপর নির্ভরশীল”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৭।]