hadith book logo

ইসলামের রুকনসমূহের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

লেখকঃ কতিপয় ছাত্র • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

সাহু সাজদাহর কারণসমূহ:

তিন কারণে সাহু সাজদাহ দিতে হয়:

১- সালাতে কোনো কিছু অতিরিক্ত করলে।

২- সালাতে কম করলে।

৩- এবং সালাতে সন্দেহ হলে।

১- সালাতে কোনো কিছু অতিরিক্ত করলে।

কোনো ব্যক্তি সালাতে ভুলে রুকু, সাজদাহ বা অনুরূপ কোনো ফরয বা ওয়াজিব কাজ অতিরিক্ত করলে তাকে সালাত শেষে সালামের পরে দু’টি সাজদাহ দিতে হয়। আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى الظُّهْرَ خَمْسًا، فَقِيلَ لَهُ : أَزِيدَ فِي الصَّلاَةِ؟ فَقَالَ : «وَمَا ذَاكَ؟» قَالَ : صَلَّيْتَ خَمْسًا، فَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ بعد ما سَلَّمَ»

“যোহরের সালাতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার পাঁচ রাকা‘আত আদায় করলেন। মুসল্লিগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, সালাত কি বৃদ্ধি করা হয়েছে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কী হয়েছে? সাহাবীগণ বললেন, আপনি যে পাঁচ রাকা‘আত আদায় করছেন। তখন তিনি সালাম ফিরানোর পরে দু’টি সাজদাহ করলেন”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৭২।]

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

«صَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الظُّهْرَ خَمْسًا، فَقَالُوا : أَزِيدَ فِي الصَّلاَةِ؟ قَالَ : «وَمَا ذَاكَ» قَالُوا : صَلَّيْتَ خَمْسًا، فَثَنَى رِجْلَيْهِ وَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ»

“একবার রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের সালাত পাঁচ রাকা‘আত আদায় করেন। তখন মুসল্লীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, সালাতে কি কিছু বৃদ্ধি করা হয়েছে? তিনি বললেন, তা কী? তাঁরা বললেন, আপনি যে পাঁচ রাকা‘আত সালাত আদায় করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি নিজের পা ঘুরিয়ে (কিবলামুখী হয়ে) দুই সাজদাহ (সাজদাহ সাহু) করে নিলেন”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৭২।]

কেউ সালাতে ভুলে সালাম ফিরিয়ে ফেললে একটু পরে মনে পড়লে সালাতের বাকী অংশ পূর্ণ করবে, অতঃপর সালাম ফিরাবে, অতঃপর সাহু সাজদাহ দিবে, তারপরে আবার সালাম ফিরাবে। এ সম্পর্কে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِحْدَى صَلاَتَيِ العَشِيِّ قَالَ ابْنُ سِيرِينَ : سَمَّاهَا أَبُو هُرَيْرَةَ وَلَكِنْ نَسِيتُ أَنَا - قَالَ : فَصَلَّى بِنَا رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ سَلَّمَ، فَقَامَ إِلَى خَشَبَةٍ مَعْرُوضَةٍ فِي المَسْجِدِ، فَاتَّكَأَ عَلَيْهَا كَأَنَّهُ غَضْبَانُ، وَوَضَعَ يَدَهُ اليُمْنَى عَلَى اليُسْرَى، وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ، وَوَضَعَ خَدَّهُ الأَيْمَنَ عَلَى ظَهْرِ كَفِّهِ اليُسْرَى، وَخَرَجَتِ السَّرَعَانُ مِنْ أَبْوَابِ المَسْجِدِ، فَقَالُوا : قَصُرَتِ الصَّلاَةُ؟ وَفِي القَوْمِ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَهَابَا أَنْ يُكَلِّمَاهُ، وَفِي القَوْمِ رَجُلٌ فِي يَدَيْهِ طُولٌ، يُقَالُ لَهُ : ذُو اليَدَيْنِ، قَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَسِيتَ أَمْ قَصُرَتِ الصَّلاَةُ؟ قَالَ : «لَمْ أَنْسَ وَلَمْ تُقْصَرْ» فَقَالَ : «أَكَمَا يَقُولُ ذُو اليَدَيْنِ» فَقَالُوا : نَعَمْ، فَتَقَدَّمَ فَصَلَّى مَا تَرَكَ، ثُمَّ سَلَّمَ، ثُمَّ كَبَّرَ وَسَجَدَ مِثْلَ سُجُودِهِ أَوْ أَطْوَلَ، ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ وَكَبَّرَ، ثُمَّ كَبَّرَ وَسَجَدَ مِثْلَ سُجُودِهِ أَوْ أَطْوَلَ، ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ وَكَبَّرَ، فَرُبَّمَا سَأَلُوهُ : ثُمَّ سَلَّمَ؟ فَيَقُولُ : نُبِّئْتُ أَنَّ عِمْرَانَ بْنَ حُصَيْنٍ، قَالَ : ثُمَّ سَلَّمَ»

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদের বিকালে সালাত ইমামতি করলেন। ইবন সীরীন রহ. বলেন, তিনি আমাদের নিয়ে দুই রাকা‘আত সালাত আদায় করে সালাম ফিরালেন। তারপর মসজিদে রাখা এক টুকরা কাঠের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁকে রাগান্বিত মনে হচ্ছিল। তিনি তাঁর হাত বাঁ হাতের উপর রেখে এক হাতের আঙুল অপর হাতের আঙুলের মধ্যে প্রবেশ করালেন। আর তাঁর ডান গাল বাম হাতের পিঠের উপর রাখলেন। যাদের তাড়া ছিল তারা মসজিদের দরজা দিয়ে বাইরে চলে গেলেন। সাহাবীগণ বললেন: সালাত কি সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে? উপস্থিত লোকজনের মধ্যে আবু বকর এবং উমার রাদিয়াল্লাহু ‘‘আনহমাও ছিলেন। কিন্তু তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেলেন। আর লোকজনের মধ্যে লম্বা হাত বিশিষ্ট এক ব্যক্তি ছিলেন, যাকে “যুলইয়াদাইন” বলা হতো। তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি ভুলে গেছেন, নাকি সালাত সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে? তিনি বললেন: “আমি ভুলি নি এবং সালাত সংক্ষেপও করা হয় নি”। এরপর (অন্যদের) জিজ্ঞাসা করলেন: ‘যুলইয়াদাইন’ এর কথা কি ঠিক? তাঁরা বললেন হ্যাঁ। তারপর তিনি এগিয়ে এলেন এবং সালাতের বাদপড়া অংশটুকু আদায় করলেন। তারপর সালাম ফিরালেন ও তাকবীর বললেন এবং স্বাভাবিকভাবে সাজদাহর মতো বা একটু দীর্ঘ সাজদাহ করলেন। তারপর তাকবীর বলে মাথা উঠালেন। পরে আবার তাকবীর বললেন এবং স্বাভাবিকভাবে সাজদাহর মতো বা একটু দীর্ঘ সাজদাহ করলেন। তারপর তাকবীর বলে মাথা উঠালেন। লোকেরা প্রায়ই ইবন সীরীন (রহ.) কে জিজ্ঞাসা করতো “পরে কি তিনি সালাম ফিরিয়েছিলেন?” তখন ইবন সীরীন রহ. বলতেন: আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইমরান ইবন হোসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন: “তারপর তিনি সালাম ফিরিয়েছিলেন”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮২।]

২- সালাতে কোনো কিছু কম বা অপূর্ণ করলে:

কেউ সালাতের কোনো ওয়াজিব ছেড়ে দিলে সালাম ফিরানোর পূর্বে দু’টি সাজদাহ দিবে। যেমন, কেউ প্রথম বৈঠকের তাশাহহুদ ভুলে গেলে তৎক্ষণাৎ মনে না পড়লে বা দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরে মনে পড়লে তখন আর তাশাহহুদের বৈঠকে ফিরে না গিয়ে সালামের পূর্বে সাজদাহ সাহু দিবে। এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবন বুহায়না রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَكْعَتَيْنِ مِنْ بَعْضِ الصَّلَوَاتِ، ثُمَّ قَامَ، فَلَمْ يَجْلِسْ، فَقَامَ النَّاسُ مَعَهُ، فَلَمَّا قَضَى صَلاَتَهُ وَنَظَرْنَا تَسْلِيمَهُ كَبَّرَ قَبْلَ التَّسْلِيمِ، فَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ، ثُمَّ سَلَّمَ»

“কোন এক সালাতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (চার রাকা‘আত বিশিষ্ট সালাতে) দু’ রাকা‘আত সালাত পড়ে না-বসে দাঁড়িয়ে গেলেন। মুসল্লিগণও তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলেন। যখন সালাত সমাপ্ত করার সময় হলো এবং আমরা তাঁর সালাম ফিরানোর অপেক্ষা করছিলাম, তখন তিনি সালাম ফিরানোর আগে তাকবীর বলে বসে বসেই দু’টি সাজদাহ করলেন। তারপর সালাম ফিরালেন”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২২৪।]

৩- সালাতে বেশি বা কমের সন্দেহ হলে:

সালাতে মুসল্লি তিন বা চার রাকা‘আতের সন্দেহ হলে নিম্নোক্ত দু অবস্থা হতে পারে:

ক- বেশি বা কমের প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে সালাত পূর্ণ করবে এবং সালাম ফিরানোর পরে সাহু সাজদাহ দিবে। দলীল হলো: আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَإِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلاَتِهِ، فَلْيَتَحَرَّ الصَّوَابَ فَلْيُتِمَّ عَلَيْهِ، ثُمَّ لِيُسَلِّمْ، ثُمَّ يَسْجُدُ سَجْدَتَيْنِ»

“তোমাদের কেউ সালাত সম্বন্ধে সন্দেহে পতিত হলে সে যেন নিঃসন্দেহে হওয়ার চেষ্টা করে এবং সে অনুযায়ী সালাত পূর্ণ করে। তারপর সে যেন সালাম ফিরিয়ে দু’টি সাজদাহ দেয়”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪০১।]

খ- বেশি বা কমের কোনটিই যদি প্রধান্য না পায় তবে ইয়াকীন তথা নিশ্চিত সংখ্যার ওপর আমল করবে, অর্থাৎ কম সংখ্যক রাকা‘আতের ওপর ভিত্তি করে সালাত পূর্ণ করবে এবং ভুলের জন্য সালামের পূর্বে সাজদাহ সাহু দিবে। এ ব্যাপারে দলীল হলো: আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ، فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى ثَلَاثًا أَمْ أَرْبَعًا، فَلْيَطْرَحِ الشَّكَّ وَلْيَبْنِ عَلَى مَا اسْتَيْقَنَ، ثُمَّ يَسْجُدُ سَجْدَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يُسَلِّمَ، فَإِنْ كَانَ صَلَّى خَمْسًا شَفَعْنَ لَهُ صَلَاتَهُ، وَإِنْ كَانَ صَلَّى إِتْمَامًا لِأَرْبَعٍ كَانَتَا تَرْغِيمًا لِلشَّيْطَانِ»

“তিন রাকা‘আত পড়া হলো না চার রাকা‘আত পড়া হলো- সালাতের মধ্যে তোমাদের কারো এরূপ সন্দেহ হলে সে যে কয় রাকা‘আত পড়েছে বলে নিশ্চিত হবে সেই কয় রাকা‘আতকে ভিত্তি ধরে অবশিষ্ট করণীয় করবে। এরপর সালাম ফিরানোর পূর্বে দু’টি সাজদাহ করবে। (এখন) সে যদি আগে পাঁচ রাকা‘আত পড়ে থাকে তাহলে এ দুই সাজদাহ দ্বারা তার সালাতের জোড়া পূর্ণ হয়ে (ছয় রাকা‘আত হয়ে) যাবে। আর যদি তার সালাত চার রাকা‘আত হয়ে থাকে তাহলে (এই) সাজদাহ দু’টি শয়তানের মুখে মাটি নিক্ষেপের শামিল হবে”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৭১।]

মূলকথা হলো: সাজদাহ সাহু সালামের পূর্বে বা সালামের পরে দিতে হয়। দু জায়গায় সালামের পরে সাজদাহ সাহু দিতে হয়:

প্রথম: সালাত নির্ধারিত কাজের অতিরিক্ত করলে।

দ্বিতীয়: সালাত সন্দেহ হলে কোনো একটিকে প্রধান্য দিলে সালামের পরে সাহু সাজদাহ দিতে হয়।

আর সালামের আগে সাহু সাজদাহ দিতে হয় দু স্থানে:

প্রথম: সালাত নির্ধারিত কাজের কম করলে।

দ্বিতীয়: বেশি কমের সন্দেহ হলে যদি কোনো একটিকে প্রধান্য দেওয়া সম্ভব না হয় তখন কম নিশ্চিত সংখ্যক ধরে সালাতের বাকী অংশ পূর্ণ করে সালামের পূর্বে সাহু সাজদাহ দিতে হয়।