১
হাদীস সংকলনের ইতিহাস
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৫৮
হাদীস বর্ণনার দুইটি পদ্ধতি
নবী করীম (ﷺ) ইতে হাদীস বর্ণনার দুইটি পদ্ধতি রহিয়াছে। নবী করীমের মুখ-নিসৃত কথা- যেভাবে যেসব শব্দ সহকারে তিনি কথাটি বলিয়াছেন, হুবহু সেইভাবে ও সেই সব শব্দ সহকারে বহু হাদীস বর্ণনা করা হইয়াছে। বর্ণনাকারী উহার ভাষা ও শব্দের কোনরূপ পরিবর্তন করেন নাই। এইরূপ বর্ণনাকে বলা হয় রেওয়ায়েত বিল- লাফজ- শাব্দিক বর্ণনা বা রাসূলের ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষায় বর্ণনা করা।
আর রাসূলের মূল বক্তব্যকে নিজস্ব ভাষায় ব্যক্ত ও বর্ণনা করা হইলে এই পদ্ধতিকে বলা হয় রেওয়ায়েত বিল মা’না- ভাব বর্ণনা বা নিজের ভাষায় মূল কথাটি বলিয়া দেওয়া। কিন্তু ইহাতে জরুরী শর্ত এই যে, রাসূলের ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষার পরিবর্তে যে শব্দ ও ভাষা ব্যবহৃত হইবে, তাহা অবশ্যই মূল ভাব ও অর্থের ধারক ও প্রকাশক হইতে হইবে। অর্থাৎ রাসূল যাহা বলিতৈ চাহিয়াছেন তাহাকে নিজস্ব ভাষায় এমনভাবে বলিতে হইবে যেন, তাহাতে মূল বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়, শ্রোতার মনে যেন সেই ভাব ও অর্থই জাগ্রত হয়, যাহা জাগ্রত হইয়াছিল রাসূলের নিকট হইতে উহার প্রথম শ্রবণকারীদের মনে। ইহাতে কোন প্রকার পার্থক্য সৃষ্টি হইলে কিংবা মূল কথার কমবেশী হইয়া গেলে বর্ণনার দায়িত্ব সঠিকরূপে পালন হইতে পারে না।
এই শেষোক্ত পদ্ধতিতেও রাসূলের হাদীস বর্ণনা করা সম্পূর্ণ বিধিসম্মত। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে বর্তমান হাদীসসমূহের অধিকাংশই এই পদ্ধতিতে বর্ণিত। অর্থাৎ রাসূলের কথাটিকে নিজস্ব ভাষায় বর্ণনা করা হইয়াছে।
একজন সাহাবী নবী করীম (ﷺ)-এর খেদমতে আরয করিলেন, ‘আমরা আপনার হাদীস শ্রবণ করি; কিন্তু উহাকে শব্দে বর্ণনা করার সামর্থ্য আমাদের হয় না। (এখন আমরা কি করিব?) নবী করীম (ﷺ) বলিলেনঃ ‘তোমরা যখন হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত কর না, বরং মূল কথাটিকেই নিজস্ব ভাষায় পৌঁছাইয়া দাও, তখন উহাতে কোনই দোষ নাই।
হাদীস বর্ণনাকারীদের শ্রেণী বিভাগ (গুণগত)
হাদীস বর্ণনাকারী লোক গুণগত দিক দিয়াচার শ্রেণীতে বিভক্ত। এই শ্রেণী-পার্থক্যের দৃষ্টিতেই তাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের পর্যায় ও মর্যাদা নির্ণীত হইয়া থাকে।
প্রথম শ্রেণীর হাদীস বর্ণনাকারী তারা, যাঁহারা অত্যন্ত মুত্তাকী, শরীয়াতের পাবন্দ, তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তিসম্পন্ন, ইসলামের বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞাননে পারদর্শী, সূক্ষ্ম বুদ্ধিমান, সুবিবেচক, মুখস্থ করা হাদীসসমূহের পূর্ণ হেফাজতকারী এবং বিদয়াত-বিরোধী।
দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনাকারী তারা, যাঁহাদের গুণ সর্বদিক দিয়াই প্রথম শ্রেণীর বর্ণনাকারীদের সমান। কিন্তু কেবল স্মরণশক্তির দিকদিয়া প্রথম শ্রেণী অপেক্ষা কম। এই পর্যায়ে দুই ধরনের লোক পাওয়া যায়। এক ধরনের লোক- যাঁহারা হাদীস লিখিয়া রাখিতেন, কেবলমাত্র স্মরণশক্তির উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল ছিলেন না। আর দ্বিতীয় ধরনের লোক- যাঁহারা হাদীস লিখিয়া রাখিতেন না। ফলে মূল হাদীসের কোন কোন শব্দ ভূলিয়া যাওয়ার কারণে বর্ণনা করার সময় উহার সম-অর্থবোধক শব্দ তদস্থলে ব্যবহার করিতেন।
তৃতীয় শ্রেণীর বর্ণনাকারী তারা, যাঁহারা শরীয়াতের অনুসরণকারী মুত্তাকী ছিলেন; জ্ঞান-বুদ্ধি, বোধশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টির দিক দিয়া দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনাকারীদের সমান নহেন। যাহা তাঁহাদের স্মরণে রক্ষিত আছে, কেবল তাহাই মূলধন; যাহা ভুলিয়া গিয়াছেন, সেদিকে তাঁহাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নাই। ভুলিয়া যাওয়ার অংশকে তারা কল্পনার সাহায্যে পুরণ করিয়া দিতেন।
চতুর্থ শ্রেণীর বর্ণনাকারী, যাঁহারা দ্বীন-ইসলামের অনুসরণকারী ও শরীয়াত পালনকারী বটে; কিন্তু বুদ্ধি-বিবেচনা ও দূরদৃষ্টির দিক দিয়া তারা পশ্চাৎপদ। লোকদিগকে নসীহত করা, পরকালীন শান্তির আশ্বাস এবং আযাবের ভয় প্রদর্শনের জন্য হাদীস রচনা করাকে তারা জায়েয মনে করিতেন। এই লোকদের আবার চারটি পর্যায় রহিয়াছে। প্রথম তারা, যাঁহারা বৈষয়িক মান-সম্মান লাভের উদ্দেশ্যে হাদীসসমূহের রদ-বদল কিংবা নূতন হাদীস রচনা করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না। দ্বিতীয়, তারা, যাঁহারা নিজেদের খুঁটিনাটি মাসলা সম্পর্কিত মতের সমর্থনে উস্তাদের নিজস্বভাবে প্রয়োগকৃত শব্দ হাদীসের মধ্যে শামিল করিয়া দিতেন। তৃতীয় তারা যাঁহারা বৃদ্ধি-বিবেচনা কম হওয়ার কারণে উস্তাদের উল্লিখিত ব্যাখ্যাদানকারী শব্দসমূহকে মূল হাদীসেরই অংশ মনে করিতেন। চতুর্থ হইতেছে ইসলামের সেইসব দুশনম লোক, যাহারা মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে দলাদলি, বিভেদ-বিচ্ছেদ ও কোন্দল সৃষ্টি এবং উহাতে ইন্ধন যোগাইবার অসদুদ্দেশ্যে হাদীস রচনা করিয়া প্রচার করিতে বিন্দুমাত্র ভয় পাইত না।
আর রাসূলের মূল বক্তব্যকে নিজস্ব ভাষায় ব্যক্ত ও বর্ণনা করা হইলে এই পদ্ধতিকে বলা হয় রেওয়ায়েত বিল মা’না- ভাব বর্ণনা বা নিজের ভাষায় মূল কথাটি বলিয়া দেওয়া। কিন্তু ইহাতে জরুরী শর্ত এই যে, রাসূলের ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষার পরিবর্তে যে শব্দ ও ভাষা ব্যবহৃত হইবে, তাহা অবশ্যই মূল ভাব ও অর্থের ধারক ও প্রকাশক হইতে হইবে। অর্থাৎ রাসূল যাহা বলিতৈ চাহিয়াছেন তাহাকে নিজস্ব ভাষায় এমনভাবে বলিতে হইবে যেন, তাহাতে মূল বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়, শ্রোতার মনে যেন সেই ভাব ও অর্থই জাগ্রত হয়, যাহা জাগ্রত হইয়াছিল রাসূলের নিকট হইতে উহার প্রথম শ্রবণকারীদের মনে। ইহাতে কোন প্রকার পার্থক্য সৃষ্টি হইলে কিংবা মূল কথার কমবেশী হইয়া গেলে বর্ণনার দায়িত্ব সঠিকরূপে পালন হইতে পারে না।
এই শেষোক্ত পদ্ধতিতেও রাসূলের হাদীস বর্ণনা করা সম্পূর্ণ বিধিসম্মত। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে বর্তমান হাদীসসমূহের অধিকাংশই এই পদ্ধতিতে বর্ণিত। অর্থাৎ রাসূলের কথাটিকে নিজস্ব ভাষায় বর্ণনা করা হইয়াছে।
একজন সাহাবী নবী করীম (ﷺ)-এর খেদমতে আরয করিলেন, ‘আমরা আপনার হাদীস শ্রবণ করি; কিন্তু উহাকে শব্দে বর্ণনা করার সামর্থ্য আমাদের হয় না। (এখন আমরা কি করিব?) নবী করীম (ﷺ) বলিলেনঃ ‘তোমরা যখন হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত কর না, বরং মূল কথাটিকেই নিজস্ব ভাষায় পৌঁছাইয়া দাও, তখন উহাতে কোনই দোষ নাই।
হাদীস বর্ণনাকারীদের শ্রেণী বিভাগ (গুণগত)
হাদীস বর্ণনাকারী লোক গুণগত দিক দিয়াচার শ্রেণীতে বিভক্ত। এই শ্রেণী-পার্থক্যের দৃষ্টিতেই তাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের পর্যায় ও মর্যাদা নির্ণীত হইয়া থাকে।
প্রথম শ্রেণীর হাদীস বর্ণনাকারী তারা, যাঁহারা অত্যন্ত মুত্তাকী, শরীয়াতের পাবন্দ, তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তিসম্পন্ন, ইসলামের বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞাননে পারদর্শী, সূক্ষ্ম বুদ্ধিমান, সুবিবেচক, মুখস্থ করা হাদীসসমূহের পূর্ণ হেফাজতকারী এবং বিদয়াত-বিরোধী।
দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনাকারী তারা, যাঁহাদের গুণ সর্বদিক দিয়াই প্রথম শ্রেণীর বর্ণনাকারীদের সমান। কিন্তু কেবল স্মরণশক্তির দিকদিয়া প্রথম শ্রেণী অপেক্ষা কম। এই পর্যায়ে দুই ধরনের লোক পাওয়া যায়। এক ধরনের লোক- যাঁহারা হাদীস লিখিয়া রাখিতেন, কেবলমাত্র স্মরণশক্তির উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল ছিলেন না। আর দ্বিতীয় ধরনের লোক- যাঁহারা হাদীস লিখিয়া রাখিতেন না। ফলে মূল হাদীসের কোন কোন শব্দ ভূলিয়া যাওয়ার কারণে বর্ণনা করার সময় উহার সম-অর্থবোধক শব্দ তদস্থলে ব্যবহার করিতেন।
তৃতীয় শ্রেণীর বর্ণনাকারী তারা, যাঁহারা শরীয়াতের অনুসরণকারী মুত্তাকী ছিলেন; জ্ঞান-বুদ্ধি, বোধশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টির দিক দিয়া দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনাকারীদের সমান নহেন। যাহা তাঁহাদের স্মরণে রক্ষিত আছে, কেবল তাহাই মূলধন; যাহা ভুলিয়া গিয়াছেন, সেদিকে তাঁহাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নাই। ভুলিয়া যাওয়ার অংশকে তারা কল্পনার সাহায্যে পুরণ করিয়া দিতেন।
চতুর্থ শ্রেণীর বর্ণনাকারী, যাঁহারা দ্বীন-ইসলামের অনুসরণকারী ও শরীয়াত পালনকারী বটে; কিন্তু বুদ্ধি-বিবেচনা ও দূরদৃষ্টির দিক দিয়া তারা পশ্চাৎপদ। লোকদিগকে নসীহত করা, পরকালীন শান্তির আশ্বাস এবং আযাবের ভয় প্রদর্শনের জন্য হাদীস রচনা করাকে তারা জায়েয মনে করিতেন। এই লোকদের আবার চারটি পর্যায় রহিয়াছে। প্রথম তারা, যাঁহারা বৈষয়িক মান-সম্মান লাভের উদ্দেশ্যে হাদীসসমূহের রদ-বদল কিংবা নূতন হাদীস রচনা করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না। দ্বিতীয়, তারা, যাঁহারা নিজেদের খুঁটিনাটি মাসলা সম্পর্কিত মতের সমর্থনে উস্তাদের নিজস্বভাবে প্রয়োগকৃত শব্দ হাদীসের মধ্যে শামিল করিয়া দিতেন। তৃতীয় তারা যাঁহারা বৃদ্ধি-বিবেচনা কম হওয়ার কারণে উস্তাদের উল্লিখিত ব্যাখ্যাদানকারী শব্দসমূহকে মূল হাদীসেরই অংশ মনে করিতেন। চতুর্থ হইতেছে ইসলামের সেইসব দুশনম লোক, যাহারা মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে দলাদলি, বিভেদ-বিচ্ছেদ ও কোন্দল সৃষ্টি এবং উহাতে ইন্ধন যোগাইবার অসদুদ্দেশ্যে হাদীস রচনা করিয়া প্রচার করিতে বিন্দুমাত্র ভয় পাইত না।