১
হাদীস সংকলনের ইতিহাস
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২১
‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতয়াতে’ রাসূল
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলেরও আনুগত্য ও অনুসরণ করার জন্য স্পষ্ট ভাষায় আদেশ করা হইয়াছে। আল্লাহর এই আদেশকে সঠিকরূপে অনুধাবন করার জন্য কুরআনে ব্যবহৃত ‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতায়াত’ শব্দদ্বয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ আবশ্যক। এখানে আমরা এই শব্দ দুইিট সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করিব।
আরবী ভাষায় ‘ইত্তিবা’ () বলা হয় কোন ব্যক্তির পিছনে পিছনে চলাকে। ইবনে মনজুর তাঁহার বিখ্যাত অভিধান গ্রন্হ ‘লিসানুল আরব’-এ বলিয়াছেনঃ
অভিধান ও ব্যাকরণ শাস্ত্রের ইমাম ফরা বলেনঃ ইত্তিবা বলিতে বুঝায়ঃ কোন ব্যক্তি অগ্রে অগ্রে চলে এবং তুমি তাহার পিছনে পিছনে চল। এখন তুমি যদি বল, আমি তাহার ‘ইত্তিবা’ করি, তবে বুঝাইবে যে, তুমি তাহার পদাংক অনুসরণ করিয়া পিছনে পিছনে চলিতেছ।
‘তাজুল উরুস’ গ্রন্হে বলা হইয়াছেঃ
‘তুব্বু’ বা ‘তুব্বু’ যেমন সুক্কারু, অর্থ ছায়া। উহাকে ছায়া বলা হয় এই জন্য যে, উহা সব সময়ই সূর্যের অনুসরণ করিয়া চলে। এই সম্পর্কের দৃষ্টিতে মধুমক্ষিকাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বোক্তম (পুরুষ) মক্ষিকাকেও ‘তুব্বা’ বলা হয়। কেননা সমস্ত সাধারণ মক্ষিকা উহাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করিয়া চলে।
ইমাম আবুল আল-আ-মদী উহার পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা প্রসংগে বলিয়াছেনঃ
‘মুতাবিয়াত-অনুসরণ- কখনো কথার ব্যাপারে হয়, কখনো কোন কাজ করা বা না করার ব্যাপারে হয়। কথার ব্যাপারে ‘ইত্তিবা’ হইতেছে কথার দাবি ও প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করা। আর কাজের ক্ষেত্রে ‘ইত্তিবা’ হইতেছে কাহারো কাজ দেখিয়া তাহা এমনভাবে করা ঠিক যেভাবে সে করিতেছে। এবং সে করিতেছে বলিয়াই সেই কাজ করা হইবে।
এই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যাইতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলার নির্দেম অনুযায়ী রাসূলের ‘ইত্তিবা’ করার জন্য রাসূলের প্রত্যেকটি কথা এমনভাবে পালন করিতে হইবে, যেমনভাবে পালন করা তাঁহার কথার লক্ষ্য ও দাবি এবং রাসূলের কাজগুলিকে যেভাবে তিনি সম্পন্ন করিয়াছেন ঠিক সেইভাবেই সম্পন্ন করিতে হইবে। অন্যথায় রাসূলকে ‘ইত্তিবা’ করার আল্লাহর আদেশ পালন হইতে পারে না।
‘ইতায়াত’ () শব্দটিও অনুরূপভাবে ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। আরবী ভাষায় ‘ইতায়াত’ বলা হয় কাহারো সম্মখে আনুগত্যের মস্তক অবনমিত করাকে, কাহারো হুকুম আহকামযথাযথরূপে পালন করাকে।
‘লিসানুল আরব’ গ্রন্হে উল্লেখ করা হইয়াছেঃ
‘তাহযীব’ নামক প্রামাণ্য অভিধান গ্রন্হে বলা হইয়াছে কথাটির অর্থ কাহারো সম্মুখে আনুগত্যের মস্তক নত করিয়া দেওয়া। কেহ যদি অপর কাহারো আদেশ পালন করে, তখন বলা হয় সে তাহার আনুগত্য করিল।
ইমাম আবুল হাসান আল-আ-মদী ‘ইতায়াত’ শব্দর পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ
কাহাকেও বড় জানিয়া বা বড় করার উদ্দেশ্যে যদি কেহ তাহার মত কাজ করে, তবে সে তাহার ‘অনুগত হইল’ বলা হয়।
‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতায়াত’ শব্দদ্বয়ের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের এই আলোচনা হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হইল যে, রাসূলের কথাও কাজকে পুরাপুরি মানিয়া লওয়া এবং যথাযথরূপে পালন করা এক কথায় তাহার পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও অনুসরণ করা মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। আর রাসূলের যাবতীয় কথা ও কাজের বিবরণ যেহেতু হাদীসের মাধ্যমেই জানা যাইতে পারে, এজন্যই দ্বীন-ইসলামে হাদীসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
এই প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের আর একটি আয়াতের উল্লেখ করা আবশ্যক বোধ হইতেছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ
কোন বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলের ফযসালা এবং ফরমান আছার পর তাহা মানা-না- মানার ব্যাপারে মু’মিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকের কোন ইখতিয়ারই থাকিতে পারে না। সে লোক আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের নাফরমানী করে, সে পথভ্রষ্ট হইয়া ইসলাম হইতে বহুদূরে চলিয়া যায়।
[সূরা আল-আহযাব, ৩৬ আয়াত।]
এই আয়াত হইতে একসঙ্গে তিনটি কথা জানা যায়। প্রথশ এই যে, কোন বিষয়ে আল্লাহর যেমন স্বাধীনভাবে কোন ফয়সালা করার বা ফরমান দেওয়ার অধিকার আছে, আল্লাহর রাসূলেরও ঠিক সেইরূপ অধিকার আছে। দ্বিতীয় এই যে, মু’মিন স্ত্রী-পুরুষ যেমন আল্লাহর ফরমান ও ফয়সালা মানিয়া লইতে বাধ্য, রাসূলের ফয়সালা ও ফরমানও অনুরুপভাবে মানিয়া লইতে বাধ্য। তৃতীয় এই যে, আল্লাহর ফরমান ও ফয়সালা না মানিলে যেমন মানুষ গোমরাহ ও কাফির হয়, রাসূলের ফয়সালা ও ফরমান না মানিলেও সেইভাবেই গোমরাহ ও কাফির হইতে হয়।
অতএব কুরআন মজীদের মত রাসূলের ফরমান ও ফয়সালা নির্ভরযোগ্য রেকর্ড-হাদীস- মানিয়া লওয়াও প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানদার হওয়া এবং ঈমানদার হইয়া জীবন যাপন করার জন্য একান্তই অপরিহার্য।
আরবী ভাষায় ‘ইত্তিবা’ () বলা হয় কোন ব্যক্তির পিছনে পিছনে চলাকে। ইবনে মনজুর তাঁহার বিখ্যাত অভিধান গ্রন্হ ‘লিসানুল আরব’-এ বলিয়াছেনঃ
অভিধান ও ব্যাকরণ শাস্ত্রের ইমাম ফরা বলেনঃ ইত্তিবা বলিতে বুঝায়ঃ কোন ব্যক্তি অগ্রে অগ্রে চলে এবং তুমি তাহার পিছনে পিছনে চল। এখন তুমি যদি বল, আমি তাহার ‘ইত্তিবা’ করি, তবে বুঝাইবে যে, তুমি তাহার পদাংক অনুসরণ করিয়া পিছনে পিছনে চলিতেছ।
‘তাজুল উরুস’ গ্রন্হে বলা হইয়াছেঃ
‘তুব্বু’ বা ‘তুব্বু’ যেমন সুক্কারু, অর্থ ছায়া। উহাকে ছায়া বলা হয় এই জন্য যে, উহা সব সময়ই সূর্যের অনুসরণ করিয়া চলে। এই সম্পর্কের দৃষ্টিতে মধুমক্ষিকাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বোক্তম (পুরুষ) মক্ষিকাকেও ‘তুব্বা’ বলা হয়। কেননা সমস্ত সাধারণ মক্ষিকা উহাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করিয়া চলে।
ইমাম আবুল আল-আ-মদী উহার পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা প্রসংগে বলিয়াছেনঃ
‘মুতাবিয়াত-অনুসরণ- কখনো কথার ব্যাপারে হয়, কখনো কোন কাজ করা বা না করার ব্যাপারে হয়। কথার ব্যাপারে ‘ইত্তিবা’ হইতেছে কথার দাবি ও প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করা। আর কাজের ক্ষেত্রে ‘ইত্তিবা’ হইতেছে কাহারো কাজ দেখিয়া তাহা এমনভাবে করা ঠিক যেভাবে সে করিতেছে। এবং সে করিতেছে বলিয়াই সেই কাজ করা হইবে।
এই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যাইতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলার নির্দেম অনুযায়ী রাসূলের ‘ইত্তিবা’ করার জন্য রাসূলের প্রত্যেকটি কথা এমনভাবে পালন করিতে হইবে, যেমনভাবে পালন করা তাঁহার কথার লক্ষ্য ও দাবি এবং রাসূলের কাজগুলিকে যেভাবে তিনি সম্পন্ন করিয়াছেন ঠিক সেইভাবেই সম্পন্ন করিতে হইবে। অন্যথায় রাসূলকে ‘ইত্তিবা’ করার আল্লাহর আদেশ পালন হইতে পারে না।
‘ইতায়াত’ () শব্দটিও অনুরূপভাবে ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। আরবী ভাষায় ‘ইতায়াত’ বলা হয় কাহারো সম্মখে আনুগত্যের মস্তক অবনমিত করাকে, কাহারো হুকুম আহকামযথাযথরূপে পালন করাকে।
‘লিসানুল আরব’ গ্রন্হে উল্লেখ করা হইয়াছেঃ
‘তাহযীব’ নামক প্রামাণ্য অভিধান গ্রন্হে বলা হইয়াছে কথাটির অর্থ কাহারো সম্মুখে আনুগত্যের মস্তক নত করিয়া দেওয়া। কেহ যদি অপর কাহারো আদেশ পালন করে, তখন বলা হয় সে তাহার আনুগত্য করিল।
ইমাম আবুল হাসান আল-আ-মদী ‘ইতায়াত’ শব্দর পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ
কাহাকেও বড় জানিয়া বা বড় করার উদ্দেশ্যে যদি কেহ তাহার মত কাজ করে, তবে সে তাহার ‘অনুগত হইল’ বলা হয়।
‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতায়াত’ শব্দদ্বয়ের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের এই আলোচনা হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হইল যে, রাসূলের কথাও কাজকে পুরাপুরি মানিয়া লওয়া এবং যথাযথরূপে পালন করা এক কথায় তাহার পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও অনুসরণ করা মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। আর রাসূলের যাবতীয় কথা ও কাজের বিবরণ যেহেতু হাদীসের মাধ্যমেই জানা যাইতে পারে, এজন্যই দ্বীন-ইসলামে হাদীসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
এই প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের আর একটি আয়াতের উল্লেখ করা আবশ্যক বোধ হইতেছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ
কোন বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলের ফযসালা এবং ফরমান আছার পর তাহা মানা-না- মানার ব্যাপারে মু’মিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকের কোন ইখতিয়ারই থাকিতে পারে না। সে লোক আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের নাফরমানী করে, সে পথভ্রষ্ট হইয়া ইসলাম হইতে বহুদূরে চলিয়া যায়।
[সূরা আল-আহযাব, ৩৬ আয়াত।]
এই আয়াত হইতে একসঙ্গে তিনটি কথা জানা যায়। প্রথশ এই যে, কোন বিষয়ে আল্লাহর যেমন স্বাধীনভাবে কোন ফয়সালা করার বা ফরমান দেওয়ার অধিকার আছে, আল্লাহর রাসূলেরও ঠিক সেইরূপ অধিকার আছে। দ্বিতীয় এই যে, মু’মিন স্ত্রী-পুরুষ যেমন আল্লাহর ফরমান ও ফয়সালা মানিয়া লইতে বাধ্য, রাসূলের ফয়সালা ও ফরমানও অনুরুপভাবে মানিয়া লইতে বাধ্য। তৃতীয় এই যে, আল্লাহর ফরমান ও ফয়সালা না মানিলে যেমন মানুষ গোমরাহ ও কাফির হয়, রাসূলের ফয়সালা ও ফরমান না মানিলেও সেইভাবেই গোমরাহ ও কাফির হইতে হয়।
অতএব কুরআন মজীদের মত রাসূলের ফরমান ও ফয়সালা নির্ভরযোগ্য রেকর্ড-হাদীস- মানিয়া লওয়াও প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানদার হওয়া এবং ঈমানদার হইয়া জীবন যাপন করার জন্য একান্তই অপরিহার্য।