hadith book logo

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫০

তাবেয়ীদের হাদীস সাধনা

নবী করীম (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবীদের যুগ সূচিত হয়। সাহাবায়ে কিরাম যেভাবে নবী করীমের নিকট হইতে কুরআন-হাদীস তথা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষালাভ করিয়া বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন, সাহাবায়ে কিরামও ঠিক সেইভাবে তাঁহাদেরই পরবর্তী পর্যায়ের লোক তাবেয়ীদিগকে কুরআন-হাদীস এবং ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দিয়াছেন। নবী করীম (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় ইসলামী জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে স্বয়ং নবীর যে মর্যাদা ছিল, নবী করীমের অন্তর্ধানের পর সাহাবায়ে কিরাম (রা) অনুরূপ দায়িত্বপূর্ণ মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। তারাও ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চেষ্টার মারফতে তাবেয়ী যুগের মুসলিম জনগণকে ইসলামী জ্ঞানধারায় পরিষিক্ত করার জন্য কুরআন ও হাদীস জ্ঞানের অধিকতর পারদর্শী করিয়া তুলিবার কাজে ব্রতী হন। নবী করীম (ﷺ) যেভাবে মদীনায় প্রাথমিক পর্যায়ে এক বিরাট জ্ঞান-কেন্দ্র স্থাপন করিয়াছিলেন, উত্তরকালে সাহাবীদের অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাগে ও নিজস্ব পরিমণ্ডলে এক-একটি জ্ঞান-চক্র রচনা করিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের নিকট হইতে তাবেয়ী যুগের মুসলিমগণ কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান অর্জন করেন। কিন্তু তাবেয়ী কে? এ সম্পর্কে মৌলিক আলোচনা এখানেই হওয়া আবশ্যক। ঐতিহাসিক খতীব বাগদাদী এই সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

তাবেয়ী তিনি,যিনি সাহাবীরে সংস্পর্শে রহিয়াছেন।

এই সংজ্ঞা অনুযায়ী সাহাবীর সহিত নিছক সাক্ষাৎ লাভই তাবেয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং সাহাবীর একত্রে কিছুকাল অতিবাহিত করাও জরুরী। কিন্তু বহুসংখ্যক মুহাদ্দিসের মত অন্যরূপ। তাঁহাদের মতেঃ

‘তাবেয়ী’ তিনি , যিনি কোন সাহাবীর সাক্ষাৎ পাইয়াছেন, যদিও তাঁহার সংস্পর্শে থাকেন নাই।

ইবনে হাব্বান এই ব্যাপারে সাহাবীর সহিত সাক্ষাতকালে তাবেয়ী’র মধ্যে বুদ্ধি ও ভালমন্দ জ্ঞানের উন্মেষ হওয়ার শর্ত আরোপ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

সাক্ষাতের সময় যদি সে অল্প বয়স্ক হইয়া থাকে এবং যাহা কিছু শুনিয়াছে তাহার পূর্ণ হেফাযত ও সংরক্ষণে সমর্থ হইয়া না থাকে, তাহা হইলে সাহাবীর সহিত তাহার নিছক সাক্ষাৎলাভের কোন মূল নাই।

সাহাবীদের পর তাবেয়ীদের উচ্চমর্যাদা কুরআন মজীদেও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। বলা হইয়াছেঃ

এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাহারা ইসলাম কবুল করার ব্যাপারে অগ্রবর্তিতা লাভ করিয়াছে এবং যাহারা ঐকান্তিক আত্মোৎসর্গ ও সন্তোষ সহকারে তাহাদের অনুসরণ করিয়াছেন, আল্লাহ তাহাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তাহারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এবং আল্লাহ তাহাদের জন্য বাগান তৈরী করিয়া রাখিয়াছেন, যাহার নিম্নদেশ হইতে ঝরনাধারা প্রবাহিত রহিয়াছে।

[সূরা আত-তাওরা, ২য় রুকূ, ১০০ নং আয়াত।]

কুরআনের এই আয়াতে মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের পরেই তাবেয়ীদের কথা বরা হইয়াছে। ইহারা ঈমান ও আমলের ব্যাপারে যেমন সাহাবায়ে কিরামরে অধীন, অনুরূপভাবে কালের দিক দিয়াও তারা সাহাবদের উত্তরসূরী। এই কারণেই প্রচলিত পরিভাষায় তাঁহাদিগকে ‘তাবেয়ীন’ (পরবর্তী বা অনুসারী) বলা হইয়াছে।

তাবেয়ীদের কথা হাদীসেও বিশেষ মর্যাদা সহকারে বলা হইয়াছে। রাসূলে করীম (ﷺ) ইরশাদ করিয়াছেনঃ

আমার সমকালীন লোকগণ (সাহাবী) আমার উম্মতের মধ্যে উত্তম। তাহাদের পর তাহারা, যাহারা তাহাদের সহিত মিলিতকালে অবস্থিত (তাবেয়ী’ন) তাহাদের পর তাহাদের সহিত মিলিতকালের লোকগণ (তাবে-তাবেয়ীন)।

[মুসলিম শরীফ, কিতাবুল ফাজায়েল পৃষ্ঠা ৩০৯।]

বস্তুত সাহাবাদের পরবর্তী সময়ের মুসলিম জামা’আত- তাবেয়ীন মোটামুটিভাবে সাহাবীদেরই প্রতিবিম্ব ছিলেন। তারা একদিকে যেমন রাসূলের সাহাবীদের নিকট হইতে কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করেন, অপরদিকে তারা তদানীন্তন বিরাট মুসলিম সমাজের দিকে দিকে কোণে কোণে উহার ব্যাপক প্রচারাকার্য় সম্পাদন করেন। ইসলামী ইলমে সাহাবীদের নিকট হইতে গ্রহণ ও পরবর্তীকালের অনাগত মুসলিমদের নিকট উহা পৌঁছাইবার জন্য কার্যত তারাই মাধ্যম হইয়াছিলেন।

[তাবেয়ীন-শাহ মুয়ীনউদ্দীন প্রণীত, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ২-৩।]

এই তাবেয়িগণ সংখ্যায় ছিলেন অনেক- তাঁহাদের সংখ্যা নির্ভূলভাবে নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। কেননা নবী করীম (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম দুনিয়ার বিভিন্ন দিকে ছড়াইয়া পড়েন এবং-

সাহাবীদের মধ্য হইতে একজনের সঙ্গেও যাঁহার সাক্ষাৎ ঘটিয়াছে, তিনিই একজন তাবেয়ী।

এই কারণে সারা মুসলিম জাহানে বিশেষভাবে এবং সারা দুনিয়ায় সাধারণভাবে কত সংখ্যক তাবেয়ী হইয়াছিলেন, তাহা নিরূপণ করা বাস্তবিকই অসম্ভব। কিন্তু হাদীস সংকলনের ইতিহাসে কেবল সেইসব তাবেয়ীই উল্লেখযোগ্য, যাঁহারা নবী করীম (ﷺ)-এর পরবর্তী যুগে হাদীস শিক্ষা, হাদীস কণ্ঠস্থকরণ ও লিখনের সহিত কোন না কোন দিক দিয়া জড়িত ছিলেন। তাবেয়ীদের হাদীস সাধনা পর্যায়ে আমরা কেবল এই শ্রেণীর প্রখ্যাত তাবেয়ীদের সম্পর্কেই আলোচনা করিব।

তাবেয়ীদের যুগে হাদীস শিক্ষার যে ক্রমিক পদ্ধতি ছিল, তাহা নিম্নোক্ত বাক্যাংশ হইতে প্রমাণিত হয়ঃ

ইলমে হাদীস শিক্ষার পদ্ধতি এইরূপ ছিল যে, প্রথমে শ্রবণ করা হইত, পরে উহাতে মনোযোগ স্থাপন করা হইত, তাহার পর উহা মুখস্থ করা হইত, অতঃপর তদনুযায়ী আমল শুরু করা হইত এবং উহার পর তাহা প্রচার করার জন্য বাস্তব কার্যক্রম গ্রহণ করা হইত।

বস্তুত ঠিক এই পদ্ধতি ও ক্রমিক অনুযায়ীই সাহাবায়ে কিরাম (রা) তাঁহাদের শিষ্য- শাগরিদদিগকে হাদীসের শিক্ষা দান করিতেন এবং নবী করীম (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী সমাজকেন্দ্রে জ্ঞান বিস্তারের আলোক-স্তম্ভ রচনা করিয়াছিলেন। ফলে এই যুগে বিপুল সংখ্যক লোক হাদীস শিক্ষা লাভ করার ও তদনুযায়ী নিজেদের জীবন গড়িয়া তুলিবার সুযোগ লাভ করেন। হাদীস মুখস্থ করা, হাদীস লিখিয়া রাখা এবং হাদীস গ্রন্হ সংকলন করা প্রভৃতি সকল কাজেই তারা পূর্ণমাত্রায় উদ্যোগী ও উৎসাহী হইয়াছিলেন। সেই সঙ্গে এই সকল বিষয়ে তারা পূর্ণ ব্যুৎপত্তি, কৃতিত্ব, যশ ও খ্যাতি লাভ করেন।

তাবেয়ী যুগে হাদীস চর্চার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে এখানে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা যাইতেছে।