hadith book logo

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭৩

(গ) তাবে-তাবেয়ীদের যুগ

তাবেয়ী যুগে হাদীস সংগ্রহের যে অভিযান আরম্ভ হয়, তাহা পরবর্তী দুই-তিন শতাব্দী পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে চলিতে থাকে। তাবে-তাবেয়ীনের যুগে ইহার প্রয়োজন যেমন কিছুমাত্র হ্রাস পায় নাই, তেমনি এই অভিযান কিছু মাত্র ক্ষীণ ও ব্যাহতও হয় নাই। বরং আমরা দেখিতে পাই, তাবে-তাবেয়ীনের পর্যায়ে এই অভিযান পূর্বপেক্ষাও ব্যাপকতর রূপ লাভ করে। তাবেয়ীনের পর তাঁহাদেরই লালিত ও তৈরী করা তাবে-তাবেয়ীদের জামাআত এই মহন ব্রত পূর্ণ মাত্রায় নিজেদের স্কন্ধে গ্রহণ করেন এবং নিজেদের সময়ের অবস্থা ও প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া এই কঠিন দয়িত্ব পালনে ব্রতী হন। এই পথে পূর্ববর্তীদের ন্যায় তাঁহাদেরও অপরিসীম দুঃখ ও কষ্ট স্বীকার করিতে হইয়াছে।

তাবে-তাবেয়ীনের যুগে সন-তারিখের দৃষ্টিতে নির্ধারণ করা কঠিন, যেমন কঠিন তাবেয়ীনের যুগ নির্ধারণ। ঠিক কখন, কত সনে তাঁহাদের যুগের সূচনা এবং কবে তাহার সমাপ্তি, তাহা সুস্পষ্ট করিয়া বলা বাস্তবিকই সম্ভব নয়। কোন কোন ঘটনা ও নিদর্শনের আলোকে বলা যায় যে, নবী করীম (ﷺ)-এর যুগেই তাবেয়ীনের যুগ সূচিত হইয়াছিল। কেননা এই যুগে এমন কিছু মহান লোকের সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁহারা নিজেদের চক্ষে রাসূলে করীমের চেহারা মুবারক দর্শন করিতে না পারিলেও ইসলামের দাওয়াত যখনই তাঁহাদের কর্ণে প্রবেশ করিয়াছে, তখনই তারা অকৃত্রিম আন্তরিকতা সহকারে তাহা কবুল করিয়াছেন। ওয়ায়েস করনী ও আবিসিনিয়ার বাদশাহ আসহামার নাম এই পর্যায়ে উল্লেখ করা যায়। ফলে একথা বলা যায় যে, প্রায় এক শতাব্দী কাল পর্যন্ত সাহাবাদের যুগ ও তাবেয়ীদের যুগ একই সঙ্গে পাশাপাশি অতিবাহিত হইয়াছে। কিন্তু প্রথম হিজরী শতকের সমাপ্তিতে এই যুগেরও সমাপ্তি হইয়া যায়। তখন তখনই তাবেয়ীদের লালিত, দীক্ষিত ও তৈরী করা লোকদের অর্থাৎ তাবে-তাবেয়ীনের যুগ আরম্ভ হইয়া যায়। কিন্তু তাবেয়ীনের যুগ তখনও শেষ হইয়া যায় নাই। বরং তাবে-তাবেয়ীনের যুগের সঙ্গে সঙ্গে তাহাও চলিতে থাকে এবং প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শতাব্দীকাল পর্যন্ত একই সঙ্গে অতিবাহিত হইতে থাকে।

অনুরূপভাবে তাবে-তাবেয়ীনের যুগ ঠিক কখন শুরু হইল এবং কখন শেষ হইয়া গেল, সন-তারিখের ভিত্তিতে তাহা বলা কঠিন। কিন্তু কোন কোন তাবে-তাবেয়ীর জন্ম তারিখ ও কোন কোন তাবেয়ীর মৃত্যু সনের ভিত্তিতে বলা যায় যে, প্রথম হিজরী শতকের শেষভাগ হইতেই এই যুগের সূচনা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ইমাম শো’বা’র জন্ম হয় ৮০ হিজরী সনে, ইমাম আবূ হানীফাও এই সনেই জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সকল জীবনী রচয়িতাই ইমাম শো’বাকে তাবে-তাবেয়ীন ও ইমাম আবূ হানীফাকে তাবেয়ীনের মধ্যে গণ্য করিয়া থাকেন। এতদসত্ত্বেও প্রকৃত কথা এই যে, তাবে-তাবেয়ীনের আসল যুগ দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথম চতুর্থাংশে সূচিত হইয়া তৃতীয় শতকের প্রথম চতুর্থাংশ পর্যন্ত শেষ হইয়া যায়। কেননা অনেক তাবেয়ী’ই ১৬৪ হিজরী হইতে ১৭৪ সনে ইন্তেকাল করেন। অন্য কথায় বলা যায়, উমাইয়া বংশের খলীফা দ্বিতীয় ওলীদের সময় হইতে আব্বাসী বংশের দশম খলীফা মুতাওয়াক্কিলের সময় পর্যন্ত তাবে-তাবেয়ীনের যুগ বর্তমান ছিল।

পূর্বেই বলিয়াছি, এই যুগের হাদীসের চর্চা, প্রচার ও সংগ্রহ পূর্বাপেক্ষাও অধিক ব্যাপক ও গভীরভাবে চলে। এই যুগে যাঁহারা ইলমে হাদীসে সর্বাধিক বুৎপত্তি এবং খ্যাতি অর্জন করেন, তাঁহাদের মধ্যে নিম্নোক্ত লোকগণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যঃ

(১) ইমাম আবূ হানীফা (২) ইমাম মালিক (৩) ইমাম আবূ ইউসুফ (৪) ইমাম মুহাম্মদ শায়বানী (৫) ইমাম আওযায়ী (৬) ইমাম ইবনে জুরাইজ (৭) ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়ায় (৮) ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (৯) আবদুল্লাহ ইবেন মুবারক (১০) ইমাম শু’বা (১১) মুসয়ের ইবনে কুদাম (১২) আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব (১৩) ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন (১৪) আলী ইবনে মাদানী (১৫) ইমাম লাইস ইবনে সায়াদ (১৬) হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াজ এবং (১৭) ইয়াহইয়া ইবনে আদাম (র)।

আমরা এখানে তাঁহাদের মধ্যে প্রধান কয়েকজনের হাদীস সাধনা ও সংগ্রহ অভিযান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করিব।