১
হাদীস সংকলনের ইতিহাস
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৯৭
মিঃ ম্যূরের অপরাপর উক্তি
এই প্রসঙ্গে মিঃ ম্যূরের আরো কয়েকটি উক্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁহার Life of Muhammad গ্রন্হের এক স্থানে হাদীস যাচই পদ্ধতি সম্পর্কে কটাক্ষ করিয়া বলিয়াছেনঃ
মুহাদ্দিসদের নিকট কোন হাদীসের গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সেই হাদীসের মূল কথাটির উল্লেক প্রয়োজনীয় বিবেটিত হইত না। কেবল হাদীস বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট ছিল।
মিঃ ম্যূরের এই কথা হইতেও প্রমাণিত হয় যে, ইলমে হাদীসের পরিভাষা ও হাদীস যাচাইয়ের রীতিনীতি সম্পর্কে তিনি সবিশেষ অবিহিত নহেন। কেননা হাদীস যাচাই করার জন্য ‘রেওয়ায়েত’ ও ‘দেরায়েত’ এই দুইটি পদ্ধটিই হাদীস জগতে নির্ধারিত ও সর্বজন পরিচিত। হাদীস যাচাইয়ের ইহা অপেক্ষা উত্তম রীতিনীতি আর কিছুই হইতে পারে না। ‘রেওয়ায়েত’ পদ্ধতিতে হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা যাচাই করা হয় এবং তখন মূল হাদীস উল্লেখ করার কোন প্রয়োজনই হয় না। পক্ষান্তরে ‘দেরায়েত’ পদ্ধতিতে হাদীসের শুধু মূল বাণী টুকুর যথার্থতা যাচাই করা হয়, আর তখন- সেইসময়- বর্ণনাকারীদের অবস্থা যাচাই করা অবান্তর হইয়া দাঁড়ায়।
ম্যূর সাহেব আর একটি মারাত্মক ভূল উক্তি করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, মুহাদ্দিসগণের হাদীস অনুসন্ধান ও যাচাই পরখের নীতি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি কোন আস্থা ও উদারতার ভাব বর্তমান ছিল না। এইজন্য প্রত্যেক মুহাদ্দিসই নিজম্ব পদ্ধতি অনুযায়ী হাদীস গ্রহণ এবং বর্জন করিয়াছেন। মুহাদ্দিসদের সম্পর্কে এই উক্তিটি অমূলক। এই ধরনের কথা একমাত্র সেই ব্যক্তিই বলিতে পারেন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে যাঁহার বিন্দুমাত্র ধারণা বা শ্রদ্ধা নাই অথবা ইসলামের দুশমনী করা্ই যাঁহার স্থিরসংকল্প। ইজতিহাদ-নীতিও এই সম্পর্কীয় মত-পার্থক্যের ম্যূর সাহেব পারস্পরিক অনাস্থা ও অশ্রদ্ধা বলিয়া অভিহিত করিতে চাহেন। কিন্তু প্রকৃপক্ষে ইহা কোন অনাস্তার ব্যাপার নহে। ইহা প্রত্যেকের ইজতিহাদ নীতি ও মত বা রায়ের পার্থক্য মাত্র। এই জন্যই দেখিতে পাই- ইমাম মুসলিম ইমাম বুখারীর কোন কোন মত বা পদ্ধতির সমালোচনা করিয়াছেন; কিন্তু তাঁহাকে ‘সাইয়েদুল মুহাদ্দিসীন- শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস’ বলিয়া মান্য করিতে ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠত হইতেন না। বস্তুত মত-পার্থক্যের কারণেই হাদীসের সূত্র বা সনদসমূহ যাচাই করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
মুহাদ্দিসদের পারস্পরিক মত-পার্থক্যের দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ইমাম বুখারী ‘যে ব্যক্তি যাহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছে’ এতদুভয়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষাত ও দীর্ঘদিন একত্র থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। কিন্তু ইমাম মুসলিম মনে করেন, উভয়ের সমসাময়িক ও একই যুগের হওয়াই যথেষ্ট। ইমাম বুখারী কেবল সেইসব বর্ণনাকারীর হাদীসই গ্রহণ করার পক্ষপাতী, যাঁহাদের ‘সিকাহ’‘বিশ্বস্ত’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’ হওয়া সম্পর্কে সকলেই একমত। কিন্তু ইমাম নাসায়ী এমন লোকের বর্ণিত হাদীসও গ্রহণ করিতেন, যাহাদের ‘সিকাহ’ হওয়া সম্পর্কে সকলের একমত নহেন। বস্তুত পারস্পরিক আস্থাহীনতার কিংবা হিংসা-বিদ্বেষের কারণে এইরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় নাই, বরং ইহা নিছক মতবিরোধ- রায়- পার্থক্য মাত্র এব রায়- পার্থক্য ভিন্ন ইহা আর কিছুই নহে। পরবর্তিকালে মুহদ্দিসগণ যদি হাদীস বর্ণনাপরম্পরার নূতন কোন বিশ্বস্ত সূত্র পাইতেন, তবে ‘ছয়জন ইমামে হাদীসে’র মধ্য হইতে কোন একজনের নির্ধারিত মূল নীতি অনুযায়ী কোন হাদীস গ্রহণ করিতেন। ইহা ক্ষেত্র প্রশস্ততারই পরিচায়ক।
সমাপ্ত
মুহাদ্দিসদের নিকট কোন হাদীসের গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সেই হাদীসের মূল কথাটির উল্লেক প্রয়োজনীয় বিবেটিত হইত না। কেবল হাদীস বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট ছিল।
মিঃ ম্যূরের এই কথা হইতেও প্রমাণিত হয় যে, ইলমে হাদীসের পরিভাষা ও হাদীস যাচাইয়ের রীতিনীতি সম্পর্কে তিনি সবিশেষ অবিহিত নহেন। কেননা হাদীস যাচাই করার জন্য ‘রেওয়ায়েত’ ও ‘দেরায়েত’ এই দুইটি পদ্ধটিই হাদীস জগতে নির্ধারিত ও সর্বজন পরিচিত। হাদীস যাচাইয়ের ইহা অপেক্ষা উত্তম রীতিনীতি আর কিছুই হইতে পারে না। ‘রেওয়ায়েত’ পদ্ধতিতে হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা যাচাই করা হয় এবং তখন মূল হাদীস উল্লেখ করার কোন প্রয়োজনই হয় না। পক্ষান্তরে ‘দেরায়েত’ পদ্ধতিতে হাদীসের শুধু মূল বাণী টুকুর যথার্থতা যাচাই করা হয়, আর তখন- সেইসময়- বর্ণনাকারীদের অবস্থা যাচাই করা অবান্তর হইয়া দাঁড়ায়।
ম্যূর সাহেব আর একটি মারাত্মক ভূল উক্তি করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, মুহাদ্দিসগণের হাদীস অনুসন্ধান ও যাচাই পরখের নীতি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি কোন আস্থা ও উদারতার ভাব বর্তমান ছিল না। এইজন্য প্রত্যেক মুহাদ্দিসই নিজম্ব পদ্ধতি অনুযায়ী হাদীস গ্রহণ এবং বর্জন করিয়াছেন। মুহাদ্দিসদের সম্পর্কে এই উক্তিটি অমূলক। এই ধরনের কথা একমাত্র সেই ব্যক্তিই বলিতে পারেন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে যাঁহার বিন্দুমাত্র ধারণা বা শ্রদ্ধা নাই অথবা ইসলামের দুশমনী করা্ই যাঁহার স্থিরসংকল্প। ইজতিহাদ-নীতিও এই সম্পর্কীয় মত-পার্থক্যের ম্যূর সাহেব পারস্পরিক অনাস্থা ও অশ্রদ্ধা বলিয়া অভিহিত করিতে চাহেন। কিন্তু প্রকৃপক্ষে ইহা কোন অনাস্তার ব্যাপার নহে। ইহা প্রত্যেকের ইজতিহাদ নীতি ও মত বা রায়ের পার্থক্য মাত্র। এই জন্যই দেখিতে পাই- ইমাম মুসলিম ইমাম বুখারীর কোন কোন মত বা পদ্ধতির সমালোচনা করিয়াছেন; কিন্তু তাঁহাকে ‘সাইয়েদুল মুহাদ্দিসীন- শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস’ বলিয়া মান্য করিতে ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠত হইতেন না। বস্তুত মত-পার্থক্যের কারণেই হাদীসের সূত্র বা সনদসমূহ যাচাই করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
মুহাদ্দিসদের পারস্পরিক মত-পার্থক্যের দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ইমাম বুখারী ‘যে ব্যক্তি যাহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছে’ এতদুভয়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষাত ও দীর্ঘদিন একত্র থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। কিন্তু ইমাম মুসলিম মনে করেন, উভয়ের সমসাময়িক ও একই যুগের হওয়াই যথেষ্ট। ইমাম বুখারী কেবল সেইসব বর্ণনাকারীর হাদীসই গ্রহণ করার পক্ষপাতী, যাঁহাদের ‘সিকাহ’‘বিশ্বস্ত’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’ হওয়া সম্পর্কে সকলেই একমত। কিন্তু ইমাম নাসায়ী এমন লোকের বর্ণিত হাদীসও গ্রহণ করিতেন, যাহাদের ‘সিকাহ’ হওয়া সম্পর্কে সকলের একমত নহেন। বস্তুত পারস্পরিক আস্থাহীনতার কিংবা হিংসা-বিদ্বেষের কারণে এইরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় নাই, বরং ইহা নিছক মতবিরোধ- রায়- পার্থক্য মাত্র এব রায়- পার্থক্য ভিন্ন ইহা আর কিছুই নহে। পরবর্তিকালে মুহদ্দিসগণ যদি হাদীস বর্ণনাপরম্পরার নূতন কোন বিশ্বস্ত সূত্র পাইতেন, তবে ‘ছয়জন ইমামে হাদীসে’র মধ্য হইতে কোন একজনের নির্ধারিত মূল নীতি অনুযায়ী কোন হাদীস গ্রহণ করিতেন। ইহা ক্ষেত্র প্রশস্ততারই পরিচায়ক।
সমাপ্ত