১
হাদীস সংকলনের ইতিহাস
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৯
হযরত আবূ হুরায়রা (রা)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সপ্তম হিজরী সনের মুহররম মাসে খায়বার যুদ্ধের সময় ইসলাম কবুল করেন এবং স্থানীয়ভাবে নবী করীম (ﷺ)-এর সঙ্গে ধারণা করেন। সেই সময় হইতেই নবী করীম (ﷺ)- এর ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি কখনো রাসূলের দরবার ও সঙ্গ ত্যাগ করিয়া যান নাই।
ইহার মূলে তাঁহার উদ্দেশ্যে ছিল ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত জ্ঞানার্জন।
ইবনে আবদুল বার লিখিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রা খায়বরের যুদ্ধের বছর ইসলাম কবুল করেন। তিনি রাসূলে করীম (ﷺ)- এর সঙ্গেই এই যুদ্ধে শরীক হন। অতঃপর তিনি রাসূলের সঙ্গ ধারণ করেন। সব সময়ই তাঁহার সঙ্গে থাকিতেন। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল ইলম হাসিল করা। ইহাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকিতেন ও তাঁহার ক্ষুধা নিবৃত্ত হইত। তাহার হাতে রাসূলের হাত বাঁধা থাকিত। তিনি যেখানে যাইতেন, আবূ হুরায়রা (রা)-ও সেখানে যাইতেন।
রাসূলে করীম (ﷺ) সাধারণত যেসব কথাবার্তা বলিতেন, অপর লোকের সওয়ালের জওয়াবে তিনি যাহা কিছু ইরশাদ করিতেন, ইসলাম ও কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ে যাহা কিছু শিক্ষাদান করিতেন, কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিতেন, বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ ও বক্তৃতা দিতেন, রাসূলের দরবারে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকিয়া তাহা সবই তিনি গভীরভাবে শ্রবণ করিতেন ও মুখস্থ করিয়া রাখিতেন। সেই সঙ্গে তিনি নিজেও রাখিতেন। অন্য সাহাবিগণের অনেকেই পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাষাবাদের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকিতেন বলিয়া তারা খুব বেশী সময় রাসূলের দরবারে অতিবাহিত করিত পারিতেন না। কিন্তু হযরত আবূ হুরায়রার এই ধরনের কোন ব্যস্ততাই ছিল না। এই কারণে অন্যান্যদের তুলনায় তিনি অধিক হাদীস শ্রবণের সুযোগ লাভ করিয়াছেলেন। বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করা তাঁহার পক্ষে বিচিত্র কিছুই নয়। এমতাবস্থায় হযরত আবূ হুরায়রা (রা) নিজেই বলিয়াছেনঃ
আমার মুহাজির ভাইগণ অধিকাংশ সময়ে বাজারে ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত থাকিতেন, আর আমি রাসূলের সঙ্গে লাগিয়া থাকিতাম। বাহিরে আমার কোন ব্যস্ততাই ছিল না। ফলে তারা যখন রাসূলের দরবারে অনুপস্থিত থাকিতেন আমি তখন সেখানে হাযিল থাকিতাম। তারা ভুলিয়া গেলে আমি তাহা স্মরণ রাখিতাম।
অপরদিকে আমার আনসার ভাইগণ তাঁহাদের ধন-সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা লইয়া ব্যস্ত থাকিতেন। কিন্তু আমি ছিলাম সুফফার একজন মিসকীন ও গরীব ব্যক্তি। ফলে তারা কোন বিষয় ভূলিয়া গেলেও আমি তাহা স্মরণ করিয়া রাখিতাম।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা)- এর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ৫৩৪৭ টি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে উল্লেখ করা হইয়াছে ৩২৫টি হাদীস, আর স্ববন্ত্রভাবে ৭৯ টি হাদীস কেবল বুখারী শরীফে এবং ৯৩টি হাদীস কেবল মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছে।
ইমাম বুখারী ও বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ
আটশতেরও অধিক সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অন্য সাহাবীদের অপেক্ষা এত অধিক হাদীস কেমন করিয়া বর্ণনা করিতে পারিলেন, উপরিউক্ত তাঁহার নিজস্ব বিশ্লেষণ হইতে তাহা বিশদভাবেই জানিতে পারা যায়। এতদ্ব্যতীত তাঁহার নিম্নোক্ত বানী হইতেও এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ
এই আয়াত দুইটি যদি আল্লাহ তা’আলা তাঁহার কিতাবে নাযিল না করিতেন, তাহা হইলে আমি কখনই কোন হাদীস বর্ণনা করিতাম না। উহাতে আল্লাহ বলিয়াছেনঃ আমি যেসব সুস্পষ্ট যুক্তিপূর্ণ ও হিদায়অতের কথা নাযিল করিয়াছে, তাহাকে যাহারা গোপন করিয়া রাখে- তাহাদের উপর আল্লাহর ও অন্যান্য অভিসম্পাতকারীদের অভিশাপ।
[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০২; বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ২২ পৃষ্ঠা।]
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কমবেশী প্রায় তিন বৎসরকাল ক্রমাগতভাবে রাসূলের সঙ্গে থাকিয়া হাদীস শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাহা স্মরণ করিয়া রাখিয়াছেন। তাহার ফলেই তাঁহার পক্ষে অন্য সাহাবীদের তুলনায় এত অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব হইয়াছে। বিশেষত তাঁহাকে আল্লাহ তা’আলা এত প্রখর স্মরণশক্তি দান করিয়াছিলেন যে, তিনি যাহা কিছু শুনিতেন, তাহা কখনই ভুলিয়া যাইতেন না। যদিও তাঁহার এই অতুলনীয় স্মৃতিশক্তি রাসূলে করীমের দো’আ ও এক বিশেষ তদবীরের ফলেই অর্জিত হইয়াছিল।
তাঁহার সর্বাধিক হাদীস অর্জন ও অতুলনীয় স্মৃতিশক্তির কথা তদানীন্দন সমাজে সর্বজনবিদিত ও স্বকৃত ছিল। নিম্বোদ্ধৃত উক্তিসমূহ হইতে তাহা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়।
হযরত উবায় ইবন কা’ব (রা) বলেনঃ
আবূ হুরায়রা রাসূলের নিকট প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে বড় সাহসী ছিলেন। তিনি এমন সব বিষয়ে তাঁহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতেন, যে বিষয়ে অপর কোন সাহাবী জিজ্ঞাসা করিতেন না।
আবূ আমের বলেনঃ আমি হযরত তালহার নিকট উপস্থি ছিলাম। এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে বলিলঃ ‘হে আবূ মুহাম্মদ!’ আবূ হুরায়রা রাসূলের হাদীসের বড় হাফেয, না তোমরা, তাহা আজ পর্যন্ত আমরা বুঝিতে পারিলাম না’। তখন হযরত তালহা (রা) বলিলেনঃ ‘তিনি
[আবূ হুরায়রা (রা)] এমন অনেক কথাই জানেন, যাহা আমাদের জ্ঞান বহির্ভূত। ইহার কারণ এই যে, আমরা বিত্ত-সম্পত্তিশালী লোক ছিলাম, আমাদের ঘর-বাড়ি ও স্ত্রী-পরিজন ছিল, আমরা তাহাতেই অধিক সময় মশগুল থাকিতাম। কেবল সকাল ও সন্ধ্যার সময় রাসূল (ﷺ)-এর খিদমতে হাযির থাকিয়া নিজের নিজের কাজে চলিয়া যাইতাম। আর আবূ হুরায়রা (রা) মিসকীন ছিলেন, তাঁহার কোন জায়গা-জমি ও পরিবার –পরিজন ছিল না। এই কারণে তিনি রাসূলের হাতে হাত দয়িা তাঁহার সঙ্গে লাগিয়া থাকিতেন। আমাদের সকলেরই বিশ্বাস, তিনি আমাদের সকলের অপেক্ষা অধিক সংখ্যক হাদীস শুনিতে পাইয়াছেন। তিনি রাসূলের নিকট না শুনিয়াই কোন হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, আমাদের কেহই তাঁহার উপর এই দোষারোপ করে নাই।
হযরত আয়েশা (রা) একবার তাঁহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেনঃ “কি রকমের হাদীস বর্ণনা করিতেছ? অথচ আমি রাসূল (ﷺ)- এর যেসব কাজ দেখিয়াছি ও যেসব কথা শুনিয়াছি, তুমিও তাহাই শুনিয়াছ? ‘ইহার জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ “আম্মা! আপনি তো রাসূল (ﷺ)-এর জন্য সজ-সজ্জার কাজেই ব্যস্ত থাকিতেন আর আল্লাহর শপথ, রাসূলের দিক হইতে কোন জিনিসই আমার দৃষ্টিকে অন্যদিকে ফিরাইতে পারিত না”।
উমাইয়া শাসক মারওয়ানের নিকট হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কোন ব্যাপার অসহ্য হওয়ায় তিনি রাগান্বিত হইয়া একবার বলিয়াছিলেনঃ ‘লোকেরা বলে, আবূ হুরায়রা (রা) বহু হাদীস বর্ণনা করেন; অথচ নবী করীম (ﷺ)- এর ইন্তেকালের কায়েকদিন মাত্র পূর্বেই তিনি মদীনায় আসেন।
জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ ‘আমি যখন মদীনায় আসি তখন আমার বয়স ছিল ত্রিশ বৎসরের কিছু বেশী। অতঃপর রাসূল (ﷺ)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত আমি তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে রহিয়াছি। তাঁহার সাথে বেগমদের মহল পর্যন্ত যাইতাম তাঁহার খিদমত করিতাম, তাঁহার সঙ্গে লড়াই-জিহাদে শরীক হইতাম, তাঁহার সঙ্গে হজ্জে গমন করিতাম। এই কারণে আমি অপরের তুলনায় অধিক হাদীস জানিতে পারিয়াছি। আল্লাহর শপথ, আমার পূর্বে যেসব লোক রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্যে আসিয়াছিলেন, তারাও রাসূল (ﷺ)-এর দরবারে আামার সব সময় উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করিতেন এবং আমার নিকট তারা হাদীস জিজ্ঞাসা করিতেন। হযরত উমর (রা) হযরত উসমান (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবায়র (রা) তাঁহাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ বলেনঃ
আবূ হুরায়রা রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হইতে এতসব হাদীস শুনিয়াছেন তাহা আমরা শুনিতে পরি নাই; ইহাতে কোনই সন্দেহ থাকিতে পারে না।
হযরত ইবন উমর (রা) হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া একদিন বলিয়াছিলেনঃ
তুমি আমাদের অপেক্ষা রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্যে বেশ লাগিয়া থাকিতে এবং এই কারণে তাঁহার হাদীস তুমি আমাদের অপেক্ষা অধিক জানিতে ও মুখস্থ করিতে পারিয়াছ।
ইমাম যাহবী লিখিয়াছেন, হযরত উমর ফারুক (রা)- ও হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে একদিন এই কথাই বলিয়াছিলেন।
তাবয়িদের মধ্যে বহুসংখ্যক মনীষী হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর তীক্ষ্ম স্মরণশক্তি সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়াছেন। এখানে কয়েকজনের উক্তি উদ্ধৃত করা যাইতেছেঃ
আবূ সালেহ বলেনঃ
নবী করীম (ﷺ)-এর সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের অতি বড় হাফেয ছিলেন।
সায়ীদ ইবনে আবুল হাসান বলিয়াছেনঃ
সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অপেক্ষা অধিক হাদীস বর্ণনাকারী আর একজনও ছিলেন না।
ইমাম বুখারী (রা) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ
তাঁহার নিকট হইতে প্রায় আটশত মনীষী হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার যুগের হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন হাদীসের সবচেয়ে বড় হাফেয।
বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ
হযরত আবু হুরায়রা (রা) সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী-ইহাতে সকল হাদীসবিজ্ঞানীই একমত।
ইমাম শাফেয়ী (র) বলিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার যুগের সমস্ত হাদীস বর্ণনাকারীর মধ্যে সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের বড় হাফেয।
মুহাদ্দিস হাকেম বলিয়াছেনঃ
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূল (ﷺ)- এর সাহাবীদের মধ্যে অধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের অতি বড় হাফেয ছিলেন। তিনি রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশী সময় অবস্থান করিয়াছেন। কেননা তিনি প্রয়োজনের দিক দিয়া পরিতৃপ্ত ছিলেন। তাঁহার হাত রাসূল (ﷺ)-এর হাতের মধ্যে থাকিত, রাসূল (ﷺ) যখন যেখানে যাইতেন তিনিও তখন সেখানে যাইতেন। রাসূলের ইন্তেকাল পর্যন্তই এই অবস্থা থাকে। আর এই কারণেই অন্যান্যের তুলনায় হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশী হইয়াছে।
ইমাম আল-হাফিয বাকী ইবন মাখলাদ আন্দালুসী তাঁহার মুসনাদ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রার বর্ণিত পাঁচ হাজার তিন শত চুয়াত্তরটি হাদীস রহিয়াছে। সাহাবাদের মধ্যে অন্য কেহই এই পরিমাণ কিংবা ইহার কাছাকাছি পরিমাণ হাদীসও বর্ণনা করেন নাই।
মোটকথা তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অধিক হওয়ার চারটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। কারণ চারটি এইঃ
১। ইসলাম কবুল করার পর সব সময়ের জন্য রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গ ধারণ।
২। হাদীস শিক্ষা ও উহা মুখস্থ করিয়া রাখার জন্য আকুল আগ্রহ এবং শ্রুত কোন কথাই ভুলিয়া না যাওয়া।
৩। বড় বড় সাহাবীর সাহচর্য ও তাঁহাদের নিকট হাদীস শিক্ষার সুযোগ লাভ ইহাতে তাঁহার হাদীস জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে ও পূর্বাপর সর্বকালের হাদীসই তিনি সংগ্রহ করিতে সমর্থ হন।
৪। নবী করীম (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর দীর্ঘ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকা, প্রায় ৭৪ বৎসর পর্যন্ত হাদীস প্রচারের সুযোগ লাভ এবং কোন প্রকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের ব্যস্ততা কবুল না করা।
এই সব কারণে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হাদীসের বড় হাফেয ও সাহাবীদের মধ্য অধিক হাদীসজ্ঞ এবং অধিক হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। সাহাবিগণ বিচ্ছিন্নভাবে যাহা বর্ণনা করিতেন, সেই সব হাদীস হযরত আবূ হুরায়রার নিকট একত্রে পাওয়া যাইত। ফলে সকলেই তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিতেন ও তাহার উপর নির্ভর করিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রা (রা) মুসলমানদের জন্য রাসূল (ﷺ)-এর হাদীস হিফয করিয়া রাখিতেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) যে হাদীসের অতি বড় আলিম ছিলেন, তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা যে অন্যান্যের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশী হইবে এবং তাঁহার বর্ণিত হাদীস যে সর্বতোভাবে বিশ্বাষ্য ও নির্ভরযোগ্য, তাহা পূর্বোক্ত দীর্ঘ আলোচনা হইতে অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হইতেছে। এতদসত্ত্বেও যাহারা হযরত আবূ হুরায়রার অধিক হাদীস বর্ণনার প্রতি কটাক্ষ করিয়াছেন, তাহাদের ধৃষ্টতা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইতে হয়।
ইহার মূলে তাঁহার উদ্দেশ্যে ছিল ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত জ্ঞানার্জন।
ইবনে আবদুল বার লিখিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রা খায়বরের যুদ্ধের বছর ইসলাম কবুল করেন। তিনি রাসূলে করীম (ﷺ)- এর সঙ্গেই এই যুদ্ধে শরীক হন। অতঃপর তিনি রাসূলের সঙ্গ ধারণ করেন। সব সময়ই তাঁহার সঙ্গে থাকিতেন। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল ইলম হাসিল করা। ইহাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকিতেন ও তাঁহার ক্ষুধা নিবৃত্ত হইত। তাহার হাতে রাসূলের হাত বাঁধা থাকিত। তিনি যেখানে যাইতেন, আবূ হুরায়রা (রা)-ও সেখানে যাইতেন।
রাসূলে করীম (ﷺ) সাধারণত যেসব কথাবার্তা বলিতেন, অপর লোকের সওয়ালের জওয়াবে তিনি যাহা কিছু ইরশাদ করিতেন, ইসলাম ও কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ে যাহা কিছু শিক্ষাদান করিতেন, কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিতেন, বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ ও বক্তৃতা দিতেন, রাসূলের দরবারে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকিয়া তাহা সবই তিনি গভীরভাবে শ্রবণ করিতেন ও মুখস্থ করিয়া রাখিতেন। সেই সঙ্গে তিনি নিজেও রাখিতেন। অন্য সাহাবিগণের অনেকেই পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাষাবাদের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকিতেন বলিয়া তারা খুব বেশী সময় রাসূলের দরবারে অতিবাহিত করিত পারিতেন না। কিন্তু হযরত আবূ হুরায়রার এই ধরনের কোন ব্যস্ততাই ছিল না। এই কারণে অন্যান্যদের তুলনায় তিনি অধিক হাদীস শ্রবণের সুযোগ লাভ করিয়াছেলেন। বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করা তাঁহার পক্ষে বিচিত্র কিছুই নয়। এমতাবস্থায় হযরত আবূ হুরায়রা (রা) নিজেই বলিয়াছেনঃ
আমার মুহাজির ভাইগণ অধিকাংশ সময়ে বাজারে ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত থাকিতেন, আর আমি রাসূলের সঙ্গে লাগিয়া থাকিতাম। বাহিরে আমার কোন ব্যস্ততাই ছিল না। ফলে তারা যখন রাসূলের দরবারে অনুপস্থিত থাকিতেন আমি তখন সেখানে হাযিল থাকিতাম। তারা ভুলিয়া গেলে আমি তাহা স্মরণ রাখিতাম।
অপরদিকে আমার আনসার ভাইগণ তাঁহাদের ধন-সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা লইয়া ব্যস্ত থাকিতেন। কিন্তু আমি ছিলাম সুফফার একজন মিসকীন ও গরীব ব্যক্তি। ফলে তারা কোন বিষয় ভূলিয়া গেলেও আমি তাহা স্মরণ করিয়া রাখিতাম।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা)- এর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ৫৩৪৭ টি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে উল্লেখ করা হইয়াছে ৩২৫টি হাদীস, আর স্ববন্ত্রভাবে ৭৯ টি হাদীস কেবল বুখারী শরীফে এবং ৯৩টি হাদীস কেবল মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছে।
ইমাম বুখারী ও বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ
আটশতেরও অধিক সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অন্য সাহাবীদের অপেক্ষা এত অধিক হাদীস কেমন করিয়া বর্ণনা করিতে পারিলেন, উপরিউক্ত তাঁহার নিজস্ব বিশ্লেষণ হইতে তাহা বিশদভাবেই জানিতে পারা যায়। এতদ্ব্যতীত তাঁহার নিম্নোক্ত বানী হইতেও এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ
এই আয়াত দুইটি যদি আল্লাহ তা’আলা তাঁহার কিতাবে নাযিল না করিতেন, তাহা হইলে আমি কখনই কোন হাদীস বর্ণনা করিতাম না। উহাতে আল্লাহ বলিয়াছেনঃ আমি যেসব সুস্পষ্ট যুক্তিপূর্ণ ও হিদায়অতের কথা নাযিল করিয়াছে, তাহাকে যাহারা গোপন করিয়া রাখে- তাহাদের উপর আল্লাহর ও অন্যান্য অভিসম্পাতকারীদের অভিশাপ।
[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০২; বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ২২ পৃষ্ঠা।]
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কমবেশী প্রায় তিন বৎসরকাল ক্রমাগতভাবে রাসূলের সঙ্গে থাকিয়া হাদীস শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাহা স্মরণ করিয়া রাখিয়াছেন। তাহার ফলেই তাঁহার পক্ষে অন্য সাহাবীদের তুলনায় এত অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব হইয়াছে। বিশেষত তাঁহাকে আল্লাহ তা’আলা এত প্রখর স্মরণশক্তি দান করিয়াছিলেন যে, তিনি যাহা কিছু শুনিতেন, তাহা কখনই ভুলিয়া যাইতেন না। যদিও তাঁহার এই অতুলনীয় স্মৃতিশক্তি রাসূলে করীমের দো’আ ও এক বিশেষ তদবীরের ফলেই অর্জিত হইয়াছিল।
তাঁহার সর্বাধিক হাদীস অর্জন ও অতুলনীয় স্মৃতিশক্তির কথা তদানীন্দন সমাজে সর্বজনবিদিত ও স্বকৃত ছিল। নিম্বোদ্ধৃত উক্তিসমূহ হইতে তাহা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়।
হযরত উবায় ইবন কা’ব (রা) বলেনঃ
আবূ হুরায়রা রাসূলের নিকট প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে বড় সাহসী ছিলেন। তিনি এমন সব বিষয়ে তাঁহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতেন, যে বিষয়ে অপর কোন সাহাবী জিজ্ঞাসা করিতেন না।
আবূ আমের বলেনঃ আমি হযরত তালহার নিকট উপস্থি ছিলাম। এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে বলিলঃ ‘হে আবূ মুহাম্মদ!’ আবূ হুরায়রা রাসূলের হাদীসের বড় হাফেয, না তোমরা, তাহা আজ পর্যন্ত আমরা বুঝিতে পারিলাম না’। তখন হযরত তালহা (রা) বলিলেনঃ ‘তিনি
[আবূ হুরায়রা (রা)] এমন অনেক কথাই জানেন, যাহা আমাদের জ্ঞান বহির্ভূত। ইহার কারণ এই যে, আমরা বিত্ত-সম্পত্তিশালী লোক ছিলাম, আমাদের ঘর-বাড়ি ও স্ত্রী-পরিজন ছিল, আমরা তাহাতেই অধিক সময় মশগুল থাকিতাম। কেবল সকাল ও সন্ধ্যার সময় রাসূল (ﷺ)-এর খিদমতে হাযির থাকিয়া নিজের নিজের কাজে চলিয়া যাইতাম। আর আবূ হুরায়রা (রা) মিসকীন ছিলেন, তাঁহার কোন জায়গা-জমি ও পরিবার –পরিজন ছিল না। এই কারণে তিনি রাসূলের হাতে হাত দয়িা তাঁহার সঙ্গে লাগিয়া থাকিতেন। আমাদের সকলেরই বিশ্বাস, তিনি আমাদের সকলের অপেক্ষা অধিক সংখ্যক হাদীস শুনিতে পাইয়াছেন। তিনি রাসূলের নিকট না শুনিয়াই কোন হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, আমাদের কেহই তাঁহার উপর এই দোষারোপ করে নাই।
হযরত আয়েশা (রা) একবার তাঁহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেনঃ “কি রকমের হাদীস বর্ণনা করিতেছ? অথচ আমি রাসূল (ﷺ)- এর যেসব কাজ দেখিয়াছি ও যেসব কথা শুনিয়াছি, তুমিও তাহাই শুনিয়াছ? ‘ইহার জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ “আম্মা! আপনি তো রাসূল (ﷺ)-এর জন্য সজ-সজ্জার কাজেই ব্যস্ত থাকিতেন আর আল্লাহর শপথ, রাসূলের দিক হইতে কোন জিনিসই আমার দৃষ্টিকে অন্যদিকে ফিরাইতে পারিত না”।
উমাইয়া শাসক মারওয়ানের নিকট হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কোন ব্যাপার অসহ্য হওয়ায় তিনি রাগান্বিত হইয়া একবার বলিয়াছিলেনঃ ‘লোকেরা বলে, আবূ হুরায়রা (রা) বহু হাদীস বর্ণনা করেন; অথচ নবী করীম (ﷺ)- এর ইন্তেকালের কায়েকদিন মাত্র পূর্বেই তিনি মদীনায় আসেন।
জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ ‘আমি যখন মদীনায় আসি তখন আমার বয়স ছিল ত্রিশ বৎসরের কিছু বেশী। অতঃপর রাসূল (ﷺ)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত আমি তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে রহিয়াছি। তাঁহার সাথে বেগমদের মহল পর্যন্ত যাইতাম তাঁহার খিদমত করিতাম, তাঁহার সঙ্গে লড়াই-জিহাদে শরীক হইতাম, তাঁহার সঙ্গে হজ্জে গমন করিতাম। এই কারণে আমি অপরের তুলনায় অধিক হাদীস জানিতে পারিয়াছি। আল্লাহর শপথ, আমার পূর্বে যেসব লোক রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্যে আসিয়াছিলেন, তারাও রাসূল (ﷺ)-এর দরবারে আামার সব সময় উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করিতেন এবং আমার নিকট তারা হাদীস জিজ্ঞাসা করিতেন। হযরত উমর (রা) হযরত উসমান (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবায়র (রা) তাঁহাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ বলেনঃ
আবূ হুরায়রা রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হইতে এতসব হাদীস শুনিয়াছেন তাহা আমরা শুনিতে পরি নাই; ইহাতে কোনই সন্দেহ থাকিতে পারে না।
হযরত ইবন উমর (রা) হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া একদিন বলিয়াছিলেনঃ
তুমি আমাদের অপেক্ষা রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্যে বেশ লাগিয়া থাকিতে এবং এই কারণে তাঁহার হাদীস তুমি আমাদের অপেক্ষা অধিক জানিতে ও মুখস্থ করিতে পারিয়াছ।
ইমাম যাহবী লিখিয়াছেন, হযরত উমর ফারুক (রা)- ও হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে একদিন এই কথাই বলিয়াছিলেন।
তাবয়িদের মধ্যে বহুসংখ্যক মনীষী হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর তীক্ষ্ম স্মরণশক্তি সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়াছেন। এখানে কয়েকজনের উক্তি উদ্ধৃত করা যাইতেছেঃ
আবূ সালেহ বলেনঃ
নবী করীম (ﷺ)-এর সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের অতি বড় হাফেয ছিলেন।
সায়ীদ ইবনে আবুল হাসান বলিয়াছেনঃ
সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অপেক্ষা অধিক হাদীস বর্ণনাকারী আর একজনও ছিলেন না।
ইমাম বুখারী (রা) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ
তাঁহার নিকট হইতে প্রায় আটশত মনীষী হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার যুগের হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন হাদীসের সবচেয়ে বড় হাফেয।
বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ
হযরত আবু হুরায়রা (রা) সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী-ইহাতে সকল হাদীসবিজ্ঞানীই একমত।
ইমাম শাফেয়ী (র) বলিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার যুগের সমস্ত হাদীস বর্ণনাকারীর মধ্যে সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের বড় হাফেয।
মুহাদ্দিস হাকেম বলিয়াছেনঃ
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূল (ﷺ)- এর সাহাবীদের মধ্যে অধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের অতি বড় হাফেয ছিলেন। তিনি রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশী সময় অবস্থান করিয়াছেন। কেননা তিনি প্রয়োজনের দিক দিয়া পরিতৃপ্ত ছিলেন। তাঁহার হাত রাসূল (ﷺ)-এর হাতের মধ্যে থাকিত, রাসূল (ﷺ) যখন যেখানে যাইতেন তিনিও তখন সেখানে যাইতেন। রাসূলের ইন্তেকাল পর্যন্তই এই অবস্থা থাকে। আর এই কারণেই অন্যান্যের তুলনায় হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশী হইয়াছে।
ইমাম আল-হাফিয বাকী ইবন মাখলাদ আন্দালুসী তাঁহার মুসনাদ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রার বর্ণিত পাঁচ হাজার তিন শত চুয়াত্তরটি হাদীস রহিয়াছে। সাহাবাদের মধ্যে অন্য কেহই এই পরিমাণ কিংবা ইহার কাছাকাছি পরিমাণ হাদীসও বর্ণনা করেন নাই।
মোটকথা তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অধিক হওয়ার চারটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। কারণ চারটি এইঃ
১। ইসলাম কবুল করার পর সব সময়ের জন্য রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গ ধারণ।
২। হাদীস শিক্ষা ও উহা মুখস্থ করিয়া রাখার জন্য আকুল আগ্রহ এবং শ্রুত কোন কথাই ভুলিয়া না যাওয়া।
৩। বড় বড় সাহাবীর সাহচর্য ও তাঁহাদের নিকট হাদীস শিক্ষার সুযোগ লাভ ইহাতে তাঁহার হাদীস জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে ও পূর্বাপর সর্বকালের হাদীসই তিনি সংগ্রহ করিতে সমর্থ হন।
৪। নবী করীম (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর দীর্ঘ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকা, প্রায় ৭৪ বৎসর পর্যন্ত হাদীস প্রচারের সুযোগ লাভ এবং কোন প্রকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের ব্যস্ততা কবুল না করা।
এই সব কারণে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হাদীসের বড় হাফেয ও সাহাবীদের মধ্য অধিক হাদীসজ্ঞ এবং অধিক হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। সাহাবিগণ বিচ্ছিন্নভাবে যাহা বর্ণনা করিতেন, সেই সব হাদীস হযরত আবূ হুরায়রার নিকট একত্রে পাওয়া যাইত। ফলে সকলেই তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিতেন ও তাহার উপর নির্ভর করিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলিয়াছেনঃ
আবূ হুরায়রা (রা) মুসলমানদের জন্য রাসূল (ﷺ)-এর হাদীস হিফয করিয়া রাখিতেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) যে হাদীসের অতি বড় আলিম ছিলেন, তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা যে অন্যান্যের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশী হইবে এবং তাঁহার বর্ণিত হাদীস যে সর্বতোভাবে বিশ্বাষ্য ও নির্ভরযোগ্য, তাহা পূর্বোক্ত দীর্ঘ আলোচনা হইতে অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হইতেছে। এতদসত্ত্বেও যাহারা হযরত আবূ হুরায়রার অধিক হাদীস বর্ণনার প্রতি কটাক্ষ করিয়াছেন, তাহাদের ধৃষ্টতা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইতে হয়।