hadith book logo

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯৬

ডাঃ স্প্রেংগারের সমালোচনা

ডাঃ স্প্রেংগার বিশেষভাবে ইমাম বুখারীর হাদীস যাচাই পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করিয়াছেন। তিনি তাঁহার গ্রন্হ Life of Muhammad- এ লিখিয়াছেনঃ

‘তিনি (ইমাম বুখারী) যেসব নীতি পদ্ধতির অনুসরণ করিয়াছেন, তাহাকে ‘হাদীস-সমালোচনা’ বলিয়া অভিহিত করা যায় না। তিনি কেবল দেখিতেন, বর্ণনাকারীদের পরম্পরা সুত্রের ধারাবাহিকতা সুরক্ষিত আছে কিনা, কোথাও তাহা বিচ্ছিন্ন হইয়া যায় নাই তো! এতদ্ব্যতীত হাদীস বর্ণনাকারীদের চালচলন- তথা চরিত্রেরও তিনি বিচার করিতেন। যেহেতু তাঁহার নীতি ছিল এই যে, যে হাদীস তাঁহার ‘বিদ্বেষ দুষ্ট’ মতের অনুকূল নহে তাহা তিনি প্রত্যাখ্যান করিতেন। এইজন্য তাঁহার কোন হাদীস প্রত্যাখ্যান করার অথ্য কোন মতেই ইহা হইতে পারে না যে, সেই হাদীস আসলেও গ্রহণ অযোগ্য। কিন্তু তাঁহার ‘জামে’ গ্রন্হ অন্যান্য মুসনাদ গ্রন্হ হইতে এই দিক দিয়া পৃথক ছিল যে, তাহা বিশেষ কোন ফিকাহ মতের অনুসারী ছিল না; বরং বর্ণনাকারীদের সততার উপরই নির্ভরশীল ছিল’।

ডাঃ স্প্রেংগারের এই কথা যাচাই করিলে সুস্পস্টরূপে মনে হয় যে, তিনি যেমন হাদীসের পরিভাষাসমূহ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নহেন, তেমনি মুহাদ্দিসদের কর্মনীতি অবস্থা সম্পর্কেও তাঁহার কোন অভিজ্ঞতা নাই। উপরন্তু ইলমে হাদীসের বিভিন্ন শর্ত সম্পর্কেও তাঁহার সুস্পষ্ট কোন ধারণা নাই।

মুহাদ্দিসগণ প্রথম ‘দেরায়াত’ নীতির মানদণ্ডে হাদীস যাচাই করেন। কুরআন হাদীস এবং সাহাবায়ে কিরামের আমলেও তাঁহার অনুসৃত কর্মপদ্ধতি হইতেই এই নীতি গৃহীত হইয়াছে। ইহা সকলের পক্ষে অনিবার্যরূপে অনুসরণীয়। ইহা যেহেতু সাধারণ ও প্রচলিত মূলনীতি বিশেষ, সেইজন্য ইহা প্রকাশ করা মুহাদ্দিসদের পক্ষে কোন প্রয়োজনীয় কজ নহে। যেহেতু সকলেরই একথা জানা আছে যে, মুহাদ্দিসগণ হাদীসসমূহকে এই সকল নীতির উপর অবশ্যই যাচাই ও পরীক্ষা করিয়াছেন। এই যাচাই পরীক্ষার ব্যাপারে কাহারো কোন ভূল থাকিলে তাহা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যাপার। প্রত্যেক মুহাদ্দিসই নিজস্ব সংগ্রহীত হাদীসসমূহের বর্ণনাপরম্পরা ধারা সঠিক ও দোষমুক্ত রাখার জন্য যারপরই নাই গবেষণা ও চেষ্টা চালাইয়া থাকেন। ইহা ছাড়া তারা কোন হাদীসই গ্রহণ করিতে আদৌ প্রস্তুত হইতে পারে না। এই কারণে প্রত্যেক মুহাদ্দিসই হাদীস বর্ণনাকারীদের যাচাই পরীক্ষা ও নিরীক্সা করিয়া নিজস্ব একটি বর্ণনাপরম্পরা সূত্র স্থাপন করিয়া থাকেন এবং সেই সূত্র হইতে প্রাপ্ত হাদীসসমূহ দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ করিয়া থাকেন।

মনে হয় সহীহ বুখারী শরীফ কি ধরনের গ্রন্হ ‘জামে’ না ‘মুসনাদ’, ডাঃ স্প্রেংগার তাহাও ঠিকতম জানেন না। কেননা তিনি তো বুখারী শরীফকে ‘মুসনাদ’ ধরনের গ্রন্হ মনে করিয়া লইয়াছেন।

ডাঃ স্প্রেংগার ইমাম বুখারীর উপর হিংসা বিদ্বেষের অভিযোগ করিয়াছেন। ইহা সম্পূর্ণ অমূলক কথা। ইমাম বুখারী হিংসা বিদ্বেষ-দুষ্ট ছিলেন, এমন মনে করার কোন কারণ নাই। আসলে তিনি ইহা হইতে সর্বতোভাবে পবিত্র ও মুক্ত ছিলেন। এইজন্যই দেখিতে পাই যে, তিনি শিয়া মতাবলম্বী না হইয়াও তাঁহার অদ্বিতীয় হাদীস গ্রন্হে শিয়া বর্ণনাকারীদের বর্ণিত হাদীস গ্রহণ ও উহার অন্তর্ভূক্ত করিয়াছেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন শাফেয়ী মতাবলম্বী, কিন্তু তাঁহার সংকলিত গ্রন্হে শাফেয়ী মতের বিপরীত অনেক হাদীস গ্রহণ করিতেও কুণ্ঠিত হন নাই। মনে হয় এই সব কথা ডাঃ স্প্রেংগারেরে একেবারেই অজ্ঞাত।