hadith book logo

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯৩

কিতাবুল আ’সর

তাবেয়ী যুগের মুহাদ্দিসদের সংকলিত হাদীস গ্রন্হাবলী স্বীয় স্বতন্ত্র অস্তিত্ব লইয়া পরবর্তীকালের হাদীসানুধ্যায়ীদের নিকট পৌঁছায় নাই। এই দিক দিয়া আমাদের নিকট বিরাজমান কেবলমাত্র একখানি গ্রন্হেরই নাম করা যাইতে পারে এবং তাহা হইতেছে ‘কিতাবুল আ’সার। ইমাম আবূ হানীফা (র) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর সময়ে প্রতিষ্ঠিত

কূফার জামে মসজিদের প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রের প্রধান শিক্ষাগুরু নিযুক্ত হইয়া একদিকে যেমন ‘ইলমে ফিকাহ’র ভিত্তি স্থাপন করেন, অপরদিকে সেই সঙ্গেই তিনি রাসূল (ﷺ)-এর আদেশ-নিষেধমূলক হাদীসসমূহের ও একটি সংকলন নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংকলিত হাদীস সমূহের সমন্বয়ে রচনা করেন। এই গ্রন্হেরই নাম হইতেছে ‘কিতাবুল আ’সার’। দুনিয়ার মুসলিম জাতির নিকট ইহা অপেক্ষা প্রাচীনতম হাদীস গ্রন্হ সম্ভবত আর একখানিও বর্তমান নাই। অথবা বলা যায়, মুসলিম উম্মতের নিকট মওজুদ হাদীস গ্রন্হাবলীর মধ্যে ইহাই সর্বাধিক প্রাচীন হাদীস-গ্রন্হ। ইমাম আবূ হানীফার পূর্বে হাদীস সংগ্রহকারিগণ কর্তৃক যেন-তেনভাবে হাদীসসমূহ সংগ্রহ ও সংকলন করার কাজই হইয়াছিল। ঠিক গ্রন্হ প্রণয়নের ধারায় হাদীসের কোন গ্রন্হই বিরচিত হয় নাই। ইমাম শা’বী একই বিষয়ের হাদীস একস্থানে একত্র করিয়া একখানি গ্রন্হের রূপ দিয়াছিলেন বটে; কিন্তু তাহা মাত্র কয়েকটি অধ্যায় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল, ইহার বেশী কিছু করা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। এই কাজ অতঃপর আর অগ্রসরও হইতে পারে নাই। এই কারণে হাদীসসমূহকে পরিচ্ছেদ (কিতাব) ও অধ্যায় (বাব) হিসাবে, গ্রন্হ প্রণয়নের ধারা ও পদ্ধতি অনুসারে সুসংকলিত করার কাজ তখন পর্যন্তও অসম্পন্নই রহিয়া গিয়াছিল। ইমাম আবূ হানীফা (র) ‘কিতাবুল আ’সার’ প্রণয়ন করিয়া এই দায়িত্ব বিশেষ যোগ্যতা ও বিজ্ঞতা সহকারেই পালন করিয়াছিলেন। হাফেজ সুয়ূতী ইমাম আবূ হানীফা (র) সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

ইমাম আবূ হানীফা (র) বিশেষ একটি কীর্তি-যাহাতে তিনি একক, তাহা এই যে, তিনিই সর্বপ্রথম ইলমে শরীয়াতকে সুসংবদ্ধ করিয়াছেন এবং উহাকে অধ্যায় হিসাবে সংকলিত করিয়াছেন। ইমাম মলিক (র) ‘মুয়াত্তা’ প্রণয়নে তাহারই অনুসরণ করিয়াছেন। কিন্তু এইরূপ গ্রন্হ প্রণয়নের ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (র)-কে সময়ের দিক দিয়া কেহই অতিক্রম করিয়া যাইতে পারেন নাই।

ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী লিখিয়াছেনঃ

ইমাম আবূ হানীফা (র) বর্ণিত স্বতন্ত্র হাদীস-গ্রন্হ বর্তমান। আর তাহা হইতেছে ‘কিতাবুল আ’সার’; ইহা তাঁদের নিকট হইতে মুহাম্মদ ইবনে হাসান বর্ণনা করিয়াছেন।

ইমাম আলাউদ্দিন ‘কাশানী’ এই কিতাবের উল্লেখ করিয়াছেন ইমাম আবূ হানীফা (র) সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ বলিয়া।

‘কিতাবুল আ’সার’ নামক হাদীসগ্রন্হখানি প্রণয়নের ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (র) ব্যাপকভাবে হাদীস সংগ্রহ ও ছাঁটাই-বাছাই করিয়াছেন। সদরুল আয়িম্মা মুয়াফফিক ইবনে আহমদ মক্কী তাঁহার গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

ইমাম আবূ হানীফা (র) চল্লিশ সহস্র হাদীস হইতে ছাঁটাই-বাছাই করিয়া ‘কিতাবুল আ’সার’-এর এই গ্রন্হখানি প্রণয়ন করেন।

[ এখানে হাদীসের যে সংখ্যা বলা হইয়াছে, তাহা হাদীসের আলাদা আলাদা সংখ্যা নহে; বরং হাদীসের সূত্র মাও এবং এক-একটি হাদীসের বহু সংখ্যক সূত্র হইতে পারে।]

হাদীস চয়ন ও হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে তাঁহার এই অসামান্য সতর্কতার কথা সকল হাদীস-পারদর্শী ব্যক্তিই স্বীকার করিয়াছেন। ইমাম ওকী (র) বলিয়াছেনঃ

হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (র) কর্তৃক যেরূপ সতর্কতা অবলম্বিত হইয়াছে, তদ্রুপ আর কাহারও দ্বারা অবলম্বিত হয় নাই।

[ঐ, এখানে উল্লেখ্য, হাদীসের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদুল কাতান হাদীস যাচাই, পরখ ও বাছাই-ছাঁটাই শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

আল্লাহর নামের শপথ, মুসলিম উম্মত বা জাতির নিকট আল্লাহ ও রাসূলের নিকট হইতে পাওয়া সমস্ত ইলম-এর ক্ষেত্রে অধিক বড় আলিমরূপে স্বীকৃত।]

ঠিক এই কারণেই মনে হয় মুহাদ্দিমগণ ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর সমালোচনা করিতে গিয়া তাঁহাকে ‘হাদীস বর্ণনায় অত্যন্ত কঠোর ও কড়া লোক’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন এবং এই কারণেই তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুব বেশী হইতে পারে নাই। ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে খালদুন ইহার কারণ বর্ণনা প্রসংগে লিখিয়াছেনঃ

ইমাম আবূ হানীফা (র)- এর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম হওয়ার কারণ এই যে, তিনি হাদীস গ্রহণ ও বর্ণনার ব্যাপারে কঠোর নৈতিক শর্ত আরোপ করিতেন।

ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর সংগ্রহীত হাদীসের বিপুলতা ও উহা সামান্য পরিমাণ বর্ণনা করা সম্পর্কে স্বয়ং ইমাম আবূ হানীফা (র)- এর হইতে একটি উক্তি এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেনঃ

আমার নিকট কয়েক সিন্দুক ভর্তি লিখিত হাদীস-সম্পদ মজুদ রহিয়াছে। কিন্তু আমি তাহা হইতে অতি অর্প সংখ্যকই প্রকাশ ও বর্ণনা করিয়াছি, যাহা লোকদের ব্যবহারিক জীবনের উপকার দিবে।

অন্যান্য হাদীস গ্রন্হের ন্যায় ‘কিতাবুল আ’সার’-এর ‘নুসখা’ (অনুলিপি) রহিয়াছে। এই কারণে তাহা এক-একজন ছাত্রের নামেই প্রখ্যাত হইয়াছে। অন্যথায় মূল গ্রন্হ ইমাম আবূ হানীফারই সংকলিত একখানি মাত্র হাদীসগ্রন্হ। এই ‘নুসখা’ প্রকাশকারীদের মধ্যে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখযোগ্যঃ

১. ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইলঃ এই সম্পর্কে প্রামাণ্য গ্রন্হাবলীতে উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

আহমদ ইবনে বকর যুফার ইবনুল হুযাইলের ছাত্র আবূ ওহাবের নিকট হইতে আবূ হানীফা (র)- এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ বর্ণনা করিয়াছেন।

২. ইমাম আবূ ইউসুফ ইবনে আবূ ইউসুফঃ তাঁহার সম্পর্কে উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর নিকট হইতে তাঁহার সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ তাঁহার পিতার সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। উহা একখানি বিরাট আকারের গ্রন্হ।

[কাজী আতহার মূবারকপুরী (বো’ই হইতে প্রকাশিত ‘আল বালাগ’ পত্রিাকর সম্পাদক) লিখিয়াছেনঃ ইমাম আবূ হানীফার ‘কিতাবুল আ’সার’ তাঁহার নিকট হইতে তাঁহার ছাত্ররা অন্য লোকদের নিকট বর্ণনা করিয়াছেন এবং বর্ণনা করার সময় তারা নিজেরাও ইহাতে অনেক হাদীস সংযোজিত করিয়াছেন। এই কারণে মূল গ্রন্হখানি বিভিন্ন ছাত্রের নামে জনগণের মধ্যে পরিচিত হইয়াছে। অন্যথায় মুলগ্রন্হ ইমাম আবূ হানিফা (র)-এর সংকলিত হাদীস গ্রন্হ।]

৩. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানীঃ তাঁহার তৈরী করা সংকলনটিই প্রসিদ্ধ এবং ইহাই বর্তমান ভূলক্রমে ইমাম মুহাম্মদ (র)-এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ বলিয়া পরিচিত।

৪. ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ লু’লুয়ীঃ ইবনে হাজার আসাকালানী (র) ইহার সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবেন ইবরাহীমের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর ‘কিতাবুল আ’সার’ মুহাম্মদ ইবনে শুজা তাহার ওস্তাদ হাসান ইবনে যিয়াদের সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন।