hadith book logo

নারীদের যে বিষয়গুলো না জানলেই নয়

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৬৯

ঘ) শিক্ষাগ্রহণের অধিকার

আল কুরআনের প্রথমে নাযিলকৃত পাঁচ আয়াত হলো সূরা আলাক। “পড় (জ্ঞান অর্জন কর! তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাধা রক্ত থেকে আল কুরআনের প্রথম নির্দেশনা যেটা মানবতার প্রতি নাযিল হয়েছিল তা সলাত নয়, সিয়াম নয়, যাকাত নয়- তা ছিল পড়া ইসলাম শিক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছে। নবী (ﷺ) পিতা-মাতাকে সর্বাধিক তাগাদা দিয়েছেন যেন তারা কন্যা সন্তানকে শিক্ষা দেয়। একজন নারীর বিয়ের পর স্বামীর কর্তব্য হলো তাকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা। সে যদি নিজে এটা করতে সক্ষম না হয় অথচ স্ত্রী যদি তা চায় তাহলে স্বামী অন্য কোথাও শিক্ষাগ্রহণের জন্য স্ত্রীকে। যেতে দেবেন।

সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী নারীরা জ্ঞানার্জনের জন্য খুবই আগ্রহী ছিলেন। তাঁরা একদা নবী (ﷺ) -কে বললেন, আপনি সাধারণত পুরুষদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন, আপনি আমাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট দিন ধার্য করলে আমরা আপনাকে (প্রয়োজনীয়) প্রশ্ন করতে পারি। নবী (ﷺ) রাজি হলেন। তিনি নিজে তো যেতেনই অনেক সময় সাথীদেরও তাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রেরণ করতেন।

ভেবে দেখি, ১৪০০ বছর পূর্বে যখন নারীদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা হতো তাদের শিক্ষা তো দূরের কথা, তাদেরকে পণ্য দ্রব্যের মতো অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সে মুহূর্তে নারীর শিক্ষাদানের প্রতি কতই না তাকিদ। এই পৃথিবীতে অনেক স্কলার মুসলিম নারীর উদাহরণ আছে। সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত যেটা তা হলো আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা) যিনি ছিলেন প্রথম খলিফা আবু বকর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর কন্যা এবং প্রিয়নবী (ﷺ) -এর স্ত্রী। তিনি রসূল (ﷺ) এর সাহাবা এমনকি খলিফাদের পর্যন্ত দিকনির্দেশনা দিতেন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন ভাগিনা উরওয়া ইবনে যুবাইর (রাদিআল্লাহু আনহু)। তিনি বলেছেন, আমি কুরআনের ব্যাপারে আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কাউকে দেখিনি। ফরয, হালাল, হারাম এবং আরবী, ইতিহাস, সাহিত্য ও কবিতায় তার জ্ঞানের জুড়ি নেই। আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা) শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই দক্ষ ছিলেন না, চিকিৎসা বিষয়েও তার অগাধ জ্ঞান ছিল। যখনই বিদেশী প্রতিনিধি রসুল (ﷺ) -এর নিকট আসতেন এবং আলোচনা করতেন, তিনি তাদের গবেষণাধর্মী আলোচনা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তা মনে করে রাখতেন।

গণিতশাস্ত্রেও তাঁর ভাল দখল ছিল, অনেক সময় সাহাবীগণও মিরাস অর্থাৎ উত্তরাধিকার বিষয়ে তাঁর নিকট সমাধান নিতে আসতেন। মীরাস কত অংশে বিভক্ত হবে, কত অংশ প্রত্যেকে পাবে এ সম্পর্কে। তাঁর সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি চার খলিফাসহ অন্যান্য সাহাবীগণকেও দিকনির্দেশনা দিতেন। অনেক সময় তিনি আবু হুরায়রা (রাদিআল্লাহু আনহু)-কে দিকনির্দেশনা দিতেন। তিনি নিজে ২,২১০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আবু উম্ম, আবু মুসার মতে তিনি (আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা)) একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ ছিলেন, তিনি বলেছেন যে, যখনই আমাদের সাহাবীদের কোন বিষয়ে জ্ঞানের অভাব ঘটত, আমরা তখন আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা)-এর নিকট যেতাম এবং অবশ্যই তাঁর নিকট এ বিষয়ের জ্ঞান ছিল। তিনি ৮৮ জনের অধিক স্কলারকে শিক্ষা দিয়েছেন।

আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে, এমনকি সুফিয়া (রাদিআল্লাহু আনহা) যিনি রসূল (ﷺ) -এর স্ত্রী ছিলেন। তিনি ইসলামী ফিকহে দক্ষ ছিলেন। ইমাম নববীর মতে, সুফিয়া (রাদিআল্লাহু আনহা) ঐ সময়ের নারীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান বুদ্ধিমতি ছিলেন।

আরেক দৃষ্টান্ত উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহা) যিনি প্রিয়নবী (ﷺ) -এর স্ত্রী। ছিলেন। ইবন হাযার-এর মতে তিনি বিভিন্ন ধরনের ৩২ জন স্কলারকে শিক্ষা দিয়েছেন।

আরো অনেক উদাহরণের মধ্যে ফাতিমা বিনতে কায়স। বলা হয় যে, তিনি একবার আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা) ও উমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গে সারাদিন ফিকহ শাস্ত্রের উপর আলোচনা করার পরও তাঁকে ভুল প্রমাণ করতে পারেননি। ইমাম নববী (র.)-এর মতে, তিনি প্রথম যুগে ইসলামে প্রবেশ করেন। এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।

অন্য উদাহরণ :

যেমন উম্মে সুলাইম, যিনি আনাস (রাদিআল্লাহু আনহু)এর মাতা, তিনি ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক ভাল ভূমিকা রাখেন। যেমন সাইয়্যেদা নাফিসা যিনি হাসান (রাদিআলাহু আনহা)-এর পৌত্রী ছিলেন, চার মাযহাবের এক প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ী (র) এর শিক্ষিকা ছিলেন। আরো উদাহরণ যেমন উম্মে দারদা (রাদিআল্লাহু আনহা), যিনি আবু দারদার স্ত্রী এবং বিজ্ঞানে দক্ষ ছিলেন। ইমাম বুখারী (র.) বলেছেন যে, তিনি তার ক্ষেত্রে দক্ষ ছিলেন।

সে সময় যখন নারীদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হতো, যখন জন্ম লাভের সাথে সাথে নারীদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো, তখন চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে মুসলিম দক্ষ নারীরা ছিলেন। কারণ ইসলাম ঘোষণা করে যে, প্রত্যেক নারী হবেন শিক্ষিতা।