hadith book logo

সুখী ও সুন্দর পরিবার গঠন

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৫

স্বামী-স্ত্রীর একান্ত মুহূর্ত

স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে শুধু তৃপ্তি উপভোগই নয়; বরং তাতে সওয়াবও রয়েছে।

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তোমাদের স্ত্রী-সহবাস করাও সদাকা। সাহাবাগণ বললেন, “হে রসূল! আমাদের কেউ যদি স্ত্রী-সহবাস করে নিজের আনন্দ আহরণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন, কি অভিমত তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে সহবাস করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? [নিশ্চয় হবে] অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে [স্ত্রী-সহবাস করে] নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।” (সহীহ মুসলিম)

স্বামী-স্ত্রীর সহবাসের চাহিদা একে অপরের উপর বৈধ অধিকার এবং এই অধিকার পুরণে একে অপরের প্রতি সচেতন থাকা উচিত। এই বিষয়ে authentic বই থেকে কিছু পড়াশোনা করা উচিত। সফল এবং তৃপ্তির জন্য বৈধ কৌশল অবলম্বন করা উচিত। অনেক সময় স্ত্রীরা এ বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না এবং নানারকম অজুহাত দিয়ে থাকেন যেমন : আজকে ঠান্ডা, এখন লজ্জা করছে, এখন ভাল লাগছে না, এখন গোসল করতে পারবো না, মাথার চুল ভিজা থাকবে, ফযর সলাত আছে, সকালে অফিস আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ বিষয়ে স্ত্রীর চাহিদা না থাকলেও স্বামীর কথা চিন্তা করে তার চাহিদা পুরণ করা উচিত কারণ এটা তার হক (যদি স্ত্রী অসুস্থ না থাকেন)

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার প্রয়োজনে আহ্বান করবে, তখন সে যেন [তৎক্ষণাৎ] তার নিকট যায়, যদিও সে রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকে।” (তিরমিযী)

রসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন : “যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ বিছানায় ডাকে এবং সে না আসে, অতঃপর সে (স্বামী] তার প্রতি নারাজ (অসন্তষ্ট) অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে ফিরিশতাগণ তাকে (স্ত্রীকে) সকাল অবধি। অভিসম্পাত করতে থাকেন। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : “তিন ব্যক্তির সলাত তাদের কান অতিক্রম করে না পলাতক ক্রীতদাস যতক্ষণ না সে তার মালিকের নিকট ফিরে এসেছে, এমন স্ত্রী যার স্বামী তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত্রিযাপন করেছে (যতক্ষণ না সে রাজী হয়েছে), এবং সেই সম্প্রদায়ের ইমাম যাকে লোকেরা অপছন্দ করে।” (তিরমিযী)

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : “মহিলা যেন স্বামীর বর্তমানে তার বিনা অনুমতিতে রমাদানের সিয়াম ছাড়া একটি দিনও (নফল) সিয়াম পালন না করে।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

সূরা রূমের ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন : “তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।”

সতর্কতাঃ

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে নতুন বিয়ের পর কয়েক বছর স্বামী স্ত্রীর খুব মিল-মহব্বত থাকে, নিয়মিত সহবাস করেন। কিন্তু বাচ্চা হওয়ার পর স্ত্রী বাচ্চাকে নিয়ে এতোই বেশী মনযোগী হয়ে পরেন যে স্বামীর দিকে খুব একটা বেশী খেয়াল করেন না। সন্তানের মা, বাবার চেয়ে বাচ্চার দিকে বেশী খেয়াল করেন এটাই প্রকৃতির নিয়ম কিন্তু এক্ষেত্রে সংসারের শান্তির জন্য ব্যালেন্স রক্ষা করে চলতে হবে, কোনভাবেই যেন ব্যালেন্স নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। আবার স্ত্রী নানারকম সাংসারিক কর্মকান্ডে এতো বেশী মনযোগী হয়ে পরেন যে স্বামীর সহবাসের চাহিদার দিকে খেয়াল করেন না। তবে স্বামীরও উচিত স্ত্রীর সহবাসের চাহিদার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখা। তাই সবদিকেই ব্যালেন্স প্রয়োজন, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান-সংসার নিয়েই সুখের পরিবার।

নেগেটিভ দিক :

স্বামী যদি তার স্ত্রীর কাছ থেকে তার ইচ্ছেমত সহবাসের সুখ না পায়, তাহলে সে হয়তো বা অনাসক্ত হয়ে পড়তে পারে। তবে স্বামীরও এতো অল্পতে ধৈর্যহারা হলে চলবে না, ধৈর্য ঈমানের অংশ। আরো অনেক সহনশীল হতে হবে। স্ত্রীর সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর একটা কথা মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন :

“তোমরা যিনার নিকটবর্তী হইও না। নিশ্চয়ই তা একটি বেহায়া পন্থা এবং অসভ্যতার দিকে যাওয়ার মতো একটা খারাপ রাস্তা।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩২)

যিনা কী?

যিনা আরবী শব্দ। এর অর্থ হলো বিয়ে বহির্ভুত নরনারীর মধ্যকার অবৈধ সম্পর্ক। বিভিন্ন উপায়ে নারী এবং পুরুষের মধ্যে যিনা সংগঠিত হয়ে থাকে। নিমে কিছু উদাহরণ দেয়া হলো

১) খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো চোখের যিনা (জীবন্ত মানুষ বা পর্ণগ্রাফী)

২) খারাপ মনে কারো কন্ঠস্বর শোনা কানের যিনা।

৩) খারাপ মনে কাউকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা হাতের যিনা।

৪) খারাপ মনে কারো দিকে দুই পা অগ্রসর হওয়া পায়ের যিনা।

৫) খারাপ মনে কারো সঙ্গে কথা বলা জিহবার যিনা।

৬) খারাপ মনে কারো কথা মনে মনে চিন্তা করা মনের যিনা।

৭) খারাপ মনে কারো সঙ্গে ইমেইল, চ্যাটিং বা ফেইসবুকের মাধ্যমে বন্ধুত্ব করা হাতের ও মনের যিনা।

৮) খারাপ মনে কাউকে এস.এম.এস/টেস্ট পাঠানো হাতের ও মনের যিনা।

স্ত্রীসহবাসের পূর্বে জিকির">দু'আ

“বিসমিল্লা-হি আল্লা-হুম্মা জান্নিবনাশ শাইত্ব-না ওয়া জান্নিবিশ শাইত্ব-না মা রযাকতানা।”

অর্থ : আল্লাহর নামে (আমরা মিলিত হচ্ছি), হে আল্লাহ! তুমি আমাদের নিকট হতে শয়তানকে দূরে রাখ এবং যে সন্তান তুমি আমাদেরকে প্রদান করবে তার নিকট হতে শয়তানকে দূরে রাখ। (সহীহ বুখারী)

স্ত্রী সহবাসের সময় উপরোক্ত দু'আটি পড়তে হয় শয়তানের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং এটা সুন্নাহ।

স্ত্রী সহবাসের নিয়ম

রসূল (ﷺ) বলেছেন : সাবধান! কখন উলঙ্গ হবে না। কারণ, তোমাদের সংগে যারা আছে (ফিরিশতা) তারা কখনও তোমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেন না, মলত্যাগ ও সহবাসের সময় ব্যতীত। (জামে আত তিরমিযী)

উক্ত হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সামনে উলঙ্গ হওয়া বৈধ। তবে যখন তখন একে অপরের সামনে উলঙ্গ হওয়া ঠিক নয়। এতে ফিরিশতারা চলে যায় এবং দিন দিন একে অপরের প্রতি আকর্ষণও কমে যায়।

সহবাসের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তৃপ্তি লাভ করে থাকে। এটা শুধু একজনের আনন্দের বিষয় নয়; বরং দুজনেরই এতে আনন্দ লাভের অধিকার রয়েছে। তাই স্বামীর উচিত স্ত্রীর পূর্ণ তৃপ্তির দিকে খেয়াল রাখা। স্বামী-স্ত্রী তাদের একান্ত সুখের জন্য যেভাবে ইচেছ সেভাবে আসন পরিবর্তন করে সহবাস করতে পারবেন শুধু স্ত্রীর মলদ্বার দিয়ে সহবাস করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

“তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শষ্যক্ষেত্র স্বরূপ, অতএব তোমরা তোমাদের শষ্যক্ষেত্রে যেভাবে খুশী সেভাবে গমণ কর এবং তোমাদের নিজেদের ভবিষ্যত রচনার জন্য এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ কর।” (সূরা বাকারা : ২২৩)

ফরয গোসল

স্বামী-স্ত্রীর সহবাসের পর অবশ্যই ফরয গোসল করতে হবে। ফরয গোসলের নিয়ম হচ্ছে, গোসলের আগে ওযু করে নিতে হবে শুধু পা ধোয়া ব্যতীত এবং গোসলের পর পা ধুয়ে নিতে হবে। যদি ঐ মুহূর্তে কোন কারণে গোসল করা সম্ভব না হয় তাহলে অন্ততপক্ষে সম্পূর্ণরূপে ওযূ করে নিতে হবে এবং পরে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব গোসল সেরে নিতে হবে। এই ফরয গোসল ব্যতীত কোন সলাত আদায় করা যাবে না।

পিরিয়ড অবস্থায় স্ত্রীসহবাস নিষিদ্ধ

এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন : “আর তারা তোমাকে (স্ত্রী লোকদের) হায়েয (পিরিয়ড) সম্মন্ধে প্রশ্ন করছে; তুমি বলে দাও যে, এটা হচ্ছে অপবিত্রতা, অতএব হায়েয অবস্থায় স্ত্রী লোকদের আলাদা কর এবং উত্তমরূপে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটে যেও না; অতঃপর তারা পবিত্র হবে, তখন আল্লাহর নির্দেশ মুতাবেক তোমরা তাদের নিকট গমণ কর, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ক্ষমাপ্রার্থীকে ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা বাকারা : ২২২)

এই আয়াতে হায়েয (পিরিয়ড) অবস্থায় স্ত্রীদের হতে পৃথক থাক’ এ কথার ভাবার্থ হচ্ছে সহবাস করো না। এছাড়া সকল কিছু বৈধ। মেডিক্যাল সায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী এই অবস্থায় সহবাস করলে নানরকম জটিল যৌন রোগব্যাধি হতে পারে।

কাপড় বিহীন গোসল করা

নবী (ﷺ) যখন গোসল করতেন তখন পর্দা করে নিতেন। (সহীহ বুখারী) এবং তিনি সকলকে পর্দা করে গোসল করার নির্দেশ দিতেন। (আবু দাউদ)

রসূল (ﷺ) কেন নিষেধ করেছিলেন তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট। কারণ তৎকালে গোসলখানাগুলো এমন জায়গায় বানানো হতো যেখানে পানি সহজলভ্য ছিল এবং গোসলখানাগুলো ছিল উন্মুক্ত, বাড়ির বাইরে এবং অনেকের জন্য কমোন। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। সবার বাসা বা এপার্টমেন্টে প্রাইভেট বাথরুম এবং বাথরুমের মধ্যেও আবার special shower arrangement। তাই এই ধরণের বাথরুমে উলঙ্গ হয়ে গোসল করা যেতে পারে, তাতে দোষের কিছু নেই। গোসলের সময় ছেলে ছেলেদের সামনে এবং মেয়ে মেয়েদের সামনে উলঙ্গ হতে পারবে না।

নাভির এবং বোগলের নিচের লোম পরিষ্কার

আনাস (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন : আমাদের জন্য গোঁফ কাটা, নখ কাটা, বগলের লোম পরিষ্কার করা এবং নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করার ব্যাপারে সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে চল্লিশ দিন। (সহীহ মুসলিম, ইবনে মাজাহ)