hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী ও সমকালীন বিশ্ব

এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই যে, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী ছিল মানব ইতিহাসের সর্বাধিক অন্ধকারময় ও অধঃপতিত যুগ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবতা যেভাবে অধঃপতন ও অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছিল এ সময় সে তার চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে উপনীত হয়েছিল। গোটা বিশ্বে এমন কোন শক্তি ছিল না যা এই পতনোন্মুখ মানবতাকে হাত ধরে তাকে ধ্বংসের অতল গহ্বর থেকে রক্ষা করতে পারে। অধঃপতনের গতি প্রতিদিনই দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল। এই শতাব্দীতে মানুষ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে অবশেষে একদিন নিজেকেও ভুলে বসেছিল। পরিণতি সম্পর্কে ভাবলেশহীন ও বেখবর মানুষ ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করবার শক্তি থেকেও সম্পূর্ণ মাহজম হয়ে গিয়েছিল। পয়গম্বরগণের দাওয়াতের আওয়াজ বহুকাল চাপা পড়ে গিয়েছিল। যেসব প্রদীপ এসব পয়গম্বর ও নবী-রসূল জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন বাতাসের প্রচণ্ড তুফান তা হয় একেবারে নিভিয়ে দিয়েছিল অথবা তা এই ঘনঘোর অন্ধকারে এমন নিভু নিভু হয়ে গিয়েছিল যারা কেবল কয়েকজন আল্লাহভক্তের দিলই রৌশন ও অলোকিত ছিল যা শহর তো দূরের কথা কয়েকটা গোটা বাড়িও আলোকিত করতে পারে না। দীনদার লোকেরা দীনের আমানত নিজেদের বুকের ভেতর আগলে রেখে জীবন ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মঠ, গির্জা ও প্রান্তরের এক কোণে গিয়ে ঠাই নিয়েছিল এবং জীবন সংগ্রাম, এর দাবি ও রাজনীতি এবং আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদের দ্বন্দে পরাজিত হয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে বসেছিল। আর যারা জীবনের এই তুফানে অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল তারা রাজা-বাদশাহ ও দুনিয়াদার লোকদের সাথে স্বার্থের ভাগাভাগি করে নিয়েছিল এবং তাদের অবৈধ কামনা-বাসনা ও জুলুম-নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাদের সহযোগী, বাতিল তথা অসৎ পন্থায় লোকের সম্পদ গ্রাস এবং তাদের শক্তি ও সম্পদ থেকে নাজায়েয ফায়দা লুটবার ক্ষেত্রে তাদের অংশীদারে পরিণত হয়েছিল।

রোমক ও পারসিকরা তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নেতৃত্ব ও দুনিয়ার কর্তৃত্বের ইজারাদারে পরিণত হয়েছিল। তারা ছিল দুনিয়ার জন্য উত্তম ও আদর্শ নমুনা হবার পরিবর্তে সর্বপ্রকার মন্দ ও ফেতনা-ফাসাদের পতাকাবাহী এবং যাবতীয় অপকর্মের গুরু ঠাকুর। বিভিন্ন সামাজিক ও চারিত্রিক রোগ-ব্যাধির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল এসব জাতিগোষ্ঠী বহুকাল থেকে। এদের লোক আরাম-আয়েশ ও বিলাসী জীবন এবং কৃত্রিম সভ্যতা-সংস্কৃতির সমুদ্রে ছিল আপাদমস্তক নিমজ্জিত। রাজা-বাদশাহ ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ অলস ঘুমে বিভোর এবং ক্ষমতার নেশায় বুদ ছিল। বিলাস জীবনের স্বাদ উপভোগ ও কামনা-বাসনার পরিতৃপ্তি ছাড়া দুনিয়ার বুকে তাদের আর কোন চিন্তা কিংবা লক্ষ্য ছিল না। জীবনের চাহিদা ও স্বাদ ভোগের লোভ তাদের এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, কোন কিছুতেই ও কোনভাবেই তা পরিতৃপ্ত হতো না। মধ্যবিত্ত শ্রেণী (প্রতিটি যুগের নিয়ম মাফিক) উপরিউক্ত উচ্চবিত্ত শ্রেণীর পদাংক অনুকরণ করে চলতে চেষ্টা করত এবং এই অনুকরণকে সবচে' গর্বের বস্তু মনে করত। থাকল সাধারণ মানুষ! তা তারা তো জীবনের বোঝা, হুকুমতের দাবি ও কভারের চাপে এতটাই নিষ্পেষিত এবং দাসত্ব ও আইনের শেকলে এতটাই আবদ্ধ হয়েছিল যে, তাদের জীবন জীব-জানোয়ারের চাইতে আদৌ ভিন্নতর ছিল না। অপরের আরাম-আয়েশের জন্য পরিশ্রম ও হাড়ভাঙা খাটুনি এবং অন্যের আয়েশ ও বিলাসের জন্য নির্বাক পশুর মত সব সময় জোতা থাকা এবং পশুর মতই উদর পূর্তি ভিন্ন তাদের আর কোন হিস্যা ছিল না। কখনো যদি তারা এই শুষ্ক ও . বিস্বাদ জীবন এবং এর একঘেয়ে চক্করে পড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠত তখন নেশাকর বস্তু ও সস্তা আমোদ-প্রমোদ ও খেল-তামাশা দ্বারা নিজেদের মনকে ভোলাতে চাইত এবং কখনো যদি জীবনের এই যন্ত্রণা থেকে আরাম ও স্বস্তির শ্বাস গ্রহণের মওকা মিলত তখন অভুক্ত ও লোভাতুর মানুষের মত ধর্ম ও সর্বপ্রকার। নীতি-নৈতিকতার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে পাশবিক আনন্দের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ত।

দুনিয়ার নানা অংশে ও বিভিন্ন ভূখণ্ডে এমন সব ধর্মীয় শৈথিল্য, আত্মবিস্মৃতি, সামাজিক অনাচার ও বিশৃংখলা ও নৈতিক অধঃপতন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল যে, মনে হচ্ছিল এসব দেশ অধঃপতন ও অধঃগতি এবং ধ্বংস ও অরাজকতার ক্ষেত্রে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাবার প্রতিযোগিতায় মাততে চায় এবং এটা ফয়সালা করা কঠিন হয়ে পড়ে যে, এগুলোর মধ্যে কোন্টি অন্যের চাইতে এগিয়ে আছে।