hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮২

পতন যুগের সূচনা ও এর কারণসমূহ

জনৈক লেখক কী সুন্দরই না বলেছেন, “মানুষের জীবনে এমন দুটো ব্যাপার আছে যার সঠিক মুহূর্তটি কেউ বলতে পারে না। এর একটার সম্পর্ক মানুষের ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে আর তা হলো নিদ্রা। আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক জাতীয় জীবনের সঙ্গে আর তা হলো তার অধঃপতন। আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেনি যে, অমুক ব্যক্তিটি ঠিক কখন নিদ্রাচ্ছন্ন হলো বা ঘুমিয়ে পড়ল এবং অমুক জাতির পতন ঠিক কোন্ দিন্ বা কোন তারিখ থেকে শুরু হলো। মানুষ কেবল তখনই তা জানতে পারে যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা জাতি অসাড় হয়ে পড়ে।

অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই এটা সত্য ও বাস্তব। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর জীবনে পতনের সূচনা অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর জীবনের তুলনায় অনেক বেশি সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান। আমরা যদি চরম উন্নতি ও পতনের মাঝের সীমাকে চিহ্নিত করতে চাই তাহলে আমরা আমাদের আঙুল সেই ঐতিহাসিক রেখার ওপর রেখে দেব যেই রেখা খেলাফতে রাশেদা ও আরব রাজতন্ত্র বা মুসলমানদের বাদশাহীর মধ্যে বিভাজনকারী সীমা। সরাসরি ইসলামী নেতৃত্ব বা এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের বাগডোর সেই সমস্ত ব্যক্তির হাতে ছিল যাদের প্রত্যেক সদস্য তাঁর ঈমান ও আকীদা, আমল ও আখলাক, প্রশিক্ষণ ও সভ্যতা-সংস্কৃতি, সুকুমার বৃত্তি ও উন্নত চরিত্র বা ভারসাম্য রক্ষায় দিক থেকে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হিওয়াসাল্লাম-এর একটি স্থায়ী মু'জিযা ছিলেন। মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে ইসলামের ছাচে এমনভাবে ঢেলেছিলেন যে, একমাত্র দেহ ছাড়া আর কোন কিছুতে আপন অতীতের সঙ্গে তাদের কোন সাদৃশ্য অবশিষ্ট ছিল না। না ঝোঁক ও প্রবণতার ক্ষেত্রে, না মন-মানসিকতার মধ্যে আর না চিন্তা-ভাবনার পন্থা ও পদ্ধতির মধ্যে, না প্রবৃত্তির ক্ষেত্রে। এ সমস্ত সম্মানিত ব্যক্তি যাদের কথা ওপরে বলা হয়েছে-দীন ও দুনিয়ার সমন্বয়ের পরিপূর্ণ নমুনা ছিলেন। তাঁরা একাধারে সালাতের ইমাম, মসজিদের খতীব, কাযী ও বিচারক, বায়তুল মাল তথা সরকারী কোষাগারের আমানতদার ও বিশ্বস্ত ভাণ্ডাররক্ষক এবং সেনাবাহিনীর সিপাহসালার ছিলেন এবং একই সময় তারা যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সমাধান, রাষ্ট্র ও শহর-নগরের ব্যবস্থাপনা এবং সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ও বিভাগের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁদের মধ্যে একেকজন একই সময়ে মুত্তাকী সাধক, সিপাহী ও মুজাহিদ, সমঝদার। কাযী, মুজতাহিদ ও ফকীহ, কুশলী ও অভিজ্ঞ প্রশাসক ও নিপুণ রাজনীতিক ছিলেন। তাদের ব্যক্তিসত্তায় একই সময় (খলীফা ও আমীরুল মু'মিনীন হিসাবে) ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয় ঘটেছিল। তাদের চারিপাশে সেই সমস্ত লোকের জামাআত ছিল যারা সেই একই মাদরাসা-ই নববী কিংবা মসজিদে নববীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। একই ছাঁচে ঢালা, একই আত্মার ধারক-বাহক এবং একই স্বভাব-চরিত্র ও গুণে গুণান্বিত। খলীফা তাঁদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজই তাদের পরামর্শ ও সাহায্য ছাড়া করতেন। অনন্তর তাঁদের প্রাণসত্তা সভ্যতা-সংস্কৃতির সমগ্র কাঠামোতে, হুকুমতের গোটা ব্যবস্থায় এবং মানুষের সমগ্র জীবন, সমাজ ও চরিত্রের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে যায়। সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর তাদের ঝোক ও প্রবণতার ছায়াপাত ঘটে। তাতে তাদের বৈশিষ্ট্যাবলীর পূর্ণ প্রতিবিম্ব পড়ে। সেখানে আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব ছিল না, ছিল না ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে কোন সংঘাত কিংবা সংঘর্ষ। সেখানে দীন ও দুনিয়ার কোন পার্থক্য বা বিভাজন ছিল না, ছিল না নীতি ও উপযোগিতার মধ্যে কোন প্রকার টানাপোড়েন। তেমনি উদ্দেশ্য সিদ্ধি ও নৈতিক চরিত্রের মধ্যেও কোন বিশেষত্ব ছিল না। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণী-সম্প্রদায় ও দল-উপদলের মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহ বা প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনার ভেতর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ছিল না। মোটের ওপর তাঁদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইসলামী সালতানাতের সমাজ জীবন এর প্রতিষ্ঠাতাদের নৈতিক চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, ভারসাম্য ও সামগ্রিকতার পূর্ণ প্রতিনিধিত্বকারী দর্পণস্বরূপ ছিল।