hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮

ইরানের সম্রাটপূজা

ইরানের রাজা-বাদশাহগণ যাদের উপাধি ছিল কিসরা (খুসরাও), দাবি করত যে, তাদের শিরা-উপশিরায় খোদায়ী রক্ত প্রবাহিত। ইরানের জনগণও তাদেরকে সেই নজরেই দেখত যেন তাদের সম্রাটই তাদের খোদা। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের ঐসব সম্রাটের প্রকৃতিতে একটি পবিত্র আসমানী বস্তু রয়েছে। অনন্তর এসব লোক তাদের সম্রাটকে সিজদা করত এবং তাদের ওপর উলুহিয়াত তথা ঈশ্বরত্ব আরোপ করে তাদের জয়গান গাইত। তারা তাদেরকে আইনের কোন প্রকার সমালোচনার, এমন কি মানবত্বের উধ্বে বলে জ্ঞান করত। ভক্তির আতিশয্যে সম্রাটের নাম তারা মুখে আনত না। কেউ তাদের দরবার কিংবা মজলিসে বসতেও সাহস করত না। ইরানের জনগণের বিশ্বাস ছিল যে, ঐসব সম্রাটের প্রত্যেক মানুষের ওপর জন্মগত অধিকার রয়েছে, কিন্তু অন্য কারো সম্রাটের ওপর অধিকার নেই। কোন সম্রাট তার সম্পদের থেকে কাউকে কিছু দিলে কিংবা দস্তরখান থেকে এক টুকরো কাউকে প্রদান করলে এটা একান্ত তার দয়া ও বদান্যতা; কারুর কিছু দাবি করার অধিকার নেই। নির্দেশ পালন ছাড়া জনগণের আর কোন অধিকার নেই। দেশ ও জাতির ওপর শাসন দণ্ড পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ পরিবারের (কায়ানী পরিবার) একচেটিয়া অধিকার ছিল। ইরানের জনগণ মনে করত যে, কেবল ঐ পরিবারের লোকেরাই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং সাম্রাজ্যের কেবল তারাই মালিক হতে পারেন। আর এই অধিকার উত্তরাধিকারসূত্রে পিতা থেকে পুত্রে পর্যায়ক্রমে হস্তান্তরিত হতে থাকবে। এতে কারোর হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই। অনন্তর জনগণ সমকালীন সম্রাটের ওপর ঈমান রাখত এবং হুকুমতকে শাহী খান্দানের মৌরছী অধিকার মনে করত, যে অধিকারে নাক গলাবার ক্ষমতা কারোর ছিল না। যদি ঐ পরিবারে কোন প্রবীণ ও বয়স্ক লোক না পাওয়া যেত তাহলে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোন শিশুকেই নিজেদের সম্রাট হিসেবে মেনে নিত। যদি পুরুষ না পাওয়া যেত তবে কোন মহিলাকেই রাজমুকুট পরিধান করানো হতো। অনন্তর শায়রূয়ার পর তার সাত বছর বয়স্ক পুত্র আদেশীরকে সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং একইভাবে খুসরাও (খসরূ)-কে ও পারভেযের পুত্র ফররুখাদ খুসরাও {খসরু)-কেও শিশুকালেই লোকেরা সম্রাট ঘোষণা দেয়। কিসরা কন্যা পুরান দতও সিংহাসনে উপবেশন করেছিল। অপর কন্যা আরমীদও সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিল।১ কারোর কল্পনায়ও আসেনি যে, কোন সিপাহসালার কিংবা বড় সর্দার অথবা অপর কোন যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে (যেমন রুস্তম ও জাবান। ছিলেন) সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব সোপর্দ করা যেতে পারে। যেহেতু শাহী। পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল না সেহেতু তাদের সম্পর্কে ভাবার প্রশ্নই ওঠেনি।

ধর্মীয় খান্দান এবং নেতৃস্থানীয় সর্দার ও সামন্ত প্রভুদের সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে, এই সব লোক সাধারণ লোকের তুলনায় অনেক উচ্চ স্তরের। তাদের ব্যক্তিত্ব ও তাদের মন-মস্তিষ্ক অপরাপর মানুষের থেকে পৃথক। এইসব লোককে ইরানের লোকেরা সীমাহীন ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিল। উঁচু-নীচুর পার্থক্য, শ্রেণী বৈষম্য ও বিভিন্ন পেশার বিভক্তি ইরানী সমাজ ও জীবন যাপন পদ্ধতির অনড় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যার ভেতর পরিবর্তন ছিল অসম্ভব। অধ্যাপক আর্থার ক্রিস্টিনসেনের ভাষায়ঃ

সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে অনতিক্রম্য ব্যবধান ও দূরত্ব ছিল।২ হুকুমতের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণের প্রতি এই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল যে, তারা কোন আমীর-উমারার স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি খরিদ করতে পারবে না।৩ সাসানী রাজনীতির এই অপরিবর্তনীয় নীতি ছিল যে, কখনো কোন লোেক জন্মসূত্রে প্রাপ্ত মান-সম্মানের চাইতে বড় কোন কিছুর প্রত্যাশী হবে না।৪ কোন লোকের পক্ষে তার জন্মগত পেশা পরিত্যাগ করে অন্য কোন পেশা গ্রহণ করা বৈধ ছিল না।৫ পারস্য সম্রাটগণ হুকুমতের কোন কাজ কিংবা দায়িত্ব কোন নীচ শ্রেণী কিংবা বংশের লোকদের সোপর্দ করতেন না।৬ সাধারণ গণমানুষের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সুস্পষ্ট বৈষম্য ও ভেদরেখা ছিল। সমাজে সকলের একটি সুনির্ধারিত স্থান ছিল।৭

[১, তারীখে তাবারী, ২য় খণ্ড ও তারীখে ইরান, ম্যাকারিয়াস ইরানীকৃত; ]

[২- ৭. সাসানী আমলে ইম, পৃ. যথাক্রমে,৫৯০, ৪২০, ৪১৮, ৪২২, ৪২২ ও ৪২১; ]