hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৫

অর্থের প্রাচুর্য ও বিত্তের ছড়াছড়ি

এরূপ বিলাসিতা ও অপচয়পূর্ণ জীবনের অনিবার্য পরিণতি ছিল এই যে, সাধারণ জনগণের ওপর এত বিবিধ প্রকার কর ধার্য করা হবে যার ভার বহন করা হবে তাদের সাধ্যাতীত। এমন সব আইন নিত্যই প্রণীত হব যার দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষক, ব্যবসায়ী, শিল্পী ও কারিগরদের উপার্জিত সম্পদ নানাভাবে শোষণ করা যায়। পরিণতি এতদূর গিয়ে পৌঁছে যে, নিত্য দিনের এই বর্ধিত ও বিপুল অংকের কভারে প্রজাদের কোমর ভেঙে যায় এবং হুকুমতের নিত্য নতুন চাহিদা মেটাতে গিয়ে তাদের শিরদাঁড়া বেঁকে যায়। সাসানী আমলে ইরান’ গ্রন্থের লেখক বলেঃ

“নিয়মিত কর ছাড়াও প্রজাবৃন্দের কাছ থেকে নযরানা গ্রহণের প্রথা আইনের নামে চালু ছিল। এই আইন অনুসারে ঈদ, নওরোয় ও মেহেরগান উপলক্ষে লোকের কাছ থেকে যবরদস্তিমূলকভাবে উপঢৌকন আদায় করা হতো। শাহী ভাণ্ডারের আমদানী উৎসের ভেতর আমাদের ধারণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল জায়গীর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয় এবং সেই সব উপায় বা মাধ্যম যা সম্রাটের বিশেষ অধিকার হিসেবে নির্ধারিত ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, আর্মেনিয়ায় অবস্থিত ফারিঙ্গী এলাকার স্বর্ণ-খনির যাবতীয় আয় সম্রাটের ব্যক্তিগত আয় হিসেবে গণ্য ছিল।”১

সিরীয় ঐতিহাসিক রোমক হুকুমতের কর্মপন্থা এবং এর আমদানি-রফতানি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেনঃ

“সিরীয় প্রজাদের ওপর হুকুমতের পক্ষ থেকে নির্ধারিত কর আদায় করা বাধ্যতামূলক ছিল এবং তাদের উৎপাদিত দ্রব্য ও আয়-উপার্জনের এক-দশমাংশ ও মূলধনের ট্যাক্স দিতে হতো। মাখাপ্রতি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়াও রোমকদের আয়-আমদানির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উৎসও ছিল, যেমন নগর শুল্ক, বাণিজ্য শুল্ক ও অন্যবিধ রাজস্ব। এ ছাড়া যেসব জমি গম চাষের উপযোগী ও পশু চারণ ভূমি সেগুলো চুক্তির ভিত্তিতে ইজারা দেওয়া হতো আর এসব ইজারাদার (ঠিকাদার)-কে ‘আশশারীন’ বলা হতো। এসব লোক সরকার থেকে টোল আদায়ের অধিকার খরিদ করত এবং প্রজাদের থেকে ধার্যকৃত অর্থ আদায় করত। প্রতি প্রদেশে এই সব ইজারাদারের কয়েকটি কোম্পানী থাকত। আর এই সব কোম্পানীতে কিছু মুনশী ও তহশীলদার নিয়োগপ্রাপ্ত হতো যারা নিজেদেরকে অফিসার ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরূপে জনগণের সামনে পেশ করত এবং নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত কর আদায় করত। তারা সাধারণ মানুষকে আরাম ও আয়েশী জীবন যাপনের উৎস থেকে মাহরূম করত এবং প্রায়ই তাদেরকে ক্রীতদাসের ন্যায় বিক্রিও করে দিত।”২

রোমকদের রাজনৈতিক নীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে কেউ নিয়োক্তভাবে বর্ণনা দিয়েছেন।

“উত্তম রাখাল সেই যে তার ভেড়ার লোম কাটে বটে, কিন্তু চেঁছে ফেলে না। ঘটনা এই যে, দুই শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়ে গেছে রোম সম্রাট তাঁর সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের লোম কাটছেন (চেঁছে ফেলতে চেষ্টা করেন নি। তিনি তাদের থেকে বিরাট অংকের অর্থ আদায় করছেন, কিন্তু একই সঙ্গে তাদেরকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষাও করছেন।”৩

[১.সাসানী আমলে ইরান, ১৬১ পৃ.। ]

[২. খুতু’শ-শাম, মুহাম্মদ কুর্দ আলীকৃত, ৫ম খণ্ড, ৪৭ পৃ.। ]

[৩. প্রাগুক্ত। ]