১
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?
লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১০০
তুর্কীদের বৈশিষ্ট্য
তুর্কী মুসলমানদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যদ্দরুন তারা মুসলমানদের নেতৃত্ব দেবার অধিকার রাখত। তাঁদের সে বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
(১) তারা ছিল উন্নত মনোবলসম্পন্ন, উৎসাহদীপ্ত ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একটি জীবন্ত জাতি যাদের মধ্যে জিহাদী রূহ সক্রিয় ছিল এবং যারা বেদুঈন যিন্দেগী ও সহজ সরল ও অনাড়ম্বর জীবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে তাদের নৈতিক, চারিত্রিক ও সামাজিক রোগ-ব্যাধির হাত থেকে নিরাপদ ছিল যেসব রোগে প্রাচ্য ভূখণ্ডের অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠী আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
(২) তাদের কাছে এমন সামরিক শক্তি ছিল যা দিয়ে তারা ইসলামের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক প্রাধান্য কেবল বজায় রাখতেই নয় বরং চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ জাতিগুলোর আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে পারে। এবং দুনিয়ার নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হতে পারে। একই সময় উছমানী সালতানাত তিনটি মহাদেশ অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা ও য়ুরোপের বুকে রাজত্ব করত। মুসলিম প্রাচ্য ইরান থেকে শুরু করে মরক্কো অবধি তাদের অধীন ছিল। এশিয়া মাইনরও তারা পদানত করেছিল এবং য়ুরোপে অগ্রাভিযান চালিয়ে তারা ভিয়েনার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। ভূ-মধ্যসাগরের ওপর ছিল তাদের একত্র আধিপত্য। এর ওপর অন্য কোন জাতি কিংবা সাম্রাজ্যের কোন প্রভাব ছিল না।
রুশ সম্রাট পিটার দি গ্রেট-এর আস্থাভাজন এক বন্ধু একবার কনস্টান্টিনোপল থেকে ম্রাটকে লিখেছিলেন যে, সুলতান কৃষ্ণসাগরকে নিজের ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া সম্পদ মনে করেন যেখানে অন্য কার প্রবেশাধিকার নেই। তুর্কী নৌবহরের মুন্সবিলা সম রূপে মিলেও করতে পারত না। ৯৪৫ হি/ ১৫৪৭ খ্রি. পোপের আহ্বানে ভেনিস, স্পেন, পর্তুগাল ও মাল্টার সম্মিলিত নৌবহর তুর্কী নৌবহরকে পর্যন্ত করার প্রয়াস পায়, কিন্তু নিদারুণভাবে পরাজিত হয়। সুলতান সুলায়মানের শাসনামলে কি স্থলভাগে আর কি জলভাগে, সর্বত্র তুকদের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আমলে উছমানী সালতানাতের সীমানা উত্তরে সাভা দরিয়া, দক্ষিণে নীল নদের উল মুৰ ও ভারত মহাসাগর, পূর্বে ককেশাস পর্বতমালা ও পেিম আটলাস পর্বত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তার শাসনাধীন এলাকা চার লক্ষ বর্গমাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তুর্কী খেরে তখন তিন হাজার সামরিক জাহাজ। একমাত্র নোম ছাড়া প্রাচীন আমলের প্রায় সব বিখ্যাত শহরই ছিল তুকী সুলতানদের অধীন।১
সমগ্র য়ূরোপ তুর্কীদের ভয়ে কাঁপত। তাদের বড় বড় রাজা-বাদশাহরা তুর্কী সুলতানদের আশ্রয়ে থাকাকেই বেশি নিরাপদ ভাবত। তাদের সম্মানে গির্জায়। ঘন্টা ধ্বনি থেমে যেত।
(৩) আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের উপযোগী সর্বোত্তম কৌশলগত ভৌগোলিক কেন্দ্রও ছিলো তাদের হাতে। তারা বলকান উপদ্বীপ থেকে একই সময় এশিয়া ও য়ুরোপের খবরদারি করতে পারত। তাদের রাজধানী ছিল কৃষ্ণসাগর ও মর্মর সাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় এবং য়ুরোপ ও এশিয়ার সঙ্গমস্থলে। ফলে একই সাথে তিন তিনটি মহাদেশের (যুরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা) খবরদারির জন্য এটাই ছিল সর্বোত্তম রাজধানী। তাই নেপোলিয়ন একবার বলেছিলেন?
"If a World-Government ever came to be established, Constantinople alone would be an ideal capital for it."
অর্থাৎ যদি কোন দিন সমগ্র বিশ্বব্যাপী এক অখণ্ড সাম্রাজ্য কায়েম হয় তবে এর রাজধানী হিসেবে কনস্টান্টিনোপলই হবে সর্বোত্তম স্থান।
তুর্কীদের অবস্থান ছিল সেই য়ুরোপ ভূখণ্ডে নিকট ভবিষ্যতে যে ভূখণ্ডটি বিরাট গুরুত্ব ও অবস্থানগত মর্যাদা লাভ করতে যাচ্ছিল। জীবনের শক্তি-সামর্থ্য ও উন্নতি-অগ্রগতির যাবতীয় উপাদান-উপকরণ তার মধ্যে উথাল-পাতাল করছিল। যদি আল্লাহ পাক তৌফিক দিতেন তাহলে তুর্কীদের পক্ষে ইলম ও আল তথা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে অগ্রসর হয়ে য়ুরোপের খ্রিস্টান জাতিগোষ্ঠীর বিজয়ী হয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের বাগডোর হাতে তুলে নেবার আগেই বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়ে গোটা দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো এবং তাকে সত্য ও হেদায়েতের প্রশস্ত মনযিল অভিমুখে পরিচালিত করা সম্ভব ছিল-যে সত্য ও সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা (হেদায়েত)-এর উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তারা ইসলামের বদৌলতে লাভ করেছিল।
[ ১. ফালসাফা-ই তারীখুল ইসলামী, মুহাম্মদ জামীল বেইমকৃত, ২৮০-১ পৃ.। ]
(১) তারা ছিল উন্নত মনোবলসম্পন্ন, উৎসাহদীপ্ত ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একটি জীবন্ত জাতি যাদের মধ্যে জিহাদী রূহ সক্রিয় ছিল এবং যারা বেদুঈন যিন্দেগী ও সহজ সরল ও অনাড়ম্বর জীবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে তাদের নৈতিক, চারিত্রিক ও সামাজিক রোগ-ব্যাধির হাত থেকে নিরাপদ ছিল যেসব রোগে প্রাচ্য ভূখণ্ডের অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠী আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
(২) তাদের কাছে এমন সামরিক শক্তি ছিল যা দিয়ে তারা ইসলামের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক প্রাধান্য কেবল বজায় রাখতেই নয় বরং চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ জাতিগুলোর আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে পারে। এবং দুনিয়ার নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হতে পারে। একই সময় উছমানী সালতানাত তিনটি মহাদেশ অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা ও য়ুরোপের বুকে রাজত্ব করত। মুসলিম প্রাচ্য ইরান থেকে শুরু করে মরক্কো অবধি তাদের অধীন ছিল। এশিয়া মাইনরও তারা পদানত করেছিল এবং য়ুরোপে অগ্রাভিযান চালিয়ে তারা ভিয়েনার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। ভূ-মধ্যসাগরের ওপর ছিল তাদের একত্র আধিপত্য। এর ওপর অন্য কোন জাতি কিংবা সাম্রাজ্যের কোন প্রভাব ছিল না।
রুশ সম্রাট পিটার দি গ্রেট-এর আস্থাভাজন এক বন্ধু একবার কনস্টান্টিনোপল থেকে ম্রাটকে লিখেছিলেন যে, সুলতান কৃষ্ণসাগরকে নিজের ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া সম্পদ মনে করেন যেখানে অন্য কার প্রবেশাধিকার নেই। তুর্কী নৌবহরের মুন্সবিলা সম রূপে মিলেও করতে পারত না। ৯৪৫ হি/ ১৫৪৭ খ্রি. পোপের আহ্বানে ভেনিস, স্পেন, পর্তুগাল ও মাল্টার সম্মিলিত নৌবহর তুর্কী নৌবহরকে পর্যন্ত করার প্রয়াস পায়, কিন্তু নিদারুণভাবে পরাজিত হয়। সুলতান সুলায়মানের শাসনামলে কি স্থলভাগে আর কি জলভাগে, সর্বত্র তুকদের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আমলে উছমানী সালতানাতের সীমানা উত্তরে সাভা দরিয়া, দক্ষিণে নীল নদের উল মুৰ ও ভারত মহাসাগর, পূর্বে ককেশাস পর্বতমালা ও পেিম আটলাস পর্বত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তার শাসনাধীন এলাকা চার লক্ষ বর্গমাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তুর্কী খেরে তখন তিন হাজার সামরিক জাহাজ। একমাত্র নোম ছাড়া প্রাচীন আমলের প্রায় সব বিখ্যাত শহরই ছিল তুকী সুলতানদের অধীন।১
সমগ্র য়ূরোপ তুর্কীদের ভয়ে কাঁপত। তাদের বড় বড় রাজা-বাদশাহরা তুর্কী সুলতানদের আশ্রয়ে থাকাকেই বেশি নিরাপদ ভাবত। তাদের সম্মানে গির্জায়। ঘন্টা ধ্বনি থেমে যেত।
(৩) আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের উপযোগী সর্বোত্তম কৌশলগত ভৌগোলিক কেন্দ্রও ছিলো তাদের হাতে। তারা বলকান উপদ্বীপ থেকে একই সময় এশিয়া ও য়ুরোপের খবরদারি করতে পারত। তাদের রাজধানী ছিল কৃষ্ণসাগর ও মর্মর সাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় এবং য়ুরোপ ও এশিয়ার সঙ্গমস্থলে। ফলে একই সাথে তিন তিনটি মহাদেশের (যুরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা) খবরদারির জন্য এটাই ছিল সর্বোত্তম রাজধানী। তাই নেপোলিয়ন একবার বলেছিলেন?
"If a World-Government ever came to be established, Constantinople alone would be an ideal capital for it."
অর্থাৎ যদি কোন দিন সমগ্র বিশ্বব্যাপী এক অখণ্ড সাম্রাজ্য কায়েম হয় তবে এর রাজধানী হিসেবে কনস্টান্টিনোপলই হবে সর্বোত্তম স্থান।
তুর্কীদের অবস্থান ছিল সেই য়ুরোপ ভূখণ্ডে নিকট ভবিষ্যতে যে ভূখণ্ডটি বিরাট গুরুত্ব ও অবস্থানগত মর্যাদা লাভ করতে যাচ্ছিল। জীবনের শক্তি-সামর্থ্য ও উন্নতি-অগ্রগতির যাবতীয় উপাদান-উপকরণ তার মধ্যে উথাল-পাতাল করছিল। যদি আল্লাহ পাক তৌফিক দিতেন তাহলে তুর্কীদের পক্ষে ইলম ও আল তথা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে অগ্রসর হয়ে য়ুরোপের খ্রিস্টান জাতিগোষ্ঠীর বিজয়ী হয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের বাগডোর হাতে তুলে নেবার আগেই বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়ে গোটা দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো এবং তাকে সত্য ও হেদায়েতের প্রশস্ত মনযিল অভিমুখে পরিচালিত করা সম্ভব ছিল-যে সত্য ও সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা (হেদায়েত)-এর উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তারা ইসলামের বদৌলতে লাভ করেছিল।
[ ১. ফালসাফা-ই তারীখুল ইসলামী, মুহাম্মদ জামীল বেইমকৃত, ২৮০-১ পৃ.। ]