hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২৮

আধ্যাত্মিকতার মধ্যে বস্তুবাদ

এই বস্তুবাদী স্পিরিট নতুন প্রাচীন নির্বিশেষে য়ুরোপের সমস্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আপনি দেখতে পাবেন, এমন কি যে আধ্যাত্মিক আন্দোলনের স্পিরিটের প্রতি য়ুরোপের বিরাট আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল তাও ছিল এই বস্তুবাদই। এও পাশ্চাত্যের অপরাপর শিল্প ও কলা-শাস্ত্রের ন্যায় এক প্রকার বিজ্ঞান ও শিল্প-কলাই বটে যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক জগতের মিউজিয়ামগুলো ভ্রমণ করা, তার রহস্যসমূহ অবগত হওয়া, মৃত মানুষগুলোর আত্মার সাথে কথা বলা এবং চিত্ত-বিনোদন ও চিত্ত প্রশান্তির উপকরণ সংগ্রহ করা। প্রাচ্যের ইসলামী রূহানিয়াত ও তাসাওউফের বিপরীতে একে তাযকিয়ায়ে নফ্স তথা আত্মশুদ্ধি, হৃদয়ের সংশোধন, আল্লাহর ভয়, নেক আমল, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কঠোর কঠিন মুজাহাদা এবং মৃত্যু। পরবর্তী জীবন ও তার প্রস্তুতির সঙ্গে এর সামান্যতম সম্পর্কও নেই। তেমনি যেসব কাজে য়ুরোপের লোকেরা নিজেদের জীবন দিয়ে দেয়, সেগুলোও শুধু বস্তুগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যই তারা করে থাকে। যদি এসব কাজের পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে সে সবের পেছনেও কোন না কোন বস্তুস্বার্থ ও উদ্দেশ্য কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ খ্যাতি, লিপ্সা, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবার প্রেরণা, জাতীয় ও দেশীয় সম্মান ও গর্ব প্রভূতির কথা বলা যেতে পারে যেগুলোর কোথাও আল্লাহর সন্তুষ্টি অভীষ্ট হয় না। পক্ষান্তরে একজন মুসলমানের প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিই কাম্য হয়ে থাকে এবং সে নির্ভেজাল তাঁরই সন্তুষ্টি লাভের আকাক্সক্ষায় কাজ করতে চায়। যে জিনিস পাশ্চাত্যে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, এখানে তা পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। পাশ্চাত্যে যা গর্ব ও গৌরবের বস্তু, একজন মুসলমানের জন্য তাই লজ্জাকর ও দোষাবহ।

কুরআন মজীদের আয়াতঃ

( قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِینَ أَعۡمَـٰلًا ۝ ٱلَّذِینَ ضَلَّ سَعۡیُهُمۡ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ ٱلدُّنۡیَا وَهُمۡ یَحۡسَبُونَ أَنَّهُمۡ یُحۡسِنُونَ صُنۡعًا ۝ أُو۟لَـٰۤىِٕكَ ٱلَّذِینَ كَفَرُوا۟ بِـَٔایَـٰتِ رَبِّهِمۡ وَلِقَاۤىِٕهِۦ فَحَبِطَتۡ أَعۡمَـٰلُهُمۡ فَلَا نُقِیمُ لَهُمۡ یَوۡمَ ٱلۡقِیَـٰمَةِ وَزۡن ࣰا)

[Surah Al-Kahf 103 - 105]

“বল, আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব কাজে-কর্মে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের?' ওরাই তারা, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পণ্ড হয় যদিও তারা মনে করে, তারা সকাজ করছে। ওরাই তারা, যারা অস্বীকার করে ওদের। প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে ওদের সাক্ষাতের বিষয়। ফলে ওদের কর্ম নিস্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন ওদের জন্য ওযনের কোন ব্যবস্থা রাখব না।” (সূরা কাহফঃ ১০৩-৫)

( وَقَدِمۡنَاۤ إِلَىٰ مَا عَمِلُوا۟ مِنۡ عَمَل ࣲ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَاۤء ࣰ مَّنثُورًا )

[Surah Al-Furqan 23]

“আমি ওদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করব, এরপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” (সূরা ফুরকানঃ ২৩)

রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, একজন বীরত্বের ওপর ভিত্তি করে লড়াই করে, একজন আত্মমর্যাদাবোধের জোশে উদ্দীপ্ত হয়ে এবং আরেকজন বাহাদুরী ফলাবার উদ্দেশে লড়াই করে। এগুলোর মধ্যে কোন্টি আল্লাহর রাস্তায় হয়েছে বলে বিবেচিত হবে? তিনি বললেন, কেবল সেই যুদ্ধ যা এই উদ্দেশে পরিচালিত হয় যেন আল্লাহর বাণী সমুন্নত হয়, সেটাই আল্লাহ্র রাস্তায় হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। এই মূলনীতি ও হাকীকতের যারা সমর্থক ছিলেন তারা নিজেদের কাজ ও পুণ্যগুলোকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য সযত্ন প্রয়াস চালাতেন। এর পরও তারা সদা শংকিত থাকতেন এবং রিয়া হয়ে গেল কি-না তার ভয় করতেন। হযরত ওমর (রা) -এর একটি বিশেষ দোআ ছিল নিম্নরূপঃ

اللهم اجعل عملى گله صلحا واجعله له وجهك خالصا ولاتجعلن لغيرك فيه شيئا .

অর্থাৎ “ হে আল্লাহ! আমার সমস্ত আমলকে তুমি শুদ্ধ বানিয়ে দাও এবং সেগুলোকে নির্ভেজাল তোমার জন্যই বানিয়ে নাও; তুমি ছাড়া আর কারোর অংশ এতে রেখো না।”