hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫২

অতীত মুসলিম নেতৃত্বের প্রভাব

পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে এ সত্য দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেছে, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে যখন বিশ্ব দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং পৃথিবীর বুকে এমন কোন শক্তি ছিল না যা পতনোন্মুখ মানবতাকে হাত ধরে বাঁচাতে পারে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব পৃথিবীকে এমন একটি দলের নেতৃত্ব প্রদান করে যারা ছিলেন আসমানী গ্রন্থ ও একটি শরীয়ত ও বিধানের মালিক, যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহ-প্রদত্ত রৌশনীর। আলোকে পরিচালিত হতো, যারা দুনিয়ার বুকে হক ও ইনসাফের পতাকাবাহী ছিলেন, যারা রাজত্ব ও নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন নবুওত ও রিসালতের সুদৃঢ় নৈতিক ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণ ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আত্মশুদ্ধি। লাভের পর, যারা কোন জাতির খেদমতগুযার এবং কোন বংশ ও দেশের প্রতিনিধি ছিলেন না, যাদেরকে ভারসাম্যময় মেযাজ ও উপযোগী স্বভাব-প্রকৃতি দান করা হয়েছিল। এই দলের অস্তিত্ব মানব জাতির সার্বিক ধ্বংসের রাস্তায় তাৎক্ষণিক প্রতিবন্ধক হিসাবে দেখা দেয় এবং ক্রমান্বয়ে মানবতাকে কয়েক শতাব্দীর জন্য সেই সব ফেতনা-ফাসাদ ও সমূহ বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দেয় যা বিশ্বের বুকে ছেয়ে ছিল। সে মানুষকে সাথে নিয়ে সহীহ মনযিলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। তাঁদের শাসনামলে মানুষ সমান্তরাল গতিতে উন্নতি করে এবং মানুষের সর্বপ্রকার প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন শক্তি একই রূপ ইচ্ছা-অভিপ্রায় ও সৌষ্ঠবসহকারে ক্রমোন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করে এবং এমন এক পরিবেশ কায়েম হয় যেখানে মানুষের জন্য খুব সহজেই আপন পরিপূর্ণতায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়।

এই দলটির প্রভাবে জীবনের ধারা ও পৃথিবীর গতিপথ পাল্টে যায়। বিপুল বিস্তৃত আকারের আত্মহত্যা এবং বিশ্বব্যাপী গতিধারা আল্লাহ-বিস্মৃতি ও আত্মবিস্মৃতির দিক থেকে সর্বব্যাপী আল্লাহ-পরস্ত্রী ও আত্মপরিচিতির দিকে বদলে যায়। মানুষের মেযাজ, বোধ-বুদ্ধি ও দি যায় পাল্টে। ভ্ৰান্ত নৈতিক মূল্যবোধ ও মিথ্যা পরিমাপের পরিবর্তন ঘটে। উন্নত নৈতিক ও চারিত্রিক আদর্শ মানদণ্ড হিসাবে বিবেচিত হতে থাকে। জীবন-যিন্দেগী ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নিমিত্ত নির্ভেজাল ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষামালা তুলাদণ্ডের মর্যাদা লাভ করে। এই সভ্যতার যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের সাথে নৈতিক চরিত্র ও প্রকৃষ্টতারও উত্থান ঘটে এবং বিজয়ের বিস্তৃতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতারও একইভাবে বিস্তার ঘটে। ধর্মীয় সম্বন্ধ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ঐক্য এবং সমঝোতা-সম্প্রীতি ও প্রেমপ্রীতি পৃথিবীটাকে সাক্ষাত বেহেশতে পরিণত। করে যেখানে পারস্পরিক শক্তি পরীক্ষা ও লড়াই-ঝগড়া ছিল না। খোদাপরস্তী ও পাক-পবিত্রতার রাস্তা যা জাহিলিয়াত যুগে কাটায় ভর্তি ছিল এবং দীর্ঘকাল থেকে নির্জন ও জনশূন্য অবস্থায় পড়েছিল, বিপদমুক্ত রাজপথে পরিণত হয় যেই পথের ওপর দিয়ে কাফেলা নির্ভয়ে পথ চলত। আল্লাহর আনুগত্য যা প্রথমে মুশকিল ছিল এখন তা সহজ এবং নাফরমানী যা প্রথমে সহজ ছিল এখন তা কঠিন হয়ে গেল। দীনের প্রতি দাওয়াতের মধ্যে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণ এবং নৈতিক প্রশিক্ষণ ও সংস্কার-সংশোধনের মধ্যে ক্রেনের শক্তি সৃষ্টি হয়ে যায় যা লক্ষ কোটি মানুষকে পশু জীবন ও চারিত্রিক অধঃপতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতির শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছিয়ে দেয়। মানুষের মেধা, জ্ঞানের চরমোকর্ষ ও স্বভাব-প্রকৃতির উদ্দাম গতি যা দীর্ঘকাল থেকে নষ্ট হচ্ছিল কিংবা অপাত্রে ব্যয়িত হচ্ছিল তা সঠিক দিক অবলম্বনপূর্বক পৃথিবীকে প্রকৃত উন্নতি ও অগ্রগতি দান করে। মোটকথা, মনুষ্য কাফেলা মনযিলে মকসূদের নিকটবর্তী হয় এবং এর সম্মুখ ভাগ মনযিলে পৌঁছে যায়।