hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩৪

জাতীয়তাবাদের সীমারেখা

য়ুরোপের সাম্রাজ্য ও জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজেদেরকে একটি স্থায়ী জগত ধরে নিয়েছে। আল্লাহ পাক পাহাড়-পর্বত ও নদ-নদীর যেই প্রাকৃতিক সীমা কায়েম করে দিয়েছেন এর বাইরে তারা নিজেদের চারপাশে রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃত্ত টেনে দিয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে এই বৃত্তের বাইরে অন্য কোন পৃথিবী ও মানুষের অস্তিত্ব নেই। তাদের কাছে এই বৃত্তের বাইরে অবস্থিত কোন কিছুই সম্মান ও মর্যাদাযোগ্য নয়। তারা নিজেরাই নিজেদেরকে এক স্থায়ী উপাস্য দেবতা বানিয়ে নিয়েছে এবং ইবাদত-বন্দেগী ও পবিত্রতার যতগুলো সম্পর্ক আবৃদ ও মা'বুদ তথা গোলাম ও উপাস্য প্রভুর মধ্যে হওয়া দরকার বা হওয়া উচিত, তারা এই স্বকপোলকল্পিত মাবুদের সাথে কায়েম করে নিয়েছে। এরই জন্য তাদের যত সব কুরবানী, এরই নিমিত্ত তাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও লড়াই-সংঘর্ষ, এরই খাতিরে তাদের বাঁচা ও মরা। একে ভেট দেবার জন্য তারা দেদার ও এন্তার মানুষের খুন ঝরিয়ে থাকে। এই জাতীয়তাবাদী ধর্মের সর্বপ্রথম আকীদা-বিশ্বাস হলো এই জাতি সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকার পাবার অধিকার রাখে এবং সব কিছুর ওপর জাতি ঊর্ধ্বে এবং জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য সব কিছুর ওপর। এই জাতি থেকে উত্তম, অভিজাত, মেধার অধিকারী, শক্তিশালী, শাসন করার, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করবার, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ওপর খবরদারী ফলাবার, অভিভাবকত্ব করবার এবং বিশ্বের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার ভূপৃষ্ঠের বুকে অন্য কোন জাতির নেই। এর নদীর পানি অমৃতের ন্যায়, এর মাটি মাটি নয়, সোনা আর এর কাটা কাটা নয়, ফুল। এই জাতীয়তাবাদরূপী ধর্ম কোন মানুষকে কোন দেশে থাকার ও বসবাসের ততক্ষণ পর্যন্ত অনুমতি দেয় না। যতক্ষণ না সে এর ওপর ঈমান আনে।

জাতি পূজার এই বীজ একই ধরনের চারা, পাতা ও ফল জন্মায়। এটা সম্ভব নয় যে, কোন জাতিগোষ্ঠী জাতি পূজায় বিশ্বাসী, অথচ সে অপর জাতির দিকে হাত বাড়ায় না, কিংবা বাড়াতে চায় না এবং নিজেদের ছাড়া অন্যদের ঘৃণা করে , অবজ্ঞার চোখে দেখে না কিংবা অপরকে ছোট ভাবে না। এসবের থেকে তারা মুক্ত ও পবিত্র। যেমন এক ব্যক্তি পেয়ালার পর পেয়ালা মদ পান করবে, অথচ সে মাতাল হবে না, তার নেশা ধরবে না - এটা যেমন অসম্ভব ঠিক তেমনি ওটাও অসম্ভব।

درمیان قعر دریا تخته بنده کرده

بازی گری که دامن ترمكن هشیاد باش

“তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সাগর মাঝে বেঁধে মোরে দিলে তক্তায়

বলে দিলে ফের সাবধান যেন আঁচল ভিজে না যায়।”

বিশেষত যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, কাব্য, দর্শন, ইতিহাস, এমন কি যখন প্রকৃতি বিজ্ঞান এই জাতীয়তাবাদী নেশাকে আরো শাণিত ও ধারালো এবং এই মদকে আরও উত্তেজক বানাতে থাকে এবং সর্বপ্রকারে জাতির মধ্যে বংশীয় অহংকার ও অহমিকাবোধ, নিজেদের অতীত নিয়ে গর্ব ও অহংকার লালন করতে থাকে এবং কোন ধরনের নৈতিক ও ধর্মীয় বাধা-প্রতিবন্ধকতা থাকে না, আর নেতৃত্বও যখন সে সব লোকের হাতে থাকে যাদের জাতীয় মর্যাদা ও শান-শওকত ভিন্ন আর কোন লক্ষ্য থাকে না, তখন তা যে কী মারাত্মক রূপ ধারণ করে তা বলাই বাহুল্য।