১
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?
লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২১
বৌদ্ধ মতবাদ এবং এর পরিবর্তন ও বিকৃতি
বৌদ্ধ মতবাদ তার সহজ সারল্য ও আপন বৈশিষ্ট্য অনেক আগেই খুইয়ে ফেলেছিল। বৌদ্ধ ধর্ম ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে এবং তার অবতার ও দেবতাসমূহকে আত্তীকরণ করে নিজের অস্তিত্বকেই হারিয়ে ফেলেছিল। গুস্তাভ-লী-বন তমদুন-ই হিন্দ বা Indian Civilisation নামক গ্রন্থে এমত মতই প্রকাশ করেছেন। ব্রাহ্মণ্যবাদ তাকে হজম করে আত্তীকরণ করে ফেলেছিল। যা-ই হোক, দীর্ঘ কাল থেকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে চলে আসা এই দুটো ধর্ম একাকার হয়ে গিয়েছিল। বৌদ্ধমতবাদ মূর্তি পূজার ধর্মের রূপ পরিগ্রহ করে। যেসব দেশেই এই ধর্মের অনুসারীরা গেছে সেখানেই তারা মূর্তি সাথে নিয়ে গেছে এবং যেখানেই যেত সেখানেই যে কাজটি তারা সর্বপ্রথম করত তা হলো গৌতম বুদ্ধের মূর্তি স্থাপন এবং তার প্রতিকৃতি ও প্রতিমূর্তি তৈরিকরণ। তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন ঐসব প্রতিমূর্তি ও প্রতিকৃতি দ্বারা ঢাকা দেখতে পাওয়া যায়।১
এসব প্রতিমূর্তি ও প্রতিকৃতি বেশির ভাগ বৌদ্ধ মতবাদের উৎকর্ষের যুগেই নির্মিত হয়েছিল। অধ্যাপক ঈশ্বর টোপা তদীয় ভারতীয় সংস্কৃতি’ (হিন্দুস্তানী তমদুন) নামক গ্রন্থে বলেনঃ
“বৌদ্ধ মতবাদ (ধর্ম)-এর ছত্রছায়ায় এমন রাজত্ব কায়েম হয় যার ভেতর অবতারের ছড়াছড়ি এবং মূর্তিপূজার অবাধ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব দেখা যেতে লাগল। সংঘসমূহের পরিবেশ পরিবর্তিত হয়ে তার ভেতর ধর্মের নামে নিত্য-নতুন প্রথা-পদ্ধতি একের পর এক দৃষ্টিগোচর হতে থাকল।”২
পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু তাঁর The Discovery of India গ্রন্থে বৌদ্ধ মতবাদের বিকৃতি ও ক্রমাবনতির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ
“ব্রাহ্মণ্যবাদ বুদ্ধকে অবতার বানিয়েছিল। বৌদ্ধ মতবাদও তাই করল। সংঘ খুবই সম্পদশালী হয়ে ওঠে এবং গোষ্ঠীর বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির আখড়ায় পরিণত হয়। সংঘের ভেতর নিয়ম-শৃঙখলার কোন বালাই ছিল না। উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে যাদু ও নানারূপ অলীক কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটে এবং ভারতবর্ষে সহস্র বর্ষব্যাপী নিয়ম মাফিক চালু থাকার পর বৌদ্ধ মতবাদের অবনতি শুরু হয়।” এই সময় তার যে রোগাক্রান্ত অবস্থা বিরাজ করছিল তার বর্ণনা দিতে গিয়ে Mrs. Rhys Davids বলেনঃ
[১. বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন রাজধানী তক্ষশীলার যাদুঘর পরিদর্শনকারী একজন দর্শক ঐসব মূর্তি ও প্রতিমূর্তি (পরবর্তী পৃষ্ঠা দ্র.)]
[২. ঈশ্বর টোপাকৃত হিন্দুস্তানী তমদুন (উর্দু)']
“এসব রোগাক্রান্ত কল্পনাপ্রবণতার গভীর ছায়ার নীচে পড়ে গৌতম বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষা দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়, একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শের জন্ম ঘটে এবং তা বিস্তার লাভ করে। এরপর তদস্থলে আরেকটি ধারণা জন্ম নেয়। অতঃপর পদে পদে এক একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিতে থাকে, এমন কি গোটা পরিবেশের মধ্যে মস্তিষ্কপ্রসূত এই ধূম্রজাল ছেয়ে যায় এবং বৌদ্ধ ধর্মের উদ্গাতার সহজ সরল ও সমুন্নত নৈতিক শিক্ষা ঐসব কাল্পনিক সূক্ষ্ম জটাজালের নিচে চাপা পড়ে যায়।১ সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধ মতবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ছিল পতনোন্মুখ এবং এগুলোর মধ্যে অনেক নীচ জাতীয় প্রথার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। ফলে এ দুটির মধ্যে পার্থক্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ মতবাদ ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে একীভূত হয়ে গিয়েছিল।”২
মোদ্দাকথা, চীনসহ বৌদ্ধ মতবাদের অনুসারীদের কাছে বিশ্বের জন্য দেবার মত কোন পয়গাম ছিল না যার আলোকে গোটা বিশ্ব তার সমস্যাবলীর সমাধান খুঁজতে পারে এবং আল্লাহপ্রদত্ত সহজ-সরল রাস্তা পেতে পারে। চীনারা সভ্য দুনিয়ার একেবারে পূর্ব প্রান্তে নিজেদের তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে আঁকড়ে ধরে ছিল যাদের মধ্যে না ছিল নিজেদের বাড়তি কিছু পাওয়ার আকাঙক্ষা আর না ছিল অন্যদের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধতর করার কোনরূপ যোগ্যতা।
[(পূর্ব পৃষ্ঠার পর) পরিদর্শনের পর বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন যা বৌদ্ধ ধর্মের মাটির নিচে চাপাপড়া শহর সমূহ খননের পর আবিষ্কৃত হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, এই ধর্ম ও সভ্যতা নির্ভেজাল মূর্তি পূজার ধর্ম ও সভ্যতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। গুস্তাভ লী বো ভারতবর্ষে বৌদ্ধ প্রাসাদ, দালান-কোঠা ও স্মৃতিস্তম্ভসমূহ দৃষ্টে এমত সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন। তিনি তদীয় ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি নামক গ্রন্থে বলেনঃ
আসল বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে অবহিত হওয়া ও উপলব্ধি করবার জন্য এই ধর্মের গ্রন্থাদি নয়, বরং স্মারক চিহ্নসমূহ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। স্মারক চিহ্নসমূহ থেকে যেই শিক্ষা আমরা পাই তা পুস্তক থেকে প্রাপ্ত যা য়ুরোপীয় লেখকগণ শেখানো শিক্ষা থেকে একেবারেই পৃথক। এসব স্মারক চিহ্ন প্রমাণ দেয় যে, যে ধর্মকে য়ুরোপীয় পণ্ডিতগণ ইলহাদী তথা খোদাদ্রোহী ধর্ম বলেন বাস্তবে তা মূর্তিপূজা ও বহু উপাস্যের ধর্মের শিরোমণি। (তদুনে হিন্দ, পৃ. ২৬৫)
[১.Discovery of India, P. 201, 203. ]
[২. প্রাগুক্ত; ]
এসব প্রতিমূর্তি ও প্রতিকৃতি বেশির ভাগ বৌদ্ধ মতবাদের উৎকর্ষের যুগেই নির্মিত হয়েছিল। অধ্যাপক ঈশ্বর টোপা তদীয় ভারতীয় সংস্কৃতি’ (হিন্দুস্তানী তমদুন) নামক গ্রন্থে বলেনঃ
“বৌদ্ধ মতবাদ (ধর্ম)-এর ছত্রছায়ায় এমন রাজত্ব কায়েম হয় যার ভেতর অবতারের ছড়াছড়ি এবং মূর্তিপূজার অবাধ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব দেখা যেতে লাগল। সংঘসমূহের পরিবেশ পরিবর্তিত হয়ে তার ভেতর ধর্মের নামে নিত্য-নতুন প্রথা-পদ্ধতি একের পর এক দৃষ্টিগোচর হতে থাকল।”২
পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু তাঁর The Discovery of India গ্রন্থে বৌদ্ধ মতবাদের বিকৃতি ও ক্রমাবনতির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ
“ব্রাহ্মণ্যবাদ বুদ্ধকে অবতার বানিয়েছিল। বৌদ্ধ মতবাদও তাই করল। সংঘ খুবই সম্পদশালী হয়ে ওঠে এবং গোষ্ঠীর বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির আখড়ায় পরিণত হয়। সংঘের ভেতর নিয়ম-শৃঙখলার কোন বালাই ছিল না। উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে যাদু ও নানারূপ অলীক কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটে এবং ভারতবর্ষে সহস্র বর্ষব্যাপী নিয়ম মাফিক চালু থাকার পর বৌদ্ধ মতবাদের অবনতি শুরু হয়।” এই সময় তার যে রোগাক্রান্ত অবস্থা বিরাজ করছিল তার বর্ণনা দিতে গিয়ে Mrs. Rhys Davids বলেনঃ
[১. বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন রাজধানী তক্ষশীলার যাদুঘর পরিদর্শনকারী একজন দর্শক ঐসব মূর্তি ও প্রতিমূর্তি (পরবর্তী পৃষ্ঠা দ্র.)]
[২. ঈশ্বর টোপাকৃত হিন্দুস্তানী তমদুন (উর্দু)']
“এসব রোগাক্রান্ত কল্পনাপ্রবণতার গভীর ছায়ার নীচে পড়ে গৌতম বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষা দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়, একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শের জন্ম ঘটে এবং তা বিস্তার লাভ করে। এরপর তদস্থলে আরেকটি ধারণা জন্ম নেয়। অতঃপর পদে পদে এক একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিতে থাকে, এমন কি গোটা পরিবেশের মধ্যে মস্তিষ্কপ্রসূত এই ধূম্রজাল ছেয়ে যায় এবং বৌদ্ধ ধর্মের উদ্গাতার সহজ সরল ও সমুন্নত নৈতিক শিক্ষা ঐসব কাল্পনিক সূক্ষ্ম জটাজালের নিচে চাপা পড়ে যায়।১ সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধ মতবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ছিল পতনোন্মুখ এবং এগুলোর মধ্যে অনেক নীচ জাতীয় প্রথার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। ফলে এ দুটির মধ্যে পার্থক্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ মতবাদ ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে একীভূত হয়ে গিয়েছিল।”২
মোদ্দাকথা, চীনসহ বৌদ্ধ মতবাদের অনুসারীদের কাছে বিশ্বের জন্য দেবার মত কোন পয়গাম ছিল না যার আলোকে গোটা বিশ্ব তার সমস্যাবলীর সমাধান খুঁজতে পারে এবং আল্লাহপ্রদত্ত সহজ-সরল রাস্তা পেতে পারে। চীনারা সভ্য দুনিয়ার একেবারে পূর্ব প্রান্তে নিজেদের তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে আঁকড়ে ধরে ছিল যাদের মধ্যে না ছিল নিজেদের বাড়তি কিছু পাওয়ার আকাঙক্ষা আর না ছিল অন্যদের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধতর করার কোনরূপ যোগ্যতা।
[(পূর্ব পৃষ্ঠার পর) পরিদর্শনের পর বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন যা বৌদ্ধ ধর্মের মাটির নিচে চাপাপড়া শহর সমূহ খননের পর আবিষ্কৃত হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, এই ধর্ম ও সভ্যতা নির্ভেজাল মূর্তি পূজার ধর্ম ও সভ্যতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। গুস্তাভ লী বো ভারতবর্ষে বৌদ্ধ প্রাসাদ, দালান-কোঠা ও স্মৃতিস্তম্ভসমূহ দৃষ্টে এমত সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন। তিনি তদীয় ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি নামক গ্রন্থে বলেনঃ
আসল বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে অবহিত হওয়া ও উপলব্ধি করবার জন্য এই ধর্মের গ্রন্থাদি নয়, বরং স্মারক চিহ্নসমূহ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। স্মারক চিহ্নসমূহ থেকে যেই শিক্ষা আমরা পাই তা পুস্তক থেকে প্রাপ্ত যা য়ুরোপীয় লেখকগণ শেখানো শিক্ষা থেকে একেবারেই পৃথক। এসব স্মারক চিহ্ন প্রমাণ দেয় যে, যে ধর্মকে য়ুরোপীয় পণ্ডিতগণ ইলহাদী তথা খোদাদ্রোহী ধর্ম বলেন বাস্তবে তা মূর্তিপূজা ও বহু উপাস্যের ধর্মের শিরোমণি। (তদুনে হিন্দ, পৃ. ২৬৫)
[১.Discovery of India, P. 201, 203. ]
[২. প্রাগুক্ত; ]